প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২৪
ভূতের বাড়ি

অনেক দিন আগের কথা, সময়টা ১৯৯৬ সাল, আবির ছিল বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান, বাবা-মায়ের সাথে শহরেই থাকতো সে, তার বাবা জনাব রফিকুল ইসলাম ছিলেন একজন সরকারি চাকরিজীবী, আবির ও তার মাকে নিয়েই জনাব রফিকুল ইসলামের ছিল ছোট্ট পরিবার।
সেবার এসএসসি পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করেছিল আবির, পরীক্ষায় পাশ করলে গ্রামে নানার বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার আবদার আগেই করে রেখেছিল সে।
তাই বাবা-মায়ের কাছে বায়না ধরেছিল কলেজে ভর্তি হওয়ার পূর্বেই একবার নানার বাড়ি থেকে ঘুরে আসার। তার বাবা জনাব রফিকুল ইসলাম কোনোভাবেই রাজি ছিলেন না ছেলেকে একা একা গ্রামে পাঠাতে, আর উনার অফিসেও যখন তখন ছুটি পাওয়া সম্ভব ছিল না, তবুও ছেলের জিদের কাছে হেরে অবশেষে ছেলেকে একা গ্রামে পাঠাতে রাজি হলেন তিনি।
তখনকার সময় গ্রামের রাস্তাঘাট ততোটা ভালো ছিল না, আর সবজায়গায় বিদ্যুতের সুবিধাও ছিল না, আবিরের নানার বাড়ি ছিল সিলেটের এক অজপাড়াগাঁয়ে।
একদিন ভোরে জনাব রফিকুল ইসলাম আবিরকে ট্রেনে তুলে দিলেন, উদ্দেশ্য ছিল বেলা থাকতেই যেন আবির তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, যথাসময়ে স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়ে গেল, ঝনঝন শব্দ করে ট্রেন চলছিল আপন গতিতে, বাইরের প্রকৃতির দৃশ্য ছিল খুবই মনোহর, কখনো সারি সারি ফসলের মাঠ, আবার কখনো পাহাড় আর সবুজ অরণ্য, সবকিছু ছবির মতো মনে হচ্ছিল আবিরের কাছে।
একটু পর-পর ট্রেন নানান স্টেশনে থামছিল, নানান রঙের মানুষ ট্রেনে ওঠানামা করছিল,
কত লোক খেলনা ও মুখরোচক খাবার নিয়ে এসেছিল তার কোনো হিসাব নেই। সময়টা আনন্দেই কাটছিল আবিরের।
হঠাৎ ধীরে ধীরে ট্রেন থেমে গেল, যাত্রীদের মাঝে চরম হৈহল্লার শুরু হলো, আবির শোনতে পেল লাইনে কিছু একটার সমস্যা হয়েছে, এভাবে চার-পাঁচ ঘণ্টা কেটে গেল একই স্থানে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ট্রেনের যান্ত্রিক ত্রুটির সমাধান হলো, জোরে হুইসেল দিয়ে ট্রেন আবারো যাত্রা করলো নিজ গন্তব্যে।
সিলেট পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে গেল আবিরের, রাত তখন ১২টা বেজে গিয়েছে,
সব কেমন নিশ্চুপ আর বিদঘুটে মনে হলো আবিরের কাছে, কেবল কয়েকটা রিকশাই স্টেশনে দাড়িয়ে ছিল, স্টেশন থেকে আবিরের নানার বাড়ি প্রায় সাত কিলোমিটারের পথ, তবে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি হওয়ার কারণে সামনের কাঁচা রাস্তাটির অবস্থা যে খুব ভালো ছিল না তা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছিল, যার কারণে কোনো রিকশাই এতো রাতে সে দিকে যেতে রাজি হচ্ছিল না। অবশেষে নিরুপায় হয়ে একাই হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল আবির।
এ রাস্তাটি আবিরের অনেকটাই চেনা, কেননা এর আগেও সে অনেকবার এসেছিল এ পথে, যদিও তখন এমন বিভৎস রাত আর একা ছিল না সে।
বুদ্ধি করে আবিরের মা আসার সময় ছেলের ব্যাগে জোর করেই একটা টর্চ-লাইট দিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাই এই বিপদে বড় ভরসা আবিরের কাছে,
কিছুদূর হাঁটার পরই পাকা রাস্তা শেষ করে কাঁচা কাদাযুক্ত রাস্তায় পৌঁছাল সে, সঙ্গে অন্য কোনো পথচারীকে দেখতে না পেয়ে কিছুটা অস্বস্তি হলো তার, তবুও হাল ছাড়লে তো হবে না, যে করেই হোক তাকে পৌঁছাতে হবে নানার বাড়ি।
ভীরু পায়ে একা-একা পথ চলছিল আবির, চারপাশে কেউ নেই, কেবল নীরবতা আর জনমানবহীন বিদঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ পাশের অরণ্য থেকে শেয়াল ডেকে উঠলো, ভয়ে কিছুটা হকচকিয়ে গেল আবির, গা ছমছম করছিল তার, কেমন যেন পুরো শরীর ভার হয়ে গিয়েছিল আবিরের, হৃদয়ের সাহসও ধীরে ধীরে কমে আসছিল তার, যেন এক পা এগোচ্ছে তো দু’পা পিছিয়ে যাচ্ছে সে।
একটু সামনেই মরা নদী, তার পাশ ধরেই সরু রাস্তাটি এগিয়ে গেছে, সে তার মায়ের কাছ থেকে শুনেছিল একটা সময় এখানে বড় হিন্দু পাড়া ছিল, যদিও এখন সংখ্যাটা একদম সীমিত, তবে পুরনো মন্দির এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল নদীর পাশে।
