শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৬ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৪, ০০:০০

আওয়াজ শুনি, শব্দ শুনি না

অনলাইন ডেস্ক
আওয়াজ শুনি, শব্দ শুনি না

হাসান মাহাদি

চিত্তবিভ্রম

হাসানাত রাজিব

প্রচণ্ড রোদে ঝলসানো দিনটি ছিল সেপ্টেম্বরের কোন একটা তারিখে। গত রাতটা কি একি তারিখের ছিল কিনা আমার কোনোভাবেই মনে পড়ছে না। নির্দিষ্টভাবে তারিখটা মনে করতে পারছি না। ইদানীং কিছুই মনে পড়ছে না। আমার ঝাপসা চোখের বারান্দায় অন্ধকারের রূপ নিয়ে কে যেন ক্রমাগত নিকষ কালো রং ঢেলে দেয়। মাথাতে অসহ্য যন্ত্রণা ব্যথার আসমান তৈরি করে রেখেছে। ঘণ্টাখানেক ধরে চেষ্টা করছি মনে করতে সকালে ঘুম থেকে উঠেছিলাম কিনা! কিংবা আমি রাতে ঘুমিয়েছিলাম কিনা! মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে বস্তুত আমি বেঁচেই আছি কিনা।

আচ্ছা আমি কি পাগল? আমাকে দেখলে সবাই এভাবে তাকিয়ে থাকে কেনো? সবাই কি যেন বিড়বিড় করে বলে! উফ! মনে করতে পারছি না। কি যেন, কি যেন! কি ছিল না এই লোকটার। সারাক্ষণ মুখের মধ্যে হাসি লেগেই থাকতো...এতটুকুইুই মনে পড়ে শুধু।

আচ্ছা এই আধাভাঙ্গা সিঁড়িগুলোতে আমি ছাড়া আর কেউ বসে না কেনো? একেকটা সিঁড়ি যেন পোড়া ইটের খোলসে আবৃত্ত। এখানে আমি একা একা বসে আছি। এখানে একা বসার অনুমতি আমার কখনোই ছিল না। ঠিক সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত তার সাথে আমার ঝগড়া-আবদার-আদর-অভিমান-ভালোবাসায় সময়টা কেটে যেতো। পাগলামি না করলে মেয়েটাকে কোনদিনই বিয়ে করতে পারতাম না। আব্বার পা ধরে এক সকাল বসে ছিলাম। লাথি, ধাক্কা আর চোখ রাঙ্গানি কোনোটাই আমাকে সেদিন থামাতে পারেনি।

তারা পাগলের মতো বলে আমি নাকি মারা গেছি। আমি এখনও দিব্যি বেঁচে আছি। এইতো কিছুদিন আগেই মেয়েটা আমার উপর কি যে ভীষণ অভিমান করে ছিল তার জন্য নীল ওড়নাটা কিনে আনিনি বলে। কথা না বলে দৌড়ে এসে ঠিক এখানে এসে বসে ছিল। আমিও পিছন পিছন দৌড়ে আসলাম কিন্তু কথা না বলে তার পিছনের সিড়িটাতে বসে রইলাম। কথা বলতে সাহস হলো না। মেয়েটা যখন অভিমান করে থাকে কিছু বললে বাবার বাড়ি চলে যাওয়ার হুমকি দিতো। আমাকে মেরে ফেললেও আমি মানতে পারি কিন্তু তারে ছাড়া একদিন আমার প্রজ্বলিত আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার সাহস কোন কালেই ছিল না।

একবার তো অনেক অভিমান করে চলেই গেলো। আমি কতবার আনতে গেলাম, আমাকে ঘরে ঢুকতেই দিলো না। মেয়েটার বাবার ও সাহস হলো না তাকে মানানোর। তাকে না দেখতে পেরে আমি এদিকে তৃষ্ণায় প্রায় মরে কাঠ হয়ে যাচ্ছিলাম। অগত্যা বাধ্য হয়ে তাদের নারিকেল গাছের মাথায় উঠে বসে রইলাম একটু দেখার জন্য। প্রায় ২ ঘণ্টা পর তার দর্শন পেলাম। কিন্তু তখন আমি কোমর ভেঙ্গে বিছানায়। কখন যে গাছ থেকে পরে হিতাহিত জ্ঞান হারালাম ঠিক মনে পড়ছে না। চেতনা আসার পর তাকে বিছানার পাশে পেয়ে সব ব্যথা আমার উষ্ণ পরিতোষে পরিণত হয়ে গেলো। তখনও তার মুখটা যেন একটা অগ্নিকুণ্ড। পরক্ষণেই তার জমে থাকা রাগ চলে গেল আর মেয়েটা আমাকে ভীষণ শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। সেদিনের পর থেকে প্রায়ই আমার নারিকেল গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার ইচ্ছে মনের মধ্যে এসে ভড় করতো। পুরুষ মানুষ একটু বেশি ভালোবাসা অদৃষ্টে লিখতে কত কিছুই না করে!

