প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৭
মেঘের সাথে একদিন

মেঘ আমার কাছে চির বিস্ময়ের। বিশেষ করে সাদা মেঘ। তুলোর মতো নরম। পালকের মতো হাল্কা। ডানা ছাড়া মেঘগুলো কীভাবে আকাশে ভেসে থাকে তা আমি ভেবে উঠতেই পারি না। শুনেছি পৃথিবী নাকি সবকিছুকেই তার কেন্দ্রের দিকে টানে। তাহলে সাদা মেঘ কীভাবে ভেসে থাকে! একটা কাগজের টুকরো এরোপ্লেন হতে নীচে ফেলে দিলে পৃথিবীর টানের কারণে মাটিতে পড়ে যায়। অথচ সাদা মেঘেরা কত সহজেই আকাশে ভেসে থাকে! দিনের বেলা সূর্যের প্রখর তাপের কারণে সাদা মেঘের দিকে তাকাতে পারি না। তবে রাতের কোমল আলোয় মেঘেরা রূপবতী হয়ে ওঠে আরো। মেঘেদের অনেক রঙ। কালো, ধূসর, লালাভ, পানিতে ডেটলের ফেনার মতো সাদা। গোধূলির মেঘের রঙ হিঙুলের মতো। আবার কোন কোন মেঘ কড়ির মতো শুভ্র, কোন কোন মেঘ খইরঙা। আমার অতো মেঘে কাজ নেই। আমি বলছি সাদা মেঘের কথা। মেঘেরা যেন আকাশে উড়ে চলা বকের বংশ। উড়ে চলেছে তো চলেছেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, মেঘের চেয়ে সুখি আর কিছুই নেই। তাদের এক দেশ হতে আরেক দেশে যেতে কোন মানা নেই। কোনো সীমান্ত তাদের জন্যে বাধা হয়ে দঁাড়ায় না। মেঘেরা তাই বিশ্বনাগরিক। মাঝে মাঝে মন চায় মেঘের লুকোনো ডানা দুটো খুঁজে বের করি। মেঘেরা আদৌ বুকে হঁাটে নাকি উড়ে যায় তা-ও বুঝি না। মেঘেদের চেনার কোন উপায় নেই। কোনটা বাংলাদেশের, কোনটা ভুটানের তা বুঝা যায় না। সব দেশের মেঘই একরকম।
একবার শরতের এক দুপুরে বাসার কাছেই সবুজ মাঠে বসে নীল আকাশে সাদা মেঘের শোভা দেখেছিলাম। সাদা মেঘের নিরালায় আকাশকে আরো নীল মনে হয়েছিল। অনেকটাই চিড়িয়াখানায় দেখা ময়ূরের মতো। সেই নীলের বিপরীতে সাদা মেঘের আকৃতিকে দেখে মনে হয়েছে কুলপি আইসক্রিম। এই বুঝি গলে গেলো। কিন্তু গলছে না। প্রতিদিন সূর্যের আলোয় মেঘের নকশা দেখি, কিন্তু রাতের মেঘের নকশা দেখার সুযোগ হয় না। শহরের কৃত্রিম আলো আর আকাশছেঁায়া ভবনগুলোর কারণে আমার কখনো রাতের আকাশে মেঘের দলাদলি দেখা হয়নি। তাই আমি সুযোগের অপেক্ষায় থাকি, কখন শরতের পরিষ্কার আকাশে রাতের মেঘের ভেসে চলা দেখতে পাবো। শারদীয়ার পূজা উপলক্ষে বেশ কয়েকদিন স্কুল ছুটি। মা এই সুযোগে গ্রামের বাড়িতে আমাদের নিয়ে যাবে। আমার আর ভাইয়ের মন তাই খুশিতে উড়ু উড়ু। আমাদের গ্রামের বাড়ি নদীর কাছাকাছি। নদী জোয়ারে ডাকলে আমরা বাড়িতে বসেই শুনতে পাই। আগে ভাঙনের ভয় ছিল। এখন নদীর পাড় বঁাধাই হওয়াতে আর পাড় ভাঙার ভয় নাই। আমাদের গ্রামের বাড়ির দোতলার ছাদ হতে নদীর শোভা দেখা যায়। গ্রামে যাওয়ার কথায় একটু খুশি হলাম এজন্যে যে, প্রবারণা পূর্ণিমায় গ্রামে ফানুস উড়ানো হয়। অনেক বড় বড় ফানুস। ফানুস ওড়ানো খুব সহজ। প্রথমে ফানুসের মুখে বঁাধা তারে মোমের টুকরা পেঁচিয়ে দিতে হয়। তারপর সেই মোমের টুকরায় আগুন ধরিয়ে দিতে হয়। আগুন জ্বলতে শুরু করলে মোম পুড়ে গ্যাস হয়। এই গ্যাস হাল্কা বলে ফানুসের ভিতরে গায়ে উপরের দিকে ধাক্কা মারে। একসময় ফানুসের গ্যাসের চাপ বাড়লে আস্তে করে হাতের মুঠোতে ধরে থাকা ফানুসের কিনারা ছেড়ে দিতে হয়। ফানুস তখন হু হু করে উড়ে যায় আকাশে। যদি বাতাস অনুকূলে থাকে তবে তো কথাই নেই। ফানুস খুব দ্রুত উড়ে যাবে দূরে বহুদূরে। অনেক সময় কপাল খারাপ হলে বাতাসের প্রবাহ না থাকলে ফানুস বেশিদূর আগায় না। একটু উঠেই পড়ে যায়।
আমরা সময়মত রওনা দিয়ে আমাদের গ্রামের বাড়িতে পেঁৗছেছি। গ্রামে যেতে হলে ট্রেনে ভোরবেলায় চেপে কাকার বাসায় যাই। তারপর সেখান থেকে সদলবলে চলে যাই গ্রামে। যাওয়ার পথে নদীর ওপর একটা ব্রিজ পার হতে হয়। ব্রিজের দুই পাশে নৌকার সমাহার চোখ জুড়িয়ে দেয়। আগে আমার দাদুরা নৌকায় চড়ে নদী পার হতো। এখন আমরা সরাসরি গাড়ি করে রওনা দিই কাকার বাসা হতে। গাড়ি ঠিক আমাদের বাড়ির ঘাটায় নামিয়ে দেয়। প্রথম দিকে কিছু সময় যায় গ্রামের সবার সাথে কুশল বিনিময় করতে। আমরা ছোটরা অবশ্য এসব করতে হয় না। আগামীকাল পূর্ণিমা। অর্থাৎ আগামীকালই আকাশে ফানুস উড়বে। আমি মনে মনে খুশি হই। আজ রাতেই চঁাদমামাকে পাবো পূর্ণ আলোয়। আকাশ পরিষ্কার। কেবল সাদা মেঘ ছাড়া। অর্থাৎ আজ রাতে বৃষ্টি হবে না। সুতরাং আজ রাতে জোছনায় মেঘের সাথে আমার দেখা হবে, কথা হবে। সারা দুপুর দৌড়ে, খেলে কাটালাম। বিকেলে নদীর পাড়ে বসে মাঝিদের নৌকা বেয়ে যাওয়ার কসরত দেখে মুগ্ধ হয়েছি বেশ। আমাদের নদীর এপারে তেমন কাশফুল ফোটেনি। কিন্তু ঐ পাড়ে সাদা কাশের হাসি মন কেড়ে নেয়। মনে হলো যেন তুলোর বিছানা। কিংবা ঠাকুরমার সাদা শাড়ি বিছিয়ে কেউ যেন শুকোতে দিয়েছে রোদে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে গেছে। ঘরে ঘরে বাতি জ্বলে উঠেছে। আমাদের গ্রামে পল্লি বিদ্যুৎ এর আলো ঝলমল করছে গত কয়েক বছর ধরে। গ্রামে এলে মায়ের কড়াকড়ি থাকে না। মা যেন হঠাৎ খুব ভালো হয়ে যায়। পড়ার চাপ নেই, খাওয়ার ডাকাডাকি নেই, টিচারের বাসায় যাওয়ার তাগাদা নেই। মনে মনে ভাবি, সারাটা জীবন যদি এভাবেই যেতো! আমার কাকা ছোটবেলায় নাকি খালি পড়া ফঁাকি দিতো। দাদু একদিন একটা বেত নিয়ে কাকাকে ভয় দেখিয়ে বলেছিলেন, তুই যে পড়িস্ না, তুই বড় হলে ভাত খাবি কী করে? ছোট কাকা নাকি তৎক্ষণাৎ জবাব দিয়েছিল, কেন, গুড়াদি রঁাধবে আর আমি খাবো। এখন যেমন খাই। গুড়াদি হলো আমার সেজো পিসি। কাকার জবাব শুনে দাদু হেসে দিয়েছিলেন। আমি দোতলার ছাদে উঠতে উঠতে বাবার বলা এই গল্পটা মনে পড়ল। আমাদের দোতলার ছাদটা বেশ বড়। চারপাশে রেলিং দেয়া দেয়াল ছাড়া আর কিছু নেই ছাদে। কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা দোলনা এককোণায় পাতানো। আমি বেশ আরাম করে দোলনায় বসলাম। হাতে বঁাধা ঘড়িতে আটটা বাজে রাত। আমি এখন একাকী ছাদে বসে আছি। নিজেকে একটু বড় বড় মনে হচ্ছে। একা ছাদে এর আগেও দু’চারবার ছিলাম। অনেকের ভূতের ভয় থাকে। আমার কোন ভূতের ভয় নেই। ভূত থাকলে তবে তো ভূতের ভয়। পুরো ছাদজুড়ে জোছনা লুটিয়ে পড়েছে। গলানো রূপোর স্রোতের মতো। মনে হচ্ছে জোছনার বান। আমি আকাশের দিকে তাকালাম। চঁাদটা পুরোপুরি গোল। বড়সড় একটা তন্দুর রুটির মতো গোল। চঁাদকে ঝলসানো রুটি বলে গেছে সুকান্ত। আর আমার কাছে মনে হলো সাদাটে তন্দুর রুটি। মাঝে মাঝে হাল্কা দাগ লাগা। চঁাদের আলোয় আশেপাশের সাদা মেঘগুলো হেসে উঠল। মনে হচ্ছে মেঘগুলো কোন দূর্গের প্রাচীরের শীর্ষ। কাজকরা আর খঁাজকাটা। আমি বোধ হয় কোন প্রাচীন সভ্যতার দেশে ঢুকে গেছি। রহস্যমাখা মুখ নিয়ে সাদা মেঘ যেন মুখ টিপে হাসছে আমাকে দেখে । আমি খুঁটিয়ে খু্িেটিয় জোছনা রাতে চঁাদের আলোয় সাদা মেঘেদের দেখছি। মনে হোল মেঘেদের মধ্যে পরিমেঘও আছে। খুব সুন্দর কেঁাকড়ানো চুল। পরি আমায় ডাকছে। এসো এসো। আমি পরিকে বললাম, তোমরা কোন দেশে যাও? পরি বললো, আমরা মেঘে মেঘে ভেসে ভেসে পরীরাজ্যে যাই। সেটা কোথায়? ওই যে আকাশের ওপারে। আকাশের ওপারে! ওখানে আর কী আছে? ওখানে আছে পৃথিবীর যমজ জগৎ। কী বললে? যমজ জগৎ? সেটা আবার কী? ওহ্! তুমি জানো না? পৃথিবীতে যেমন তুমি আছো তেমনি তোমার যমজ মানুষটা আছে আকাশের ওপারে। ওখানে তোমার ভাই আর তোমার মায়ের যমজও আছে। তাই নাকি? আমাকে কি নেওয়া যাবে ওখানে? পরি বললো, ঠিক আছে নেওয়া যাবে। তবে তোমার চোখ বন্ধ করতে হবে। কেন? চোখ বন্ধ করতে হবে কেন? কারণ চোখ বন্ধ না করলে তুমি ভয় পেয়ে অতো উঁচু থেকে পড়ে যেতে পারো। ও...কে ঠিক আছে। আমি তাহলে চোখ বন্ধ করলাম। পরি একটা অস্ফুট শব্দ করলো। আমি শুধু টের পেলাম, আমি উড়ছি শূন্যে। ভয়ে চোখ খুলছি না। উপরে উঠছি তো উঠছিই। কানে শুনতে পেলাম পরিকে কে জানি শঁাসাচ্ছে। তুমি পৃথিবীর মানুষকে কেন আকাশের এপারে আনলে? তুমি কি জান না এখানে শুধু পৃথিবীর বিপরীত যমজেরাই থাকে। যাও ওকে রেখে এসো যেখান থেকে নিয়ে এসেছো সেখানে। পরি বললো না। ওকে আমি কথা দিয়েছি এখানে আনবো। তুমি আমাকে যেতে দাও। ওকে আবার আমি রেখে আসবো পৃথিবীতে। শুধু ও তার বিপরীত যমজকে দেখতে চায় নিজের চোখে। উঁহু। তা হবে না। এখানে আমার কথাই আইন। আমিই এখানের নিয়ন্ত্রক। যাও তুমি ওকে রেখে এসো। না আমি ওর বিপরীত যমজকে না দেখিয়ে ফেরৎ নিয়ে যাবো না। পরির কথা শুনে আকাশের ওপারের রাজ্যের নেতা পরির সাথে লড়াই শুরু করে দিলো। লড়াই করতে গিয়ে পরী আমাকে ছেড়ে দিলো অগত্যা। আমি খুব বেগে পড়তে শুরু করলাম নিচে। আমি চিৎকার করে উঠলাম। কিছু বুঝে উঠার আগেই ধপাস করে একটা শব্দ হলো। শব্দ শুনে নিচ থেকে মা, কাকা আর অন্যরা উঠে এলো। আমি টের পেলাম, দোলনায় নয়, আমি পড়ে আছি ছাদের মেঝেতে। চারদিকে একটা হাসির রোল বয়ে গেল। ব্যথায় কাতর হলেও আমি শুধু খুঁজে বেড়াচ্ছি পরিটাকে। কারও হাসি তখন আমার কানে ঢুকছেই না। একদমই না।
ছবি-৩৬
আনন্দঘন শ্রেণিকক্ষে প্রাণবন্ত শিখন
রাশেদা আতিক রোজী
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হচ্ছে আনন্দঘন শিখন। যেখানে শিশুরা কোনো প্রকার ভয়, চাপ বা ভীতি ছাড়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে, খেলাধুলা ও আনন্দমুখর পরিবেশের মাধ্যমে শেখে, তাকে আনন্দঘন শিখন বলা হয়।
