প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০
বসন্ত বিকেল ও টিকিট-বৃত্তান্ত

তখন মানস বা শ্রাবণী কারও হাতে মোবাইল পৌঁছায়নি। কদাচিৎ তা এসেছে শহরের অত্যন্ত বড়লোক বলতে যারা বোঝায়, তাদের হাতে। পড়াশোনায় লম্বা লম্বা ছুটি। পুরোটাই রাজনৈতিক অঘটনের ফলে। ছুতো পেলেই ‘হল খালি করো’। ছাত্র-পুলিশে প্রায়ই শহরাঞ্চলকে কেঁপে জ্বর উঠিয়ে ছাড়ে।
অনির্দিষ্টকালের জন্য হল খালি করে একটা ব্যাগ কাঁধে শ্রাবণী সোজা স্টেশনে। কিন্তু টিকিট কাটতেই যত গ্যাঞ্জামে পেয়ে বসে। মেয়েমানুষ। টিকিট শেষ অথবা ওগুলো ব্ল্যাকে চলে গেছে। একটা অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠ, ‘আপনি কি ময়মনসিংহ যাচ্ছেন?’
সংশয় মেশানো উত্তর শ্রাবণীর, ‘হ্যাঁ। আপনি...?’
‘আমিও। আমার নাম মানস। জেনারেল হিস্ট্রি, সেকেন্ড ইয়ার, জহুরুল হকের ২০৬ নম্বরে আছি। আপনি কোন হলে?’ মানস বলল।
‘আমি শামসুন্নাহারে, পঁয়ত্রিশে। টিকিট কাটবেন না?’
‘কাটব। আপনার টাকাটা দিন আমি কেটে দিচ্ছি। হ্যাব্বি গ্যাঞ্জাম, আপনি পারবেন না।’
টাকাটা দিয়ে শ্রাবণী হেসে বলল, ‘আপনাকে ঝামেলায় ফেললাম।’
‘কী যে বলেন।’ হেসে দিয়ে মানস টিকিট কাউন্টারের দিকে গেল। মানস টিকিট কেটে এনে জানাল, ‘একটিমাত্রই ছিল। ওই যে বললাম না, সব ব্ল্যাকে চলে গেছে। টিকিটটা রাখুন, ট্রেন আছে ২ নম্বর লাইনে। গিয়ে বসুন, আমি যাব আর আসব।’
পাক্কা ৪৫ মিনিট শেষ। কিন্তু মানসের কোনো খবরই নেই। গার্ড বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছে। ট্রেনের চাকা নড়ে উঠেছে। যাত্রীকে নিমেষেই চুম্বকের মতো টেনে নিয়েছে ট্রেনটা। শ্রাবণীও উঠল। পাশের সিটটা আগলে রেখেছিল মানসের জন্য। গফরগাঁও পর্যন্ত বেশ কটা স্টেশনে ট্রেন থেমেছে। কিন্তু কোথায় মানস? এত মানুষের মধ্যে একটা মেয়েমানুষ কতটুকুই-বা পারবে?
