প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৪, ০০:০০
‘ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম’

‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ দেশ স্বাধীন হওয়ার চুয়ান্ন বছর পেরিয়ে গেছে, এর মধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা পেয়েছি। সামগ্রিক সূচকে আমাদের দেশের উন্নয়ন বিশ্ব মানচিত্রে একটা মর্যাদার আসন করে নিয়েছে। এখন আর বাংলাদেশকে কেউ তলাবিহীন ঝুড়ি বলে না। আজকের বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অনেকটা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ। উন্নয়নশীল দেশের পথে হাঁটছে আমার জন্মভূমি।
‘কোন দেশের অভ্যন্তরে এক বছরে চূড়ান্তভাবে উৎপাদিত দ্রব্য ও সেবার বাজারে সামষ্টিক মূল্যই হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপি। আর জিডিপি হলো একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান সূচক। আর সেই জিডিপির আকার অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতির দেশ।’
কিছুটা না, অনেকটা গর্বের বিষয় আমাদের জন্যে, আমরা এখন আত্মমর্যাদাশীল জাতি। খুব ভালো কথা। এই যে, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ শুধু দেশকে ভালোবাসলে হবে না, মানুষকেও ভালোবাসতে হবে।
ধারাবাহিক দেশপ্রেম না থাকলে, দেশের উন্নয়ন-চাকা উল্টোদিকে ঘুরতে পারে। এই সোনার বাংলায়, ঊর্ধ্বগতির বাজারে প্রতিমুহূর্তে সাধারণ মানুষকে চোখ রাঙাচ্ছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী! এক শ্রেণির অতি মুনাফাখোর মানুষের জন্যে আরেক শ্রেণির মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সব পণ্যের মজুতি সিন্ডিকেট। এমন একটা মনোভাব, আমার সুযোগ আছে, আমি ক্রেতা সাধারণের পকেট কাটবো। কার সামর্থ্য আছে কার সামর্থ্য নাই, তা দেখবার সময় আমার নাই। ভঙ্গুর ঈমান! রুগ্ন নৈতিকতা!
চিকিৎসার জন্যে হাসপাতালে যান, কাঁচি নিয়ে বসে থাকে এক ধরনের ডাক্তার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার। তারপর আছে ভুল চিকিৎসা। আপনি মরবেন কি বাঁচবেন তার দায়-দায়িত্ব আপনার কপালের। আছে দালালের দৌরাত্ম্য।
সবাই বোনাস চায়! চায় সোনার হরিণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাণিজ্য চলে, উন্নয়ন কাজে ভাগ-বাঁটোয়ারা, মানে সোনার হরিণ চাই। (গড়ে সবাই খারাপ বা সব প্রতিষ্ঠান খারাপ, তা বলা যাবে না।) তবে এইটা সত্য, সিন্ডিকেটের যাঁতাকলে আমার সোনার বাংলা।
‘বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অনিশ্চয়তার মধ্যে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা সম্প্রসারণ করা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জাতীয় পরিকল্পনার মধ্যে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন’। (সূত্র : বিশ্বব্যাংক, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট)।
দুর্নীতি দমন না হলে, উন্নয়ন বলি আর স্বল্পোন্নত দেশ বলি, তা বাস্তবে তো পথ হারাবেই, কাগজ-কলম থেকেও হারিয়ে যাবে। খাল যদি থাকে, জল নাই, ইট-পাথরের শহরে উন্নয়নের নামে চলে বৃক্ষ নিধন। নদী দূষণ, নদী ভরাট, কব্জিজোরে চলছে কারবার!
আজ ৪৩.৮ ডিগ্রি তাপদাহে পুড়ছে দেশ। আজকের এ পরিস্থিতি শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে--তা মনে করি না। পরিবেশ ভারসাম্যহীন হওয়া, তার বৃহৎ দোষ আমাদেরও কম নয়। এই প্রযুক্তির যুগে, আমরা আমাদের মানসিকতায় শুধু লোভ-লালসার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছি। এবার সোনার বাংলাকে ভালোবাসতে শিখুন, গড়ে তুলুন প্রজন্মের সিঁড়ি, শিক্ষাকে বাণিজ্য না বানিয়ে মানসম্মত করুন, স্বাস্থ্য বিভাগ যেনো হয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।
গাছগাছালি, নদীনালা, প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, প্রকৃতি আমাদেরকে দিবে শীতল ছায়া। দিবে স্বচ্ছ তৃষ্ণার জল। (এ দায়িত্ব স্ব স্ব ক্ষেত্রে সকলের)
সীমিত আয়ের মানুষের মূল কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মজুতি সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা এখন সময়ের দাবি। মানুষের আয় বেড়েছে, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে তার দ্বিগুণ। হ্যাঁ, বৈশ্বিকভাবে নানা কারণে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, এটা সত্য। কিন্তু আমাদের দেশের মতো দ্রব্যমূল্য নিয়ে এমন কারসাজি, অরাজকতা, তুঘলকি কারবার খুব বেশি দেশে চোখে পড়বে না।
শুধু সরকারি দপ্তর দিয়ে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়, পাশাপাশি নষ্ট মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। তা না হলে, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ স্যারের একটা কবিতার দুটি লাইন বলতে হয় :
‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।
কড়কড়ে রৌদ্র আর গোলগাল পূর্ণিমার চাঁদ
নদীরে পাগল করা ভাটিয়ালি খড়ের গম্বুজ
শ্রাবণের সব বৃষ্টি...’
আমরা বীরের জাতি, আমাদের আছে বীরত্বগাথা ইতিহাস, আমরা অর্জন করতে জানি। কিছু নষ্ট মানসিকতার মানুষের কারণে আমাদের সব অর্জন বিফল হতে পারে না।
‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি,
আমি আমার ভালোবাসার কথা বলতে এসেছিলাম’।- নির্মলেন্দু গুণ।
পরিশেষে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতার শেষ চারলাইন দিয়ে শেষ করবো :
‘এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মজিবুর রহমান;
তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলার পথ চলি-
চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি’।
সবাই সুস্থ থাকুন। ভালো থাকুন। নিরাপদে থাকুন।
০৫.০৫.২০২৪