শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৬ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০

রাতের ট্রেন

এশতিয়াক মাহমুদ
রাতের ট্রেন

জ্ঞান ফিরতেই তীব্র ব্যথায় গুঙিয়ে উঠলাম আমি। চোখ মেলতেই দেখতে পেলাম আমার শরীরজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় ছোট-বড় নানা ধরনের ব্যান্ডেজ। বাম হাতের শিরায় স্যালাইনের সূঁচ লাগানো। গতকাল রাতের কাটাছেঁড়াগুলো ঢাকা পড়ে আছে সাদা গজের আবরণে। আমি চোখ মেলে তাকাতেই দেখতে পেলাম একটি মেয়ে বসে আছে। নিকাব পরা মেয়েটার চোখ দুটো মিলিত, ক্লান্তিতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আছে মেয়েটি। আমি হালকা কাশি দিতেই চোখ খুলে তাকালো মেয়েটি। আমার দিকে ঝুঁকে এলো খানিকটা। মেয়েটার চোখ দুটো ঝলমল করছে, আমি তার চোখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করলাম। অনভিজ্ঞ দৃষ্টিতেও মনে হলো মেয়েটার চোখ দুটো আনন্দে ঝলমল করছে!

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। চারদিকে লোকজনের ভিড় আজ কম। ট্রেন ছাড়ার আর কিছুক্ষণ বাকি। এক ঠোঙা বাদাম কিনেছিলাম, তাই নিয়েই কামরায় গিয়ে বসলাম। আপাতত এই বাদাম চিবিয়েই অর্ধেকটা পথ পেরিয়ে যাবে আমার।

ট্রেনের কামরায় আমার সিটে বসে আছি। কামরায় আমি ব্যতীত দ্বিতীয় কেউ নেই। ঈদের পরদিন বলেই হয়ত এই দশা। আমি এ কথা ভাবতেই মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক উঠলেন কামরায়। গায়ে সাদা জোব্বা, মাথায় কালো পাগড়ি বাঁধা। আতরের সুগন্ধি ভেসে এল নাকে। দেখে আগন্তুককে জবরদস্ত মাওলানা বলেই মনে হলো আমার। মাওলানা সাহেবের সঙ্গে বোরখাবৃত এক স্ত্রীলোক। আমি ধারণা- করলাম তিনি মাওলানা সাহেবের স্ত্রী। মাওলানা সাহেব সিট খুঁজতে খুঁজতে পেছনে চলে গেছেন। পেছনের দিকে সিট খুঁজে পেতেই বলে উঠলেন, ‘মা, এইতো সিট পেয়ে গেছি। এসে বসো’। আমার ভ্রম কেটে গেল। মেয়েটি মাওলানা সাহেবের স্ত্রী নন, মেয়ে বলেই ধারণা হলো আমার। অবশ্য ভাগ্নি বা ভাতিজিও হতে পারে।

আমার সিট কামরার সামনের দিকে, মাওলানা সাহেবের সিট একেবারে পেছনে। মেয়েটি গিয়ে বসলো। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে মাওলানা সাহেব আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমি সালাম দিলাম। শুদ্ধ উচ্চারণে বেশ জোরের সঙ্গেই উত্তর দিলেন তিনি। মাওলানা সাহেব বললেন, ‘বাবা, কোথায় যাবেন?’

‘ময়মনসিংহ। এক দুঃসম্পর্কের চাচার কাছে যাচ্ছি।’

‘ও আচ্ছা, কী করেন আপনি? কোথায় থাকেন?’

‘তেমন কিছুই করি না জনাব, টুকটাক লেখালেখি করি, এতে যা আসে তাই দিয়েই চলছে আমার। থাকি কমলাপুরই।’ মাওলানা সাহেব মৃদু হেসে বললেন , ‘বিবাহ করেছেন?’

