প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০
দৃশ্যটা স্থির হয়ে আছে

নিয়ম করে পত্রিকা পড়া কবে ছেড়েছি, মনে করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। মানুষ বিরহের কথা মনে রাখতে চায় না। বিরহ শব্দটার সঙ্গে ব্যথা-বেদনার ব্যাপারস্যাপার থাকে বলেই বোধহয় এ স্মৃতি থেকে পালিয়ে বেড়াতে চায়। কিন্তু মিলনের দিনক্ষণ ঠিকই মনে রাখে। দেয়ালে বাঁধাই করে রাখে মিলনের দিন-তারিখ। ঘটা করে প্রতিবছর সেই উপলক্ষ উদযাপন করে। কেউ কখনো ভুল করেও বিচ্ছেদ দিবস উদযাপন করে না। যদিও সব বিরহই মন্দণ্ড এমন নয়। কিছু বিরহ ভালো থাকার পথ হয়তো খুলে দেয়। কাজেই ভবিষ্যতে বিচ্ছেদ দিবস উদযাপিত হবে না- এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।
ও হ্যাঁ, পত্রিকা পড়া ছেড়েছি মানে পত্রিকার সঙ্গে একপ্রকার বিচ্ছেদ ঘটেছে বলা যায়। অথচ এ পত্রিকাই ছিল একসময়ের ধ্যান-জ্ঞান। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তাম প্রতিটা পৃষ্ঠা। সিনেমার খবর কয়েকবার করে পড়া হতো। খেলার খবরেও আকর্ষণ ছিল খুব। অথচ তখন বাংলাদেশ এভাবে ক্রিকেট খেলার জগতে প্রবেশ করেনি। ফুটবলের খবরই পড়া হতো বেশি। এখন পত্রিকার সংখ্যা বেড়েছে। পৃষ্ঠাগুলো আরো রঙিন হয়েছে। কেবল আমি দূরে সরে গেছি।
ভালো খবরের অভাব অথবা খুঁজে ভালো খবর বের করার মতো সময়ের অভাব কিংবা ভালো আর মন্দের মধ্যে তফাত করতে না পারার অক্ষমতা নাকি উভয়ই আমার এ পত্রিকাণ্ডবিচ্ছেদের কারণ, তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু আমি ভাবব না। দশটা-পাঁচটা অফিস, পেঁয়াজ-রসুন-তেল-নুন এসবের বাইরে আর কিছু নিয়ে ভাবনার ফুরসত নেই।
আজ দুপুরের পর অফিসের একটা কাজে বাইরে বের হয়েছি। রিকশায় উঠব, এমন সময় ঝুম বৃষ্টি।
আকাশে মেঘ ছিল না। কাজেই হঠাৎ করে নামা বৃষ্টি অপ্রস্তুত করে দেয়। রিকশাওয়ালা আর আমি দুজনেই একটা ছাউনির মতো দেখে তার নিচে গিয়ে দাঁড়াই। আদতে এটা একটা পত্রিকার স্টল। আমরা দুজনসহ জনাসাতেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে ছাউনির তলে। পত্রিকাওয়ালা একটা চেয়ারে বসে পত্রিকার ওপর বিছানো পলিথিনের দুই প্রান্ত সামলাচ্ছে। বাকি দুই মাথায় দুটো ইটের টুকরো চাপা দেওয়া। কী মনে করে যেন পত্রিকাওয়ালার দিকে ১০ টাকার একটা ময়লা নোট বাড়িয়ে দিয়ে পত্রিকা চাইলাম। অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে তিনি পলিথিনের নিচ থেকে একটা পত্রিকা বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। পত্রিকা বেচতে পেরে লোকটার মুখ প্রসন্ন হয়ে উঠল। বুঝতে কষ্ট হয় না, অনেকের মতো তাদের দিনও ভালো যাচ্ছে না। ফেসবুক, ইউটিউব গিলে খাচ্ছে ছাপা অক্ষরের খবরের কাগজ।
বৃষ্টি ধরে এসেছে। কিছুক্ষণ বাদেই বের হওয়া যাবে। তার আগে অনিচ্ছার সঙ্গে পত্রিকার পাতা উল্টাই। সারা বিশ্বের খবরে গিয়ে থমকে যাই। ফুটফুটে একটা শিশুর ঝকঝকে ছবি ছাপা হয়েছে। ঠিক যেন অরণি! অরণি আমার একমাত্র কন্যা। ওর মতোই ছবির মেয়েটার বয়স ৯-১০ বছর হবে। টুকটুকে ফর্সা। মেয়েটার দুচোখ বন্ধ। নিষ্পাপ মুখে বিঁধে আছে ঘাতকের ছোড়া স্প্লিন্টার। বুঝি না এ পৃথিবীর হালচাল, বুঝতেও চাই না। নিরাপদ-স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাওয়ার ‘অপরাধ’ আর কত নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবে! শ্রেষ্ঠত্বের লোভে মানুষ কতটা অমানুষ হতে পারে তারই প্রতিযোগিতা যেন সর্বত্র! অথচ জীবনের স্থায়িত্ব সম্পর্কে আমরা কেউই কিছু জানি না। পত্রিকাটি ছুড়ে ফেলি। বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে থাকে পত্রিকার বুকে। সেখানটা ভিজে যায়। অক্ষরগুলো একটা আরেকটার সঙ্গে লেপ্টে যেতে থাকে। কেবল আমি অন্তর্গত হাহাকারের শব্দ শুনতে পাই। বৃষ্টির একটা ছাঁট যদি সেই হাহাকারকেও মুছে দিতে পারত, কী দারুণই না হতো!
