প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০
দুই পাল্লার দরজা

সাল ২০২০। সবে এসএসসি পাস করেছি। স্কুলে পড়া অবস্থায় ইচ্ছা ছিল কলেজজীবনটা অন্তত নিজের এলাকা ছেড়ে বাইরে কোথাও গিয়ে পড়াশোনা করব। থাকতাম রংপুরের ছোট্ট একটি এলাকা রবার্টসনগঞ্জে।
যেই ভাবা সেই কাজ, পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার জন্য চলে এলাম গাজীপুর। ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে ভর্তি হলাম।
বরা বরই একা এক রুমে থাকতে পছন্দ করতাম। কেউ আমার সঙ্গে রুম শেয়ার করে থাকবে, সেটা মেনে নিতাম না। তাই কলেজ হোস্টেল বা প্রাইভেট মেস- কোনোটাতেই উঠিনি। জ্যাঠার এক বন্ধুর একটি বাড়ি ছিল গাজীপুরে। তিনি নিজে সেখানে থাকতেন না। কাজের সুবাদে পরিবারসহ থাকতেন রংপুরে। তার বাড়ি দেখাশোনার জন্য একজন কেয়ারটেকার ছিল।
বাড়িতে তিনটি রুম। একটায় থাকত কেয়ারটেকার, আর দুটি ফাঁকা। জ্যাঠার বরাতে সেখানে গিয়ে দুটো রুমের মধ্যে একটি পছন্দ করে ফেললাম। ভাড়া ঠিক করে রুমে উঠে পড়লাম জুলাই মাসের এক তারিখে। ভাড়া ঠিক হলো দুই হাজার টাকা। আলাদা করে আর খাট, টেবিল, চেয়ার—এসব কিনতে হয়নি। এগুলো আগে থেকেই রুমে ছিল।
বাড়িটার চারপাশে বেশ ঝোপঝাড়। কেয়ারটেকার ছাড়া আর কেউ বাড়িতে না থাকার কারণে কেমন একটা জনশূন্য উদ্যান হয়ে গিয়েছিল। শহরের রাস্তা থেকে বেশ ভেতরে বাড়িটা। সন্ধ্যা নামলেই একটা গা–ছমছমে ভাব এসে যায় শরীরে।
আমার অবশ্য তাতে কোনো সমস্যা নেই। খুব সাহসী ছিলাম তা–ও নয়, আবার খুব ভীতও না। কোলাহলমুক্ত পরিবেশ খুব পছন্দ করতাম। বাড়িটা এমন সুনসান পরিবেশে হওয়ায় সন্ধ্যা নামলেই নিস্তব্ধ হয়ে যেত চারপাশ। আমার বেশ সুবিধা হতো। ঠান্ডা মাথায় পড়াশোনা করতে পারতাম।
তবে একটা সমস্যা ছিল। রাত গভীর হলেই শুরু হয় লোডশেডিং। একবার লোডশেডিং হলে টানা আধপ্রহরের নিচে আর আসার নাম নেই। তবু মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। আর যা-ই হোক, অন্য কারও সঙ্গে তো আর রুম শেয়ার করতে হবে না; এই ভেবেই মনের ভেতর প্রশান্তি অনুভব করতাম।
দিনভর বাড়ির বাইরে কলেজ, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘোরাঘুরিতেই কেটে যেত। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে বসে যেতাম খেতে। তিন বেলা খাওয়ার জোগান দিত কেয়ারটেকার। সেই বাবদ তাকে তিন হাজার টাকা দিলেই হতো। খাবারদাবারের মানও বেশ ভালো। সকালে খিচুড়ি, সঙ্গে কখনো ডিম সিদ্ধ কখনো বা গরু, মুরগির মাংস; দুপুরে ভাতের সঙ্গে মাছ বা মাংস এবং রাতেও দুপুরের মতো একই আইটেম। ছুটির দিনে থাকত মোরগ–পোলাও অথবা কাচ্চি বিরিয়ানি।
এভাবে দুই সপ্তাহ কেটে গেল। দিনকাল বেশ ভালোই চলছিল। কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নেই। কিন্তু ঝামেলা হলো হঠাৎ এক রাতে। ৮ জুলাই মধ্যরাত। লোডশেডিংয়ের কারণে ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলতেই দেখি বিদঘুটে অন্ধকার। মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। ঝিঁঝিপোকা আর হুতুমপ্যাঁচার ডাকে অদ্ভুত এক কোরাস তৈরি হয়েছে। হঠাৎ দরজার কিসের যেন আওয়াজ হলো! দরজার পাল্লা দুটো খুলে গেল!
বিষয়টা স্বাভাবিকভাবেই নিলাম। ভাবলাম বাতাসের ধাক্কায় হয়তো খুলে গেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এল, ‘না! আমি তো দরজাটা লক করেছিলাম। লক করা দরজা খুলবে কী করে?’
পরক্ষণই নিজের মনকে শান্ত করে বোঝালাম, হয়তো ঘুমানোর সময় দরজা লক করতে ভুলে গেছি। তাই বাতাসের কারণে খুলে গেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই হঠাৎ মাথাটা কেমন বোঁ করে ঘুরে গেল। ঘরের দরজা তো দুই পাল্লার নয়, এক পাল্লার দরজা। ঠিক সেই সময় দরজার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম, দরজার পাল্লা দুটি নড়ছে।
দ্রুত মাথার কাছে টর্চ লাইট হাতড়াতে লাগলাম। পেয়েও যাই। টর্চ জ্বালিয়ে জোরে জোরে চিল্লাতে লাগলাম, ‘কেয়ারটেকার! কেয়ারটেকার!’
