শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৬ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০০:০০

জান্নাত বোরকা বাজার

আয়েশা সিদ্দিকা
জান্নাত বোরকা বাজার

(গত সংখ্যার পর)

- আবিদা ব্যস্ত তুমি?

- না, কিছু বলবে?

- হ্যাঁ। ওই কথার কোনো উত্তর দিলে না। তাই ভাবলাম ব্যস্ত। যাই হোক। একটা প্রশ্ন করার ছিল।

- হ্যাঁ বলো।

- বাসায় কেনো নালিশ করেছিলে? আমাদের মধ্যে তো নালিশ করার মতো সম্পর্ক ছিল না আবিদা।

প্রশ্ন টা শুনে আবিদার খুব রাগ হচ্ছিলো। প্রশ্ন টা তো এমন হওয়ার কথা ছিল, তুমি কী এসব বাসায় বলেছো আবিদা? কিন্তু ইরফান বিশ্বাস করেই নিয়েছে, আবিদা এইসব বলেছে।

- এটার উত্তর দিতে চাচ্ছি না। আর কিছু বলবে?

- সবকিছু ঠিকঠাক চলছে?

- কোন কিছুর কথা বলতে চাচ্ছ?

- তোমার পড়াশোনা? রিলেশনশিপ?

- রিলেশনশিপ!

- নাহিদ হোসাইন (আইসিটি স্যার) নামের লোকটা ই তো আমাকে বললো, তোমাকে সে ভালোবাসে। তোমাকে জানিয়েছে ও। তুমি তাকে আমার কথা শেয়ার করেছো।

- আর কিছু বলেছে?

- না, তারপর আর তার সাথে কথা হয়নি আমার। তার কথাগুলো শুনতে আমার বিরক্ত লাগছিলো, তাই তাকে ব্লক করে দিয়েছি।

- তাহলে রিলেশনশিপ এর কথা বলছো কেনো?

- তোমাকে আর মেসেঞ্জারে অ্যাক্টিভ দেখিনি, জান্নাত নামের একটা ফেসবুক ছিল তোমার, আমি খুলে দিয়েছিলাম, সেটায় ও মেসেজ করেছি। তুমি তো সেই ফেসবুকেও যাওনি আর। তাই ভেবে নিয়েছি ওই লোকটার সাথে রিলেশনশিপ এ গিয়েছো।

আবিদা একটু হাসলো মনে মনে। তারপর ইরফান কে উত্তর দিলো,

-হ্যাঁ এটাই তো পারো তুমি। মনে মনে ভেবে নিতে। আর তুমি নেই আমি সে ফেসবুকে কেনই বা যাব ইরফান!

- হ্যাঁ তা ও কথা। ভালোই আছো তাহলে?

- হ্যাঁ, তুমি যেমনটা চেয়েছিলে।

- তোমার চিরকুট টা এখনো সবসময় আমি সাথে রাখি আবিদা।

এই কথা টা শুনে আবিদা নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আর একটা কথা বলার মতো অবস্থায় ও সে ছিল না। চোখ দুটি বেয়ে একনাগাড়ে জল পড়ছিল। অথচ আবিদা কান্নার কারণ ও জানে না। কাপা কণ্ঠে ইরফান কে শেষ বারের মতো বলল, - রাখছি ইরফান। একটু কাজ আছে। ভালো থেকো।