দুই.
অফিসে, অফিসের বাইরে মিলিয়ে বেশ ধকল গেছে। শরীর ভেঙে আসছে। হাত-মুখ না ধুয়েই শুয়ে পড়ি। একটু ঘুমোতে পারলে বেশ হতো। সুরাইয়া তা হতে দেয় না, ‘এভাবে শুয়ে পড়লে যে! শরীর খারাপ লাগছে?’
‘না।’
‘তাহলে ফ্রেশ হয়ে এসো, চা দিচ্ছি।’
‘আচ্ছা।’
সুরাইয়ার কথায় সায় দিলেও ঝিম ধরে শুয়ে থাকি, ঠিক তখনই একটা ছবি মাথার ভেতরে চক্কর দিতে থাকে।
পত্রিকার পাতায় দেখা ছবিটা।
৯-১০ বছরের একটি মেয়ে- ফর্সা, গোলগাল মুখ, নিরপরাধ ঘুমে...
মাঝরাতে হঠাৎই ঘুম ভেঙে যায়। কেন জানি মনে হয়, আমার আর সুরাইয়ার ঠিক মধ্যিখানে মেয়েটা শুয়ে আছে। ধড়মড় করে উঠে বসি। আলো জ্বালাই। সুরাইয়া চরম বিরক্ত হয়।
‘এত রাতে আলো জ্বালালে কেন? কী হয়েছে তোমার?’
‘না মানে অরণিকে দেখতে ইচ্ছে হলো।’
‘এত রাতে অরণিকে দেখতে হবে না। সকালে দেখো।’
অরণি পাশের ঘরে ওর দাদিমার সঙ্গে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি নিজের অজান্তেই সেদিকে পা বাড়াই। অরণি ঠিক যেন ছবির মেয়েটার মতো করে ঘুমোচ্ছে! বুকের ভেতরটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। অরণিকে ডেকে তুলি। সুরাইয়া উঠে পড়ে। কিছু একটা বুঝতে পেরে অরণিকে আমাদের ঘরে নিয়ে আসে। দুজনের মাঝখানে শুইয়ে দেয়। বাকি রাতে আর ঘুম হয় না। অরণির মুখের দিকে তাকিয়ে রাত পার করে দিই। সুরাইয়াকে লুকিয়ে কয়েকবার ওর নাকের কাছে হাত রাখি। ঠিকঠাক শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে তো!
এরপরের রাতগুলো আমার জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। কোনো রাতেই ঘুমাতে পারি না। কেবলই মনে হয় অরণির কাছে গেলেই ওর স্থানে ছবির মেয়েটাকে দেখব। সুরাইয়া আমাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য চাপ দেয়। আমি রাজি হই না। বলি, ঠিক হয়ে যাবে। কিছুই ঠিক হয় না। ছবিটা কেবল মাথার ভেতরে দাপিয়ে বেড়ায়। আমাকে অসহায় করে তোলে। কিছু অবস্থা কাউকে বোঝানো যায় না। আমি ঠিক সেই অবস্থার ভেতর দিয়ে দিন কাটাতে থাকি।
অফিসের কাজে মন নেই, বাড়িতেও স্বস্তি পাই না। রাতে একেবারেই ঘুম হয় না। চোখের নিচে একপ্রস্থ কালো দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমাকে যে দেখে সে-ই আঁতকে ওঠে। সবার একই প্রশ্ন, এ কী হাল হয়েছে আপনার!
আমি নিজেও বুঝতে পারি, স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিঁটকে যাচ্ছি। একটা ছবিই আমার জীবনটা ওলট-পালট করে দিচ্ছে। সারাক্ষণ অরণির জন্য অস্থির থাকি। একটা ভাবনাই মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে- ওর যদি সত্যিই কিছু হয়ে যায়!
সুরাইয়ার কপালে চিন্তার ভাঁজ বড় হতে থাকে। আমার আচরণে ও রীতিমতো অতিষ্ঠ। ওর পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। সব শুনে ডাক্তার কড়া ঘুমের ওষুধ লিখে দেয়। সুরাইয়া নিয়ম করে তা খাইয়ে দেয়। আমার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। অতিমাত্রার ঘুমের ওষুধেও ঘুম আসে না। সারারাত ছটফট করতে থাকি। পৃথিবীটাকে কেমন এলোমেলো লাগে। নিষ্ঠুর মানুষের জন্য ঘৃণা হয়। কখনো একটু চোখ বুজলেই ধড়মড় করে উঠে অরণিকে খুঁজতে থাকি।
তিন.
