প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৪, ০০:০০
সুখপরশ
ফরিদুল ইসলাম নির্জন

প্রত্যন্ত অঞ্চলের বন্ধু আতিক বাবা হওয়ার অনুভূতি-কথন শেয়ার করতে চোখ-মুখ আষাঢ়ে হয়ে যায়। প্রসব বেদনাকাতর তার বউকে নিয়ে গভীর রাতে হাসপাতালে পৌঁছাবে। মাঝপথে এসে গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। কী করবে, কীভাবে পৌঁছাবে! দূর থেকে দেখা যায় সুমুদ্রের ঊর্মির মতো শুধু পাহাড়ের ঢেউ, চারপাশে বসতির কোনো ছায়া নেই। তার দুঃসাহসিকতার গল্প নিয়ে এ লেখা
মাঝপথে এসে স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল প্রাইভেট কারটির। গন্তব্য সীতাকুণ্ড হাসপাতালে। জামানের মুখ ফ্যাকাশে। হৃদয় বেড়িবাঁধে একটা বড় ধাক্কা দিল। অতল গহ্বরে তলিয়ে নিল তার স্বপ্ন। পেছনে একবার তাকিয়ে আবার চেষ্টা করল স্টার্ট দেওয়ার কিন্তু কাজ হলো না। চাবিটি ঘুরিয়ে বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ। হেমন্তের এই হালকা কুয়াশা শীতময় আবহাওয়ার রাতেও ঘামছে জামান। বুকের ভেতর ভয় বাসা বাঁধছে। এই ভয় কাউকে হারানোর ভয়।
গাড়ির পেছন থেকে গোঙরিয়ে উঠল রাহেলা। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। রাহেলার এমন গোঙরানো দেখে জামানের মা চেঁচিয়ে উঠল। একটু ধমক দিয়ে, ‘এই জামান। কী করছিস। বউটারে মেরে ফেলবি নাকি’। জামান কথার কোনো উত্তর দিল না। তার এমন নীরবতায় জামানের মা রেগে আগুন। আরো জোরে চিৎকার দিয়ে, ‘জামান কথা কেন বলছিস না?
‘মা কী বলব। গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না।’
প্রচণ্ড গরম অনুভব হচ্ছে জামানের। সে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। তার মেজাজ যেন প্যারিসের আইফেল টাওয়ার ছুঁয়েছে। দেশীয় সর্বোচ্চ গরম তার শরীরে বহমান। তার শরীরে হেমন্তের হিম হিম শীতল বাতাস কোনো ইটভাটার ধোঁয়ার মতো লাগছে। ড্রাইভারের ওপর তার সবচেয়ে বেশি রাগ বেগমান। একটি বাক্য মাথার ভেতর গিজগিজ করছে, ‘ব্যাটা, সময় পেল না ছুটি নেওয়ার।’
এখনই যেতে হবে? ভাবতেই তার শরীর রাগে ছমছম করছে। উত্তপ্ত লোহার আগুন তার মনের ভেতর জ্বলছে। বুকের ভেতর ক্ষোভের ঢেউয়ের গর্জন বইছে। দোষ অবশ্য ড্রাইভারের ওপর চাপানোটা উচিত হবে না। রাহেলার গর্ভে সন্তান। ভূমিষ্ঠ হওয়ার তারিখ ডাক্তার দিয়েছেন বেশ কয়েক দিন পরে। অনেকেই বলেছিলেন, ডাক্তার যে তারিখ দেন, তার পরে সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। ডাক্তার বলেছিলেন, ১০ দিন আগে বা পরে হতে পারে।
এদিকে ড্রাইভারটির মেয়ের বিয়ে। মেয়ের বিয়ে বাবা না থাকলে চলে! সেই মানবিকতা থেকে তাকে ছুটি দেওয়া। প্রসব হওয়ার সময় এখনো দেরি ২০ দিন। এভাবে হঠাৎ করে প্রসব বেদনা উঠবে ভাবতেই পারেনি।