আমি লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম। মাওলানা সাহেব বললেন, ‘আমার মেয়েটাও যাবে ময়মনসিংহ। আমিও যেতাম সাথে, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে যেতে পারছি না। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়ে গেছে। সিট সব খালি, এ কামরায় কি আর যাত্রী উঠবে না?’ আমি অনিশ্চিত ভঙ্গিতে ডানে-বায়ে মাথা দোলালাম। আমার মনে হলো না আর কেউ আসবে। মাওলানা সাহেব বললেন, ‘বাবা, আমি যেতে পারছি না, এদিকে কামরায় লোকও নেই। আপনি একটু মেয়েটাকে দেখবেন। ময়মনসিংহ জংশনে আমার ভাই থাকবে, ওকে নেওয়ার জন্য।’ আমি বললাম, ‘মাওলানা সাহেব, আপনি আমাকে কেন বিশ্বাস করছেন? আমিও তো কোনো দুর্ঘটনা ঘটাতে পারি।’ মাওলানা সাহেব হাসলেন। বললেন, ‘বাবা, বহু বছর ধরে মানুষের সঙ্গে চলছি, মানুষের চেহারা দেখেও অনেক কিছু বোঝা যায়। আপনাকে আমার খারাপ মানুষ মনে হয়নি। আপনি কি মেহেরবানি করে এই উপকারটুকু করবেন?’ আমি হাসি মুখে বললাম, ‘ইনশা আল্লাহ জনাব। আপনি চিন্তা করবেন না। ওনাকে আপনার ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিলাম। আপনি নিশ্চিন্ত মনে যেতে পারেন।’ মাওলানা সাহেব আমার সঙ্গে আরো কিছু কথা বলে মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

ট্রেন চলতে আরম্ভ করলো। বাতাসের গতিতে ছুটে চলেছে আন্তঃনগর ট্রেন। বাইরে তাকিয়ে দেখলাম আকাশে বসেছে অজস্র তারার মেলা। জয়দেবপুর স্টেশনে থেমেছে ট্রেন। কামরায় এখন আমি আর মাওলানা সাহেবের কন্যা ব্যতীত কেউ নেই। মনে হলো না আর কেউ উঠবে। মেয়েটার সঙ্গে এ পর্যন্ত কোনো কথা হয়নি আমার। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এক লোক পেয়ারা মাখা বিক্রি করছে। আমার লোভ হলো। আজকাল এসব জিনিসের প্রতি আকর্ষণ জন্মেছে আমার। এমনিতেও খাওয়া-দাওয়া বেড়ে গেছে। শুনেছি, মানুষের মৃত্যুর আগে আগে মুখের রুচি বেড়ে যায়, আমারও তেমন কিছু কিনা ভেবে ভয় হয় আজকাল। আমি বাইরে যাওয়ার জন্য উঠে দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই মেয়েটা পেছন থেকে বলে উঠলো, ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ আমি চমকে উঠলাম মেয়েটার কথা শুনে। এতো অপূর্ব কণ্ঠস্বর আমি আগে কখনো শুনিনি। মেয়েটার কণ্ঠে কিছুটা ভয়ার্ত ভাব খেয়াল করলাম, হয়ত ভেবেছে তাকে একা ফেলে রেখে আমি নেমে যাচ্ছি এই স্টেশনে। আমি অভয় দেয়ার সুরে বললাম, ‘এইতো এখানেই আছি, আমি এই যাবো আর আসবো।’ মেয়েটা আশ্বস্ত হলো। আমি প্ল্যাটফর্মে নেমে গেলাম পেয়ারা মাখা কিনে আনার উদ্দেশ্যে। কামরায় চারজন লোক উঠে বসে আছে। তারা বসেছে মেয়েটার সিটের পাশেই। মেয়েটা জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। লোকগুলো অশ্লীল আলাপে মত্ত। আমি পেয়ারা মাখা কিনে নিয়ে কামরায় ফিরতেই এ দৃশ্য চোখে পড়লো। আমাকে দেখে লোকগুলো বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকালো, যেন আমি এসে তাদের সাজানো খেলায় জল ঢেলে দিয়েছি। আমি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মেয়েটার ব্যাগটা তুলে নিয়ে বললাম, ‘আপনি আসুন।’ মেয়েটা আমার কথা মতো উঠে এল। আমি বাঁ দিকের সারিতে বসেছি, মেয়েটাকে আমার ডান পাশের সারির জানালার পাশের এক সিটে বসিয়ে, কিনে আনা পেয়ারা মাখা এগিয়ে দিলাম। মেয়েটা প্রথমে নিতে অস্বীকৃতি জানালো। আমি একটু জোর করতেই প্যাকেটটা হাতে নিলো মেয়েটা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার নাম?’

