বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৪, ০০:০০

মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস

এই জনমে

অনলাইন ডেস্ক
এই জনমে

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

দশ.

ক্যাম্পে বসে বসে চিন্তা করছে মেহের জল্লাদ। পাশে বসা তার প্রধান অনুচর হেকমত। সে এই মাত্র খবর নিয়ে এসেছে আমির বাহিনীর অবস্থান। এসব বিষয় জানাবে বলে কিছুক্ষণ যাবৎ অপেক্ষা করছে। কিন্তু মেহের হাতে পানপাত্র নিয়ে পান করছে আর কী যেনো ভাবছে।

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এবার মেহের জল্লাদকে বললো, ‘ওস্তাদ কিছু কথা কমু।’

হেকমতের কোনো কথা শুনছে না মেহের। সে চোখ বন্ধ করে ভাবছে। খবর পেয়েছে আরেক রাজাকার খাজা সাঈদ শাহর বিষয়ে। বর্তমানে এই লোকটি তাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে নির্মমতায়।

খাজা সাঈদ শাহ সে সময় নওয়াপাড়ার পীর। সবাই তাকে মেজো হুজুর বলেই সম্বোধন করতো। মেহের শুনেছে সে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে মুক্তিযোদ্ধা শনাক্ত করে। তারপর তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলা হতো ভৈরব নদে। অভয়নগর থানার রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটির প্রধান এই মেজো হুজুর। অভয়নগর এলাকায় স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন হত্যা করার জন্যে তার রয়েছে বিশেষ বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্য ছিল ৩০ জনের মতো। নওয়াপাড়ার পুরানো বাসস্ট্যান্ডের পাশে মেজো হুজুরের টর্চার সেল। যা আমজাদ মোল্লার বাড়ি হিসেবে মানুষজন জানে। এখানে অসংখ্য মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে।

আরো একটি খবরও তার কানে আসে। খাজুরা এমএন হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সেক্রেটারি ছিলো ডাঃ ইব্রাহীম। যুদ্ধ শুরু হলে সে নিজের স্কুলে স্থাপন করে রাজাকার ক্যাম্প। টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত হয় স্কুলের কমন রুমটি। এখানে দিনের পর দিন পৈশাচিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষদের। লাশ ফেলা হতো চিত্রা নদীতে।

এসব খবরে মনে মনে উৎফুল্ল হয় মেহের জল্লাদ। সে মনে করে তাকেও এদেরকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। শুনেছে, এখানে অনেককেই হত্যা করা হয়েছে। তবে লক্ষণ পরামাণিক, ডাঃ আবদুল কাদের, সহোদর দুই মুক্তিযোদ্ধা আয়েন উদ্দীন আয়না ও ময়েন উদ্দীন ময়না এবং আজিজের নাম জানা গেছে। এ ছাড়া আরও ২২ মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে হত্যা করা হয়। ওই ২২ মুক্তিযোদ্ধাকে কৌশলে বন্দি করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এখানে রাজাকারদের হাতে মিত্র বাহিনীর ৬ জন অফিসারও নিহত হয়।

সে এসব বিষয় মনে মনে ভাবে আর খুশি হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন ইব্রাহীম ডাক্তার এক প্রকার নিজ উদ্যোগেই স্কুলে রাজাকার ক্যাম্প চালু করে। তার রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিল ২৫ জন। এরা হচ্ছে হেকমত আলী, মোসলেম আলী, আমজাদ আলী, হাবিবর মোল্লা, ফসিয়ার মোল্লা, লিয়াকত আলী, আবদুর রহমান, মোশারেফ মুন্সী, সমির উদ্দীন, হাসান আলী, কাদের ড্রাইভার, রুহুল আমিন, সিদ্দিকুর রহমান, নাসির হাকিম লস্কর, জুলফিকার ও কাজী সিরাজসহ আরও কয়েকজন। এর মধ্যে হেকমত আলী তার নিজের দলে চলে এসেছে।