ইদানীং অরণি আমার কাছে আসতে ভয় পায়। বাড়ির লোকজনও চায় না ও আমার কাছে আসুক।
অফিস আমাকে লম্বা ছুটি দিয়েছে। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত অফিসমুখো হওয়া যাবে না, বস স্পষ্ট বলে দিয়েছেন।
ওষুধে কাজ হচ্ছে না দেখে একের পর এক ডাক্তার বদলানো হচ্ছে। তারাও আমার অবস্থা দেখে হতাশ হচ্ছেন। শেষমেশ ডাক্তারের পরামর্শমতো আমাকে মানসিক রিহ্যাব সেন্টারে রাখা হয়। অন্যরা তাচ্ছিল্য করে যেটাকে বলে ‘পাগলাগারদ!’
সপ্তাহে এক দিন আমার সঙ্গে অরণির সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেয়েটা কোনোদিন আসে সুরাইয়ার সঙ্গে, কোনোদিন তার দাদির সঙ্গে। আমার সামনে এলেই অরণি অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কিছুটা ভয় পায় বলেও মনে হয়। ওকে আমি নানারকম প্রশ্ন করি। ও কেবল হ্যাঁ আর না দিয়ে জবাব দেয়। ওর অস্বস্তি বুঝতে পারি। কিন্তু অরণিকে ছাড়তে মন চায় না। আমার ঘরের দেয়ালে অরণির বড় বড় ছবি লাগানো হয়েছে। সব ছবিতে তার মুখে হাসি লেগে আছে। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়েই আমার দিন কেটে যায়।
গত তিন সপ্তাহ যাবৎ অরণি আমার কাছে আসে না। কর্তৃপক্ষের কাছে কারণ জানতে চাইলে তারা কোনো জবাব দিতে পারেনি। তারাও জানে না, ঠিক কী কারণে অরণি আসে না। আমার চিন্তা হয়। অরণির জন্য মন আনচান করে। পুরোনো ছবিটা আবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে...
আমার রুমের একটা রুম পরেই কর্তৃপক্ষের অফিস। ওখানে নিয়মিত পত্রিকা রাখা হয়। আমার জন্য খবরের কাগজ পড়া নিষেধ। আমি পড়তেও চাই না। জগৎ-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই বেশ আছি। কোনো বাড়তি ভাবনা নেই, যন্ত্রণা নেই, মুক্তির তাড়না নেই...
কেবল একটা ছবি... যা থেকে মুক্তি চাই...
এখানে যত্ন-আত্মির কমতি হয় না। রাতে শোবার আগে এক গ্লাস দুধ দিয়ে যায়। গ্লাসের ওপরে ঢাকনা দেওয়া থাকে। দুধে আমার অরুচি, তবু নিয়মের কারণে খেতে হয়। এখানে নিয়ম না মানার অবকাশ নেই। আজ দুধের গ্লাসে ঢাকনা নেই। বোধহয় হারিয়ে ফেলেছে। ঢাকনার কাজ পত্রিকা দিয়ে করা হয়েছে। একটা পত্রিকা ভাঁজ করে গ্লাসের মুখের ওপর রাখা। আমি দৌড়ে গিয়ে পত্রিকাটা হাতে নিই। পৃষ্ঠা উল্টে কী যেন খুঁজতে থাকি...
শেষের আগের পৃষ্ঠায় ইনসেটে একটা খবর, সেখানে একটা মেয়ের হাসিমাখা মুখের ছবি! আমার বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে ওঠে। মেয়েটা কি অরণি? অরণিই তো! আমার ঘরের দেয়ালে লাগানো একটা ছবিই এখানে ছাপা হয়েছে। কী হয়েছে অরণির! আর ভাবতে পারি না। খবর পড়ার সাহস হয় না। আমি কেবল অরণির হাসি মুখের ছবিটা সম্বল করেই বাঁচতে চাই। সেদিনের মতো করেই পত্রিকাটা ছুঁড়ে ফেলি।
আজ বাইরে বৃষ্টি নেই। আমি দরদর করে ঘামছি। দেয়ালে টানানো অরণির ছবিগুলো ঠিকঠাক আছে। কেন জানি মনে হচ্ছে অরণি আর আসবে না। ও না আসুক, ওর হাস্যোজ্জ্বল ছবিগুলো তো থাকবে! খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেগুলো দেখতে থাকি। কী নিষ্পাপ! মাথার ভেতরে এ ছবিগুলোকে স্থায়ী করে রাখতে চাই। একটা জীবন এ ছবিগুলো নিয়েই কাটিয়ে দিতে পারব। অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ছবি সেখানে না আসুক।