মেয়েটা কিয়ৎকাল ইতস্তত করে বললো, ‘আনহা!’

যাত্রাবিরতি শেষে ট্রেন চলতে শুরু করলো। আমি আর কিছু না বলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলাম। লোকটা পেয়ারা মাখাটা বানিয়েছে ভালো। অতি সুস্বাদু খাবারটা আমি গলাধঃকরণ করে ফেললাম মুহূর্তেই। খাওয়া শেষে প্যাকেটটা বাইরে ছুড়ে দিলাম, বিপরীতমুখী বাতাসের তীব্রতায় তা নিমিষেই হারিয়ে গেল দৃষ্টিসীমা থেকে। আমি আনহার দিকে তাকালাম। মেয়েটা প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বসে আছে। আমি পেছনে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, লোকগুলো লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আনহার দিকে। আমার ভেতরটা যেন মুহূর্তেই একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরির রূপ ধারণ করলো। ইচ্ছে করলো লোকগুলোকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিই চলন্ত ট্রেন থেকে। লোকগুলো সিগারেট ধরিয়েছে। কেউ বোধহয় গাঁজাও ধরিয়েছে। উৎকট গন্ধে কামরা ভরে গেছে। আনহা গুটিসুটি মেরে জানালা ঘেঁষে বসে আছে। বাইরে তাকিয়ে আছে সে। ঘড়ির কাঁটা টিক টিক শব্দে সময় পেরোনোর সংকেত দিয়ে যাচ্ছে। আমার মন মস্তিষ্কের সবটুকু ছেয়ে আছে দুশ্চিন্তায়, লোকগুলো যে কোন প্রকার অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে মুহূর্তের মধ্যেই ময়মনসিংহ জংশনে পৌঁছাতে আর খুব বেশি দেরি নেই, বড়জোর আধঘণ্টা লাগবে। আমি আড়চোখে নজর রেখে চলেছি পেছনে থাকা চারজনের উপর। হঠাৎ খেয়াল করলাম, লোক চারজনের চেহারা পাল্টে গেল। তাদের দৃষ্টি জানালার পাশে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা আনহার উপর নিবদ্ধ। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। শেষ রক্ষা বুঝি আর হলো না।

দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস। পেছন থেকে লোকগুলো উঠে দাঁড়ালো। এবার আর আড়চোখে নয়, ঘুরে তাকালাম আমি। চারজনের দুজন চাকু হাতে এগিয়ে আসছে আমার দিকেই। বাকি দুজন অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসছে আনহার দিকে। আমি তড়িৎ গতিতে উঠে গিয়ে আনহার পাশের সিট বরাবর দাঁড়ালাম। মেয়েটা এতক্ষণ বাহিরে তাকিয়ে থাকায় খেয়াল করেনি বিষয়টা। আমি পাশে এসে দাঁড়াতেই আনহা ঘুরে তাকালো পেছন দিকে। লোকগুলোকে এগিয়ে আসতে দেখে ভয়ে-আতঙ্কে চুপসে সে। আমি পকেট হাতড়ে একটা কলম বের করে দাঁড়ালাম। চাকু হাতে এগিয়ে আসা লোক দুজনের সামনের জন আমার কাছাকাছি এসে বলে উঠলো, ‘আমরা চাইরজন। আপনে একলা কী করবেন? কিচ্ছু করতে পারবেন না। তারচেয়ে আসেন, এক লগে ফুর্তি করি সামাইন্য। আপনার জানও বাঁচল আর মজাও পাইলেন।’ ঝামেলা নিশ্চিত, তাই সময় নষ্ট না করে প্রথম আঘাতটা আমিই করলাম। শক্ত করে সিট আঁকড়ে ধরে ডান পা চালালাম এগিয়ে আসা লোকটার তলপেট বরাবর। লোকটা হয়ত আমার কাছ থেকে এরকম কিছু আশা করেনি। লাথি খেয়ে পেছনে ছিটকে পড়লো সে। তার পেছনের জন সতর্ক দৃষ্টিতে আমাকে একবার পরখ করে নিল। পেছনের দুজনের চোখে লোলুপ দৃষ্টির বদলে এখন খেলা করছে ভয়ানক ক্রোধ। ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে বললো, ‘যা, কল্লাটা ফালায়া দে হারামজাদার। লাত্থি মারছে, কত্ত বড় সাহস হারামজাদার।’ লোকটা লাফিয়ে দু কদম এগিয়ে এসে আমার ডান কাঁধ বরাবর ছুরি চালালো। আমি সরে গিয়ে আঘাত এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও বিশেষ লাভ হলো না। ছুরির একটা গভীর পোঁচ লেগে গেল বুকের ডান দিকের মাংসপেশিতে। ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম, তবে দ্বিতীয়বার আঘাতের পূর্বেই লোকটার ছুরি ধরা হাতটা ধরে ফেললাম। লোকটা আমাকে ধাক্কা দিয়ে কামরার দেয়ালে চেপে ধরলো। আমার বুকের রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। লাথি খাওয়া লোকটা উঠে এসে পরপর দুবার ছুরি বসিয়ে দিল আমার বুকের ঠিক ডানদিকটায়। বলে উঠলো, ‘কইছিলাম তরে, আয়, একলগে মজা লই, ভালো কথা তর কানে গেল না। এখন মর।’ পেছনের লোকদুটোর একজন এসে হেঁচকা টানে আনহার নিকাব খুলে ফেললো। আনহা এবার চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। আমি শেষ চেষ্টা হিসেবে সর্বশক্তি দিয়ে বা দিকের দরজার দিকে ঠেলে দিলাম আমাকে ধরে রাখা লোকটাকে। তাল সামলাতে না পেরে লোকটা সোজা দরজা দিয়ে বাহিরে গিয়ে পড়ল। তার একটা তীক্ষ্ম মরণ আর্তনাদ শোনা গেল কেবল। আমাকে ছুরি মারা লোকটা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে এসে আবার ছুরি চালালো আমার দিকে। লোকটা বাঁ-হাতি, আমি ডান দিকে সরে গিয়ে সর্বশক্তিতে লোকটার ঘাড়ে আঘাত করলাম হাতে থাকা কলমটা দিয়ে। কলমের অর্ধেকটা সেঁধিয়ে গেল লোকটার ঘাড়ে। কাঁটা কলা গাছের মতো মেঝেতে পড়ে গেল লোকটা। আমি তার হাত থেকে ছুরিটা তুলে নিয়ে দৌড়ে গেলাম আনহার দিকে। একজন তাকে জাপটে ধরেছে, আরেকজন আনহার বোরখা ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে। এদিকে তাদের নজর নেই। আমি গিয়ে পেছন থেকে সম্পূর্ণ ছুরি বসিয়ে দিলাম আনহার বোরখা ছিঁড়তে থাকা লোকটার পিঠে। লোকটা চিৎকার করে উঠে পড়ে গেল মেঝেতে। শব্দ পেয়ে আনহাকে ছেড়ে দিয়ে অপরজন আমার বাম চোয়াল বরাবর শক্ত এক ঘুষি চালালো। লোকটার গায়ে প্রচণ্ড শক্তি, আমি ঘুষি খেয়ে চোখে অন্ধকার দেখলাম। পড়ে যেতে গিয়েও একটা সিট আঁকড়ে ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নেয়ার আগেই লোকটা এগিয়ে এসে লাথি হাঁকালো আমার পেট বরাবর। আমি গুঙিয়ে উঠে মেঝেতে পড়ে গেলাম। লোকটা এসে আমার হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে এলোপাথাড়ি কয়েকটা পোঁচ বসিয়ে দিল হাত আর পেটে। ফের ছুরি রেখে লোকটা আমার ঘাড়ে একটা ঘুষি দিতেই আমার সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এলো। আনহা বললো, ‘আপনার এখন কেমন লাগছে?’

