প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২৩
বধ্যভূমি

এক.
সদ্যজাত শিশুটি পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে, এ তার নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
বাবা বাড়ি ফেরার আয়োজনে ব্যস্ত। হৃদকম্পন স্পষ্ট কানে বাজে, শ্বাস ফেলা কষ্টকর। ছোটো মানুষ, এত বড়ো সিদ্ধান্ত কোনোদিন নিতে হবে, ভাবতে পারেনি। অভ্যস্ত জীবনের গণ্ডিতে বন্দি। ঋষভের পৃথিবী বলতে ঘর আর চাষের জমি। সপ্তাহান্তে বাজারে যায়, তেল-নুন কিনে, মাছ-তরকারি নিজেই ফলায়। আপন বলতে স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই, যেকোনো উপায়ে তাকে বাঁচাতে হবে। এদিকে মাতৃত্বকে অস্বীকার করারও শক্তি নেই।
ঋষভ এ—ক’মাসে জগৎ চিনেছে। যেদিন স্ত্রীর মুখে কথাটা প্রথম শুনে, সে কী উচ্ছ্বাস! অনাগতকে ঘিরে স্বপ্ন সাজায়। দিনগুলো হবে শ্যামল-শুভ্র। নিজের সত্তার বিচরণ পৃথিবীর বুকে, দৌড়ে এসে ঝাপটে ধরবে। বাড়ির সামনের দিকটা এবড়ো-থেবড়ো। গতবছর ভারী বর্ষণে সব মাটি সরে গেছে, ঠিক করা দরকার। হারিয়ে যায়, কল্পনার রঙিন দুনিয়ায়। মুরুব্বিরা বলে, সন্তান আশীর্বাদ।
ক্ষুধা ক্রোধের পিতৃভূমি, বিলাসিতা বোঝে না, খাবারেই মেটাতে হয়। মাঝে-মধ্যে কলহ বাঁধে। ভালোবাসার বিনিময়ে পঙ্কিলতা মুছে শুদ্ধতা আনে। বাবা ডাক শোনার আকুলতায় সংযত রাখে নিজেকে। স্ত্রীকে ঘরের কাজে সাহায্য করে। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে, সন্ধ্যার পর চা-বিড়ির দোকানে ঢু মারতো। পুরনো সব বদ-অভ্যাস ছেড়েছে, চায় না তার কারণে সন্তানের মাথা নত হোক। হিংসুটে পড়শিরা আড়ালে হাসে। বেটা মানুষ, সারাদিন বউয়ের কাছে কী?
ঘুম সকল রোগের মহৌষধ, অসুস্থ মনে কথাটি সারাক্ষণ বাজে। যুগ যুগ ধরে এ—বিশ্বাস লালন করে এসেছে দীনহীন মানুষগুলো। এবার ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া দরকার, যদিও গ্রাম অঞ্চলে ঔষধ বিক্রেতাকেই সে—আসন দিয়েছে।
ডাক্তার পরামর্শ দেয়, ‘বউকে নিয়ে সদরে যা। একজন ভালো গাইনি রোগ বিশেষজ্ঞ দেখা। এ—সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া ঔষধ খাওয়ানো ঠিক না।’
ঋষভ পুরোপুরি অবসর, মাটি কাটা বা ফসলের মৌসুম শেষ। এ—সময় অন্য এলাকায় চলে যেতো। গতবার গিয়েছিল পুটিয়ার চর, সাথে আরও বারো-তেরো জন। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা তারাই করে। নগদ টাকা, ধান-চাল দেয়। বছরের খোরাকি রেখে বাকিটুকু বিক্রি করে। জগতীর জন্য নতুন কাপড় কিনে আনে। দেখে কী যে খুশি হয়েছে মেয়েটা। চোখে কাজল এঁকে, খোঁপায় ফুল তুলে স্বামীকে সঙ্গ দেয়। বায়না ধরে, এবার একজোড়া কানের দুল দিতে হবে।