‘জামান এই তোর মনে কী কোনো মায়া নাইরে। তুই বাইরে গিয়ে কী ভাবিস। আশ্চর্য! বউটা প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে। আর তুই কি না গাছের মতো দাঁড়িয়ে আছিস।’
জামানের কর্ণের ভেতর এই কথাগুলো ট্রেনের হর্নের মতো কানে হুইসেল বেজে ওঠে। সে যেন স্রোতহীন নদীর মতো থমকে গেছে। তার হৃদয়টা জ্যৈষ্ঠের খড়তায় চৌচির। রাগ-অনুরাগে ভেতরটা একেক সময় একেক রকম অনুভব বহমান। বোঝাতে পারছে না কী করবে। অনেক কিছু করা দরকার, ভেতরে ভেতরে মনের খাঁচায় সেটাই পোষ মানাচ্ছে। জামান বাইরে তাকাল। সে হতভম্ব। এই নিস্তব্ধময় রাতে কোনো পাখির শব্দ নেই। মাঝেমধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আসছে। দূর থেকে বা কাছে শিশিরের ফোঁটার আওয়াজ বোঝা যায়। চারদিকে কেউ নেই। সে জেনেও দেখে নিল, কোনো বাড়ি আছে কি না। দূর থেকে খেঁকশিয়ালের হুঙ্কার শব্দ আসছে। মনের ভেতর হালকা ভয় ভয়ও লাগছে। বিপদের সময় অদৃশ্য কোনো ভয় মাথায় কাজ করে না।
কত দিন তার মাকে বলেছে, ‘মা চলো আমরা চট্টগ্রাম গিয়ে বসবাস করি। অনেক আলিশান বাড়ি। পাশেই হাসপাতাল, বাজার, পাশে সবকিছু। যেকোনো সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করা যাবে। খুব সহজেই সবকিছু গুছিয়ে নেওয়া যাবে। সীতাকুণ্ডের এত গহিনে থাকা খুব মুশকিল। যাতায়াত ব্যবস্থা খুব জঘন্য। সময়মতো সবকিছু পাওয়া যায় না। বিপদে রক্ষা করার মতো কেউ নেই। চারদিক নেই কোনো লোকারণ্য। শুধু গাছগাছালি, পাখপাখালি আর আকাশ ছুঁয়ে যাওয়া কোনো পাহাড়। আমাদের এই বাড়ি পরিচর্যার জন্য লোক রেখে দেব। মাঝেমধ্যে বা প্রতি শুক্রবার এসে দেখে যাব।’
জামানের মার কথা, ‘আমি এই বাড়ি ছেড়ে একটি দিনও থাকতে পারব না। এই বাড়ি ছেড়ে একটি রাত অন্য কোথাও ঘুমালে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। তুই কি চাস আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাক, আমি না ফেরার দেশে চলে যাই, আমাকে খুব তারাতারি মাটিতে শুইয়ে দিতে। তাহলে এই বাড়ি ছেড়ে নিয়ে যেতে পারিস। এই বাড়ির সঙ্গে আমার কত স্মৃতি। তোকে এই বাড়িতেই ভূমিষ্ঠ করেছি। এই গাছগাছালি সাক্ষী। কোনো ডাক্তার-কবিরাজ লাগেনি। মহান আল্লাহপাকের দয়ায় তোর জন্ম খুব সুন্দরভাবে হয়েছে। দূরের পাহাড়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে তোর জীবন। তোর খেলার সঙ্গী তারা। তোর বাবার কবরটা আমাদের বাড়ির আঙিনায়। সেই লোককে রেখে আমরা কীভাবে যাই জামান। তুই চাইলে যেতে পারিস। বউমাকে নিয়ে তুই যা। আমাকে শুক্রবারে এসে দেখে গেলেই চলবে। আপনজনের কবরের পাশে কবর সবার ভাগ্যে জোটে না। এটা সৃষ্টিকর্তার বড় নিয়ামত ও সৌভাগ্য। আমার শেষ জীবন যেন এখানেই শেষ হয়।’