আমি কোনো মতে বললাম, ‘ভালো।’

আনহা হাত মোজা আর নিকাব খুলে রেখে আমার মাথার কাছের টেবিল থেকে একটা বাটি তুলে নিয়ে বললো, ‘ডাক্তার সাহেব বলেছেন, আপনি জেগে উঠলে আপনাকে যেন দুধটুকু খাইয়ে দেই। নিন মাথাটা উঁচু করুন একটু।’

আমি আনহার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলাম। স্রষ্টা পৃথিবীর কোনো নারীকে এতোটা রূপবতী করে সৃষ্টি করতে পারেন, তা হয়ত আনহাকে না দেখলে আমার বিশ্বাসই হতো না। আমি মাথা উঁচু করতে সক্ষম হলাম না। ঘাড়ের কাছে তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে গেলাম। আনহা দুধের বাটিটা একপাশে রেখে একহাতে আমার মাথাটা আলতো করে উঁচু করে ধরে আরেকটা বালিশটা টেনে দিল মাথার নিচে। আমি আনহার কোমল স্পর্শে শরীরে এক অদ্ভুত পুলক অনুভব করলাম। আনহা বাটিটা তুলে নিয়ে চামচে করে এক চামচ দুধ আমার মুখে তুলে দিল। আমি খেয়াল করলাম আমার উপরের ঠোঁটের বা দিকের কোনাটা থেঁতলে গেছে। আনহা আমার দিকে করুণ চোখে তাকালো। হয়ত বুঝতে পেরেছে, আমার কষ্ট হচ্ছে। আমি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি ঠিক আছেন তো? আপনার কিছু হয়নি?’

আনহা মুচকি হেসে বললো, ‘নাহ, আপনি যখন শেষ লোকটার সাথে মারামারি করছিলেন, তখন আমি মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ছুরি নিয়ে লোকটার গলার পেছন দিকে আঘাত করেছিলাম। তারপর আপনার কাছে গিয়ে দেখি আপনি রক্তের ভেসে যাচ্ছেন। আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। যদি আপনার কিছু হয়ে যেতো।’ আনহা এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে করুণ চোখে তাকালো আমার থেতলে যাওয়া ঠোঁটের দিকে। আমি হালকা হাসার চেষ্টা করে বললাম, ‘কিছু একটা হয়ে গেলেও তেমন কোন ক্ষতি হতো না। তিনকূলে যার কেউ নেই, তার মৃত্যুতে কার কীই-বা আসে যায় বলুন?’ আমার কথার উত্তরে আনহা আমার দিকে তাকালো, তার দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ আগের সেই হাসি হাসি ভাবটা নেই। তার পরিবর্তে সেখানে একরাশ পুঞ্জিভূত অভিমান দেখতে পেলাম। আমি বললাম, ‘আনহা, এই যে আপনি আমার সাথে কথা বলছেন, আমাকে ধরে আধশোয়া করলেন, খাইয়ে দিচ্ছেন, আপনার চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছি। আপনার পর্দা নষ্ট হচ্ছে না?’

আনহা মুচকি হেসে বললো, ‘হচ্ছে তো।’

‘আপনার খারাপ লাগছে না?’

‘লাগছে তো, অনেক খারাপ লাগছে।’

আমি চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণ পর বললাম, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত। আপনাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছি।’

আনহা আমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, ‘আপনি কি আমাকে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে চান?’

আমি বললাম, ‘জি¦, অবশ্যই।’

আনহা মুচকি হেসে বললো, ‘তাহলে, যেন আপনার সামনে আর কখনো পর্দা না করতে হয়, আপনাকে স্পর্শ করতে কোনো বাধা না থাকে, সেই ব্যবস্থা করতে পারবেন না?’

আমি বহু সময় স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম আনহার অপরূপ মুখের দিকে। একসময় আনহার চোখে চোখ রেখে বললাম, ‘পারবো। আপনাকে পাওয়ার জন্য আমি সবকিছু করতে পারি। সব কিছু!’

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়