কেউ বলছে ট্রেন ব্লক দিয়েছে। মোবাইল কোর্ট। বেশ কিছু বিনা টিকিটের যাত্রী ধরা খেয়েছে। মানস কি তাহলে...? মনটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
আবার একজন স্বল্প পরিচিতের জন্য এতটা উদ্বেগের কোনো মানে আছে? টিকিট কাটার জন্য এত কষ্ট করল...। টেনশন হতেই পারে।
ময়মনসিংহ স্টেশন পৌঁছাতে বিকেল গড়াল।
একপাল ছেলে-ছোকরাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে রেলের পুলিশ। স্টেশনে নেমে শ্রাবণী দেখল, এখানেই মানসের কোমরে দড়ি বেঁধে অন্য সবার সঙ্গে বসিয়ে রাখা হয়েছে। দেখে কান্না পাচ্ছে শ্রাবণীর। দৌড় দিয়ে কাছে গিয়ে কোর্টের লোকজনকে টিকিটটা দেখিয়ে পুরো ঘটনাটা বোঝাতে চাইল। কিন্তু ওনারা একটা কথাই বলছেন, যেহেতু মানসের সঙ্গে কোনো টিকিট ছিল না, কাজেই এ ছাড়া কোনো রাস্তা খোলা নেই।
তবে মানসের ভদ্রতায় তারা মুগ্ধ। জরিমানা নামকাওয়াস্তে দিয়ে ছাড়া পাওয়ার পর মানস কৃতজ্ঞতায় বারবার নুইয়ে পড়ছিল শ্রাবণীর সামনে। শ্রাবণী অনুরোধ করল থেকে যেতে। একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে দিয়ে বলল, ‘সারা দিন আপনার খিদেয় পেট জ্বলে গেছে। আপাতত এটি খেয়ে চলুন আমার বাসায়।’
শিশুর মতো সহজভাবে বিস্কুটের প্যাকেট হাতে নিয়ে মানস বলল, ‘আমাকে প্রথমে মুক্তাগাছা, তারপর পদুরবাড়ী যেতে হবে। অনেক ঝামেলা। ঠিকানাটা লিখুন আমি বলছি,
‘মানস, প্রযত্নে: আবদুল হাকিম মাস্টার, পদুরবাড়ী, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ।’
ছোট একটা পকেট ডায়েরিতে শ্রাবণী ঠিকানা লিখল। নিজেরটাও দিল।
‘তাহলে আসি? আমার জন্য আপনার খুব কষ্ট হলো। ক্ষমা করবেন।’ মানস বিদায় নিতে চাইছে।
মৃদু ধমকে দিচ্ছে শ্রাবণী, ‘কী খালি “আপনি আপনি” করছেন। “তুমি”তে আসতে পারেন না?’
‘হ্যাঁ, পারি। কিন্তু আপনিও যে কেবল “আপনি আপনিতে আটকে আছেন...”।’
তারপর একটা যুগল হেসে উঠল প্ল্যাটফর্মে।
পশ্চিমের কমলা রঙের রোদের ছোঁয়ায় ওদের আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল বসন্তের গোধূলিবেলায়। মানস আবারও বিদায় চাইল। এবার শ্রাবণী সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলছে। ও ভেজা গলায় বলছে, ‘কাল গেলে হয় না?’
‘না, হয় না।’
‘কেন, বাড়িতে কি বউ-বাচ্চা ফেলে এসেছেন?’
‘ঠিক ধরেছেন। সত্যি কথা কি, গত মাসেই নানিজানের জেদের বশে বিয়ে করেছি একটা চতুর্দশী বালিকাকে, বুঝুন এবার।’
‘আপনাকে ফাঁসিতে দেওয়া দরকার।’ শ্রাবণী এবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে যান। যখন ট্রেনে উঠবেন, তখন একটু সতর্ক থাকবেন। নিজের টিকিট অন্য কাউকে দেবেন না। তাহলে কিন্তু খবর আছে।’
‘তোমার কথা অনেক দিন মনে রাখব। হল খুললে দেখা হচ্ছে?’
‘হ্যাঁ।’
ব্যাগ হাতড়ে একটা সিগনেচার পেন বের করে মানসের হাতে দিয়ে শ্রাবণী বলল, ‘তোমার নতুন সাথির জন্য শুভকামনা রইল।’
মানস চলে যাচ্ছে...।
হঠাৎ করেই অসংখ্য রিকশার বেল বেজে উঠল একসঙ্গে। হাঁটতে হাঁটতে কখন শহরের মাঝখানে এসে পড়েছে শ্রাবণী টেরই পায়নি। এখানে-ওখানে মাইক বাজছে। বক্তৃতা, কবিতা পাঠ আর থেকে থেকে ঝোড়ো মিছিল। বসন্তের গরম ভাপ পেয়ে আপামর জনতা তখন দুলছে।
শ্রাবণী কেবল ভাবছে, ‘আচ্ছা, মানস বিয়ে করা ছেলে এটা মিথ্যা হতে পারত, নাকি?’
আরে দূর, নিজের ওপর কৃত্রিম রাগ ধরে যাচ্ছে শ্রাবণীর।