প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০০:০০
স্রোতের বিপরীতে

“আচ্ছা রাস্তার পাশে এরা ঘুমায়, এদের ঘুম হয়? এতো গাড়ি! শব্দ!” “শব্দের তীব্রতায় তারাই ঘুমায় শান্তির ঘুম অথচ দেখো কারো মাথার নিচে ভাঙা ইট কিংবা পানির বোতল। কনক্রিটের বিছানায় যেনো মহাকালের নিদ্রা যাপন। যদি কখনো কোনো মাতাল বড়লোক তাদের উপর দিয়ে গাড়ি তুলে দেয় তাদের আত্মাগুলো রুহের জগতেই থেকে যায়। রক্তাক্ত শরীরে মরণ যন্ত্রণা সহ্য করতে ফিরে আসে না। এক ঘুমেই পুলসেরাত।”
মুহিবের এমন প্রকোট গাম্ভীর্যমাখা কথায় চুপ হয়ে যায় রুবি। মুহিব বুঝতে পারে কথাটা খুব বেশি ভারি হয়ে গিয়েছে। পরিবেশ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে মুহিব।
“আইসক্রিম খাবে।”
“হু, খাওয়া যায়। একটা ভ্যানিলা ফ্লেভারের কাপ আইস্ক্রিম।”
ওরা হাঁটতে হাঁটতে শাহবাগের দিকে আগায়। শহর কখনো ঘুমাতে যায় না। দিন যখন ঘুমোতে যায় রাত তখন জেগে উঠে নতুন বার্তা নিয়ে। নিশাচর জেগে উঠে জীবিকার তাগিদে। নিশি রাতে রেললাইনের ইস্পাতে যে খুনিটা জীবন নিতে ছুরি ধারায় সেটাও হয়তো তার জীবিকার জন্যেই। নিজেকে আকর্ষণীয় করার জন্য অস্বাভাবিক মেকাপ নিয়ে যে জীবন্ত লাশগুলো ঘোরাফেরা করে তাও জীবিকার জন্যেই। আচ্ছা গুলশান বারে দামি মদ খেতে যাওয়া প্রাণিটি কী জন্যে রাত জাগে? নিশ্চয়ই জীবিকার জন্যে নয়। আত্ম দ্বন্দ্বে ভুগে মুহিব। রাত জাগা নিশাচরের প্রকারভেদ আছে তাইলে। রাত জাগাটাও বিলাসিতা কারো কাছে।
রুবি বড়ই সাদামাটা মেয়ে। গ্রাম থেকে শহরে পড়তে এসেছে। এতোদিনেও গ্রামীণ ভাবটা কাটেনি। সে এভাবেই থাকতে চায়। এটা যেন তার চিরাচরিত সহজাত বৈশিষ্ট্য। সে চঞ্চল যেনো গ্রামীণ ঘাসফড়িং। তার চঞ্চলতা শুধুই মুহিবের জন্য। মুহিবের একেবারে উলটো প্রজাতির। সে মুহিবের মতো রাজনীতি, দর্শন কিংবা সাহিত্য বুঝে না। আসলে সে বুঝতেই চায় না। মুহিব কয়েকবার আলোচনা করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। রুবির মতে, জীবন সহজ এবং সাধারণ। জীবনকে এতো কঠিন এবং দুর্বোধ্য শব্দে প্যাঁচানোর কী দরকার? মুহিব তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে জীবন এবং দর্শনের যোগাযোগসূত্র। সাহিত্য এবং রাজনীতির যোগসূত্র। মুহিব লেখক মানুষ। সে বোঝাতে চায় একজন লেখককে অবশ্যই কোনো না কোনো আইডিওলজি ধারক হতে হয়। একজনের লেখকের প্রত্যেকটা বাক্য একেকটা রাজনৈতিক স্টেটমেন্ট। সে যদি নিখাদ প্রেমের কবিতাও লিখে সেখানেও থাকে রাজনীতির আভাস। আইডিওলজি ছাড়া লেখক ব্যক্তিত্বহীন। মুহিব ব্যর্থ বদনে অভিমানী হয়। অতি সরল মনের এই অসাধারণ মেয়েকে বোঝানোর সাধ্য মুহিবের নেই। তবুও সে প্রেমিক। তার এই অতি সাধারণত মনের অসাধারণ প্রেমিকাকে সে ভালোবাসে। যে মেয়েটা মনে করে মুহিবের জীবনযাপনের পদ্ধতি অস্বাভাবিক এবং এমন জীবন সে চায় না তবুও কেন মুহিবের এক কথায় সে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলো! মুহিবের অদ্ভুত লাগে। মাঝে মাঝে ভয় হয়। প্রেমিকা আর যুদ্ধ যেনো একে অপরের প্রতিপক্ষ না হয়ে যায়। যেকোনো একটাকে বিসর্জন দিতে হবে। মুহিব তো আজন্ম যোদ্ধা। সে ময়দান ছাড়বে কী করে? শূন্য পকেটের মুহিবের কাঁধে মাথা রেখেই রুবি স্বপ্ন দেখে একট ছোট্ট স্বাভাবিক সংসারের। অথচ মুহিব ভিন্ন চিন্তা করে। প্রশান্ত চিত্তে সে মনে মনে গল্প গুছানোয় ব্যস্ত থাকে। রুবির উষ্ণতা থাকে স্থির করে। ভাবার জন্য ফুয়েল জোগায়। ক্লান্ত মুহিবের শার্টে ঘামের গন্ধ রুবের নাকে যায়। কয়েক দফা কথা শুনিয়ে সেই ঘামার্ত কাঁধেই নিজেকে সমার্পণ করে রুবি। মুহিব তখন ‘ধুমকেতুর’ মতো শব্দ সাজানোয় মগ্ন। একটা রুক্ষ্ম পথের পথিক হওয়া তার আজন্ম সাধনা। সে চায় তার লেখা বাজেয়াপ্ত হোক শোষকের খরগ হস্তে। সে সাহসী হতে চায়, লিখতে চায় অনন্য অবিনাশী কথামালা। যা বারবার বাজেয়াপ্ত হলেও অক্ষত থেকে যাবে কালের পাতায়। সে চায় তার ফাঁসি হোক। সত্যের অমরত্বে সে নিজেকে সমর্পণ করেছে বহু আগেই। রুবি কি তার সহযোদ্ধা হবে? সত্যের জন্য মুহিব নিজেকে উৎসর্গ করেছে। রুবি কি পারবে তাকে উৎসর্গ করতে? নাকি সেও স্বার্থপর? রুবির মাঝে মাঝে মনে হয় মুহিবের বিপ্লবী মনোভাব কোনো ফিকশন বইয়ের কাহিনির মতো। এটাই মুহিবকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়।
২
বদ্ধ ঘরে কেউ প্রবেশ করে। প্রচণ্ড মারে প্রায় অচেতন হয়ে গিয়েছিল। পুরোনো কিছু বাস্তব অবচেতন মনে মঞ্চস্থ হচ্ছিল। রক্তাক্ত বন্দির কল্পনা ভঙ্গ হয়। কে এসেছে তা বোঝার জন্য সে মনোযোগ দেয়।
কোতোয়ালি থানার অন্ধকূপ। একেবারে অন্ধকার। নামের সাথে বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে যথেষ্ট। এখানে শুধু বিশেষ অতিথিদের আনা হয়। এই অন্ধকূপ সম্পর্কে শুধুমাত্র বিশেষ কিছু অফিসারই জানে। বাকিদের কাছে এটা শুধু মিথ। থানার কোনদিকে আছে বাকিরা কেউই জানে না। এখানে যাদের আনা হয় তাদের জীবিত ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
এডিসি সাবিহা জাহান ঢুকলেন অন্ধকূপে। হাতে টর্চ। একটা স্পেশাল কেইস। অনেকক্ষণ পর চোখে আলো পড়তেই নড়ে চড়ে বসলো রক্তাক্ত শরীর। চেয়ারের দুপাশে দুটো হাত হ্যান্ডকাফ দিয়ে লাগানো। প্রায় উলঙ্গ রক্তাক্ত শরীর।
এডিসি প্রশ্ন করলেন, কী খবর মুহিব?
