প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২০
রঙ-তুলিতে স্বপ্ন আঁকে মোমেনা ফাইরোজ নুহিন
নেপাল-ঢাকায় সাফল্যের পর ব্যাংককের প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে

ছোট্ট হাতে রঙ-তুলির আঁচড়। ক্যানভাসে ফুটে ওঠে কখনো প্রকৃতি, কখনো মানুষের জীবন, আবার কখনো মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা নানা অনুভূতি। বয়সের তুলনায় শিল্পের প্রতি গভীর মনোযোগ আর একের পর এক অর্জন তাকে ইতোমধ্যে পরিচিত করে তুলেছে একজন সম্ভাবনাময় খুদে চিত্রশিল্পী হিসেবে। সে মোমেনা ফাইরোজ নুহিন।
চাঁদপুর শহরের পশ্চিম শ্রীরামদী এলাকার মোমেনা ফাইরোজ নুহিনের শিল্পচর্চার শুরু ২০১৯ সালে। সেই থেকে চাঁদপুর চারুকলা একাডেমির প্রশিক্ষক ও চিত্রশিল্পী অজিত দত্তের কাছে নিয়মিতভাবে ছবি আঁকার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে সে। দীর্ঘদিনের অনুশীলন, শিক্ষকের নির্দেশনা এবং নিজের সৃজনশীল চিন্তার সমন্বয়ে ধীরে ধীরে নিজের একটি শিল্পভাষা তৈরি করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে নুহিন।
শিল্পের প্রতি এই ভালোবাসা ইতোমধ্যে তাকে এনে দিয়েছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। ২০২৫ সালে নেপালের পোখারায় নর্থ ক্যানভাস ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিশু আর্ট এক্সিবিশন ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ক বিভাগে অর্জন করে বেস্ট অ্যাওয়ার্ড। ২৫ থেকে ২৭ জুন তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত ওই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিশু-কিশোর শিল্পীদের সঙ্গে নিজের সৃষ্টিকর্ম তুলে ধরার সুযোগ পায় সে।
নেপালের সেই অর্জনের পর দেশের মাটিতেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে নুহিন। ২০২৬ সালে ঢাকায় দোলন আর্ট এক্সিবিশন আয়োজিত ‘বর্ষা আর্ট এক্সিবিশন ২০২৬’-এ অংশ নেয় সে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ১৭ থেকে ২২ আগস্ট ছয় দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের পর চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে খ-বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করে মোমেনা ফাইরোজ নুহিন।
একের পর এক অর্জন যেন তার শিল্পচর্চার পথকে আরও প্রশস্ত করে তুলছে। তবে পুরস্কারই তার কাছে শেষ কথা নয়; রঙ, রেখা ও ক্যানভাসের মাধ্যমে নিজের ভাবনাকে প্রকাশ করাই তার মূল আনন্দ। নিয়মিত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে নিজের কাজ তুলে ধরার স্বপ্ন দেখে এই খুদে শিল্পী।
নুহিনের এই পথচলায় পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বাবা মো. মমিন বেপারী একজন ব্যবসায়ী এবং মা ফাতেমা আক্তার ডলি গৃহিণী। পরিবারের দু সন্তানের মধ্যে নুহিন একমাত্র মেয়ে। তার ভাই হাসান হাবীব ধ্রুব একজন শিক্ষার্থী। পরিবারের উৎসাহ ও সহযোগিতা শিল্পচর্চায় তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
নেপাল ও ঢাকার পর এবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও একটি নতুন অভিজ্ঞতার অপেক্ষায় মোমেনা ফাইরোজ নুহিন। ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে দ্য পিকচারি আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘বাংলাদেশ-ব্যাংকক-থাইল্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ চিত্র প্রদর্শনী’। এ প্রদর্শনীতে চাঁদপুর চারুকলা একাডেমির ১২ জন খুদে চিত্রশিল্পী অংশ নিচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছে মোমেনা ফাইরোজ নুহিনও।
ব্যাংককের এই প্রদর্শনীতে নুহিনের অংশগ্রহণ চাঁদপুরের শিল্পচর্চার জন্য একটি আনন্দের বিষয়। দেশের বাইরে নিজের আঁকা ছবি প্রদর্শনীর সুযোগ একজন খুদে শিল্পীর জন্য যেমন বড় অভিজ্ঞতা, তেমনি চাঁদপুরের শিশু-কিশোরদের শিল্পচর্চার সম্ভাবনাকেও নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে।
ব্যাংককের প্রদর্শনীতে নুহিনের পাশাপাশি চাঁদপুর চারুকলা একাডেমির যে ১২ জন চিত্রশিল্পী অংশ নিচ্ছে, তারা হলো—নাফিসা ইসলাম, সাদিয়া ইসলাম, মুনতাহা ইসলাম, পৃথ্বীরাজ পাল, অবনীশ জাগরী, মোমেনা ফাইরোজ নুহিন, নূরুল ইসলাম ইভান, নূর নাহার আক্তার নুহা, প্রতীক পাল, তিথি দে, অথৈ রক্ষিত ও অরিন চন্দ্র দে।
চাঁদপুরের মাটি থেকে উঠে আসা মোমেনা ফাইরোজ নুহিনের রঙ-তুলির সঙ্গে যে বন্ধুত্ব ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল, সেই পথচলা আজ তাকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর মঞ্চে। নেপালে পুরস্কার, ঢাকায় প্রথম স্থান আর এবার ব্যাংককে নিজের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের সুযোগ—সব মিলিয়ে তার ছোট্ট শিল্পযাত্রায় যোগ হচ্ছে একের পর এক নতুন অধ্যায়।
সম্ভাবনার এই বয়সে সঠিক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত চর্চা এবং পরিবারের পাশাপাশি শিল্পাঙ্গনের মানুষের সহযোগিতা পেলে মোমেনা ফাইরোজ নুহিন ভবিষ্যতে দেশের শিল্পাঙ্গনে আরও উজ্জ্বল ভূমিকা রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।







