প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৪, ০০:০০
চিত্তবিভ্রম

প্রচণ্ড রোদে ঝলসানো দিনটি ছিল সেপ্টেম্বরের কোন একটা তারিখে। গত রাতটা কি একি তারিখের ছিল কিনা আমার কোনোভাবেই মনে পড়ছে না। নির্দিষ্টভাবে তারিখটা মনে করতে পারছি না। ইদানীং কিছুই মনে পড়ছে না। আমার ঝাপসা চোখের বারান্দায় অন্ধকারের রূপ নিয়ে কে যেন ক্রমাগত নিকষ কালো রং ঢেলে দেয়। মাথাতে অসহ্য যন্ত্রণা ব্যথার আসমান তৈরি করে রেখেছে। ঘণ্টাখানেক ধরে চেষ্টা করছি মনে করতে সকালে ঘুম থেকে উঠেছিলাম কিনা! কিংবা আমি রাতে ঘুমিয়েছিলাম কিনা! মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে বস্তুত আমি বেঁচেই আছি কিনা।
আচ্ছা আমি কি পাগল? আমাকে দেখলে সবাই এভাবে তাকিয়ে থাকে কেনো? সবাই কি যেন বিড়বিড় করে বলে! উফ! মনে করতে পারছি না। কি যেন, কি যেন! কি ছিল না এই লোকটার। সারাক্ষণ মুখের মধ্যে হাসি লেগেই থাকতো...এতটুকুইুই মনে পড়ে শুধু।
আচ্ছা এই আধাভাঙ্গা সিঁড়িগুলোতে আমি ছাড়া আর কেউ বসে না কেনো? একেকটা সিঁড়ি যেন পোড়া ইটের খোলসে আবৃত্ত। এখানে আমি একা একা বসে আছি। এখানে একা বসার অনুমতি আমার কখনোই ছিল না। ঠিক সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত তার সাথে আমার ঝগড়া-আবদার-আদর-অভিমান-ভালোবাসায় সময়টা কেটে যেতো। পাগলামি না করলে মেয়েটাকে কোনদিনই বিয়ে করতে পারতাম না। আব্বার পা ধরে এক সকাল বসে ছিলাম। লাথি, ধাক্কা আর চোখ রাঙ্গানি কোনোটাই আমাকে সেদিন থামাতে পারেনি।
তারা পাগলের মতো বলে আমি নাকি মারা গেছি। আমি এখনও দিব্যি বেঁচে আছি। এইতো কিছুদিন আগেই মেয়েটা আমার উপর কি যে ভীষণ অভিমান করে ছিল তার জন্য নীল ওড়নাটা কিনে আনিনি বলে। কথা না বলে দৌড়ে এসে ঠিক এখানে এসে বসে ছিল। আমিও পিছন পিছন দৌড়ে আসলাম কিন্তু কথা না বলে তার পিছনের সিড়িটাতে বসে রইলাম। কথা বলতে সাহস হলো না। মেয়েটা যখন অভিমান করে থাকে কিছু বললে বাবার বাড়ি চলে যাওয়ার হুমকি দিতো। আমাকে মেরে ফেললেও আমি মানতে পারি কিন্তু তারে ছাড়া একদিন আমার প্রজ্বলিত আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার সাহস কোন কালেই ছিল না।
একবার তো অনেক অভিমান করে চলেই গেলো। আমি কতবার আনতে গেলাম, আমাকে ঘরে ঢুকতেই দিলো না। মেয়েটার বাবার ও সাহস হলো না তাকে মানানোর। তাকে না দেখতে পেরে আমি এদিকে তৃষ্ণায় প্রায় মরে কাঠ হয়ে যাচ্ছিলাম। অগত্যা বাধ্য হয়ে তাদের নারিকেল গাছের মাথায় উঠে বসে রইলাম একটু দেখার জন্য। প্রায় ২ ঘণ্টা পর তার দর্শন পেলাম। কিন্তু তখন আমি কোমর ভেঙ্গে বিছানায়। কখন যে গাছ থেকে পরে হিতাহিত জ্ঞান হারালাম ঠিক মনে পড়ছে না। চেতনা আসার পর তাকে বিছানার পাশে পেয়ে সব ব্যথা আমার উষ্ণ পরিতোষে পরিণত হয়ে গেলো। তখনও তার মুখটা যেন একটা অগ্নিকুণ্ড। পরক্ষণেই তার জমে থাকা রাগ চলে গেল আর মেয়েটা আমাকে ভীষণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। সেদিনের পর থেকে প্রায়ই আমার নারিকেল গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার ইচ্ছে মনের মধ্যে এসে ভড় করতো। পুরুষ মানুষ একটু বেশি ভালোবাসা অদৃষ্টে লিখতে কত কিছুই না করে!
উফ! উফ! ব্যথাটা ক্রমেই বেড়ে চলছে। সাবিনা আপার বাড়িতে দৌড়ে আসলাম। উনি আমাকে খুব আদর করতো। আমার থেকে ২ মাসের বড়। এটা নিয়ে খুব হিংসা করতো মেয়েটা। উনাকেই বিয়ে করে নিয়ে আসতে পারেন, এই কথাটা উঠতে বসতে শতবার শুনতে হতো আমার। শুনতে খারাপ লাগত না বৈকি। অন্য মেয়েকে নিয়ে তার হিংসেটা বরং আমাকে মানসিকভাবে তৃপ্তি দিতো। এসে শুনি সাবিনা আপা বাবার বাড়ি চলে গেছে। উনি নাকি এখন পাগলের মতো আচরণ করে। কিছুক্ষণ পর পর কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। প্রায়ই নাকি আমার বাড়ি থেকে ওনার বাড়ি পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করতো আর একটু পরপর হেসে উঠতো। উনিও বাকিদের মতো ভাবতো আমি মারা গিয়েছি।
মনটা খারাপ করে আবার এসে ঘাটে বসলাম। উহ! কোথায় গেলো আমার আদুরে রানি! এতোটা অভিমান করে কেউ! অভিমান করলেও তো কাছাকাছি থাকতে হয়। অভিমান ভাঙানোর সুযোগ দিতে হয়। অবশেষে তার মুখদর্শন পেলাম। তার হাতে একটা নীলপদ্ম কেমন যেন অভিমানের ভাড়ে নুয়ে আছে। সে জানে নীলপদ্ম আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু ঐপাশে কোথায় যাচ্ছে! আমি তো এখানে। তার পিছু পিছু যাওয়ার পুরোনো অভ্যাসে গিয়ে দেখলাম একটা কবরে রানি আমার ফুলটা দিয়ে অঝোরে কেঁদে চলেছে। কবরে মৃত্যুর তারিখটা আজকের। মেয়েটার কান্না মুছে দিতে ভীষণ ইচ্ছে করলো। হাত বাড়াতেই আমার হাতটা অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগলো। তাকে কথা দিয়েছিলাম তার চোখের পানি কখনো মাটি স্পর্শ করতে দিব না। আমি পারিনি রাখতে কথাটা। অঝোরে চোখের পানিগুলো মাটিকে আঘাত করে চলেছে। একি! আমি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি কেন? তাকে ডাকতে গিয়ে গলাটা আমার ধরে এলো! এই যে আমি!