প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০০:০০
উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে চাই সমন্বিত প্রয়াস

যে কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় এর প্রতিটি ধাপ দায়িত্বশীলতা ও সততার সঙ্গে অতিক্রম করার পর যদি গ্র্যাজুয়েটরা বিশ্বমানের না হয়, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন বা পরিমার্জন প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও অংশীজনের আন্তরিকতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে। সুতরাং শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করাটাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজসমূহের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়।
বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার শতভাগ সুফল পেতে সেখানকার ইতিবাচক দিক ও দুর্বলতাগুলো আলোচনার দাবি রাখে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা নামমাত্র খরচেই করা সম্ভব। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। এসব শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে খুব সহজেই বিশ্বমানের মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারে।
কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও উচ্চশিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির স্বাধীনতা বেশি থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই শেখানোর বিষয়ে শিক্ষকের আন্তরিতার অভাব পরিলক্ষিত হয়।
১৬ জানুয়ারি ২০২৪ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কাজে গিয়েছিলাম। ক্যাম্পাসের রাস্তা দিয়ে ওখানকার শিক্ষকরাসহ হেঁটে যাওয়ার সময় পথচারী শিক্ষার্থীদের কথোপকথন কানে এলো।
একজন আরেকজনকে বলছে, ‘স্যার অল্প ক্লাস নিয়েই সিলেবাস শেষ করে দেন। এমন করে কি কিছু শেখা যাবে?’ বাস্তবিক অর্থে ক্লাস না নেওয়ার ফলে শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের যে নেতিবাচক মনোভাব থাকে, তাতে শিক্ষকতা পেশা উপভোগ করা তো দূরের কথা, সেটি রীতিমতো বোঝা হয়ে যায়।
নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে পারলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের উন্নয়ন ঘটবে ও গ্র্যাজুয়েটরা বিশ্বজনীন হবেন। যুক্তিটির যথার্থতা নিরূপণে আমি একটি খবরের অবতারণা করছি। ২ এপ্রিল ২০২৩ জাতীয় একটি দৈনিক পত্রিকার সংবাদ শিরোনাম ‘বাংলাদেশের ৯ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রাইস ইউনিভার্সিটিতে বিশেষ সুযোগ’।
খবরে প্রকাশ, ভিনদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য সাধারণত ইংরেজিতে ভাষা দক্ষতার পরীক্ষা দিতে হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইইএলটিএস, স্যাট বা টোফেলের মতো পরীক্ষা দিয়ে নির্ধারিত স্কোর অর্জনকারী বাংলাদেশিরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের নামি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের রাইস ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রিধারীরা কোনো ইংরেজি টেস্টের স্কোর ছাড়াই আবেদন করতে পারবে বলে ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে ১৪৭তম অবস্থানে থাকা রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন সিদ্ধান্ত আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। খবরটি ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের গ্র্যাজুয়েটদের মান সম্পর্কে রাইস বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে। এই তালিকায় বাংলাদেশের পাঁচটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে।
প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে সেখানে কিভাবে তত্ত্বীয় ও ব্যাবহারিক ক্লাস নেওয়া হয়, সে বিষয়ে আমি ওয়াকিফহাল। কোনো বিভাগের প্রত্যেকটি বিষয়ের তত্ত্বীয় পাঠক্রমকে সমান দুই ভাগে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি ভাগ পাঠদানের জন্য একজন করে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। বিষয়ভিত্তিক ব্যাবহারিক ক্লাসও ওই দুজন শিক্ষকই পরিচালনা করেন। ফলে একজন কোনো কারণে ছুটি নিলে বা অসুস্থ হলে তাঁর সময়ে অন্য শিক্ষক ক্লাসটি চালিয়ে নিতে পারেন। আবার ছুটিতে থাকা শিক্ষক ফিরে এসে অন্য শিক্ষকের স্লটগুলোতে ক্লাস নিয়ে পুষিয়ে দিতে পারেন। এতে শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয় না এবং বিষয়ভিত্তিক তত্ত্বীয় ও ব্যাবহারিক জ্ঞানে ঘাটতি হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। সেখানে বছরে দুই সেমিস্টারের পদ্ধতিতে ১৪ সপ্তাহে একটি সেমিস্টারের পাঠদান শেষ হয়। এমন আঁটসাঁট রুটিনে যদি প্রত্যেক বিষয়ে দুজন শিক্ষক পাঠদানের দায়িত্বে নিয়োজিত না থাকেন, তাহলে শিক্ষকের ছুটিজনিত বা অসুস্থতাজনিত কারণে ক্লাসে অনুপস্থিতির পরে মেকাপ ক্লাস নিয়ে সিলেবাস শেষ করা বাস্তবে সম্ভব না।
বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখলাম কর্তৃপক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ কিভাবে অল্পদিনেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, শিক্ষা ও গবেষণার প্রভূত উন্নতি সাধন করতে পারে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের কাছেই আমার শোনা, সেখানকার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ গবেষণার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। এ ছাড়া অফিস চলাকালে হঠাৎ করেই তিনি একাডেমিক ভবনের করিডর দিয়ে হেঁটে যান। এতে ক্লাসগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
বাংলাদেশের ১১৩টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন লাখেরও অধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আগে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে অধ্যয়ন করতে যেত, যা বৈদেশিক মুদ্রা খরচের একটি বিশাল খাত ছিল। সে ক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আমাদের দেশে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কিউএস ওয়ার্ল্ড র্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পাঠদান ও শিক্ষার মানোন্নয়নে এখনো সন্তোষজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। আমার এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। আমার অফিসে এসে এক দিন তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার শেয়ার করলেন—তিনি তাঁর এক শিক্ষার্থীকে ব্যাবহারিক পরীক্ষায় সাধারণ গ্রেড দিয়েছেন। শিক্ষার্থী সংক্ষুব্ধ হয়ে বিভাগীয় প্রধান বরাবর এই মর্মে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে যে সে আরো বেশি নম্বর পাবে, শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে কম নম্বর দিয়েছেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় প্রধান শিক্ষককে ডেকে আরো এক গ্রেড বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। এমন অতিমূল্যায়ন সার্বিক শিক্ষার সমৃদ্ধির অন্তরায়। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিশ্রম করার প্রবণতা বাড়ার পরিবর্তে নেতিবাচক বিনাশী দর্শন তৈরি হয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে। এখানে শিক্ষার মানোন্নয়নে মনোযোগী হলে শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের সূচক হবে ঊর্ধ্বমুখী।
উচ্চশিক্ষার ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অধ্যয়ন করছে। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিনিয়ত তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তাদের জন্য নিয়মিত ক্লাস পরিচালনার বিষয়, বিজ্ঞান বিভাগে ব্যাবহারিক ক্লাসের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে উচ্চশিক্ষার মান ঊর্ধ্বমুখী হবে।
আমরা উন্নত বিশ্ব থেকে শিক্ষাপদ্ধতি গ্রহণ করতে চাই। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে উচ্চশিক্ষায় নির্দিষ্ট সময়ে সিলেবাস শেষ করার আন্তরিকতা যদি আমাদের মধ্যে তৈরি না হয়, তাহলে ভিত্তিজ্ঞানের গভীরতার অভাবে গড়ে উঠবে না প্রত্যয়ী ও গবেষণাপ্রেমী বিশ্বনাগরিক। শিক্ষাপদ্ধতি যতটা গুরুত্বপূর্ণ ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এর বাস্তবায়নের নিমিত্তে অংশীজনের নিয়মিত অংশগ্রহণ ও মানোন্নয়নের সমন্বিত প্রয়াস।
ড. মোঃ নাছিম আখতার : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।