একটি শ্রেণিকক্ষে আনন্দঘন শিখন কেন প্রয়োজন, তার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
ভীতি ও মানসিক চাপ দূরীকরণ: সনাতন পদ্ধতির কড়া শাসন বা মুখস্থনির্ভর পড়া শিশুদের মনে শ্রেণিকক্ষ সম্পর্কে ভীতি তৈরি করে। আনন্দঘন পরিবেশে শিশুরা নির্ভয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে, ভুল করতে ভয় পায় না এবং তাদের মানসিক চাপ অনেকাংশ কমে যায়।
দীর্ঘস্থায়ী শিখন ও কৌতূহল বৃদ্ধি: আনন্দ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখা তথ্য শিশুরা দীর্ঘদিন মনে রাখতে পারে। যখন পড়ালেখাকে খেলার মতো বা মজার কোনো ক্রিয়াকলাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন শিশুদের মধ্যে জানার ও শেখার কৌতূহল বহুগুণ বেড়ে যায়।
সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ: একটি প্রাণবন্ত শ্রেণিকক্ষে শুধু শিক্ষক কথা বলেন না, বরং প্রতিটি শিশু সরাসরি কার্যক্রমে অংশ নেয়। ছবি অঁাকা, গান, গল্প বলা, ভূমিকা অভিনয় (রোল-প্লে) বা দলীয় কাজের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজেকে পাঠের অংশ মনে করে।
সৃজনশীলতা ও চিন্তন দক্ষতার বিকাশ: বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে কাজ করার স্বাধীনতা পেলে শিশুদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকাশ পায়। আনন্দময় পরিবেশে তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ও নতুন নতুন সমাধান খুঁজতে শেখে।
সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা বৃদ্ধি: দলগত খেলাধুলা বা আনন্দময় কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিশুরা একে অপরের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে শেখে। এর ফলে তাদের মধ্যে সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার মনোভাব গড়ে ওঠে।
বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি ও ঝরে পড়া রোধ: শ্রেণিকক্ষ যদি আনন্দদায়ক না হয়, তবে শিশুরা বিদ্যালয়ে আসতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। আনন্দঘন পরিবেশ শিশুকে বিদ্যালয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে, যা নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করে এবং প্রাথমিক স্তরে শিশু ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে।
আনন্দঘন শিখন কেবল শিক্ষাকে সহজ করে না, বরং এটি শিশুকে একজন আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। শিক্ষা যখন আনন্দের হয়, তখন তা আর শিশুর কাছে বোঝা মনে হয় না।
একটি প্রাণবন্ত ও গোছানো শ্রেণিকক্ষ মানেই হলো যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়াটা একদম জলের মতো পরিষ্কার। ক্লাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো পরিবেশটাকে মাতিয়ে রাখতে এবং পড়াশোনাটা জমিয়ে তুলতে কিছু দারুণ ও ঝটপট কৌশল বা কৌশলগত বুদ্ধি চমৎকার কাজ করে। একেবারে বাস্তব শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতার আলোকে সাজানো সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ও গোছানো কিছু নির্দেশিকা নিচে দেওয়া হলো:
সাধারণ কৌশলসমূহ:
* পরিষ্কার নিয়ম: ক্লাসে ঢুকতেই বাচ্চাদের জন্য একদম জলের মতো পরিষ্কার করে দেওয়া যে, কেউ কিছু বলতে চাইলে আগে হাত তুলতে হবে আর সবাই সবাইকে সম্মান করবে।
* সকালের বার্তা আলাপন: পড়ালেখার মূল পর্বে যাওয়ার আগে প্রতিদিন সকালে মাত্র ৫ মিনিট সবার সাথে একটু আড্ডা বা ছোটখাটো মন ভালো করার পর্ব রাখা, যাতে সবাই চনমনে হয়ে ওঠে।
* শান্তি রক্ষা: শিক্ষক চিৎকার না করে জাস্ট হাতে একটা নির্দিষ্ট তালি বা ইশারা দেবেন, আর তাতেই ক্লাসের সব দুষ্টুমি থেমে গিয়ে সবাই একদম চুপচাপ মনোযোগ দেবে।
* বাহবা দেওয়া: কেউ বাড়ির কাজ ঠিকঠাক জমা দিলে সবার সামনে তাকে দারুণ একটা “সাবাশ!” বা ছোট্ট একটা অঁাকা ছবি/স্টিকার দিয়ে উৎসাহ দেওয়া।
* একই নিয়ম: নিয়মের বেড়াজাল সবার জন্য একদম এক রাখা; আজ একজনের জন্য এক নিয়ম আর কাল আরেকজনের জন্য অন্য নিয়মÑএমনটা যেন না হয়।
সৃজনশীল কৌশলসমূহ:
* বিকল্প পরিকল্পনা: পড়া শেষ হয়ে যাওয়ার পর ক্লাসে যদি হাতে বাড়তি সময় বেঁচে যায়, তবে একঘেয়ে না করে একটা ঝটপট মজার কুইজ বা ছোট্ট কার্যক্রম বের করে ফেলা।
* নামের কাঠি: ছোট্ট একটা পাত্রের মধ্যে সবার নাম লেখা কাঠি রেখে সেখান থেকে একটা করে তুলে হুট করে প্রশ্ন করা, যাতে সবাই সবসময় সতর্ক থাকে যে কখন কার ডাক পড়ে!
