প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২১
মায়ের গানের সুরে শিল্পী হয়ে ওঠা অনির্বাণ সাহার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রা

চাঁদপুর শহরের অলিগলি, মেঘনার পাড়, খেলার মাঠ আর পুকুরে দাপাদাপির শৈশব। সন্ধ্যা নামলেই কোনো এক ঘর থেকে ভেসে আসতো গানের সুর, কোথাও তবলার বোল, আবার কোথাও হাওয়াইন গিটারের মূর্ছনা। এমন সাংস্কৃতিক আবহেই বেড়ে ওঠা এক শিশুর মনে হয়তো শুরুতেই শিল্পী হওয়ার স্পষ্ট স্বপ্ন ছিলো না; কিন্তু চারপাশের সেই সুর আর ছন্দের পরিবেশ তাকে ধীরে ধীরে টেনে নেয় শিল্পের ভুবনে। তিনি বহু গুণে গুণান্বিত অনির্বাণ সাহা। গান, নৃত্য, আবৃত্তি ও অভিনয়ের মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই নিজেকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রেখেছেন। শিশুশিল্পী হিসেবে মঞ্চে যাত্রা শুরু করে পরবর্তীতে নাট্যকর্মী ও সংগীতশিল্পী হিসেবে দেশের বিভিন্ন মঞ্চে নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি। বর্তমানে পেশাগত জীবনের ব্যস্ততার পাশাপাশি সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছেন সংগীতচর্চা।
অনির্বাণ সাহার জন্ম চাঁদপুর সদরের মূল শহরের জোড়পুকুর পাড় এলাকায়। বাবা প্রয়াত কানাই লাল সাহা এবং মা প্রয়াত শিবানী সাহা। চাঁদপুর খ্রিস্টিয়ান মিশন স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরবর্তীতে হাসান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়ে ডি এন হাই স্কুল থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর চাঁদপুর সরকারি কলেজ ও সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনের সূচনাও এই চাঁদপুর শহরকে ঘিরেই। সংগীত জীবনের প্রথম শিক্ষক ছিলেন তাঁর মা। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সদস্যদের সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন অনির্বাণ। সন্ধ্যা নামলেই মায়ের গান, মামার তবলা, মাসির হাওয়াইন গিটার, বড় বোন মৌয়ের নৃত্যচর্চা আর দিদার অশেষ অনুপ্রেরণায় তাঁর মনে সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ জন্ম নেয়। তাঁর শৈশবের সাংস্কৃতিক বিকাশে দিদা প্রভাবতী সাহা এবং মাসি কল্যাণী সাহার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গান, নাচ ও আবৃত্তির নিয়মিত চর্চার পেছনে দিদার শ্রম ও সময় ছিলো অপরিসীম। অন্যদিকে, মা শিবানী সাহা বাবুরহাট সরকারি শিশু পরিবারের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংগীতচর্চা করতেন। পারিবারিক এই সাংস্কৃতিক পরিবেশই অনির্বাণের মননে সংগীতপ্রীতি আরও গভীর করে তোলে।
১৯৮৯ সালে চাঁদপুর সংগীত নিকেতনের সংগীত, চিত্রাঙ্কন ও নৃত্য বিভাগে ভর্তি হন অনির্বাণ সাহা। প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে কেটেছে তাঁর সাংস্কৃতিক শিক্ষাজীবনের বড় একটি অংশ। ১৯৯০ সালে টাউন হল মঞ্চে সংগীত নিকেতনের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম মঞ্চে পরিবেশনা করেন তিনি। এরপর ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত নিয়মিতভাবে চাঁদপুরসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করেন।