মুহিব পালটা প্রশ্ন করে, আজকে কত তারিখ ম্যাডাম?
ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল এডিসি, ১১ ডিসেম্বর।
ক্লান্ত দৃষ্টিতে আবারো জিজ্ঞাসা, কতটা বাজে?
এডিসি জবাব দেন, রাত ১২টা ০৫ মিনিট।
মুহিব বলে, শুভ জন্মদিন এডিসি সাবিহা জাহান রুবি! আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
এডিসি জবাব দেয় না। মুহিব বলে, কী হলো ম্যাডাম? ধন্যবাদ দিবেন না?
এডিসি রুবি কথা বলে, তুমি জানো? আমি এখানে এতো রাতে কেনো এসেছি?
মুহিব বলে, অবশ্যই নিজের স্বামীর প্রতি দয়া দেখিয়ে স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হতে না?
মুহিব হাসে। কিন্তু হাপিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে মুহিব। তারপর বলে, এনকাউন্টারে নাতো? তাই যদি হয় এটা আপনার ১১ নম্বর এনকাউন্টার হবে। টোটাল। অফিশিয়াল এবং আনঅফিশিয়াল মিলিয়ে। কে কতজন খেয়ে দিচ্ছো তার হিসেব বিপ্লবীরা জানে। খুন করে তারপর নিউজ ছেপে দেন যে, বন্দুকযুদ্ধে কুখ্যাত সন্ত্রাসী নিহত। আমার বেলায় কী লিখবেন? আমার সবচেয়ে কাছের দুজন তোমার হাতে খুন হয়েছে। রঞ্জ ও আতিক। তারা সন্ত্রাসী ছিল না। তারা আপনাদের ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলো। লড়ে ছিল সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য। নিজের বত্রিশতম জন্মদিনে প্রমোশন পাওয়ার এমন লোভনীয় উপলক্ষ্য একেবারে দারুণ ব্যাপার! তাও আবার নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রুকে পেয়েছেন। প্রতিশোধ এবং পদোন্নতি দুটোই। জন্মদিনের তোফা হিসেবে আমার চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?
এডিসি রুবি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে, চুপ করো। তুমি আমার শত্রু নও। শত্রু হলে কবেই তালাক নিতাম। জীবনে দ্বিতীয় কাউকে মেনে নিতে পারবো না। মুহিব হাসে। উপহাসের অট্টহাসি। দ্বিতীয় কাউকে মেনে নিতে পারনি! আবারো মুহিবের অট্টহাসি। তোমাকে যে মেনে নিতেই হবে, প্রিয়। যেভাবে আমাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্তটি মনে নিয়েছ। যেভাবে আমি মেনে নিয়েছি আমার জীবনে আপনার বাহ্যিক অনুপস্থিতি। যাই হোক আপনার ঊর্ধ্বতন বসেরা নিশ্চয়ই আপনাকে একটা তথাকথিত দাগী ক্রিমিনালের সাথে বিরহ মন্থনের জন্য প্রেরণ করেনি? কাজের কথায় আসেন।
তুমি কেন এসব করছো? তোমার কাছে যা জানতে চাওয়া হচ্ছে বলে দাও। রাজসাক্ষী হও। তোমাকে বের করার সমস্ত দায়িত্ব আমার। তুমি কী জানো, গত পনেরো দিন যাবৎ তুমি নিখোঁজ? তোমাকে গুম করা হয়েছে। তোমার পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষ তোমাকে পাগল হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর আমি খুনি না। আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করছি।
দায়িত্ব, হা হা হা। আপনার মনে আছে? আপনি একদিন বলেছিলেন, মানুষকে যদি সাহায্য করতে চাও তবে অনেকভাবে করতে পারো। আগে নিজেকে একটা জায়গায় নিয়ে যাও। আমাকে কী বলতো পারেন বাংলাদেশে চাকুরি ক্ষেত্রে বিসিএসের চেয়ে বড় সাফল্য আর কী আছে? আপনিতো মাশাআল্লাহ র্যাংক করে পুলিশ ক্যাডারে এসেছেন। এসে কী করেছেন মানুষের জন্য? প্রতিনিয়ত ফ্যাসিস্ট সরকারের দাসত্ব করছেন। জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে, জনগণের টাকায় বুলেট কিনে জনগণের বুকেই চালাচ্ছেন। ফ্যাসিস্টকে অ্যাসিস্ট করাই আপনাদের দায়িত্ব। আমিও তো জনগণের সেবা করতে চেয়েছিলাম। প্রশাসন ক্যাডারে পাস করেও কেন নিয়োগ পেলাম না বলতে পারেন?