* হাসি মুখ চিহ্ন: খাতায় লম্বা কোনো মন্তব্য না লিখে ঝটপট একটা হাসিমুখের চিহ্ন বা ইমোজি স্টিকার বসিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া যে কাজটা দারুণ হয়েছে।
* দিনের পরিকল্পনা: বোর্ডের একপাশে সুন্দর করে এঁকে বা লিখে রাখা যে এর পরে অঙ্কন ক্লাস, তারপর গণিত আর কখন টিফিনের বিরতিÑযাতে বাচ্চারা নিজেরাই বুঝতে পারে এরপর কী আসছে।
* ছোট দলনেতা: আজকের মতো ব্ল্যাকবোর্ড মোছা বা খাতা দেওয়ার দায়িত্ব কোনো একজন বাচ্চার হাতে দিয়ে তাকে ছোট্ট একটা শ্রেণিনেতা বানিয়ে ক্লাসের আসল মালিকানা বোধটা তৈরি করে দেওয়া।
শ্রেণিকক্ষ শুধু চার দেয়ালের কোনো পাঠশালা নয়, এটি হলো এক টুকরো জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে প্রতিদিন নতুন স্বপ্নের রঙ ছড়ান একজন শিক্ষক। গতানুগতিক নিয়মের কঠোরতার চেয়ে যখন সেখানে ভালোবাসা, ছোটোখাটো সৃজনশীল কৌশল আর চমৎকার বোঝাপড়ার মেলবন্ধন ঘটে, তখন শিক্ষা হয়ে ওঠে এক আনন্দের উৎসব। আর এভাবেই প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠতে পারে ছোট্ট একটি পরিবারের মতো স্নিগ্ধ ও প্রাণোচ্ছ্বল।
বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় শিশুদের আধুনিক শ্রেণিকক্ষে আনন্দঘন শিখন পরিবেশ তৈরিতে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাদানের পাশাপাশি ভৌত পরিকাঠামো ও শিখন পদ্ধতিতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
আধুনিক শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়িত প্রধান উদ্যোগসমূহ:
নমনীয় ও শিশু বান্ধব আসন ব্যবস্থা: ঐতিহ্যবাহী সারিবদ্ধ বেঞ্চের বদলে হালকা, সহজেই সরানো যায় এমন চেয়ার-টেবিল স্থাপন করা হয়। এর ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষকে দ্রুত একক কাজ, জোড়ায় কাজ বা দলীয় কাজের উপযোগী করে সাজানো যায়।
খেলাভিত্তিক শিখন সামগ্রী ও কার্যক্রম কোণ: শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন ধরনের শিখন কোণ তৈরি করা হয়:
* বই কোণ: শিশুতোষ ও রঙিন গল্পের বই।
* ব্লক ও ধঁাধা কোণ: গাণিতিক ও স্থানিক ধারণা তৈরির সরঞ্জাম।
* শিল্প ও হস্তশিল্প কোণ: ছবি অঁাকা ও হাতের কাজের উপাদান।
অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক শিখন: শুষ্ক মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হয়:
* ভূমিকা অভিনয় ও নাটক: গল্প বা ইতিহাসকে অভিনয়ের মাধ্যমে উপস্থাপন।
* ছড়াগান ও শারীরিক ভঙ্গি: সুর, ছন্দ ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে পাঠদান।
* হাতে-কলমে পরীক্ষা: স্থানীয় ও সস্তা উপকরণ দিয়ে বিজ্ঞান ও গণিতের বিমূর্ত ধারণাগুলোকে মূর্ত করে তোলা।
ইতিবাচক মানসিক ও আবেগীয় পরিবেশ: * ভয় ও শৃঙ্খলার আধুনিক ধারণা: কড়া শাসনের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো হয়।
* ভুলকে অনুশীলনের অংশ ধরা: “ভুল করা মানেই শেখার প্রথম ধাপ”Ñএই মানসিকতা গড়ে তোলা হয় যাতে শিশু দ্বিধাহীনভাবে প্রশ্ন করতে পারে।
* প্রশংসা ও স্বীকৃতি: শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট সাফল্যকে উৎসাহ দেওয়া এবং তাদের তৈরি কাজ শ্রেণিকক্ষের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা।
প্রযুক্তির সঠিক ও পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ামূলক ব্যবহার: শ্রাব্য-দৃশ্য উপাদান (অডিও-ভিজুয়াল কন্টেন্ট), শিক্ষণীয় অ্যানিমেশন ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহারের মাধ্যমে কঠিন বিষয়গুলোকে শিশুদের সামনে জীবন্ত ও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়।
রাশেদা আতিক রোজী : ইন্সট্রাক্টর ও শিক্ষা গবেষক, উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টার (ইউপিইটিসি), চঁাদপুর সদর, চঁাদপুর।
ছবি-৩৭
শিশুর খেলাভিত্তিক শিখন এবং ভবিষ্যতের আত্মনির্ভরশীল নারী
রোকেয়া সুলতানা
শিশুর জন্য খেলাভিত্তিক শিখন কেবল আনন্দের মাধ্যম নয়, বরং এটি তার সামগ্রিক বিকাশের একটি বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক ভিত্তি। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে চিরাচরিত মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে খেলার ছলে শেখা শিশুর মস্তিষ্ক গঠন এবং সামাজিক-আবেগীয় দক্ষতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
খেলাভিত্তিক শিখনের মূল গুরুত্ব:
জ্ঞানীয় বিকাশ ও চিন্তন দক্ষতা: ব্লক দিয়ে কিছু বানানো, ধঁাধা মেলানো (পাজল) বা বিভিন্ন বস্তু বিন্যাসের মাধ্যমে শিশুরা গাণিতিক ধারণা, সমস্যা সমাধানের কৌশল এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তা শেখে।