এবার মেহের জল্লাদ ভাবে আমজাদ মোল্লা ও কায়েম আলীর কথা। বাঘারপাড়া উপজেলার প্রেমচারায় তাদের বাড়ি। তাদের বাহিনীতে আছে নওশের, ইদ্রিস, সবুর বিশ্বাস, দলিল উদ্দিন, মোজাহার বিশ্বাস, আহমদ আলী, মতিয়ার, দাউদ, গফুর, সোবহান, নওশের, লিয়াকত, আজিবর, সিদ্দিক হোসেন, মজিদ, আনসার, মাহাতাব, জবেদ, ফসিয়ার ও গফুর। এই বাহিনী অসংখ্য মানুষ খুন করে। লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে ঘর-বাড়িতে। তারা চানপুরের মুক্তিযোদ্ধা নওশেরের মা ও বাবাকে গুলি করে হত্যা করে। সাত মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে পাতকুয়ার মধ্যে লাশ ফেলে দেয়। খোকন নামে একজনকে হত্যা করে লাশ ভেলায় ভাসিয়ে দেয়া হয়। তার বাবাকেও হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয় তারা। এই বাহিনী বন্দবিলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম, ছাত্র সাখাওয়াতকে ঘুমন্ত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করে। একইভাবে হত্যা করে আবুল মন্ডল, রুহুল ও আফসারকে। আর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় গাইদঘাটের সুরত আলী, মুক্তার আলী, আড়োকান্দির মান্নান, পিয়ারপুরের চাঁদ আলী ও তার স্ত্রী এবং রজব, উত্তর চাঁদপুরের আয়নাল, নিমটার তারাপদের স্ত্রীসহ অসংখ্য মানুষকে। এদের দ্বারা লুটতরাজ, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে অগণিত।

ওদিকে আর এক ডাকসাইটে ঘাতক আফছার জল্লাদের বাড়ি সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামে। তার হাতেই সৃষ্টি হয় রূপদিয়ার বধ্যভূমি। সে ঘাড়ে রাইফেল ঝুলিয়ে কচুয়া, রূপদিয়া, চাউলিয়া, নরেন্দ্রপুর এলাকায় চালাচ্ছে ত্রাসের রাজত্ব।

রূপদিয়া বাজারে রোস্তম ডাক্তারের বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বাঙালিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এই ক্যাম্পের প্রধান জল্লাদ আফছার। তার হাতে নৃশংসভাবে খুন হয় মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুল হক, মোস্তফা মৌলভী, সান্যাল, গফুর, মৃধা, আবদুল জলিল, গহর আলী। এখানে আফসারকে অনেকেই ‘মেজর’ বলে সম্বোধন করে।

মেহের জল্লাদের মনে আগুন জ্বলে উঠে। এতো নির্মম হওয়া সত্ত্বেও তাকে কেনো এখানে মেজর বলে না! সে শুধু সবার কাছে মেহের জল্লাদ হিসেবেই পরিচিত। এবার তার মনে আরও মানুষ খুনের নেশা শুরু হয়ে যায়। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে বাঙালির রক্তে সে গোসল করবে। একটা বাঙালিকেও সে আস্ত রাখবে না।

মনে মনে ভাবনা শেষ হলে তার চোখ দুটো খোলে। পাশে বসা হেকমতকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘কিরে কী খবর আনছস?’

‘ওস্তাদ, আমিরদের ক্যাম্পে তো রসালো কয়েকটা মালামাল। এগুলো সবই খুব মিষ্ট অইবো আপনের জন্য। আজ রাইতেই কামডা করতে অইবো।’

কথাটা শুনেই মেহের জল্লাদের রক্ত গরম হয়ে যায়। খপ করে হেকমতের গলাটা চেপে ধরে। প্রচণ্ড চাপে হেকমতের জিহ্বা বের হয়ে যায়। সে গোঁ গোঁ করতে থাকে।

মৃত্যু আসন্ন মনে করে আল্লাহকে ডাকে। কিন্তু তার মুখ দিয়ে স্বর বের হয় না। সে জানে মেহের জল্লাদ এটা খুশিতে করেছে, এখনই তাকে ছেড়ে দেবে। কিন্তু মেহের ছাড়ে না। দম বন্ধ হয়ে যাবার আগে ঝাঁকি দেয় হেকমত। এবার তাকে ছেড়ে দেয় মেহের।

কোনোরকমে মেহেরের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে তার চোখের দিকে তাকায় হেকমত। মেহেরের চোখ দুটি আগুনের মতো জ্বলছে। ধীরে ধীরে অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠে সে, ‘তোরা সবাইরে রেডি কর, আইজ রাইতেই কামডা করতে অইবো।’

সেই রাতেই মেহের জল্লাদ বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা আমির বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করার জন্যে বের হয়ে যায়। তাদের বাসনা, আমির বাহিনীকে পরাস্ত করে ক্যাম্পের সুন্দরী নারীদের হস্তগত করবে আর তাদের রসদ ও অস্ত্রগুলো লুট করবে। সেই লক্ষ্যে রাতের আঁধার অগ্রসর হতে থাকে।

