প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৪, ০০:০০
মসনদের আত্মকথা

আমি বাংলার মসনদ। বাংলার ভূমিপুত্র। আমাদের বংশধরেরা কেউবা দিল্লীর সালতানাতের জন্যে তৈরি, কেউবা প্রাচীন বাংলার মৌর্য বংশ বা সেন বংশ বা পাল বংশের জন্যে তৈরি হয়েছিলেন। প্রত্যেকে নিজ নিজ মনোরঞ্জক উপাদানে আমাদেরকে সজ্জিত করেছিলেন। আমরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্নরূপ প্রজাতিতে বিভক্ত। যেমন কেদারা, চকি, পিঁড়ি, গোল টেবিল, লম্বা টুল ইত্যাদি। আমাদেরকে তৈরির প্রধান উপাদান ছিলো কাঠ আর পেরেক। তার ওপর দক্ষ কারিগর দ্বারা খচিত হতো নয়নাভিরাম নমুনা এবং বিভিন্ন ধরনের মণি-মুক্তা খচিত আসন। মোঘল স¤্রাট শাহজাহান কোহিনুর নামীয় একটা অতি উন্নতমানের মুক্তা খচিত মসনদে বসেই তাঁর স্ত্রী আরজুমান্দ বানু বেগম যিনি মমতাজ মহল নামে পরিচিত, তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে অপূর্ব তাজমহল সৌধটি নির্মাণ করেছিলেন। সেই মসনদে বসেই ১৬৫৮ সালে তাঁর পুত্র আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দী হন এবং আগ্রা দুর্গে মৃত্যুবরণ করেন। আমি প্রকৃতিতে মূক ও বধির। আমার বুকের ওপর জৌলুস নিয়ে বসে থেকেই মহামতি হিটলার পৃথিবীতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিলেন। আবার আমার বুকের ওপর বসেই হাজী মুহাম্মদ মহসীন এবং আর-পি সাহারা প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। যে মসনদে বসে ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ জাতিকে পাইয়ে দিয়েছিলেন, অনুরূপ একটা মসনদে বসেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের ত্রিশ লাখ স্বাধীনতা সংগ্রামীকে শহিদ করেছিলেন।
একদিকে আমার বুকে যেমন জ্বালা, অন্যদিকে আমি তৃপ্ত। যে শার্দুল জীবনে একবার নরমাংসের স্বাদ পেয়ে যায় বা যে যুবক-যুবতী সূচনাতেই জীবনের স্বাদ পেয়ে যায়, আবার যে শাসক জীবনে একবার মসনদে আরোহনের স্বাদ পেয়ে তৃপ্ত হয়ে যায়, তার মনটাই চৌম্বক পদার্থের ন্যায় আচরণ করে। তার ভবিষ্যৎ দিশেহারা ঝুলন্ত। কাষ্ঠ নির্মিত আমাতে বা আমার কোনো প্রজাতির বক্ষে উপবিষ্ট হয়ে কেউবা গ্রাম্য সালিসে জটিল সমস্যার সামাধান প্রদান করেন, কেউবা বৈকালিক আড্ডা জৌলুসের সাথে অথবা কেউ শুভ্র-জ্যোৎস্নায় পুলকিত যামিনি উপভোগ করতেন।
আমাদের অনুভূতি অতীব প্রখর কিন্তু আমরা যে সৃষ্টিতেই মূক-বধির। আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই, স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর-বাড়ি নাই। কিন্তু আমরা অতি সযতনে পরিবারেই পালিত হয়ে থাকি। কারণ আমাদের দ্বারা সামাজিক এবং পারিবারিক ঐতিহ্য বহাল থাকে। প্রাচীন বাংলায় রাজা-মহারাজা বা জমিদারগণ চিত্ত সুখে পুলকিত থাকতেন। রাজকার্য সম্পাদনের যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক সিংহাসন তৈরি করাতেন। যা নির্মিত হতো বাঁশ-বেতসহ আরো বহু ধরনের প্রাকৃতিক আঁশ দিয়ে। নির্মাণ শৈলী এতোটাই নিপুণ ছিল যে, হঠাৎ দেখলে কৃত্রিম ভাবার কোনো উপায় ছিল না। যা কর্মোদ্যমের প্রতীক মাত্র। আমরা সবাই শ্রেণিওয়ারী ব্যস্ত আছি নিয়ত মানব কুলের সেবায়। আবার আপনারা জীবশ্রেষ্ঠ মানবকুল কেউ বা অস্থির আছেন নির্দিষ্ট আসনে বসে পাশব বৃত্তি চরিতার্থ করার অপকৌশলে। কেউবা ভাবছেন নিঃস্বার্থ জনকল্যাণ কৌশল।
আমাদের বিধি বাম। চোখ নাই তাই মোরা দৃষ্টিহীন। কিন্তু আমরা এক বিস্ময়কর অনুভূতি প্রবণ। আমাদের বক্ষে বসে কে কোন্ ধরনের চিন্তামগ্ন আছে তা কিন্তু সহজেই বুঝতে পারি। কিন্তু তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না বলেই সব অপকর্ম আপন গতিতেই ঘটে যায়। চলমান শতাব্দীতে আমার প্রাকৃতিক দেহ সৌষ্ঠব কৃত্রিমতায় আচ্ছাদিত হয়ে একেবারে হালকা এবং সহজেই ভঙ্গুর হয়ে গেছে। এতে আমি রি-সাইক্লিং জাতীয় পদার্থের সাথে আমার দেহাবশেষ যুক্ত করতে বাধ্য। কারণ উপাদানগুলো ধাতব এবং প্লাস্টিক উপকরণীয়। আমরা মানুষের তৈরি আর তাই যেভাবে চালায় সেভাবেই চলি।
ক্ষমতালিপ্সু মানুষ আজি অতিশয় মোহাচ্ছন্ন,
অবয়বটাই রয়েছে, মানবতা হয়েছে বিপন্ন ॥
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক, বলাখাল যোগেন্দ্র নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় ও কারিগরি কলেজ, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।