সামাজিক ও আবেগীয় দক্ষতা: সহপাঠীদের সাথে খেলার মাধ্যমে শিশুরা দলগতভাবে কাজ করা, নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করা, ভাগাভাগি করা (শেয়ার) এবং অন্যের অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখে। এটি তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
ভাষা ও যোগাযোগের বিকাশ: ভূমিকা অভিনয় (রোল-প্লে) বা দলীয় খেলায় অংশ নেওয়ার সময় শিশুরা নতুন নতুন শব্দ শেখে এবং নিজের ভাব ও চিন্তাভাবনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে শেখে।
শারীরিক ও পেশিগত দক্ষতা: দৌড়াদৌড়ি, লাফানো বা বল খেলার মতো বড় পেশির কাজ এবং ছবি অঁাকা, মাটি বা কাদা দিয়ে কিছু তৈরি করার মতো সূক্ষ্ম পেশির কাজ শিশুর শারীরিক সমন্বয় বাড়ায়।
সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তির প্রসার: কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে না বেঁধে শিশুদের মুক্তভাবে খেলতে দিলে তাদের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রবণতা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে।
স্বতঃস্ফূর্ত ও দীর্ঘস্থায়ী শিখন: খেলার ছলে অর্জন করা অভিজ্ঞতা শিশু কখনো সহজে ভোলে না। এতে পড়াশোনার প্রতি ভীতি দূর হয় এবং বিদ্যালয় ও শিখনপ্রক্রিয়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।
খেলা কোনো অতিরিক্ত কাজ নয়Ñএটিই শিশুর শেখার প্রাথমিক ও সবচেয়ে স্বাভাবিক ভাষা।
শিক্ষা যে কেবল লেখা-পড়া শেখা নয়, এ কথা শিশুর মায়েরাও জানেন। তবুও আমরা কেবল লেখা-পড়া শেখানোতেই ব্যস্ত! কেননা লেখা-পড়া শেখানো সহজ, শিক্ষা সহজ নয়। এই লেখা-পড়া শেখানোর কসরত করতে করতে প্রাক-প্রাথমিক স্তরেই শিশুর যে বিরাট শিখন-ঘাটতি হচ্ছে, সে খবর কেউ রাখছেন কি!
৩-৫ বছর বয়সে যে শিশুর জীবনকে চেনার কথা, জীবনযাপনের আবশ্যক দক্ষতাগুলো অর্জন করার কথা, চারপাশকে জানার কথা এবং সর্বোপরি শেখার আনন্দ উপভোগ করার কথাÑসেই বয়সেই শিশুকে আমরা কেবল বই-খাতা-পেনসিলে অভ্যস্ত হতে বাধ্য করছি। ফলে জীবনের পাঠ থেকে যাচ্ছে অসম্পূর্ণ! এই অসম্পূর্ণতা বা শিখন-ঘাটতি (প্রাক-প্রাথমিক স্তরের জন্য নির্ধারিত ১২টি মূল্যায়ন সূচকে এই ঘাটতি পরিমাপযোগ্য) পূরণের কোনো সুযোগই আর থাকছে না পরবর্তী স্তরে। গবেষণা বলছে শিশুর জীবনের প্রথম ৫ বছর তার জীবনের ভিত্তি তৈরির সময়। শিশু কেমন মানুষ হবে তা এই সময়েই নির্ধারিত হয়ে যায়। সেজন্য এই স্তরের শিখন-ঘাটতি লেখা-পড়ার ঘাটতির চেয়েও গভীর।
প্রাক-প্রাথমিক স্তরে (৪-৫ বছর বয়স) শিশুর শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দদায়ক, খেলাভিত্তিক এবং চাপমুক্ত। এই বয়সে প্রথাগত বই-খাতার পড়াশোনার চেয়ে অভিজ্ঞতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখাটাই সবচেয়ে কার্যকর।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার মূলভিত্তি:
খেলাভিত্তিক শিক্ষা: বিভিন্ন ধরনের ছড়াগান, গৃহঁাঙ্গণ ও উন্মুক্তাঙ্গণ খেলা (ইনডোর-আউটডোর), ধঁাধা ও রূপকথার গল্পের মাধ্যমে শিশুরা স্বাভাবিক ও সহজাতভাবে শেখে।
সৃজনশীল কার্যকলাপ: ছবি অঁাকা, রঙ করা, কাগজের কাজ বা মাটি/নরম কাদা (ক্লে) দিয়ে বিভিন্ন বস্তু তৈরির মাধ্যমে কল্পনাশক্তি ও মেধা বিকশিত হয়।
সামাজিক ও আবেগীয় বিকাশ: সমবয়সীদের সাথে মেশা, নিজের খেলনা ভাগাভাগি করা, দলগতভাবে কাজ করা, পর্যায়ক্রমে নিজের সময়সূচির (রুটিন) জন্য অপেক্ষা করা এবং অনুভূতি প্রকাশ করার কৌশল শেখে।
ভাষা ও যোগাযোগের দক্ষতা: গল্প শোনা ও বলা, ছোট ছোট ছড়া আবৃত্তি এবং নতুন শব্দ শেখার মাধ্যমে নিজের ভাষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ে।
সূক্ষ্ম ও স্থূল পেশীর বিকাশ: দৌড়াদৌড়ি, লাফানো, বল ধরা এবং পেন্সিল ধরা, কঁাচি দিয়ে কাগজ কাটা বা পুঁতি গঁাথা শেখানো হয়।
পড়াশোনার প্রকৃতি, বিষয় ও শিক্ষার ধরণ:
মুখস্থ না করিয়ে ছবির কার্ড, তথ্য-কার্ড (ফ্ল্যাশকার্ড) বা বস্তু গুণে সাধারণ ধারণা দেওয়া; গাছপালা, পশুপাখি, রঙ, আকার ও আবহাওয়া সম্পর্কে নিজের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শেখা; পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়া, জিনিস গুছিয়ে রাখা ও সুঅভ্যাস গঠন করা।
শিশুর ওপর কোনো প্রকার পরীক্ষার চাপ বা আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নের বোঝা না চাপিয়ে কেবল পর্যবেক্ষণ ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে তার আগ্রহ ও বিকাশ চিহ্নিত করা উচিত।