ঋষভ সে ভাবনা আগেই ভেবে রেখেছে। কখনও মুখ ফুটে কিছু চায়নি। অল্প জমা করেছে। আসছে বর্ষায় পুকুর থেকে মাছ তুলে বিক্রি করে গড়ে দেবে।
ঋষভ হাসপাতালের কাউন্টার থেকে টিকিট কাটে। সবাই লাইনে দাঁড়ানো। ভেতরে মিটিং চলছে, কোট-টাই পরা একদল লোক, কী ঔষধ লিখে, তা দেখবে। কিছুদিন আগে এরাই এক ডাক্তারকে পিটিয়েছিল, নিজেদের বিক্রি কমে যাওয়ার অপরাধে। দামি ফ্ল্যাট, এতো এতো উপহার, আসবাব-পত্র, স্ত্রীর জন্য গহনা, সন্তানদের খেলনা সামগ্রী — এ’টুকু প্রত্যাশা রাখতেই পারে।
অধিকাংশ ঘরে তালা ঝুলানো। যারা এসেছে, তাদের চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। ভোর হতে রোগী দেখছে।
মন খারাপ করে এক রোগী বেরিয়ে আসলো। গরিব মানুষ, বিনা পয়সায় চিকিৎসা পাবার আশায় এসেছিল। ডাক্তার পরীক্ষা করানোর কথা বলে। রোগী নিজের অপারগতার কথা জানায় — ‘আপনি ঔষধ লেইখা দেন, পরীক্ষা করাতে পারমু না।’
রাগান্বিতস্বরে, ‘ডক্তার আপনি, নাকি আমি? এক্ষুণি বেরিয়ে যান।’
ভয়ে ভয়ে জগতী প্রবেশ করলো।
‘কী সমস্যা?’ বলেই একনাগারে লিখতে থাকে, একবারের জন্যেও মুখ তুলে তাকালো না। সামনের দিকে ইশারা করে, ‘প্রেসক্রিপশনটা উনার হাতে দিন, বুঝিয়ে দেবে।’
দরজায় দাঁড়ানো সহকারী এগিয়ে এসে, ‘ম্যাডাম রিপোর্ট দেখে ঔষধ লিখবেন। এখানে ল্যাব নাই। আপনারা ‘সঞ্জিবনী হাসপাতাল’—এ যান। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত ম্যাডাম ওখানে বসেন। ওখানকার যন্ত্রপাতি একেবারে আধুনিক, রিপোর্ট নির্ভুল আসে। আমার নাম বলবেন, টাকা কম রাখবে।’
‘সঞ্জিবনী হাসপাতাল’ এলাকাবাসীর কাছে স্বর্গতুল্য। এক মহৎপ্রাণ মানুষ প্রতিষ্ঠানটি গড়েছে, ডা. ধর্মানন্দ, এক নামে সবাই চেনে। শহরের বড়ো ডাক্তার, দেশি-বিদেশি ডিগ্রি আছে। ছোট্ট উপজেলা শহর, মানুষ চাইলেও শহরে যেতে পারে না। অসুখবিসুখ বলে-কয়ে আসে না। এখানে জটিল রোগের চিকিৎসা চলে। ঝড়-বৃষ্টি-বাদলেও সেবা পায়। ঔষধ-পত্রের জন্য বাইরে যাওয়া লাগে না। মালিকপক্ষ খুব সচেতন, ডাক্তাররা যথাসময়ে আসে। আগে চিকিৎসা, পরে টাকা, এ—নীতিতে বিশ্বাসী। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দুপুরের পর ভূতের বাড়ি মনে হয়, ডাক্তাররা চলে যায় ব্যক্তিগত চেম্বারে কিংবা বেসরকারি হাসপাতালে। জ্বর, ঠাণ্ডা, কাশি ছাড়া অন্য রোগী ছুঁয়েও দেখে না।
ঋষভের কপালে চিন্তার রেখা। দরজায় হেলান দিয়ে শুন্যে তাকিয়ে আছে। নাওয়া-খাওয়া নেই। স্ত্রীকে এ—অবস্থায় রেখে দূরে যাবে, তাও নিরাপদ নয়। তিল তিল করে যা জমিয়েছিল, একদিনে শেষ। দশটার বেশি পরীক্ষা, রিপোর্টগুলো খুলেও দেখেনি। মনে যা আসলো, লিখে দিলো। তবে স্বস্তির কথা এই, সবকিছু স্বাভাবিক, ভয়ের কারণ নেই। তিনমাস পর আবার যেতে বলেছে।
দুই.