১৯৯২ সালে বিজয় মেলার মঞ্চেও শিশুশিল্পী হিসেবে সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন। একই সময়ে তিনি অংকুর কচি-কাঁচার মেলা ও খেলাঘরের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯৭ সালে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শহীদ পাটোয়ারীর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় অংকুর কচি-কাঁচার মেলার দু দিনব্যাপী সম্মেলনে চাঁদপুরের শিশু প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। ১৯৯২ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৯৮ সালে এক বছরের জন্য চাঁদপুরের অপর সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ললিত কলা’য় সংগীত গুরু প্রয়াত শীতল ঘোষালের কাছে তালিম নেন। সংগীত নিকেতনে থাকাকালে শিক্ষক হিসেবে পান স্বপন সেনগুপ্ত, বাবুল চক্রবর্তী, শান্তি রক্ষিত, মীরা সেন, দিলীপ দাস, শঙ্কর আচার্যী এবং প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অধ্যক্ষ বিচিত্রা সাহাকে। চিত্রাঙ্কনে শিক্ষক হিসেবে পান অমল সেনগুপ্ত ও অজিত দত্তকে। নৃত্যে তালিম নেন অনিমা সেন চৌধুরী, রুমা সরকার, অপু সরকার ও নাজমা আক্তারের কাছে। পরবর্তীতে ১৯৯৪ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ‘সপ্তরূপা নৃত্য শিক্ষালয়ে’ অনিমা সেন চৌধুরীর অধীনে নৃত্যের চর্চা চালিয়ে যান।
শৈশবের স্মৃতিচারণ করে অনির্বাণ শ্রদ্ধার সঙ্গে বলেন, “শিক্ষকদের অপরিসীম সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণাই আমার সাংস্কৃতিক পথচলাকে সহজ ও সমৃদ্ধ করেছে।”
গান, নৃত্য ও আবৃত্তি মিলিয়ে তাঁর শৈশবের দিনগুলো সংস্কৃতিময় হয়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালে শহীদ পাটোয়ারীর হাত ধরে প্রথম মঞ্চনাটকে অভিনয় শুরু করেন অনির্বাণ। টাউন হল মঞ্চে অনন্যা নাট্যগোষ্ঠীর ‘রাক্ষুসী’ নাটকে ‘পচা’ চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর নাট্যজীবনের সূচনা। ২০০৩ সালে বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে নিয়মিত নাট্যচর্চায় যুক্ত হন। বর্ণচোরার হয়ে প্রথম অভিনয় করেন ‘লালন নামা’ নাটকে এক গ্রামবাসীর চরিত্রে। পরবর্তীতে গিটঠু, শাহজাহান, জমিদার দর্পণ ও লালন নামাসহ বিভিন্ন নাটকে নানা চরিত্রে অভিনয় করেন। নাট্যজীবনে শহীদ পাটোয়ারী ও শরীফ চৌধুরীর সান্নিধ্য তাঁর অভিনয়ের ভিত গড়ে দেয়।
২০০৩ সালে সংগীতশিল্পী ও শিক্ষক মৃণাল সরকারের মাধ্যমে বিজয় মেলার মঞ্চে প্রথম আধুনিক মিউজিক সিস্টেমের সঙ্গে গান পরিবেশন করেন অনির্বাণ। এরপর সংগঠক হারুন আল রশীদের হাত ধরে চতুরঙ্গ সাংস্কৃতিক সংগঠনে নিয়মিত সংগীতশিল্পী হিসেবে যুক্ত হন। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চতুরঙ্গের শিল্পী হিসেবে বিভিন্ন মঞ্চ মাতিয়েছেন। চতুরঙ্গ ও বর্ণচোরার সঙ্গে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা আজও অব্যাহত।
চাঁদপুরে থাকাকালে সংগীত গুরু শঙ্কর আচার্যীর কাছেও নিয়মিত তালিম নেন তিনি। পাশাপাশি ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সংগীত নিকেতনের নিয়মিত ছাত্র ছিলেন। নিজের এই সংগীতযাত্রায় স্বর্গীয় স্বপন সেনগুপ্ত, হারুন আল রশীদ, শঙ্কর আচার্যী, শরীফ চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আবুল কালাম সরকার, মিল্টন ভূঁইয়া, মৃণাল সরকার, প্রয়াত তবলা শিল্পী টুটুন চক্রবর্তী, তবলা শিল্পী অঞ্জন আচার্যী এবং শিক্ষক অনিমেষ দাস টিটুর অবদান ও অনুপ্রেরণা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন অনির্বাণ।