প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা ও সফল করার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেবল একজন প্রশাসনিক নির্দেশক নন, বরং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ তৈরির মূল অনুঘটক।
প্রধান শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব ও ভূমিকা:
শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি: প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষকে আকর্ষণীয়, বর্ণিল ও নিরাপদ রাখা নিশ্চিত করা। শ্রেণির চার্ট, ছবি ও শিক্ষোপকরণ যেন শিশুদের নাগালের মধ্যে থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
শিক্ষককে সহায়তা ও দিকনির্দেশনা: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষককে জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী খেলাভিত্তিক ও আনন্দদায়ক উপায়ে ক্লাস নিতে উৎসাহিত করা। সময়সূচি (রুটিন) অনুযায়ী শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
উপকরণ সংরক্ষণ ও সরবরাহ: প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত উপকরণ (যেমন: তথ্য-কার্ড, খেলনা, রঙ-পেন্সিল, মাটির তৈরি জিনিস) যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং ক্লাসে ব্যবহার নিশ্চিত করা।
অভিভাবক সচেতনতা বৃদ্ধি: অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব (পরীক্ষাহীন, খেলাভিত্তিক শেখা) অভিভাবকদের বুঝিয়ে বলা, যাতে তঁারা বাড়িতেও শিশুর ওপর পড়ার বাড়তি চাপ না দেন।
নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন: প্রথাগত পরীক্ষা ছাড়া শিশুদের ধারাবাহিক বিকাশ ও শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং শিক্ষককে প্রয়োজনীয় ইতিবাচক মতামত (ফিডব্যাক) দেওয়া।
নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি: শিশুদের জন্য নিরাপদ পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং খেলাধুলার নিরাপদ জায়গা নিশ্চিত করা।
মেয়েদের দিকে আলাদা মনোযোগ দিতে হবে। তাদের মানসিক বিকাশ ও শারীরিক গঠনকে মাথায় রেখে তাদের সাথে বাবা-মায়ের ভূমিকা অভিনয় (রোল-প্লে) করতে হবে।
পারিবারিক শিক্ষা বলতে যা বোঝায়, সেক্ষেত্রে বর্তমানে বাবা-মা দুজনই কর্মজীবী হলে শিশু অভিভাবকহীনতার মুখোমুখি হয়। তাহলে এই পারিবারিক শিক্ষা কীভাবে গড়ে উঠবে, যেখানে সে বাবা-মা কাউকে হাতের কাছে পায় না?
এর শ্রেষ্ঠ সমাধান হলো শিক্ষককে বাবা-মায়ের ভূমিকায় থেকে শিশুর সকল কিছুর তত্ত্বাবধান করতে হবে। বয়সন্ধিকালে তার দিকে আলাদা যত্ন নিতে হবে, বিকাশের ধাপগুলো মাথায় রেখে তাকে সেভাবে পরিচর্যা করতে হবে।
বিদ্যালয়ে শিশুর প্রথম আগমনকে আনন্দদায়ক করতে এবং তার ভবিষ্যৎ শিক্ষার শক্ত ভিত গড়ে তুলতে প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্ব ও সক্রিয় পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। এভাবেই গড়ে ওঠা শিশুই ভবিষ্যতে আত্মনির্ভরশীল নারী হয়ে ওঠে।
রোকেয়া সুলতানা : প্রধান শিক্ষক, হাজীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজীগঞ্জ, চঁাদপুর।
ছবি-০১
ফণার নিচে মমতা
শিকদার বাসির
গ্রীষ্মের দুপুর। আমগাছের উঁচু ডালে কাঠবিড়ালি ছুটকির ছোট্ট বাসা। সেখানে তার তিনটি অন্ধ বাচ্চা। গাছের নিচের গর্তে থাকত সাপ বাসুকি। সেদিন সে রোদ পোহাতে বেরিয়েছিল। ছুটকি পাকা আম পাড়তে গিয়ে হঠাৎ পা ফসকে পড়ে গেল। তার থাবা থেকে ছুটে যাওয়া আমটি সজোরে গিয়ে পড়ল বাসুকির মাথায়।
চমকে উঠে বাসুকি ফণা তুলল। ছুটকিও ভয় পেল। কিন্তু ভয়কে ঢাকতে রাগ দেখিয়ে বলল, “তুই আমার বাচ্চাদের খেতে এসেছিস?”
বাসুকি হিস্ করে উঠল, “তোর বোকামির জন্য মাথায় আঘাত পেলাম, আবার আমাকেই দোষ দিচ্ছিস?”
সেদিনের ভুল বোঝাবুঝিই তাদের মধ্যে শত্রুতার দেয়াল তুলে দিল। এরপর বাসুকি গাছের গুঁড়ি বেয়ে উঠতে চাইলে ছুটকি ডাল ভেঙে ছুড়ে মারত। বাসুকি গর্ত থেকে বেরোলেই ছুটকি চিৎকার করে বাচ্চাদের সতর্ক করত। দুজনেই মনে মনে ভাবত, অন্যজনই বিপদ। অথচ সত্যিটা কেউ জানার চেষ্টা করল না।
তৃতীয় দিন সকালে বনের এক পাশে আগুন লাগল। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে আগুন দ্রুত ছুটে এল আমগাছের দিকে। ছুটকি বাচ্চাদের নিয়ে পালাতে গিয়ে দেখল, একটি বাচ্চা নিচের
ঝোপে পড়ে গেছে। ঠিক তখনই আগুনে আটকে পড়ল বাসুকি। তার গর্তের মুখে আগুন, পালানোর পথও বন্ধ। ছুটকি এক মুহূর্তের জন্য ভাবল, “শত্রুর শেষ!”