তারপর ইরফান কয়েকদিন আবিদা কে একনাগাড়ে কল করেছে। আবিদা ইচ্ছে করেই রিসিভ করেনি। আবিদার আর কখনো ইরফানের সাথে কথা বলার সাহস ই হয়নি। ভয় টা কীসের ছিল? আবিদার ভয় ছিল অবিশ্বাসের, যদি সব সত্যি বলার পরেও ইরফান বিশ্বাস না করে! তাহলে সে পরিস্থিতিতে আবিদা নিজেকে সামলাতে পারবে না। আবিদার আরও ভয় ছিল কেঁদে ফেলার। যে দুর্বলতা টা আবিদা দেখাতে চায় না ইরফান কে। আবিদা সব সত্যি কথা বললে আবার তাদের সম্পর্ক টা ঠিক হয়ে যেত হয়ত। কিন্তু এমন নিজে নিজে সবকিছু ভেবে নেয়া মানুষকে আবিদা চায় না, শুধু মাত্র আবার কষ্ট পাওয়ার ভয়ে। অথবা আবিদা কখনো ব্যাখ্যা করতেই পারবে না। প্রচণ্ড রাগ অথবা অভিমান, সব ক্ষেত্রেই আবিদার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য, প্রতিক্রিয়া ও বলা যায়, তা হচ্ছে থেমে যাওয়া। রাগ অথবা অভিমান প্রকাশের একেক জনের একেক রকম ধরন, আবিদার ধরন হচ্ছে সে থেমে যায়। আবিদা এমন ইরফান কে চেয়েছিলো, যে সবকিছুর আগে আবিদা কে বিশ্বাস করবে। কিন্তু ইরফান তা কখনোই করতে পারবে না। তারপর আরও কয়েক বছর কেটে গেলো। জান্নাতের বয়স এখন পাঁচ বছর। জান্নাত এখন স্কুলে পড়ে। জান্নাতের আরোও একটা বোন হয়েছে। তখন অবশ্য আবিদা গ্রামে ছিল না। নাম রাখতে তাকে কেউ আর বলেনি। জিল্লুর রহমান কে আবিদার প্রায়ই মনে পরে। বেচারা ফোন ব্যবহার করেন না। তাই আবিদার সাথে কথা হওয়ার কোনো উপায় নেই। আবার গ্রামে গেলে দেখা হওয়ার ও উপায় নেই, খুব কম দেখা হয়। বছরে একবার হতে পারে। কারণ আবিদা যখন গ্রামে যায় প্রায়ই তিনি তাবলীগ এ থাকেন। আবিদা এখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার প্রায় শেষের দিকে। বছর খানেক পরেই শেষ হয়ে যাবে। প্রতিবার ছুটিতে গ্রামে গেলে জান্নাতের সাথে দেখা করা টা তার অবশ্যকর্তব্য বলে মনে হয়। আর এই পিচ্চি মেয়েটা আবিদাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসে সাত বছর আগের দিনগুলো থেকে। আজকে আবিদার রুমমেট এর জন্মদিন। হাতঘড়ি উপহার দিবে ঠিক করেছে। তাই অনেকদিন পরে পাটুয়াতলী যাওয়া। পাটুয়াতলী থেকে ঘড়ি কিনে ফেরার সময় হাতের ডান পাশে একটা দোকানের দিকে চোখ আটকে গেল। দোকানের কোনো পণ্যের দিকে নজর পড়েনি। সন্ধ্যায় লাল আলোতে জ্বলজ্বল করছে দোকানের নাম টা। সেই নামের দিকে আবিদার নজর পড়েছে। দোকানের নাম “জান্নাত বোরকা বাজার”। নাম টা আবিদা কে থামিয়ে দিয়েছে কিছুক্ষণের জন্য। মস্তিষ্ক তাকে সাত বছর আগের সেই দিনগুলো তে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো। দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর পেরিয়ে যায়। কিন্তু কিছু মুহূর্ত, কিছু কথা, কিছু মুখ, মস্তিষ্কের নিউরন আজীবন ধারণ করে রাখে। কিছুতেই তা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায় না। জীবন জীবনের গতিতে চলতে থাকে। তবুও হুট করে কখন যে অজানা ঘোরে ডুবে যায় মন, তা কেউ বুঝতেই পারে না। আবিদার দোকানের দিকে তাকিয়ে প্রথমে ইরফানের মুখ টা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। তারপর ইরফানের মুখে জান্নাত নাম টা যেন এখনো শুনতে পাচ্ছে আবিদা। এরপর আবিদার পুঁচকে জান্নাত এর কথা মনে পড়লো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সামনে এগিয়ে গেল আবিদা। যেতে যেতে ভাবছে জান্নাত যতদিন বেচে থাকবে, ততোদিন পৃথিবীতে বেচে থাকবে আবিদার ভালোবাসা। এটা ভেবে আবিদার আরও ভালো লাগছে,আবিদা পৃথিবীতে না থাকলেও তার ভালোবাসা পৃথিবীতে বিরাজ করবে। কিন্তু ইরফান তা কখনো জানতেও পারবে না। একতরফা ভালোবাসা কত অদ্ভুত! কোনো প্রত্যাশা নেই, হতাশা নেই, চাহিদা নেই, উপহার দেয়া নেয়া নেই, মনোমালিন্য নেই, অপেক্ষা নেই, সময়ের ব্যয় নেই। শুধু মনের কোণে আক্ষেপ আর অনেক অনেক স্মৃতি জমে থাকে। আবিদার মনে হলো দোকানটা একবার ঘুরে আসা যাক। যদিও কিছু কেনার ইচ্ছে নেই। দোকানের নাম টা আবিদা কে অদৃশ্য এক শক্তিতে দোকানের দিকে টানছে। আবিদা নিজেকে আটকাতে না পেরে সে বোরকার দোকানে একরকম ঘুরতেই গেল। মানুষের জীবন সত্যিই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ভরপুর। ঠিক তেমনি এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে চলেছে আবিদার সাথে। আবিদা দেখতে পেল ইরফান একজন কাস্টমারকে জলপাই রঙের বোরকা দেখাচ্ছে। দেখেই আবিদার মনের মধ্যে অদ্ভুত ধরনের অনুভূতি হচ্ছিল। এটা কষ্টের অনুভূতি নাকি আনন্দের তা আবিদা নিজেও জানে না। প্রথমে আবিদার মনে হচ্ছিলো এখানেও হয়ত সে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে। নিজেকে চিমটি কেটে আবিদা বিষয়টি পরীক্ষা করে নিল। এবার সে বুঝতে পারলো বিষয়টি স্বপ্ন না। সত্যিই ইরফান এখানে। আরেকটু ভালো করে বোঝার জন্য আবিদা নিজের ব্যাগ থেকে চশমা টা বের করে ভালোভাবে অবলোকন করল। বারবার ইরফান কে ই দেখা যাচ্ছে। বাইরে থেকে ছোট মনে হলেও, দোকানটা বেশ বড়। চার-পাঁচ জন স্টাফ ও দেখা যাচ্ছে। আবিদা যখন শিওর হলো লোকটা সত্যিই ইরফান, তখন সাথে সাথে আবিদা দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে একজন স্টাফ কে ডাকলো। ইরফান সম্পর্কে জানার জন্য। আবিদা ভাবছে,