হাঁকতে হাঁকতে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। কিন্তু কেয়ারটেকারের কোনো সাড়া-শব্দ নেই।
কী তাজ্জব ব্যাপার! চারপাশে তাকিয়ে দেখি কোনো রুম নেই। অথচ সন্ধ্যা অবধি তো ঠিকই তিনটি রুম ছিল! এখন শুধু আমার রুম ছাড়া আর কোনো রুম নেই। শুধু রয়েছে বাড়ির সদর দরজাটা। সদর দরজার কাছে আসতেই মনে হলো, ‘একি! সদর দরজাটাও যেন পাল্টে গেছে’। ‘হ্যাঁ! আমি আমার রুমে যেমন দুই পাল্লার দরজা দেখেছি, ঠিক তেমনি।’
দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে বাড়ি থেকে বের হয়ে এক ভোঁ দৌড় দিলাম।
দম বন্ধ হয়ে আসছিল। চারদিকে শুধু ঝোপঝাড় আর ঝোপঝাড়। শহরের রাস্তার দেখা নেই। এরই মধ্যে হাঁপিয়ে গেছি। আর পারছি না দৌড়াতে। বসে পড়ি মাটিতে। হঠাৎ দূর থেকে একটি টিমটিমে আলো চোখে এসে পড়ল।
আমি আবার উঠে পড়ি। একপানে সে আলোর দিকে ছুটে চলেছি। ছুটছি আর ছুটছি। আঁধার পথ মাড়িয়ে আলোর কাছে আসতেই দেখি এ কী! এ তো আমার সেই প্রাইমারি স্কুল। যেখানে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলাম।
ওই তো একটা রুম। যার দেয়ালে লাল রং দিয়ে লেখা ‘পঞ্চম শ্রেণি’। হ্যাঁ তাই তো! এটাই তো আমার ক্লাস। যেখানে অনেকবার এসেছি। কিন্তু বাকি শ্রেণিকক্ষগুলো কোথায়? আর একটি শ্রেণিকক্ষও দেখতে পেলাম না। শুধু আমার প্রাইমারি স্কুল আর পঞ্চম শ্রেণির সেই রুম। আর কিছুই নেই।
তখনই হঠাৎ স্মৃতির দেয়ালে ধাক্কা লাগল। মনে পড়তে লাগল অনেক কথা। এই স্কুলের শেষ দিনের কথা। সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরেছিলাম, ‘এই রুমের দরজা লাথি দিয়ে ভাঙতে পারব।’ দরজাটি ছিল দুই পাল্লার একটি দরজা। যেমন দরজা দেখে আমি এতক্ষণ ভয় পেয়ে ছুটেছি। সেদিন তিনটি লাথি মেরে দরজাটি ভেঙেছিলাম ঠিকই। এরপর পালিয়ে যাই স্কুল থেকে। হেড স্যারের ভয়ে আর কোনো দিন স্কুলে ফিরে আসিনি।
হঠাৎ মনে হলো মুখে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে। চোখ খুলে দেখি মুখের সামনে কেয়ারটেকার। আমার মুখে পানি ছিটাচ্ছে। তিনি বলতে লাগলেন, ‘দুপুর বারোটা বেজে গেছে। আপনি উঠছেন না দেখে আপনার রুমে এলাম। আপনাকে অনেকবার ডাকলাম। এমনকি আপনাকে ধাক্কা দিয়েছি অনেকবার। পরে বাধ্য হয়ে মুখে পানি ছিটালাম।’
বললাম, ‘তা ভালো করেছ। শরীরটা ঝিমঝিম করছে।’
‘আপনার কি কিছু হয়েছে? খাবেন না সকালে?’
‘না, আজ আর খাব না। একটু পরই বের হব। বাড়ি যাব দুই দিনের জন্য।’
‘আচ্ছা। আপনি যেটা ভালো মনে করেন।’
দুপুরে গোসল করেই বেরিয়ে পড়লাম। হোটেলে দুপুরের খাওয়া সেরে ট্রেন ধরলাম রংপুরের। আট ঘণ্টার জার্নি শেষে পৌঁছালাম নিজ বাড়িতে। সেদিন রাতে ভালো ঘুম হয়নি। বার বার গত রাতের বিভীষিকাময় ঘটনাটি মনে পড়ছিল।
সকাল হতেই হাত-মুখ ধুয়ে বেড়িয়ে পড়লাম সেই প্রাইমারি স্কুলের দিকে। স্কুলে গিয়ে দেখি পঞ্চম শ্রেণিতে ক্লাস হচ্ছে। অনেক ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস করছে। একটা কোলাহলযুক্ত পরিবেশ। কিন্তু এ কি! সেই রুমের দরজাটার জায়গায় কোনো দরজা নেই। একদম ফাঁকা।
হেড স্যারের রুমে গেলাম। স্যারের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ হলো।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার, ক্লাস ফাইভের দরজা নেই কেন?’
স্যার বললেন, ‘কী আর বলব! ওই দরজা ঠিক করার জন্য এ যাবৎ অনেক মিস্ত্রি এনছি। কিন্তু যারাই কাজ করতে আসে তারা একদিন কাজ করে পরদিন আর আসে না। আর কাজ করবেনা বলে চলে যায়। কিন্তু কেন এমনটা করে আজ পর্যন্ত জানি না। তাই ওটা এমন ফাঁকা পড়ে আছে।’
আমি স্যারকে রাজি করিয়ে দরজাটি লাগিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিলাম। এরপর নিজ খরচে দাঁড়িয়ে থেকে দরজাটি ঠিক করে এসেছি। আমার বেলায় অবশ্য কোনো মিস্ত্রি এমন কথা বলেনি।