কিন্তু পরক্ষণেই দেখল, বাসুকি নিজের শরীর দিয়ে সেই ছোট্ট বাচ্চাটিকে আগুনের স্ফুলিঙ্গ থেকে ঢেকে রেখেছে। ছুটকি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ছুটে গিয়ে ভেজা কলাপাতা এনে বাসুকির পোড়া লেজের ওপর রাখল। তারপর ডালপালা সরিয়ে আগুনের পথ ঘুরিয়ে দিল। অনেকক্ষণ পর আগুন থামল। ক্লান্ত বাসুকির পাশে বসে ছুটকি কঁাপা গলায় বলল, “তুমি আমার বাচ্চাকে বঁাচালে?”
বাসুকি ধীরে চোখ খুলল। বলল, “শত্রু ভেবেছিলে বলে কি সত্যিই শত্রু হয়ে যাই? সেই দিনের আমটা ছিল দুর্ঘটনা। কিন্তু আমাদের রাগই দুর্ঘটনাটাকে শত্রুতায় পরিণত করেছিল।”
ছুটকি মাথা নিচু করল। সেদিন থেকে আমগাছের নিচে আর কোনো ফণা ওঠেনি, কোনো ডালও ছোড়া হয়নি। ছুটকি দিনে বাসুকির গর্তের সামনে শুকনো পাতা রেখে যায়, আর রাতে বাসুকি গাছটির নিচে পাহারা দেয়।
তারা বুঝেছিল, অনেক সময় শত্রু আমাদের সামনে থাকে না; আমাদের ভুল ধারণার ভেতরেই তার জন্ম হয়।
নিচের লেখায় প্রচুর ইংরেজি আছে। একটু চেক করে দিয়েন ভাই। যথোপযুক্ত একটি ছবি দিয়ে দিয়েন।
ছবি-
ইংরেজিতে আটকে যাওয়া জিহ্বা: শিক্ষার্থীদের জড়তা ও উত্তরণের পথ
ফাতেমাতুজ জান্নাত প্রিয়া
আমরা শিক্ষাজীবনে ইংরেজি পড়ি, ব্যাকরণের (গ্রামার) শত নিয়ম মুখস্থ করি, কিন্তু একজন বিদেশির সামনে পড়লেই গলা শুকিয়ে যায়। “গু হধসব রং...” এর পর আর কথা বের হয় না (ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী এবং কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া)। এই চিত্রটা শুধু গ্রামের স্কুলে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকধারীদের (গ্র্যাজুয়েট) মধ্যেও দেখা যায়।
প্রশ্ন হলো, আমরা ইংরেজি পারি না, নাকি বলতে পারি না? দুটোর মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে।
তাহলে কেন এই জড়তা, সে বিষয়ে আজ জেনে নেওয়া যাক:
ভুল পদ্ধতিতে শেখা: একটি ভাষা শিখতে হলে প্রথমে আমাদেরকে সেই ভাষার নিয়ম শেখানো হয়। ওসব নিয়মগুলো প্রয়োগ করা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানান ক্ষেত্রে ভাষাটিকে ব্যবহার করার প্রবণতা খুব কমই দেখা যায়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ইংরেজি শেখায় পরীক্ষায় পাস করার জন্য, কথা বলার জন্য নয়। ক্লাসে কাল (ঞবহংব), বাচ্য (ঠড়রপব), উক্তি (ঘধৎৎধঃরড়হ), ক্রিয়া পদের সঠিক ব্যবহার (জরমযঃ ভড়ৎস ড়ভ াবৎনং) ইত্যাদি শেখানো হয়, কিন্তু বলার অনুশীলনের (ঝঢ়বধশরহম ঢ়ৎধপঃরপব) জন্য ৫ মিনিটও বরাদ্দ থাকে না। ফলে আমরা ইংরেজি সম্পর্কে জানি, কিন্তু ইংরেজি বলতে জানি না। ব্যাকরণের এত এত নিয়ম শেখানো হয় যে খোদ ইংরেজরাও বোধ হয় এত নিয়মের ধার ধারে না।
ভুল করার ভয়: শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো “লোকে কী বলবে”। ব্যাকরণে ভুল হলে বন্ধুরা হাসবে, উচ্চারণ খারাপ হলে শিক্ষক প্রকাশ্যে বকা দেবেনÑএমন নানা সংকোচ ও ভয় থেকেই আমরা চুপ থাকি। অথচ পৃথিবীর কোনো শিশুই ব্যাকরণ শিখে কথা বলা শুরু করে না।
আমরা নিজেদের মাতৃভাষার দিকে নজর দিলে দেখতে পাই, প্রথমে মা, বাবা-সহ নিকটজনদের মুখ থেকে শুনে শুনে মাতৃভাষা রপ্ত করেছি। তখন কি আগে আমাদের ভাষার নিয়মকানুন শেখানো হয়েছিল? একদমই না। আমরা যে ভাষা বেশিরভাগ সময় শুনব, চর্চা করব, তাতে খুব সহজেই অভ্যস্ত হতে পারব।
বাংলায় চিন্তা করে ইংরেজিতে অনুবাদ: আমরা মনে মনে প্রথমে বাংলায় বাক্য সাজাই, তারপর সেটাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে যাই।
এই অনুবাদ প্রক্রিয়ায় ৮০% সময় ও আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়। ফলে কথা আটকে যায়। এ ব্যাপারটা আমাদের বাচনিক ইংরেজিতে (ঝঢ়ড়শবহ ঊহমষরংয) ভালো করার ক্ষেত্রে বিশাল বড় বাধা হয়ে দঁাড়িয়েছে।
শোনার অভাব: একটি শিশু কথা বলার আগে অন্তত দুই বছর শুধু শোনে। তারপর আধো আধো উচ্চারণে বলার চেষ্টা করে। আমরা ইংরেজি শুনি কতটুকু? ক্লাসের বাইরে ইংরেজি শোনার কোনো পরিবেশই আমাদের নেই। অথচ, আমরা যা শুনি তার অনেকটুকু অংশই আমাদের মস্তিষ্ক ধারণ করে ফেলে খুব সহজেই। যেমন: জনপ্রিয় কোনো গান বা ছড়া বারবার শুনলে আমাদের খুব সহজেই মুখস্থ হয়ে যায়। মুখে কথা বলার দক্ষতার জন্য শোনার কোনো বিকল্প নেই।
