শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৭

গুনগুন আজও কাঁদে, টিয়ে পাখিটি ফিরবে বলে

পলাশ দে

শিশুমন বড়ই সরল। ছোট ছোট বিষয়ও তাদের আনন্দ দেয়, আবার সামান্য হারানোও গভীর কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। কখনো পুতুলকে জীবন্ত মনে হয়, কখনো গরু, ছাগল, মোরগ, কবুতর, বিড়ালছানা, টিয়ে কিংবা ময়না পাখির প্রতি গড়ে ওঠে অকৃত্রিম মায়া। সৃষ্টির সবকিছুই ছুঁয়ে দেখতে চায় শিশুমন। জানতে চায়, আপন করে নিতে চায়।

তেমনই একটি শিশু গুনগুন। বয়স সাড়ে চার বছরের বেশি নয়। মিষ্টি করে কথা বলে। খেলাধুলা, দুষ্টুমি, বায়না আর পড়াশোনায় কাটে তার দিন। শুধু বাবা-মায়ের নয়, পরিবারের সবারই আদরের সোনামণি সে।

গুনগুনদের বাড়িতে ছিল একটি টিয়ে পাখি। ভাই-বোনের ছোট্ট সংসারে পাখিটিও যেন পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠেছিল। গুনগুনের স্নেহময়ী মা একেবারে ছোট অবস্থায় পাখিটিকে এনে লালন-পালন করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিয়েটি বড় হয়। পরে তাকে কথা বলাও শেখানো হয়।

গুনগুন সব সময় পাখিটির কাছাকাছি থাকত। আশ্চর্যের বিষয়, গুনগুনকে চোখের আড়ালেই পেলেই টিয়েটি উচ্চস্বরে ডাকত, ‘গুনগুন... গুনগুন...।’

পাখিটির মুখে নিজের নাম শুনে গুনগুনের আনন্দের সীমা থাকত না। পুরো পরিবারও আনন্দে ভরে উঠত। ছোট্ট একটি পাখি যেন ঘরের সবার হাসির কারণ হয়ে উঠেছিল।

টিয়ে পাখিটির পরিচর্যায় গুনগুন ছিল সবচেয়ে ব্যস্ত। কখন খাবার দেবে, কখন পানি বদলাবে, কখন খঁাচা পরিষ্কার করবেÑএসব নিয়েই তার সারাক্ষণের ভাবনা। গভীর রাতেও কখনো কখনো সে খঁাচার সামনে গিয়ে দেখে আসত, পাখিটি ঠিক আছে কি না।

অল্প দিনের মধ্যেই টিয়েটি শুধু একটি পোষা পাখি ছিল না, হয়ে উঠেছিল পরিবারেরই একজন। তার কথা বলা, ডাকাডাকি আর নানা কাণ্ড ঘিরে প্রতিদিনই তৈরি হতো নতুন আনন্দ।

গুনগুনের বিশ্বাস ছিল, টিয়ে পাখিটি কখনো তাদের ছেড়ে কোথাও যাবে না। যে পাখি তার নাম ধরে ডাকে, সে কী করে তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে!

টিয়ের সেই ডাক গুনগুন মোবাইল ফোনে ভিডিও করে রাখত। আত্মীয়-স্বজনদেরও পাঠাত। যেন সবাই শুনতে পারে, তাদের টিয়ে পাখি কী সুন্দর করে ‘গুনগুন’ বলে ডাকে।

টিয়ে পাখিটিকে খাবার দেওয়ার সময় মাঝেমধ্যে খঁাচার দরজা খোলা থাকত। কিন্তু কখনোই সে বাইরে বের হতো না। তাই পরিবারের কারও মনে ভয়ও ছিল না।

হঠাৎ একদিন খাবার দেওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ খঁাচার দরজা খোলা রয়ে যায়। সেই সুযোগে টিয়ে পাখিটি উড়ে গিয়ে বাড়ির ছাদের কার্নিশে বসে।

খঁাচায় পাখিটিকে না দেখে গুনগুন ছটফট করতে থাকে। এদিক-ওদিক খুঁজতে শুরু করে। তার মা ছুটে গিয়ে দেখেন, টিয়ে পাখিটি ছাদের এক কোণে বসে আছে। পাখিটিকে দেখে মা-মেয়ে দুজনেই কিছুটা স্বস্তি পান।

গুনগুন আপন মনে টিয়েটিকে ডাকতে থাকে। কিন্তু পাখিটি কোনো সাড়া দেয় না। তখন চোখ ভিজে যায় ছোট্ট মেয়েটির। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, ‘কী রে, তুই আমাকে চিনতে পারিস না? আমি তো তোর গুনগুন।’

