বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৭:৩২

ফরিদগঞ্জে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় আটক মাদ্রাসাশিক্ষকের হঠাৎ মৃত্যু নিয়ে তোলপাড়

পুলিশের দাবি, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যু ॥ পরিবারের দাবি, অপবাদ সহ্য করতে না পেরে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু

প্রবীর চক্রবর্তী।।
ফরিদগঞ্জে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় আটক মাদ্রাসাশিক্ষকের হঠাৎ মৃত্যু নিয়ে তোলপাড়

ফরিদগঞ্জে ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তার মিজানুর রহমান (৫৫) নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষকের পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই ২০২৬) ভোরবেলা পুলিশ তাকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার পর কর্মরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত মিজানুর রহমান ফরিদগঞ্জ উপজেলার কড়ৈতলী গ্রামের বাসিন্দা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা দেলোয়ার হোসেন পাটওয়ারীর জামাতা। তিনি স্থানীয় একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন এবং একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন। পুলিশের দাবি, ধর্ষণচেষ্টার মামলায় তাকে আটক করে নিয়ে আসার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

ফরিদগঞ্জ হাসপাতালে এসে লাশের অবস্থান দেখে চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার ভোর প্রায় ৬টার দিকে কড়ৈতলী গ্রামের পাটওয়ারী বাড়ি এলাকা থেকে ধর্ষণচেষ্টা মামলার অভিযুক্ত মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। থানায় নিয়ে আসার পথে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে কর্মরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক ডা. মাকসুদুল হাসান বলেন, সকাল ৫টা ৫০ মিনিট বা কাছাকাছি সময়ে পুলিশ মিজানুর রহমান নামে একজনকে নিয়ে আসে। আমরা দ্রুত তাকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। হাসপাতালে নিয়ে আসার পরও তিনি প্রায় শেষ মুহূর্তে ছিলেন। আমার ধারণা, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল। দ্রুত তাকে যাবতীয় চিকিৎসা দেওয়া হলেও তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কয়েকদিন আগে কড়ৈতলী গ্রামের ৭ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। বুধবার (২৯ জুলাই ২০২৬) দিবাগত রাতে দায়ের করা সেই মামলার ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ভোরবেলা থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহর নির্দেশে এসআই নুরুল আলম সঙ্গীয় ফোর্সসহ মিজানুর রহমানের বসতঘরে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেন। এরপর মিজানুর রহমানকে নিয়ে আসার পথে গাজীপুর বাজারে আসলে তিনি অসুস্থবোধ করেন। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই তিনি মারা যান। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর রাব্বীর উপস্থিতিতে পুলিশ মরদেহের সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

নিহতের শ্যালক, সাবেক ইউপি সদস্য আলী হায়দার উজ্জ্বল জানান, তার বোনজামাতা কড়ৈতলী বাইতুল হামদ জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও রওশনআরা নুরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। তিনি রূপসা উত্তর ইউনিয়নের মজুমদার বাড়ির শরাফত আলী মাস্টারের ছেলে। তিনি ২০০১ সাল থেকে শ্বশুরবাড়ির পাশে কড়ৈতলী বাবুর দীর্ঘর পাড়েই সপরিবারে বসবাস করতেন। এলাকায় তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।

তিনি দাবি করেন, একটি মিথ্যা অভিযোগে স্থানীয় আবুল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে আসিফ ভূঁইয়ার সহযোগী লোকজন ফেসবুক লাইভ করে। তারা তার বোনজামাইয়ের কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলো। তাদের যোগসাজশেই পুলিশ তাকে আটক করে মানসিক নির্যাতন করেছে। কোনো প্রকার তদন্ত ছাড়াই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে না পেরেই তিনি মারা গেছেন। তার পুরুষাঙ্গে ফোলা ও জখম দেখা গেছে। আমি এর বিচার চাই।

তিনি আরও বলেন, আমার বোনজামাই পুলিশের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, যেন তাকে ফজরের নামাজটা ঘরে আদায় করতে দেওয়া হয়; কিন্তু দেওয়া হয়নি। সর্বশেষ আমাকে ফোন দিয়ে জানান, তিনি কড়ৈতলী চৌরাস্তা এলাকায় রয়েছেন। এরপর তার সঙ্গে আর কথা বলতে পারিনি। আমি চাই, ঘটনার সঠিক তদন্ত হোক। তিনি অপবাদ সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুবরণ করেছেন। তবে সঠিক ময়নাতদন্ত হলেই আমরা মৃত্যু রহস্য জানতে পারবো। একই সঙ্গে একজন মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসাশিক্ষককে কেন এলাকার কিছু বখাটে ফেসবুক লাইভে এসে বিরূপ মন্তব্য করলো, আমরা তারও বিচার চাই। মামলা হলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। আদালত বিচার করবে তিনি অপরাধী না নির্দোষ।

এদিকে, আসামি আটকের সময় সিএনজি অটোরিকশাচালক কাউছার হোসেন বলেন, আমাকে রাতে জানানো হয় পুলিশের ডিউটি রয়েছে। রাত সাড়ে ৪টার দিকে কড়ৈতলী দিঘির পাড়ের মাঠে গিয়ে আমরা বৃষ্টিতে আটকা পড়ি। অনেক সময় বসে থাকার পর ফজরের আজান দিলে বৃষ্টির মধ্যেই দারোগা গাড়ি থেকে নেমে মিজানুর রহমানকে নিয়ে আসেন। তার সঙ্গে কথাবার্তা চলার সময় গাড়িটি গাজীপুর বাজারে এলে হঠাৎ করেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্রুত তাকে আমরা ফরিদগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসি। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

নিহতের ছোট ভাই আনিছুর রহমান হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার ভাই একজন নামাজি মানুষ ছিলেন। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কী এমন হলো যে দিব্যি সুস্থ মানুষটি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করলেন?

অন্যদিকে, ভুক্তভোগী শিশুটির মা-বাবা জানান, তাদের মেয়ে প্রতিদিনের মতো মিজানুর রহমান হুজুরের কাছে মক্তবে পড়তে যায়। এ সময় তাকে মক্তবঘর ঝাড়ু দেওয়ার কথা বলে অন্য শিশুরা চলে যাওয়ার পর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পর শিশুটি বাড়িতে এসে গোপনাঙ্গে ব্যথার কথা তার মাকে জানালে বিষয়টি প্রকাশ পায়। এরপর তারা স্থানীয় কড়ৈতলী বাজার ব্যবসায়ী কমিটির সভাপতি মাসুদুর রহমান, মেম্বার জিতু ও ইউপি চেয়ারম্যান রাজনের কাছে বিচার চাইলে তারা থানায় জানাতে বলেন। এছাড়া এলাকায় স্থানীয়ভাবে ঘটনাটি মিটমাট করার চেষ্টা করে একটি পক্ষ।

ধর্ষণচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তারকারী কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ নুরুল আলম জানান, রাতে ডিউটিতে থাকাকালে শিশু ধর্ষণচেষ্টার মামলাটি রেকর্ড হলে আমাকে আসামিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিযুক্তের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসার পথে গাজীপুর বাজারে তিনি অসুস্থ বোধ করেন। এরপরই তাকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।

ঘটনার পর নিহত ব্যক্তির সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির জন্য চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার তানভীর রাব্বি ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপস্থিত হন।

এছাড়া চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) লুৎফুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়