২০১০ সালের পর উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি জমান অনির্বাণ সাহা। শহর বদলালেও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর টান ছিন্ন হয়নি। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রখ্যাত সংগীত গুরু শ্রী সঞ্জীব দের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নেন। পাশাপাশি ছায়ানটে নজরুল সংগীতে তালিম গ্রহণ করেন। ২০১২ সালে ঢাকার অন্যতম নাট্যদল ‘আরণ্যক’-এ যুক্ত হন। সেখানে নাট্যগুরু মামুনুর রশীদের সান্নিধ্যে থেকে নিয়মিত বিভিন্ন মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। পরবর্তীতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংগীত পরিবেশন করে প্রশংসা কুড়ান।
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে এক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন অনির্বাণ। ২০১৪ সাল থেকে তিনি ব্যাংকিং সেক্টরে কর্মরত আছেন। তবে পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও গানকে দূরে ঠেলে দেননি। চাকরি সামলেই নিয়মিত মঞ্চে গান গেয়ে যাচ্ছেন। সৈয়দ আব্দুল হাদী, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, সনু নিগম ও রাহাত ফাতেহ আলী খান তাঁর প্রিয় শিল্পী।
বর্তমানে তিনি স্টেজ শোর পাশাপাশি কয়েকটি বিজ্ঞাপনী জিঙ্গেলেও কণ্ঠ দিয়েছেন। প্রখ্যাত গীতিকার কবির বকুল এবং সুরকার উজ্জ্বল সিনহার জিঙ্গেলে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও জানান তিনি। বর্তমানে নিজের মৌলিক গান নিয়ে শ্রোতাদের সামনে আসার পরিকল্পনা করছেন এই শিল্পী।
চাঁদপুর অনির্বাণের কাছে স্মৃতির এক বিশাল ভুবন। প্রিয় শহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গন নিয়ে যেমন ভালোবাসা রয়েছে, তেমনি কিছু আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, সঠিক মূল্যায়নের অভাব, স্বজনপ্রীতি বা পারিবারিক সুযোগ-সুবিধার প্রভাবে অনেক সময় প্রকৃত প্রতিভা কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাতে পারে না। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, খাঁটি প্রতিভা কখনো হারিয়ে যায় না; সময়ের পরিক্রমায় তা নিজের আলো ছড়াবেই।
অনির্বাণ সাহা বর্তমানে স্ত্রী ও একমাত্র কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। কর্মজীবন, পরিবার ও মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার ব্যস্ততার মাঝেও সংগীত তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি চান তাঁর কন্যাও শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চায় যুক্ত থাকুক। তাই নিজে তাকে সংগীতে তালিম দিচ্ছেন।
চাঁদপুরে এখন আর আগের মতো ঘনঘন আসা হয় না, বছরে হয়তো দু-তিনবার আসেন। কিন্তু যখনই ফিরে আসেন, শৈশবের স্মৃতিকাতরতা তাঁকে স্পর্শ করে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “যতদিন বেঁচে আছি, হৃদয়ের মণিকোঠায় বেঁচে থাকবে চাঁদপুর শহরের আলো-বাতাস, রাস্তাঘাট, নদীর পাড় আর শৈশবের দাপাদাপির স্মৃতি। সংগীত আমার নেশা, আমার রক্তে মিশে আছে। যতদিন গলায় সুর আছে, মঞ্চে গেয়ে যেতে চাই।”
শৈশবের চাঁদপুরের ছোট মঞ্চ থেকে রাজধানীর বড় পরিবেশনা, শিশুশিল্পী থেকে পরিপক্ক শিল্পী—দীর্ঘ এই পথচলায় অনির্বাণ সাহার মূল পরিচয় তিনি সংস্কৃতির একজন একনিষ্ঠ সাধক। আর সেই সুরের যাত্রার মূল শেকড়টি যে চাঁদপুরে, সেই শহরই আজও তাঁর স্মৃতির সবচেয়ে গভীর ঠিকানা।