আমির বাহিনীরও পূর্ব প্রস্তুতি ছিলো। তারা গুপ্তচরের মাধ্যমে জানতো, যে কোনো মুহূর্তে ক্যাম্পে আক্রমণ হবে। ওদিকে সেই রাতেই আবারও আক্রমণের প্রস্তুতি নেয় মুুক্তিযোদ্ধা জহিরুল হক খানের দল। তারাও ধীরে ধীরে এদিকে আসছিলো।

হঠাৎ করেই আমির বাহিনীর ক্যাম্পে গোলাগুলি শুরু করে মেহের জল্লাদের দল। কিন্তু একদিকে আমির বাহিনী আর অন্যদিকে জহিরুল হক খানের দলের অপ্রতিরোধ্য আক্রমণে মেহের জল্লাদের রাজাকার বাহিনীর ৯০ ভাগ সদস্যই কিছু বুঝে উঠার আগে গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এই বেঈমানগুলোর রক্তে ভেসে যায় মাটির জমিন।

রাজাকার দলের পরাজয়ে সুচতুর মেহের জল্লাদ তার প্রধান শিষ্য হেকমতকে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাবার চেষ্টা করে। দু’দিক থেকে দুই মুক্তিযোদ্ধার দল তাদেরকে গুলি করতে থাকে। কিন্তু তারপরও তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আমির বাহিনী ও জহিরুল হক খানের দল একত্রিত হয়। এরই মধ্যে আমির খুঁজে পায় তার স্ত্রী সুজানাকে। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে আর যুদ্ধ জয়ের উল্লাসে মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত করতে থাকে।

জহিরুল হক খান এ দৃশ্যে বেশ খুশি হন। তিনি আমির-এর সাথে বুকে বুক মিলান। তারপর বলেন, ‘যুদ্ধ কখনো মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে আবার সেই যুদ্ধই মানুষের মাঝে মিলনের সূচনা করে।’

আমির জহিরুল হকের সাথে করমর্দন করে তার বাহুতে হালকা চাপ দিয়ে বলে, ‘আপনার মতো দেশপ্রেমিকের জন্যে অনেক কিছুই সম্ভব। আপনাকে আমার অভিবাদন।’

এ সময় ওরা সবাই ক্যাম্পে প্রবেশ করে। ক্যাম্পের আলোতে আমির সবাইকে দেখতে পেলেও রূপালিকে খুঁজে পেলেন না। তাৎক্ষণিক ইমতিয়াজকে ডাকলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘রূপালি কোথায়?’

ইমতিয়াজসহ সবাই রূপালিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করলো। কিন্তু ক্যাম্পের ভেতর-বাইরে কোথাও রূপালিকে কেউই খুঁজে পেলো না।

ইমতিয়াজ হতভম্ভ, কোথায় গেলো রূপালি! যুদ্ধের সময়তো সে তার পাশেই ছিলো। রূপালিকে রাজাকার বাহিনীর দিকে অনবরত গুলি করতে দেখেছে সে। এক সময় ইমতিয়াজ জায়গা বদল করেছিলো। রূপালিকে বলেছিলো, তুমি এখানেই থেকে ওদের দিকে গুলি করতে করতে সামনে এগিয়ে যাও, আমি অপর দিকটা দেখছি। ইমতিয়াজ অন্য দিকে গিয়ে রাজাকারদেরকে গুলি করছিলো। কিন্তু রূপালির কথা ভুলেই গিয়েছিলো। ভাবতে থাকে ইমতিয়াজ, তাহলে কি রূপালিকে ওরা ধরে নিয়ে গিয়েছে?

পাহাড় সমান একটা জগদ্দল পাথর তার বুকের মাঝে চেপে বসে। ভাবে সে, তাহলে আমরা জয়ী হয়ে জিততে পারলাম না?

এ সময় আমির এসে সান্ত¡না দিলেন। বললেন, ‘তুমি চিন্তা করো না ইমতিয়াজ। রূপালিকে আজ রাতের মধ্যেই আমরা খুঁজে বের করবো।’

এ সময় পাশে এসে বসলো অনন্যা, ঈষাণবালা, তুষার, ইরফান, অধরা, ইরণাসহ ক্যাম্পের সবাই। তারপর অধরা ইমতিয়াজকে বললো, ‘রূপালি আমাদের বোন, তাকে খুঁজে বের করা আমাদেরই দায়িত্ব। তুমি একেলা চিন্তা করো না। সে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেই।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়