উফ! উফ! ব্যথাটা ক্রমেই বেড়ে চলছে। সাবিনা আপার বাড়িতে দৌড়ে আসলাম। উনি আমাকে খুব আদর করতো। আমার থেকে ২ মাসের বড়। এটা নিয়ে খুব হিংসা করতো মেয়েটা। উনাকেই বিয়ে করে নিয়ে আসতে পারেন, এই কথাটা উঠতে বসতে শতবার শুনতে হতো আমার। শুনতে খারাপ লাগত না বৈকি। অন্য মেয়েকে নিয়ে তার হিংসেটা বরং আমাকে মানসিকভাবে তৃপ্তি দিতো। এসে শুনি সাবিনা আপা বাবার বাড়ি চলে গেছে। উনি নাকি এখন পাগলের মতো আচরণ করে। কিছুক্ষণ পর পর কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। প্রায়ই নাকি আমার বাড়ি থেকে ওনার বাড়ি পর্যন্ত দৌড়াদৌড়ি করতো আর একটু পরপর হেসে উঠতো। উনিও বাকিদের মতো ভাবতো আমি মারা গিয়েছি।

মনটা খারাপ করে আবার এসে ঘাটে বসলাম। উহ! কোথায় গেলো আমার আদুরে রানি! এতোটা অভিমান করে কেউ! অভিমান করলেও তো কাছাকাছি থাকতে হয়। অভিমান ভাঙানোর সুযোগ দিতে হয়। অবশেষে তার মুখদর্শন পেলাম। তার হাতে একটা নীলপদ্ম কেমন যেন অভিমানের ভাড়ে নুয়ে আছে। সে জানে নীলপদ্ম আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু ঐপাশে কোথায় যাচ্ছে! আমি তো এখানে। তার পিছু পিছু যাওয়ার পুরোনো অভ্যাসে গিয়ে দেখলাম একটা কবরে রানি আমার ফুলটা দিয়ে অঝোরে কেঁদে চলেছে। কবরে মৃত্যুর তারিখটা আজকের। মেয়েটার কান্না মুছে দিতে ভীষণ ইচ্ছে করলো। হাত বাড়াতেই আমার হাতটা অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগলো। তাকে কথা দিয়েছিলাম তার চোখের পানি কখনো মাটি স্পর্শ করতে দিব না। আমি পারিনি রাখতে কথাটা। অঝোরে চোখের পানিগুলো মাটিকে আঘাত করে চলেছে। একি! আমি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছি কেন? তাকে ডাকতে গিয়ে গলাটা আমার ধরে এলো! এই যে আমি!