কিন্তু পোষা পাখি আর কারও কথা শুনল না। এত দিনের আদর-ভালোবাসা পেছনে ফেলে কিছুক্ষণ পরই উড়ে গেল অজানার পথে।

যে পাখিকে যতই যত্নে লালন করা হোক, সুযোগ পেলে সে মুক্ত আকাশেই ফিরে যেতে চায়। ছোট্ট গুনগুন তখনও সেই বাস্তবতা বুঝে ওঠেনি।

টিয়ে পাখিটি চোখের আড়াল হতেই গুনগুনের কান্না আর থামানো গেল না। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষাও যেন কারও জানা ছিল না।

অন্যদিকে মেয়েকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে গুনগুনের মা নিজেও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি আশপাশের বাড়ি, গাছপালা আর উঁচু উঁচু জায়গায় পাখিটিকে খুঁজতে থাকেন। মনে শুধু একটাই প্রশ্নÑটিয়েটি কি কোথাও বসে আছে, নাকি সত্যিই অনেক দূরে উড়ে গেছে?

টিয়ে পাখিটিকে না পেয়ে গুনগুনসহ পুরো পরিবার ভেঙে পড়ে। এত যত্নে বড় করা, কথা শেখানো একটি পাখি হঠাৎ হারিয়ে গেলে মন কি সহজে তা মেনে নিতে পারে?

সেদিনের সেই কষ্ট আজও ভুলতে পারেনি গুনগুনের পরিবার। প্রিয় কোনো পোষা প্রাণী হারানোর বেদনা সত্যিই সহজে ভোলা যায় না।

টিয়ে পাখিটি উড়ে যাওয়ার পর গুনগুন কিছুতেই বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। তার খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সারাক্ষণ শুধু টিয়ে পাখিটির কথাই ভাবত।

মাঝেমধ্যে সে মাকে জিজ্ঞেস করত, ‘মা, আমাদের টিয়ে পাখিটা কি সত্যিই চলে গেছে? সে কি আর কোনো দিন ফিরে আসবে না?’

ছোট্ট গুনগুনের মন বিশ্বাস করতে চাইত না, যে পাখি একবার উড়ে যায়, সে আর ফিরে আসে না। তার মনে হতো, একদিন না একদিন টিয়েটি নিশ্চয়ই ফিরে আসবে।

প্রতিদিন সে খালি খঁাচার সামনে গিয়ে দঁাড়াত। চোখের জল ফেলতে ফেলতে বলত, ‘তুই কেন চলে গেলি? আমি তোকে কি বকেছি? আমি কি তোকে খেতে দিইনি?’

মেয়ের এমন কান্না দেখে গুনগুনের মা কোনো সান্ত্বনার ভাষা খুঁজে পেতেন না। ইচ্ছা করলে তিনি আরেকটি টিয়ে পাখি কিনে আনতে পারতেন। কিন্তু যে পাখিটি গুনগুন বলে ডাকত, সেই পাখিটিকে তো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

আজও মাঝেমধ্যে টিয়ে পাখিটির ডাক যেন কানে ভেসে আসে। পরিবারের কোনো সদস্য হারিয়ে গেলে যেমন শূন্যতা তৈরি হয়, টিয়ে পাখিটির চলে যাওয়ার পর গুনগুনদের পরিবারেও তেমনি এক শূন্যতা নেমে আসে।

এত ভালোবাসা, এত যত্ন আর এত আদরের পরও পাখিটি উড়ে যাবেÑএ কথা কোনো দিন ভাবেননি গুনগুন কিংবা তার মা।

আজও টিয়ে পাখিটির কথা মনে পড়লে গুনগুন কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরিবারের সদস্যরাও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ছোট্ট একটি পাখির চলে যাওয়া যে একটি শিশুর মনে এত বড় শূন্যতা তৈরি করতে পারে, তা তঁারা আগে বুঝতে পারেননি।

হয়তো সময়ের সঙ্গে গুনগুন বড় হবে। জীবনের অনেক কিছুই ভুলে যাবে। কিন্তু এই টিয়ে পাখির স্মৃতি তার শৈশবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।

গুনগুনের মা হয়তো আবার একটি টিয়ে পাখি আনতে পারবেন। কিন্তু যে পাখিটি পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিল, যে পাখিটি গুনগুন বলে ডাকত, তার জায়গা আর কেউ নিতে পারবে না।

পোষা প্রাণীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ। আর সে ভালোবাসা হারিয়ে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তার সান্ত্বনা সব সময় ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

বাস্তবতা মেনে নিতেই হয়। তবু গুনগুনের মতো একটি শিশুর মনে আজও একটি বিশ্বাস রয়ে গেছেÑএকদিন হয়তো টিয়ে পাখিটি আবার ফিরে আসবে।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়