রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩১

প্রচণ্ড গরমে সুস্থ থাকতে করণীয়

ডা. আফলাতুন আকতার জাহান
প্রচণ্ড গরমে সুস্থ থাকতে করণীয়

গ্রীষ্মের শুরুতেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাপমাত্রা। ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলায় পারদ ইতিমধ্যেই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, এই তীব্র তাপপ্রবাহ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিবছরই এই তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাজপথে থাকা রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরা এখন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে। তাপমাত্রা ২৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে মানুষের শারীরিক সক্রিয়তা কমতে শুরু করে, যা দীর্ঘ মেয়াদে হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

হিটস্ট্রোক ও হিট ক্র্যাম্প

প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকি হলো হিটস্ট্রোক। এটি একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যখন শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হয়ে যায় এবং শরীর নিজে থেকে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এর ফলে মস্তিষ্ক, কিডনি ও হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

লক্ষণ

* শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়া এবং ত্বক গরম ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া।

* তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম ভাব।

* বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।

* দ্রুত হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসকষ্ট।

* মানসিক বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।

হিটস্ট্রোক ছাড়াও হিট ক্র্যাম্প বা মাংসপেশিতে টান লাগা, অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা, শরীরে লবণের তারতম্যতা, গরমের কারণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এমন সমস্যাও হতে পারে।

করণীয়

পানিশূন্যতা রোধ ও খাদ্যাভ্যাস

তৃষ্ণা না পেলেও সারা দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে যে লবণ বেরিয়ে যায়, তা পূরণে খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি বা লেবুর শরবত পান করা জরুরি। তবে অতিরিক্ত চা, কফি বা চিনিযুক্ত সোডা এড়িয়ে চলুন, এগুলো শরীরকে আরও পানিশূন্য করে। তেল-চর্বিযুক্ত ও গুরুপাক খাবার বাদ দিয়ে সহজপাচ্য ও হালকা খাবার (যেমন দই, ফল, সবজি) খান। রাস্তার ধারের খোলা শরবত বা বাসি খাবার এড়িয়ে চলুন।

বাইরে চলাচলে সতর্কতা

খুব প্রয়োজন না হলে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরাসরি রোদে না যাওয়াই ভালো। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা, চওড়া টুপি এবং সানগ্লাস ব্যবহার করুন। দীর্ঘক্ষণ টানা রোদে কাজ না করে মাঝে মাঝে ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম নিন।

পোশাক নির্বাচন

আঁটসাঁট বা সিনথেটিক কাপড়ের বদলে হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরুন। সুতির কাপড় বাতাস চলাচলে সাহায্য করে এবং দ্রুত ঘাম শোষণ করে শরীর রাখে ঠাণ্ডা।

ঘর ঠাণ্ডা রাখার উপায়

দিনের বেলা জানালার পর্দা টেনে রাখুন, যাতে সরাসরি রোদ ঘরে না ঢোকে। সূর্যাস্তের পর জানালা খুলে দিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন। অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখুন, কারণ এগুলো ঘরকে আরও উত্তপ্ত করে। দিনে একাধিকবার গোসল করা বা বারবার পানি দিয়ে মুখ-হাত মোছা শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে।

জরুরি অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা

কেউ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো নিনÑ

আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত ছায়াযুক্ত বা ঠাণ্ডা স্থানে নিয়ে যান।

শরীরের অতিরিক্ত কাপড় খুলে বা ঢিলা করে দিন।

ঠাণ্ডা পানি বা ভেজা কাপড় দিয়ে পুরো শরীর মুছে দিন। বগল, ঘাড় ও কুঁচকিতে বরফ বা ঠাণ্ডা পানি দিতে পারেন।

রোগী সচেতন থাকলে তাকে ধীরে ধীরে পানি বা স্যালাইন পান করান।

অবস্থার উন্নতি না হলে বিলম্ব না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ শুধু একটি আবহাওয়াগত পরিবর্তনই না, এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে শিশুদের তাপনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম এবং বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় তাদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, সচেতনতাই এই দুর্যোগে বাঁচার শ্রেষ্ঠ উপায়।

গরমে ঘামলেই স্যালাইন নয়

ডা. মারুফুর রহমান অপু

এক ব্যক্তি গরমের কারণে ২ দিনে ১০ প্যাকেট খাবার স্যালাইন (সঠিক নিয়মে অর্থাৎ ১ প্যাকেট আধা লিটার পানিতে) খেয়েছেন। এখন তিনি অস্বস্তি বোধ করছেন। কিছু হলেই বিশেষ করে গরমে স্যালাইন খাওয়া প্রচলিত একটি বিষয় হয়ে গেছে দেশে।