- ইরফান এই শপের ওউনার, আর নাম টা ইরফান ই কী দিয়েছে! আবার ভাবছে,

- এটা বেশি বেশি ভাবনা হয়ে যাচ্ছে না! ও কী এতোদিন এই নাম টা মনে রেখেছে! দোকান টার বয়স তো ছয়মাসের বেশি হবে না। এর আগের বার এসে এই দোকান টা তো দেখিনি। কিন্তু ওর এই দোকানের স্টাফ হওয়ার ও সম্ভাবনা নেই। কারণ ইরফান কখনো চাকরি পছন্দ করত না।

আবিদার এসব ভাবনাচিন্তার মধ্যে স্টাফ লোকটা দোকানের বাইরে আসলো।

- ম্যাম ডেকেছিলেন?

- হ্যাঁ। মেরুন রঙের পাঞ্জাবি পরা লোকটা এই দোকানে কী করে? সরি, কিছু মনে করববেন না। আমি জিজ্ঞেস করেছি সেই কথাও তাকে বলবেন না, প্লিজ।

- ইরফান ভাইয়ের কথা বলছেন!

- হ্যাঁ।

- উনি তো এই শপের ওউনার।

কথাটা শুনে আবিদা আর একমুহূর্ত ও সেখানে দাঁড়ালো না। সেদিন রাতে আবিদার ই-মেইল অ্যাকাউন্ট এ একটা মেইল এসেছে।

জান্নাত, তোমার দেয়া চিরকুট টার কথা মনে আছে তোমার! হয়ত ভুলে গেছো। আমি মনে করিয়ে দেই,

“ইচ্ছে করে তোমায় নিয়ে ঝড় দেখতে

বেগতিক বাতাসে উড়ে যাওয়ার উপক্রম

তোমায় আমার আটকে রাখার চেষ্টা

আর আমায় তোমার।

এভাবে দুজনেই দুজনকে জড়িয়ে কোন

এক অচেনা জায়গায়

তিন রাস্তার মাঝ বরাবর

দুজনে থেমে যেতাম যদি,

তুমি কি তোমার পথ খুঁজতে ব্যস্ত হতে?

আর আমি কি আমার!

নাকি দুজনে একই পথে হাঁটার অঙ্গীকার?

বিজলির উজ্জ্বল আলোতে আমার তোমায়

দেখার বহুদিনের অভিলাষ।

চিরকুটের প্রতিটি অক্ষর তা জানে।

তুমি কি কখনো পড়বে এই চিরকুট?

অক্ষর গুলো কি জানাবে তোমায়!

আমার গোপন অভিলাষের কথা?

চিরকুট পড়ে কী নিজের অজান্তেই

মৃদু হাসবে তুমি?

তখন তোমায় দেখতে কেমন লাগবে

তা ই ভাবছি আমি।

ঝড়ের মধ্যে ঘুম ভেঙে গেলে তোমাকে খুবই মনে পরে ইরফান।

-আবিদা।

আবিদা, তুমি কি জানো! এখনও প্রতি রাতে এই চিরকুট দেখে মৃদু হাসে ইরফান। তোমার কী সে হাসি দেখতে ইচ্ছে হয়? তোমার কী এখন আর বিজলির আলোতে ইরফান কে দেখতে ইচ্ছে হয়? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। তুমি জানো? আমার আজও খুব ইচ্ছে হয়, তোমার সুন্দর নাক, আর ডিম ডিন চোখগুলোর দিকে একনাগাড়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে। আজকে অনেক বছর পরে তোমাকে দূর থেকে এক নজর দেখার সুযোগ হয়েছে। চশমারর জন্য তোমার চোখ, আর নীল রঙের মাস্ক এর জন্য তোমার নাক আর দেখা হলো না আমার। প্রিয়তমা জান্নাত, আমি আজও একটা ভালো দিনের অপেক্ষায়, যেদিন তুমি আবার চিরকুট লিখবে আমায়। আমি ইচ্ছে করেই তোমার সামনে সে চিরকুট জোরে জোরে পড়ব বার বার, তোমার চিমটি কাটার শাস্তি পাওয়ার আশায়।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়