জামানের মায়ের কথার পিঠে কথা বলার সাহস আর জোটেনি। তার লোহার ব্যবসা চট্টগ্রামে। সেখানে অবশ্য ম্যানেজার আছে। বড় দোকানে বেশ কয়েকজন কর্মচারী। সপ্তাহে হুট করে চলে যায়। মাঝেমধ্যে রেগুলার যায় গাড়ি নিয়ে। অনলাইনে সব হিসাবনিকাশ নেয়। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমোতে বা মেইলে সব আদান-প্রদান হয়।
‘জামানরে বউমা নেই। তুই আয়’। জামানের মায়ের জোরে আর্তনাদ শোনার পর চোখে ছলছল জল।
দৌড়ে ছুটে গেল গাড়ির ভেতর। রাহেলা শুয়ে আছে। জামান তার হাতের রগ দেখে চলাচল করছে। এবার যেন জামানের স্বপ্নপূরণের গল্পের হাতছানি। চোখে-মুখে স্বপ্ন। রাহেলাকে বাঁচানোর স্বপ্ন। বাবা হওয়ার স্বপ্ন। জামান যেন এবার কোনো সিনেমার নায়কের মতো কাজ শুরু করল। গাড়ির দরজা খুলে মাকে বেরোতে বলল। হালকা গড়নের রাহেলা। ছিপছিপে শরীর। জামান রাহেলাকে গাড়ি থেকে বের করে দেখে তার শরীর পাতলা। পেছনটার কাপড় ভিজে গেছে। তুলার বস্তার ওজনের মতো রাহেলা। জামান তাকে দুহাতের ওপর তুলে শুরু করল পথচলা। পেছনে পেছনে জামানের মা এগোচ্ছে। হাতের আঙুলে তসবি। মনে মনে দোয়া-দরুদ পাঠ করছে। দোয়া ইউনুছ পড়ছে বেশি বেশি। বিপদের সময় এই দোয়া পড়লে বিপদ দূর হয়।
এভাবে কি আর হাসপাতালে পৌঁছানো যায়। জামান এগিয়ে চলছে আর এদিক-সেদিক দেখছে। কোথাও কোনো বাড়িঘর আছে কি না। কোনো মানুষজন আছে কি না। এইখানে যে রাস্তা, দিনেদুুপুরেই যাতায়াত কম। এই নগ্ন দুপুর রাতের নির্জনতায় কার দায় পড়ছে আসতে। কার জরুরি দরকার পড়েছে এখানে আসবে। এই রাস্তায় এককভাবে চলাই কষ্ট, তারপর আবার কোনো গর্ভবতী নারীকে কোলে নিয়ে চলা মহাদুষ্কর। এই মহাদুষ্কর কাজই সে করছে। এটা কোনো কাল্পনিক গল্প বা সিনেমা নয়। এটা ভাবতেই জামানের বুকের ভেতর একটা অস্থিরতা কাজ করছে। এমন অস্থিরতার কোনো শেষ নেই। এই অস্থিরতার স্থিরতা আসার পথ একটাই হাসপাতালে পৌঁছানো। জামান একটু দূরে দেখল আলো জ্বলছে। কোনো কুপির আলো নয়, এটা কোনো মশালের আলো। এই আলো দেখে একটু আশার আলো সঞ্চয় হলো। তার হৃদয়ের ভেঙে যাওয়া বাঁধ জোড়া লাগার সরঞ্জাম যেন সেই আলো। রাস্তার মাঝে তার মাকে বসিয়ে রেখেই সে ছুটল। রাহেলা তার মাথা শাশুড়ির কোলে রেখে শুয়ে আছে।
সেই আলোর কাছে পৌঁছাতে তার তেমন সময় লাগেনি। একটু পুরাতন ইটের ঘর। পাশে আরো কিছু পুরাতন ঘর। দেয়ালটা বেশ পুরাতন ইট দিয়ে গাঁথা। জায়গায় জায়গায় ফাটল ধরেছে দেয়ালে। ওপরে টিন। কাঠের দরজায় ভাঙা হাতল দেওয়া। তক্তাগুলো খুলে যাওয়ার মতো অবস্থা।
এটা একটা পুরাতন মন্দির। সেখানে আলো জ্বলছে। কোনো মানুষ দেখা যাচ্ছে না। পাশে একটা ইঞ্জিনচালিত গাড়ি। কীভাবে এই গাড়ি নিয়ে যাবে। এই জঘন্য রাস্তায় চলতে পারবে তো?