আয়া শান্ত করার চেষ্টা করলো। ভাগ্য বিড়ম্বিতা, পেটের দায়ে পড়ে আছে। হাঁড়ির খবর জানে। দুঃখগুলো ভাগ করে নিতে চায়। রাতে চুপি-চুপি জগতীকে বলেছিল, মা, তুই পালা, আমি পেছনের দরজা খুলে রেখেছি।
ঋষভ ঘোর আপত্তি জানায়। এখানে আছে পাঁচদিন ধরে। জগতীর শরীর নাজুক। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, সেলাইয়ে ইনফেকশন। সারাতে সময় লাগবে, সাথে ঔষধ-পত্র। নিয়মিত ডাক্তর দেখাতে হবে, চিকিৎসা চলবে আরো কয়েকমাস। বিল হয়েছে পঞ্চাশ হাজারের মতো, দুই হাজার জমা করেছিল। বন্দোবস্ত করে যেতে না পারলে, জগতীকে বাঁচানো যাবে না, ভাবতেই মূর্ছা যাওয়ার দশা। মা ছাড়া একটা শিশু কতটা অসহায়, নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছে। জানে নিষ্ঠুর পৃথিবীর ইতিহাস।
সাহেব গোছের এক লোক এসে বাচ্চাটিকে ভালোভাবে নেড়েচেড়ে দেখলো। বিরাট ধনী মানুষ, গেইটে দামি গাড়ি, তাতে সুন্দরী এক রমণী অপেক্ষা করছে। প্রচণ্ড গরম, বাতাসে ধূলা-বালি, কাঠফাটা রোদ— উপেক্ষা করা যায় না।
জগতী শিশুটিকে শক্ত করে চেপে ধরে। বুক ফাটা আর্তনাদ, শক্তি নেই আগলে রাখার। কপালে শেষবারের মতো চুমু খেলো।
একটা হৈ চৈ পড়ে গেছে। ভদ্রলোকের বিচরণক্ষেত্র, অহেতুক ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই, সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। এতোদিনের সম্পর্ক, সামান্য কারণে নষ্ট করা যায় না। ডাক্তার সাহেব তার যুক্তিতে অটুট। এক বছর ধরে দেখছেন, প্রতিমাসে আসে, ফুলবডি চেকাপ করায়, রোগ অনুযায়ী চিকিৎসা দেন। অথচ গতকাল রিলিজ করে দিয়েছে, আর আসা লাগবে না।
বললেই হলো? বহু মানুষের রুটি-রুজি হাসপাতালটি ঘিরে। ছুটিতে ছিলো, অন্য এক ডাক্তার তার পরিবর্তে চেম্বার করেছে।
সবার প্রিয় জায়গা। প্রতিযোগিতা লেগে থাকে, একটা সুযোগ চাই। স্থানীয় ওষুধ বিক্রেতা, হাতুড়ে ডাক্তার, রিকশাওয়ালা, কেউ-ই বাদ যায় না, সবার ঘরে হলুদ খাম পৌঁছে দেয়। কাজটা মালিক নিজে করে, দু’নাম্বারির সুযোগ নেই।
তিন.
শেষরাতে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়েছে, জগতীর শরীর অচল, অতিমাত্রায় ব্যথানাশক প্রয়োগ করেছিল। এতোদিন টের পায়নি।
ঋষভ পাগলপ্রায়। নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত। বিল মেটাতে না পেরে বুকের মানিক বিক্রি করে এসেছে। লোকটি ডা. ধর্মানন্দের ঘনিষ্ঠ, দরদাম করে দিয়েছিলো। কথা দিয়েছে, আদর-যত্নের কমতি হবে না, তাদের একজন উত্তরাধিকার প্রয়োজন। এদিকে চিকিৎসা আর ঔষধ না পেলে, জগতীকে বাঁচানো যাবে না, তাইতো সে রাতে পালায়নি।
ডা. ধর্মানন্দের বাড়ি নোয়াখালীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে। ঢাকা শহরে ফার্মেসিতে চাকরি করতো। একদিন টাকা-পয়সা নিয়ে পালায়। মালিক বিশ্বাস করে পুরো দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল। ধরা পড়ার ভয়ে নিজ গ্রামে ফিরেনি, এখানে এসে ব্যবসা শুরু করে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। সাথে যোগ দিয়েছে ‘ঢাকা মেডিকেল’ থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া আয়া, সিজারিয়ান অপারেশনের কাজটা তিনিই করেন। সকল ঔষধের নাম মুখস্থ, উচ্চমাত্রার ডোজ দেয় সাধারণ রোগে। দ্রুত সেরে যায়, সবাই বাহ্ বাহ্ রব তুলে।
সকাল-বিকাল যারা শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নিতো, তারাই বিশেষজ্ঞ, প্রত্যেকের নামে আলাদা বিল। ফার্মেসি থেকে নেওয়া ঔষধের, একভাগও ব্যবহার করে না, অপারেশন টেবিল হয়ে ফিরে আসে। বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ। ল্যাব সহকারী বয়স ও রোগের ধরন শুনে রিপোর্ট বানায়।
গল্পগুলো একটা অদৃশ্য পর্দার আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে। এতো মানুষের নতুন জীবন প্রাপ্তি, মাঝে-মধ্যে দু-চারটা মৃত্যু, নিছক দুর্ঘটনা মাত্র।
বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে, টিনের চালে নূপুরের মৃদু-মন্দ তাল। জগতী পৃথিবীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে, স্বামীর কোলে মাথা রেখে, ঠিক প্রথম রাতের মতো।