কথায় আছে, ‘ভরা কলস বাজে না’। তাহলে কি দুঃখভরা হৃদয়ের আর্তনাদ ইহ জাগতিক কোনো কান শুনতে পায় না? আমি হাঁটছি অনবরত। পুরাণ ঢাকার কয়েকশ’ বছর পুরোনো অলিগলি দিয়ে আমার দেহটাকে নিয়ে আমার পা দুটো চলছে। আমার মন আর আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। সে ছুটছে বাতাসের গতিতে। যেন জাগতিক চেতনার বাইরে গিয়ে নিজেকে নিয়োজিত করেছে মহাজাগতিক কোনো ভাবনায়। আমি শুধু সেই ভাবনাগুলো প্রলাপের মতো বকে যাচ্ছি। কোনো চর্মচক্ষু দেখা মাত্রই আফসোস করবে, “আহা! এই অল্প বয়সেই মনে হয় মাথাটা গেছে।“ আদতে শব্দের সাধনা করতে করতে হেঁটে চলছেন এক সাধক পুরুষ। এই শব্দ বাংলা ব্যাকরণের রূপতত্ত্বের আলোচনা না নয়। এ শব্দ তরল, কঠিন বা বায়বীয় মাধ্যম দিয়ে সঞ্চারিত মাধ্যম দিয়ে সঞ্চারিত যান্ত্রিক কোনো তরঙ্গ নয় যা আমাদের শ্রবণের অনুভূতি দেয়। এ শব্দ মজলুমের যা জালেমের কান কখনো শুনে না। এ শব্দ শীতের রাতে ফুটপাতে পরে থাকা হাড্ডিসার দেহটার যা চলন্ত পথিকের বড়লোকি উষ্ণতায় পৌঁছায় না। এ শব্দ লক্ষ্মীবাজারের সেই ছোট্ট শিশুটার যে প্রতিদিন সকাল বেলা মুসলিম হোস্টেলের গেটের সামনে কংক্রিটের বিছানায় শুয়ে শুয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সেন্ট গ্রেগরির ইউনিফর্মে মায়ের হাত ধরে হেঁটে যাওয়া তার বয়সী শিশুটার দিকে তাকিয়ে সে ভাবে, “আহা! নম্বর কম পাওয়ার অপরাধে কেউ যদি আমাকে একটু বকে দিত।“ এ শব্দ জগন্নাথের সেই ছেলেটার , যার বন্ধুরা জানেনা সে মেসে মিলের টাকা কমাতে দুটো সিঙ্গারা খেয়েই দুপুরটা কাটিয়ে দিয়েছে। টিউশনির বেতনের টাকাটা বাঁচিয়ে টাকাটা বাড়িতে পাঠাতে হবে। এ শব্দ সব হারানো সেই লোকটার যে ঋণের বোঝা সমেত মাথাটা ট্রেনের নিচে দিয়েছিলো। ট্রেনের ঝনঝন শব্দে তার মৃত্যুকালীন কয়েক ন্যানো সেকেন্ডের আর্তনাদের শব্দটাও শুনা যায়নি। এ শব্দ মধ্যবিত্তের। যে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে নিজের ব্যক্তিত্ব ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করে যায়। এ শব্দ টাকায় গড়াগড়ি খাওয়া এই ধনী মানুষটার, যে, টাকা দিয়েও সুখ কিনতে পারেনি। এ শব্দ সেই তরুণটার যে এলোমেলো চুলে নিজের স্বপ্ন নিয়ে হেঁটে যায়। হয়ত মাঝে মাঝে কোনো ব্যথিত মানুষের চিৎকার শুনা যায়। মানুষের কাছে হাত পাতা ভিক্ষুকটার সুর করে ভিক্ষা চাওয়াটা শুনা যায়। “আমাদের দাবি মানতে হবে”, “ধর্ষকের বিচার চাই” শুধু এই স্লোগানগুলোই শুনা যায়। গুম হয়ে যাওয়া স্বজনের খোঁজে মানববন্ধন বা সংবাদ সম্মেলনে শুধু লিখিত বক্তব্যগুলো শুনা যায়। বিনাদোষে কারাগারে থাকা সন্তানের জামিনের জন্য বাবা-মায়ের শুধু আকুতির ভাষাগুলো শুনা যায়। কমলাপুরে গুলি খেয়ে মরে যাওয়া মেয়েটার বাবা যখন বলে, “কার কাছে বিচার চাইব?” শুধু এই বক্তব্যটাই পত্রিকাই ছাপা হয়। এগুলো সবই আওয়াজ স্রেফ আওয়াজ। কখনো কখনো শব্দ দূষণ। জাগতিক চামড়া শুধু সেই আওয়াজগুলো শুনতে পায়। শব্দ শোনার সময় কারো নেই। সবাই ছুটে আপন গতিতে। স্বার্থের সীসায় গভীর শব্দযন্ত্র নষ্ট হয়ে গিয়েছে। যতক্ষণ না নিজের সাথে ঘটে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত শুধু আওয়াজ শুনা যায়।

আমি কোনো এতক্ষণ কল্পনায় হেঁটেছিলাম। আসলে আমি ক্লাসরুমে বসে আছি। প্রোজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কোর্সের লেকচার চলছে। মাইক্রোফোনে কেউ একজন কথা বলছে শুধু এই আওয়াজটুকুই কানে আসছে। হঠাৎ ডাক আসে,”লাস্ট ব্যাঞ্চ, স্ট্যান্ড আপ। হোয়াট ইজ সট অ্যানালাইসিস?” আমার দিব্ব ধ্যান ভঙ্গ হয়। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। কারণ সট অ্যানালাইসিস টপিকের একটা শব্দও আমি শুনি নাই।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়