তারপরও জামান চেষ্টা করছে কীভাবে গাড়িটি নেবে। দেখে নিল কীভাবে রেখেছে। গাড়িটিতে হাত দিতেই শেকলের শব্দ। দৌড়ে আসে এক লোক। ভয়ার্ত চেহারা। চোখ বিড়ালের মতো। গাড়িচোর বলেই জামানকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একদম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি করতে থাকে দুজন। লোকটি নেশা করছে বোঝাই যাচ্ছে। তার মুখ দিয়ে গন্ধ। কোনো হিংস্র জানোয়ার কোনো হরিণ শাবককে ধরে ফেলার মতো অবস্থা।
জামান বারবার বলছে, আমি গাড়িচোর নই। আমি গাড়িচোর নই।’
‘তুই গাড়িচোর না। ভালো মানুষের এত রাতে এখানে কী করছিলি। বিপদে পড়লে তো মানুষ ডাক দিতি। গাড়িতে হাত দিতি না।’
জামান কিছুতেই লোকটিকে সরাতে পারছে না। তার সর্বশক্তি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। পারছে না। হাতের কাছে বড় একটা কাঠের ফালি পায়। লোকটির পেছনে আঘাত করে লাফিয়ে ওঠে। এবার লোকটিও লাফিয়ে ওঠে। সে আরো বেশি হিংস্র হয়ে যায়। দুজন দুজনের চোখে তাকিয়ে। রাত গভীর। আশপাশে অন্য কোনো মানব নেই। কী করবে কেউ বুঝতে পারছে না। ঘুরছে দুজন।
জামান ঘোরার মাঝেই কথা বলা শুরু করে, ‘বিশ্বাস করেন আমি চোর নই। আমার স্ত্রীর পেটে সন্তান। তাদের রাস্তায় রেখে এসেছি। বিশ্বাস করুন। আমাদের সাহায্য করেন। হাসপাতালে পৌঁছে দেন। আমাদের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে।’
লোকটি এই কথায় বিশ্বাস না করলেও একটু শীতল হয়ে বলে, ‘এই রাস্তায় গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। মোবাইলে একটা ফোন করলেই তো হয়।’
‘মোবাইল রেখে এসেছি। তড়িঘড়ি করতে সব ফেলেই আমরা রওনা হই। আপনার দোহাই লাগে। ওই দেখেন আমার মা আর বউ রাস্তায় বসে আছে।’
লোকটি এবার কথাগুলো বিশ্বাস করল। দ্রুত গাড়ি বের করল। জামান এসে দেখে রাহেলা মুখ খোলেনি। চোখ মেলেনি। শুয়ে আছে একটি আধা পাকা রাস্তায়। কিছুদূর এগুলেই পাকা রাস্তা।
লোকটি বলল, ‘তারাতারি গাড়িতে তুলুন। ঈশ্বর সহায় হোন।’ বলেই গাড়ি ছাড়ল।
কিছু পথ এগিয়ে পাকা রাস্তা, তখনি জামানের মা চিৎকার দিয়ে ওঠে। জামানরে বউমা নেই!