কিছুটা এগিয়ে যেতেই সামনে পড়ে একটি পুরনো শ্মশান, পাশেই লাশ পোড়ানো ঘর, এসব দেখার পর আবিরের মনে যেটুকু সাহস অবশিষ্ট ছিল তাও বিলীন হয়ে গেছে।
লাইটের আলো ক্রমশেই ফুরিয়ে আসছিল, বুকের ভেতর ধুপ ধুপ শব্দ হচ্ছিল তার, নিজের সাথে যুদ্ধ করে আর এগিয়ে যেতে ইচ্ছে হলো না তার।
আবির জানত এখানে আশেপাশেই অনেক হিন্দু বসতি আছে, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, যে করেই হোক আজকের রাতটা কারো কাছে আশ্রয় নিবে সে, ভোরের আলো ফুটলেই নিরাপদে নানার বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে যাবে।
এসব ভেবে অবশেষে পথ ঘুরিয়ে রওনা দিল একটি হিন্দু বসতির উদ্দেশ্যে।
কিছুটা সামনে যেতেই তার লাইটের স্বল্প আলোতে খানিকটা দূরে একটা ছোট্ট বাড়ি দেখতে পেল, মনে কিছুটা আশার আলো সঞ্চার হলো তার, আগে-পিছে না ভেবেই সে দিকে হাঁটা দিল আবির।
বাড়ির কাছে যেতেই লাইটের আলো পুরোপুরি ফুরিয়ে এলো তার, পুরো বাড়িটা বড় বড় গাছপালা দিয়ে ভর্তি ছিল, আর কেমন যেন নিস্তব্ধ, যেন নিজের হৃদয়স্পন্দনও শোনা যায়।
সাহস করে ডাক দিল আবির, বাড়িতে কেউ আছেন? আমার একটু সাহায্য দরকার, প্রত্যুত্তরে কোনো সাড়া পেল না, আবারো বলল, কেউ কি আছেন বাড়িতে? হঠাৎ সোঁ সোঁ করে জোরালো বাতাস বইতে শুরু হলো, চারদিক থেকে পাখিগুলোও একসাথে ডেকে উঠলো, ভয়ে শরীর কাঁপছিল আবিরের, দূরে দেখতে পেল একঝাক জোনাকি পোকা, সে তখন আরো ভীত হয়ে গিয়েছিল, কেননা সে ছোট বেঁলায় তার মায়ের মুখ থেকে গল্প শুনেছিল—
জ্বীনভূত নাকি জোনাকি পোকা হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
বাড়িটির ভেতর খুব বেশি ঘর ছিল না, একটি পুরনো ছোট ঘর, আর একটি দালান, আবির দালানের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছিল, হঠাৎ ভয়ংকর ভাবে বিজলি চমকালো, সজোরে এক বিকট শব্দ, যেন মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়েছে, পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে নিশাচর পাখিরাও একসাথে ডেকে উঠলো, আবির ধপাস করে আছড়ে পড়ল মাটিতে, শরীর নিস্তেজ হয়ে এলো তার, মাথাও ঝিমঝিম করছিল আবিরের, বিন্দুমাত্র শক্তি ছিল না উঠে দাঁড়ানোর, মনে হলো পুরো পৃথিবী যেন আচমকা তার বুকের উপর আছড়ে পড়েছে, এরপর সে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।
ধীরে ধীরে ভোর হলো, চারপাশে সোনালি দিনের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল, এ পথ ধরেই সকাল সকাল হেঁটে আসছিলেন মন্দিরের পুরোহিত মশাই, পুরোহিত মশাইয়ের চোখ গেল পরিত্যক্ত বাড়ির উঠানে, দেখতে পেলেন কেউ একজন পড়ে আছে সেখানে, পুরোহিত মশাই দ্রুত সেখানে পৌঁছে টেনে তুললেন আবিরকে, কোনো সাড়া ছিল না আবিরের, অবশেষে পুরোহিত মশাই বহু কষ্টে আবিরকে নিজ গৃহে নিয়ে গেলেন, অবস্থার উন্নতি না দেখে কবিরাজ ডেকে নিয়ে এলেন তিনি, দীর্ঘ সময় পর জ্ঞান ফিরলো আবিরের, তার চোখে মুখে এখনো সে ভয়ের বিভৎস প্রতিচ্ছবি ভেসেছিল, পুরোহিত মশাই আশ্বস্ত করলেন কোনো ভয় নেই আর, আবিরের মুখ থেকে সব ঘটনা শুনার পর পুরোহিত বললেন বাড়িটি পরিত্যক্ত, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় এই বাড়ির প্রতিটি সদস্য খুন হয়েছিল, এখন পর্যন্ত সে ঘটনার কোনো রহস্য উন্মোচন করতে সক্ষম হয়নি কেউ, সে দুর্ঘটনার পর থেকে বহু বছর ধরেই সরকার বাড়িটিকে সিলগালা করে রেখেছিল। সময়ের সাথে সব ভেঙেচুরে খোলামেলা হয়ে গিয়েছে এখন।
লোকমুখে শোনা যায় বাড়িটি থেকে এখনো নাকি হঠাৎ হঠাৎ ভয়ংকর চিৎকার ভেসে আসে, তাই কেউ ভয়ে বাড়িটির আশেপাশে যেতে চায় না। সবাই এখন বাড়িটিকে ভূতের বাড়ি বলেই ডাকে।
আর এ পথটিও রাতের জন্য মঙ্গলজনক নয়, তাই কেউ রাতের বেলা এ পথে খুব একটা চলাচল করে না।
আবিরের মুখ থেকে তার সাথে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা শুনলেন পুরোহিত মশাই, তারপর আবিরকে সাহস দিয়ে নিজের সঙ্গে করে তার নানার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলেন।