রুবি বলে, তোমার বিরুদ্ধে মামলা ছিল।
আবারও মুহিবের অট্টহাসি। নিরাপরাধ কিছু ছেলেকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যে মিথ্যা মামলাটা দিয়েছিলো, সেটার কথা বলছো? আপনিতো খুব কেঁদেছিলেন। খুব অভিশাপ দিয়েছিলেন। আপনি কি জানেন এখন কত মানুষ আপনাকে অভিশাপ দেয়? সে সময়ে আপনার লেখা চিঠিগুলো এখনও আছে।
রুবি সিরিয়াস হয়। মুহিব আমি তোমার সাথে গল্প করতে আসিনি। তোমাকে নিয়ে চরম পর্যায়ের পরিকল্পনা হচ্ছে। এসিডে ঝলসানোর কথা হচ্ছে। দয়া করে তুমি যা জানো বলে দাও। আমি একা এসেছি তোমার সাথে খোলামেলা কথা বলার জন্য। আমি আমার চোখের সামনে এতো নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করতে পারব না। প্রয়োজনে নিজ হাতে মেরে ফেলব। কষ্ট কম হবে তোমার।
একদমে কথাগুলো বলে ফেলে এডিসি রুবি।
মুহিব হাসে উপহাসের হাসি। মুহিব বলে, তাহলে মেরে দেন। আর কি বাকি আছে? নখ গেছে, দাঁত গেছে। এখনো শুধু একটা চোখ বাকি আছে।
রুবি বলে, আমি নিরুপায়। আমি তোমার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।
মুহিব হাসতে হাসতে বলে, মানুষ ভালোও বাসে নিজের স্বার্থে। জীবনটা পর্যন্ত বিলিয়ে দেয় নিজের স্বার্থে। কেউ চায় এপারে মহান হতে কেউ চায় ওপারে স্রষ্টার সান্নিধ্যে মহান হতে। রুবি বলে, আমাকে ক্ষমা করো মুহিব।
মুহিব বলে, অহ! তাহলে শিকারেই এসেছো। সময় নষ্ট করছো কেন? তুমি আর প্রেমিকা নও, তুমিও ফ্যাসিবাদ। তো চালাও গুলি। পিঠে নয়, বুকে। হৃদয়ের ঠিক মাঝ বরাবর। এতটুকু স্বজনপ্রীতিতে তোমাকে ওএসডি হতে হবে না। আমি কাপুরুষের মরণ চাই না। একি! তোমার হাত কাঁপছে কেন? এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক। যাও তোমাকে মুক্তি দিলাম। স্বামী হত্যার অপরাধ থেকে তোমায় মুক্তি দিলাম। মানব হত্যার অপরাধ থেকেও তোমাকে মুক্তি দিলাম। তোমার ফ্যাসিবাদ তোমাকে পুরস্কৃত করুক। চালাও গুলি!
সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল থেকে গুলি চলল। পরপর দুবার। ঠিক বামপাশে। হৃদয়ের মাঝ বরাবর। একদিন সেই বহুদিন আগে, সালেহউদ্দিন মুহিব তার স্ত্রীর ডান হাতটি নিজের বুকের বাপাশে হৃদয় বরাবর রেখে বলেছিলো, জানো বুড়ি, এখানে দুটো আসন রাখা আছে। একটাতে তুমি আরেকটিতে ঠিক বিপরীত পাশে আমার দ্রোহ। এডিসি সাবিহা জাহান রুবি ভালো করেই জানে, দুটি গুলি চললো ঠিকই। কিন্তু দুটো আসনের একটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। তার দ্রোহ তার ত্যাগের মধ্য দিয়ে চির অক্ষত থেকে গেছে। মুহিবের মৃত্যুপূর্ব তাকবির তার প্রাক্তন স্ত্রীর পাথর হয়ে যাওয়া হৃদয়ে একটা আফসোস রেখে গেলো। মুহিবের মৃত্যুপূর্ব তালাক শহিদের স্ত্রী হওয়ার মর্যাদাটুকু কেড়ে নিলো। মুহিব কি তাকে স্বামী ঘাতিনী হওয়ার অপরাধ থেকে মুক্তি দিলো, নাকি শহিদের স্ত্রী হওয়ার অধিকারবোধটুকু কেড়ে নিয়ে শাস্তি দিলো? পাথর ফেটে অশ্রু বের হলো। এডিসি সাবিহা জাহান রুবি পিস্তল হাতেই মূর্ছা গেলো।
বাইরে বেলীফুল গাছটায় কী সুন্দর ফুল ফুটেছে। থানাজুড়ে মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়েছে। থানার মেসে কেউ মনে হয় রেডিও শুনছে। মুহিবের লেখা রুবির সবচেয়ে প্রিয় গানটি রেডিওতে কেউ একজন খুব মিষ্টি করে গাইছে।
“যদি অভিমানে কোনোদিন চলে যেতে চাই/চিরতরে হারিয়ে যেতে দিও না/যদি বিস্মৃতি ঘটে গিয়ে সব কিছু ভুলে যাই/আমাকে ভুলে যেও না/সহযোদ্ধা হয়ে ওগো পাশে থেকো/জীবন দিয়ে আমি বিনিময় দিতে চাই।“
এই ঘটনার অনেক বছর পর। ডিআইজি সাবিহা জাহান রুবি এখন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার প্রধান। তার পোশাকে অনেক পদকের ব্যাচ। এ বছর বিশেষ ক্যাটাগরিতে স্বাধীনতা পদকে তালিকায় তার নাম এসেছে। স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তির জন্য ঘরোয়া একটা উদযাপনের আয়োজন চলছে। সরকারি অনুষ্ঠানের পরদিনই বাসার আয়োজন। ডিবিপ্রধান ডিআইজি সাবিহা জাহান রুবির স্বামী জনাব ড. হাসানুজ্জামান হাদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন সচিব। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাসায় আমন্ত্রিত। রুবি খুবই ব্যস্ত। লাইব্রেরি রুমে তেমন কারো আসার অনমুতি নেই। রুবি নিজ হাতেই লাইব্রেরি গুছায়। হঠাৎ একটি পুরোনো বই নিচে পরে। নজরুলের অগ্নিবীণা। রুবি থমকে যায়। ধীরে ধীরে বইটি হাতে নেয়। কাঁপা হাতে সে বইয়ের মলীন কভারটি খুলে। একটি স্টিকি পেপার আটকানো। বোল্ড কালো কালিতে একটি কবিতা লেখা আছে। মুহিবের কবিতা!
আমারও বলতে ইচ্ছে করে, প্রিয়
এই বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় চায়ের কাপে একটু সঙ্গ দিলে ক্ষতি কী?
বিভেদের চরম অব্যর্থ দেয়াল
আমাদেরকে রেখেছে যোজন যোজন মাইল দূরে।
আমাদের পথের ভিন্নতা আমাদেরকে আলাদা সত্তায় রূপায়িত করেছে
আমাদের চিন্তার ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক
আমাদের মধুর সন্ধ্যাগুলোকে ছিন্ন করেছে
আমাদের চায়ের পেয়ালাগুলো আলাদা
আমাদের চায়ের আড্ডাগুলোও আলাদা
তোমার সন্ধ্যা কাটে প্রভু সেবায়
স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তির আনন্দ উদযাপনে
আমার সন্ধ্যা কাটে রাষ্ট্রদ্রোহী পাপীদের আড্ডাখানায়
শকুনের হাত থেকে স্বাধীনতাকে রক্ষার কুমন্ত্রণায়।
সদ্য স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত এবং ডিবিপ্রধান ডিআইজি সাবিহা জাহান রুবি মুর্ছা যায়। ৮ বছরের একটি ফুটফুটে ছেলে মা মা বলে ছুটে আসে।