প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৪, ০০:০০
রবিবারের ট্রেন

হাসানাত রাজিব চশমাটা শার্টের কাপড় দিয়ে হালকা মুছে নিয়ে নিয়মিত শ্রাবণে প্লাবিত অশ্রুসিক্ত চোখ দুটোতে পরে নিয়ে মাথাটা একটু উঁচু করে দেখার চেষ্টা করলাম, ট্রেনটা কি এখনো আসছে না! সন্ধ্যাটা বেশ বেখেয়ালিপনা চর্চা করে যাচ্ছে আজ। তার আগমনের নিশ্চয়তার আভাস দিচ্ছে। শার্টটা বেশ পুরোনো হয়ে গেছে। পকেটে কিছু রাখা যায় না। ছিড়ে গেছে পকেট। অবাক হয়ে গেছেন এই ভেবে যে আমার একটাই শার্ট? হ্যাঁ! তার দেয়া আমার এই একটাই শার্ট। কীভাবে এটা আমি ফেলে দিই! আমি যে তার বলা এক একটা শব্দ পর্যন্ত মস্তিষ্কের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে লুকিয়ে রেখেছি।
আজকে আরেকটি রবিবার। পুরোনো চেয়ারটাতে বসে আছি নিভু নিভু চোখগুলোকে পলক না ফেলার চেষ্টায়। ১৭ বছর আগে আমার এই শূন্য হাতগুলোকে ছেড়ে দিয়ে বলেছিল ফিরে আসবে সে। তার আগের রাতে অন্তত ২টা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছিলাম জেগে থাকার ভয়ে। তার জন্যে অপেক্ষার রাতটি যে দীর্ঘতম হবে আমার জানাই ছিলো। এভাবে অস্থিরতায় দীর্ঘ রাতটা কাটানো আমার জন্য বিষোদ্গার হয়ে উঠবে জানাই ছিল। তার জন্য আমি এই অপেক্ষাটাই করতে পারি না। যতক্ষণ না আসবে প্রাণবায়ু বের হওয়ার মতো অবস্থা হয়। আবার এর বেশি খেলে যদি ঘুম থেকেই না জাগতে পারি তবে যে সব আয়োজনের শূন্য সমাপ্তি হয়ে যাবে। আপনি যাকে কাছে পেতে এতোটা দিন আকাশের সব তারা গুনে শেষ করেছেন, সামান্য ভুলে তাকে হারাতে চাইবেন না নিশ্চই।
তার নিষ্ঠুর প্রস্থানের গল্পটা শুনবেন? আচ্ছা ভালোবাসার মানুষটার প্রতি এতোটা নিষ্ঠুর হতেই হবে! উহ! সেই বিকেলটা মনে পড়লে এখনো শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে। বুকের ব্যথাতুর বাঁ পাশটা ক্রমাগত কাঁপতে থাকে। তার প্রথম কথাটি শোনার পর আর হিতাহিত জ্ঞানটা ঠিকমতো কাজ করছিল না। পঞ্চইন্দ্রিয় যেনো অকেজোপ্রায়। তার চোখমুখ দেখেই বজ্রপাতের আশঙ্কা করছিলাম। দু হাত শক্ত করে ধরে বলেছিলাম, আর পরের কথাটা বলো না প্রিয়! তোমার না আকাশ অনেক প্রিয়? দেখো না আকাশ তোমার আগমনে কেমন হেসে যাচ্ছে! তুমি মুখটা এমন ভার করেছো বলে আবছা রোদ্রময় আকাশটা এখনই মেঘে ঢেকে নিয়েছে। এই বুঝি অঝোরে বৃষ্টি নামিয়ে দিবে। কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে সে! বলেই দিলো, আমাকে দূরত্ব মেনে নিতেই হবে। তুমি এ হাতে আর অন্য হাত ধরো না। আমার ফিরে আসার অপেক্ষা করবে। আমি এসেই ঝাপটে ধরে সব অভিমান ভেঙ্গে দেবো- বৃষ্টি এসেই পড়লো তার চোখে। আমি ততক্ষণে আল্লাহর কাছে প্রার্থনায় রত হয়ে গেছি, আল্লাহ এটা যেনো স্বপ্নই হয়। সে যে দু হাত ছেড়ে চলে গেলো।
সেদিন ছাদের বেলিফুলগুলো কেমন যেনো ছন্নছাড়া আচরণ করছিলো। একটু আগেই তো ঘ্রাণে মাতোয়ারা করেছিলো সব। এখন কী হলো! কোথায় গেল ঘ্রাণগুলো সব! ঐ ঝালমুড়িওয়ালা ভাই, আজকে মুড়ি দিবেন না আমায়? আজকে ১০ টাকার দিয়েন তো। ট্রেন আসতে দেরি হবে মনে হচ্ছে। বেলিফুলের মালাটাতে একটু পানি ছিটাতে হবে। শুকিয়ে যাচ্ছে। শুকিয়ে যাওয়া ফুল সে নিবে নাকি! তখন তো আবার গলা উঁচু করে বলবে, এই ১৭ বছরে কী একটা তাজা ফুলের মালাও আনতে পারলা না! শুধু তার জন্যই ছাদে একটা বেলিফুলের টব লাগিয়েছি। যতবার দেখা করতে যেতাম আমার দেরি হতোই। কিন্তু তাজা বেলিফুলের ঘ্রাণটা যেনো তার সব অভিমান ভুলিয়ে দিতো! তবে চালাকি ধরে ফেলেছিলো একদিন। হঠাৎ বলে উঠেছিলো, বেলিফুল যেদিন আনতে আনতে শুকিয়ে যাবে, সেদিন কিন্তু অভিমান নিয়েই চলে যাবো, আর আসবো না। এজন্য পানির বোতল সাথে রাখছি। শুকিয়ে গেলে আমার দফারফা হবে নিশ্চিত।
আচ্ছা এখন কি এই বয়সে আমাকে এসে ঝাপটে ধরবে? হয়তো দূর থেকেই ভালোবাসবে। না না! আমি এটা কী বলছি! ভালোবাসা কি বয়স বেধে হয় নাকি! সে ঠিকই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলবে, তুমি ভালো আছো তো, প্রিয়? এই হাত দিয়ে অন্য হাত ধরো নিতো, না? খুব হাসি আসছে খুশিতে আমার। তার জন্য একটা কবিতা লিখেছি। এলেই শোনাবো। রাত তো অনেক হয়ে গেলো। ট্রেনটাও ফিরতি পথে ফিরে যাওয়ার জন্য আওয়াজ দিচ্ছে। আজকেও আসবে না বোধহয়।
আগামী রবিবার ঠিকই আসবে। আপনারা দেখবেন সে নিশ্চিত আসবে। বেলিফুলের মালাটা চেয়ারে রেখে প্রবহমান অশ্রুদলের সাথে গল্প জুড়ে দিয়ে বাড়ির পরিচিত রাস্তাটার দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আজও ভেবেছি প্রকৃতি বিদ্রুপের হাসি হাসবে। কিন্তু আজ যে হাসছে না! কষ্টের ভারে কেমন যেনো নুয়ে পড়েছে। ট্রেন স্টেশনের প্রতিটা মানুষ আর অনুভূতিহীন বস্তুগুলো যেনো আমার হেঁটে চলে যাওয়ায় বেদনার্ত হয়ে পড়েছে। তাদের চাহনিতে কেমন যেনো বেদনা লুকিয়ে আছে! পিছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিলো এই বোধহয় কেউ বলছে, ফিরে যাচ্ছ কেনো, প্রিয়। আমি এসেছি তো।