উত্তরণের ৫টি বাস্তব সমাধান: জড়তা কাটানোর জন্য বিদেশে যাওয়া বা দামি কোর্স করা জরুরি নয়। দরকার পদ্ধতি বদলানো।
১. স্বাবলীলতা আগে, নির্ভুলতা পরে (ঋষঁবহপু ঋরৎংঃ, অপপঁৎধপু খধঃবৎ): প্রথম ৩ মাস ব্যাকরণের চিন্তা বাদ দিন। ভুল হোক, তবুও বলুন। লক্ষ্য থাকবে: থামা যাবে না। একটি ভুল বাক্য একটি নীরবতার চেয়ে হাজার গুণ ভালো। নির্ভুলতা পরে আপনা-আপনিই আসবে।
২. অনুসরণের কৌশল (ঝযধফড়রিহম ঞবপযহরয়ঁব): প্রতিদিন ১৫ মিনিট একটি ইংরেজি ভিডিও (যেমন: বিবিসি লার্নিং ইংলিশ, টেড টক) চালিয়ে বক্তার সাথে সাথে একই সুরে, একই গতিতে বলার চেষ্টা করুন। এতে উচ্চারণ, গতি ও আত্মবিশ্বাসÑতিনটাই বাড়বে।
বর্তমান যুগে ইংরেজিতে কথা বলায় ভালো করার জন্য ইউটিউবের ব্যবহার হতে পারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রতিদিন ৩০ মিনিট ধারাবাহিক আলোচনা (পডকাস্ট), গল্প বলা (স্টোরি টেলিং), সহজ ইংরেজিতে সংবাদ শোনা যেতে পারে। এছাড়াও অনুবাদিত উপশিরোনাম (সাবটাইটেল)সহ সহজ ইংরেজিতে কার্টুন সিরিজ দেখা যেতে পারে।
৩. ছোট ছোট পরিবেশ তৈরি করুন: বড় লক্ষ্য নয়, দিনে ১০ মিনিটের “বাংলা বর্জিত অঞ্চল (ঘড় ইধহমষধ তড়হব)” বানান বন্ধুদের সাথে। আয়নার সামনে দঁাড়িয়ে ২ মিনিট নিজের দিন সম্পর্কে বলুন। ফোনের ভাষা ইংরেজি করে দিন। ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনে। ছোট ছোট কাজগুলোর ব্যাপারে ইংরেজিতে বাক্য তৈরির অভ্যাস করা যেতে পারে।
৪. প্রশ্ন দিয়ে কথা শুরু করুন: ইংরেজিতে কথা চালিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রশ্ন করা। নিজে আটকে গেলে উল্টো প্রশ্ন করুনÑ”ডযধঃ ফড় ুড়ঁ ঃযরহশ ধনড়ঁঃ রঃ?” এতে চাপ আপনার ওপর থেকে সরে যাবে। আর, নিজেকে নিয়ে ভুলেও হীনমন্যতায় ভোগা যাবে না। নিজেকে দ্বিতীয়বার ভালো করার সুযোগ দেওয়ার মনমানসিকতা থাকলে নিজের প্রতি ভালোবাসাও বৃদ্ধি পাবে, যা একজীবনে খুবই জরুরি।
৫. প্রযুক্তির ব্যবহার: এখন আর সঙ্গী (পার্টনার) খুঁজতে হয় না। চ্যাটজিপিটি (ঈযধঃএচঞ), এলসা স্পিক (ঊখঝঅ ঝঢ়বধশ), ডুওলিঙ্গো (উঁড়ষরহমড়)-র মতো অ্যাপে আপনি দিনরাত অনুশীলন করতে পারেন, কেউ আপনাকে বিচার করবে না। আপনার সত্যিকারের ইচ্ছাশক্তিই এখানে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।
স্কুল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম (ওঞ ঃড়ড়ষং), স্পোকেন শিখতে সহায়ক অ্যাপের ব্যবহার, উপশিরোনামসহ (সাবটাইটেল) সহজ ইংরেজিতে কার্টুন দেখতে উৎসাহিত করা উচিত। এতে শব্দ ও বাক্যের বানানগুলোও আয়ত্তে চলে আসবে। প্রযুক্তির শত খারাপ দিকের বিপরীতে এটা হোক ভালোর পক্ষের কার্যকরী পদক্ষেপ।
শেষ কথা: ইংরেজি কোনো জ্ঞানের বিষয় নয়, এটি একটি অভ্যাস। সঁাতার বই পড়ে শেখা যায় না, পানিতে নামতে হয়। একইভাবে ইংরেজি বলতে হলে বলতে শুরু করতে হবে। আর স্পোকেন ইংরেজি শেখার যাত্রায় কখনোই নিন্দুকের কথায় থেমে যাওয়া যাবে না। আপনি থেমে গেলেন মানেই হেরে গেলেন। হারবেন না জিতবেন, আয়নায় দঁাড়িয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন।
মনে রাখবেন, পৃথিবীর কেউই আপনার ব্যাকরণ মনে রাখবে না, মনে রাখবে আপনি তার সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছেন কি না। তাই আজ থেকেই ভাঙা ভাঙা হলেও বলা শুরু করুন। জড়তা একদিনে কাটবে না, কিন্তু প্রতিদিন একটু একটু করে কাটবেই। অবশ্যই শুরুটা আগামীকাল থেকে নয়, বরং আজ থেকেই হোক, এখন থেকেই হোক আপনার ইংরেজি চর্চার শুরু।
ছবি-০১
সবাই বলে
সুশীল কুমার দেবনাথ
বাবা আমায় এনে দিলো
হাতের সুন্দর একটি ঘড়ি,
আমি যেন সবসময় ভালোভাবে
লেখাপড়া মনোযোগ দিয়ে করি।
বললো বাবা এবার তোকে
করতে হবে পাস,
তাই আমি মন দিয়ে
পড়ছি এগারো মাস।
মাসের শেষে পরীক্ষাতে
পাস করেছি আমি,
সবাই বলে এই ছেলেটি
হবে নামীদামী।