কথা শুনে গাড়ি থামিয়ে দিল। পেছনে তাকিয়ে, সে ইশারার অপেক্ষায় আছে। কোনো কিছু পেলেই চলতে শুরু করবে যাত্রা।
এবার আগের মতো হাতের রগ দেখতে লাগল জামান। কিছুক্ষণ রগ দেখে কিছুই পারল না বুঝতে। একবার তার মায়ের দিকে আরেকবার চালকের দিকে তাকিয়ে আছে। হাতের রগ চলা স্বাভাবিক দেখে একটু জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে বলল, ‘বেঁচে আছে রাহেলা। দ্রুত গাড়ি ছাড়েন।’
আবার শুরু হলো যাত্রা। কত গতি, জীবন ঝুঁকি নিয়েই পৌঁছাল হাসপাতালে। হাসপাতালে যখন পৌঁছাল তখন রাত প্রায় ৪টা বাজে। ডাক্তার ও নার্স রেস্টে। নার্স, নার্স জরুরি। প্লিজ বাঁচান।
নার্স এলো চোখ মুছতে মুছতে। রোগী দেখে তারা বিমর্ষ। চোখে-মুখে অস্থিরতা। আহারে মা হওয়ার জন্য কতইনা কষ্ট। কতইনা পীড়া। কতইনা যন্ত্রণা। তা কী সন্তানরা অনুধাবন করে। হ্যাঁ হয়তো কেউ করে। কেউ করে না।
নার্স বলেই উঠল, ‘আপনারা রোগীকে কেমন বেহাল অবস্থায় ফেলছেন। দ্রুত স্যালাইন লাগাতে হবে।’
ডাক্তার এসে রাহেলাকে দেখে একটি কাগজ জামানের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘নিচ থেকে ওষুধগুলো নিয়ে আসেন। ’
জামান প্রেসক্রিপশন নিয়ে গেল নিচে। জামানের মা বসে আছে। মনে মনে তসবি জপছে। মানত করছে আর বলছে, হে করুণাময়। তুমি আমার বউমাকে রক্ষা করো। আমার বউমার পেটে সন্তানকে রক্ষা করো। তুমি বড় হেকিম। তুমি বড় ডাক্তার। তুমি রক্ষা না করলে কেউ রক্ষা করবে না। তুমি ইউনুছ নবীকে মাছের পেট থেকে যেভাবে রক্ষা করেছো, সেভাবে আমাদের রক্ষা করো। তোমার ঘর মসজিদে আমি বড় ধরনের দান করব। বায়েজিদ বোস্তামির মাজারে আমি গরু দেব। এতিমখানায় অনেক দান করব। আমাদের বিপদের হাত থেকে রক্ষা করো। রক্ষা করো মওলা। আমাদের এই আপনজনকে বাঁচাও।
জামান ওষুধ নিয়ে চলে আসে। দেখে ডাক্তার দাঁড়িয়ে।
‘রোগীর সঙ্গে কে এসেছেন’ ডাক্তার বললেন।
জামান উত্তর দিলেন, আমি আর মা এসেছি।
‘রোগী আপনার কী হন?’
‘আমার ওয়াইফ।’
‘রোগী দেখলাম। অনেক রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাতে রোগীর অবস্থা বোঝা যাচ্ছে না। তবে একটি সত্য কথা বলি, হায়াত-মউতের মালিক একজনই। তবে রোগী বা বাচ্চা যে কেউ মারা যেতে পারে। আবার দুজনও না ফেরার পথে যেতে পারে। আমাদের চেষ্টার কমতি থাকবে না। আপনি ধৈর্যহারা হবেন না। বসে থাকুন। মওলাকে ডাকেন। এ ছাড়া কোনো পথ নেই।’ বলেই ডাক্তার অপারেশন রুমে প্রবেশ করল।
জামানের কথাগুলো শোনার পর হার্টবিট কত গতিতে চলছে, বুঝতে পারছে না। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। পাশ ফিরতেই জামানের মা বলল, ডাক্তার কী বললেন?
জামান একটু আড়াল করে বলল, ‘সব ঠিক আছে। চিন্তা করো না মা। দোয়া করো রবের কাছে। সে ছাড়া আমাদের কেউ নেই।’ কথাগুলো বলে জামান চোখ মুছল।
জামান গাড়ি রাস্তায় ফেলে রেখে এসেছে সেটা সে ভুলে গেছে। এগুলো মনে রাখার কথা নয়। এখন মন শুধু একদিকই স্থির। রাহেলার কী হাল। অপারেশনের রুম থেকে বাচ্চার আওয়াজ, জামানের চোখে জল। রাহেলা তাহলে বেঁচে নেই। তার কোলে নার্স বাচ্চাটি দিতেই বলল, ‘রাহেলার কী অবস্থা?’
নার্স বলল, ‘রোগী ও বাচ্চা সুস্থ আছে। সুখপরশ হয়ে এসেছে আপনার সন্তান!’ জামান কথাটি শুনে চোখে জল চলে আসে। আনন্দে কপালে চুমো দিয়ে বলে, সব বেদনার গ্লানি মুছে যাক, সুখপরশ হয়ে অনন্তকাল বুকে থাক!’