ব্যাপারটি ভয়াবহ। কারণ প্রথমত খাবার স্যালাইন কোনো কোমল পানীয় না যে, ভালো লাগলে বা না লাগলেও খেয়ে ফেলবেন। পানিশূন্যতা বিশেষ করে ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতায় দেহ থেকে বেরিয়ে যাওয়া লবণ ও পানির অভাব দ্রুত পূরণে চিকিৎসা হিসেবে ওরস্যালাইনের জন্ম, যা বাঁচিয়েছে কোটি মানুষের প্রাণ। কিন্তু এই প্রাণ রক্ষাকারী স্যালাইন যদি আপনি কারণে-অকারণে অপরিমিতভাবে খান, তাহলে তা শরীরের উপকার না করে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের জন্য দৈনিক খাবারে লবণ গ্রহণের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যকর মাত্রা হলো ৬ গ্রাম (২.৪ গ্রাম সোডিয়াম) বা আধা চামচের কম। এক প্যাকেট ওরস্যালাইনে থাকে ১.৩ গ্রাম সোডিয়াম। কেউ দুই দিনে ১০ প্যাকেট অর্থাৎ দিনে ৬.৫ গ্রাম সোডিয়াম খেলে দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্রার প্রায় ৩ গুণ বেশি হবে। এর বাইরে আমরা যে নিয়মিত খাবার খাই, তাতে প্রচুর পরিমাণে লবণ থাকে। এমনকি নলকূপ বা ডিপ টিউবওয়েলের পানিতেও কিছু মাত্রায় লবণ থাকে উপকূল এলাকায়। ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ গড়ে দৈনিক ১৭ গ্রাম পর্যন্ত লবণ গ্রহণ করেন, যা স্বাস্থ্যকর সর্বোচ্চ মাত্রার তিন গুণ।

এর বাইরেও স্যালাইন, ডাবের পানি, এনার্জি ড্রিংক, সফট ড্রিংক, লবণ মাখানো ফলসহ আরও নানাবিধ উপায়ে কত পরিমাণ লবণ যে আমরা খাচ্ছি। কারণে-অকারণে স্যালাইন বা অন্য উপায়ে অতিরিক্ত লবণ খেলে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে শরীরে।

লবণের সঙ্গে অতিরিক্ত সোডিয়াম আমাদের শরীরে ঢুকে রক্তে ও কোষের বাইরে থাকা তরলের ঘনত্ব বাড়িয়ে দেবে। যার কারণে কোষ থেকে পানি বেরিয়ে আসবে, এতে একদিকে কোষের কর্মক্ষমতা কমে যাবে অন্যদিকে কোষ থেকে পানি রক্তে চলে আসায় রক্তচাপ বাড়বে, এমনকি মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। এটি একটি ভয়াবহ বিপজ্জনক অবস্থা।

এত বললাম শুধু সোডিয়ামের কথা। এর চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করতে পারে পটাশিয়াম। মানবদেহে দৈনিক পটাশিয়াম গ্রহণের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যকর মাত্রা ৩.৫ গ্রাম। এক প্যাকেট খাবার স্যালাইনে থাকে ০.৭৫ গ্রাম। অর্থাৎ ৪-৫ প্যাকেট স্যালাইন খেলেই সর্বোচ্চ মাত্রা অতিক্রম করবে। ডাবের পানিতে এর চেয়ে বেশি পটাশিয়াম থাকে। আধা লিটার ডাবের পানিতে প্রায় ০.৯ গ্রাম পটাশিয়াম থাকে। কেউ প্রয়োজনের বেশি পটাশিয়াম গ্রহণ করলে হাইপারক্যালেমিয়া তৈরি হতে পারে। যার ফলাফল কিডনি ফেইলিওর, হার্ট অ্যাটাক ও মৃত্যু।

সুতরাং গরমে ঘেমে গেলেই বা দু-একবার পাতলা পায়খানা বা বমি হলেই খাবার স্যালাইন বা ডাবের পানি ঘন ঘন খাবেন না। শুধু পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে খেতে পারেন চিকিৎসকের পরামর্শ মতো। পানিশূন্যতার লক্ষণ হলো প্রচণ্ড পিপাসা পাওয়া, জিহ্বা আঙুল দিয়ে স্পর্শ করলে ভেজা অনুভূতি না পাওয়া, প্রস্রাব ঘন হলুদ বর্ণের এবং অল্প পরিমাণে হওয়া, মুখ, ঠোঁট, চোখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরানো, প্রচণ্ড শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি। শুধু ঘাম হওয়ার কারণে এ ধরনের লক্ষণ ছাড়াই খাবার স্যালাইন খাওয়া উপকারী নয় বরং ক্ষতিকর হতে পারে।

এ ছাড়া অতিরিক্ত লবণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির প্রথমেই থাকবে উচ্চ রক্তচাপ। সেখান থেকে উচ্চ রক্তচাপজনিত অন্যান্য শারীরিক জটিলতা, যেমন কিডনি ও হার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, হাইপারটেন্সিভ রেটিনোপ্যাথি (দৃষ্টিশক্তির সমস্যা) এবং স্ট্রোক হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৮ শতাংশই এ ধরনের অসংক্রামক রোগজনিত কারণে হয়, যার মাঝে ২০ শতাংশই আবার উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণ। সুতরাং দৈনিক খাদ্যতালিকায় লবণের পরিমাণ যাচাই করুন। কোন কোন উপায়ে প্রতিদিন মাত্রাতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করছেন তালিকা করুন। ভাত-তরকারির সঙ্গে থাকা লবণ হঠাৎ করে কমিয়ে ফেলা অনেকের ক্ষেত্রেই সম্ভব নয় কিন্তু অন্যান্য উৎস যেমন বিভিন্ন কোমল পানীয়, নাস্তা, চিপস, লবণ মাখানো ফল, সস, ভাজাপোড়া, খাবার স্যালাইন ইত্যাদি উৎস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়