প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ২০:৪৯
সওগাত ও বেগম সম্পাদকের যথাযথ মূল্যায়নে বাংলা একাডেমির প্রতি আহ্বান
মোখলেছুর রহমান ভূঁইয়া

সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের ৬ জুলাই। ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি চল্লিশ বছরে পদার্পণ করেছে। সাহিত্যের কলেবরে চলতে চলতে এ দীর্ঘ পথচলায় কলমসারথিদের কখনো বন্ধুর, কখনো মসৃণ পথে অগ্রসর হতে হয়েছে।
|আরো খবর
সাহিত্য একাডেমির চল্লিশ বছরপূর্তি স্মরণীয় রাখতে একাডেমি প্রয়াত সদস্য ও লেখকদের স্মরণে প্রার্থনা, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, বৃক্ষ উপহার, বইপাঠ, চিত্রাঙ্কন, রচনা, কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, দেয়ালিকা প্রকাশ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের চাঁদপুর আগমন দিবস উপলক্ষে আলোচনা, লেখালেখিবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা, শোভাযাত্রা এবং সমাপনী অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণসহ ১৩টি কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে।
চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমি ব্যতীত এমন আয়োজন রাজধানীতেও বোধহয় হয়নি। বিষয়টি সাহিত্য মহলে আলোচনায় এসেছে।
চাঁদপুরের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সাহিত্যের শিকড় অত্যন্ত সুদৃঢ়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধন এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পদরেণুতে সমৃদ্ধ এই উর্বর সাহিত্যভূমিতেই জন্ম সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও বেগম সম্পাদক নূরজাহানের।
সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যের এক আলোকময় অধ্যায়।
সাহিত্য একাডেমির পূর্তি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘চারপাশের অবকাঠামো গঠনকল্পে প্রতিভার বিকাশ ঘটে।’ নজরুলের প্রতিভা বিকাশে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
সরদার জয়েনউদ্দীন সম্পাদিত বইপত্র পত্রিকার পঞ্চম বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা (জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৬/জুন ১৯৬৯)-এ নাসিরউদ্দীন সাহেব বলেন, ‘নজরুলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয়ের আগে তাঁর লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। নজরুল করাচির বাঙালি পল্টন থেকে লেখা পাঠাতেন। এখন ভাবতে আমার আনন্দ লাগে, নজরুলের প্রথম প্রকাশিত রচনা “বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী” আমার সওগাত-এই (জ্যৈষ্ঠ ১৩২৬) প্রকাশিত হয়।’
নাসিরউদ্দীনের মুখে এ কথা শোনার পর সরদার জয়েনউদ্দীনের মনে হয়েছিল, তিনি যেন এক জীবন্ত ইতিহাসের সামনে বসে আছেন। যাঁকে নিয়ে আজ দেশব্যাপী জাগরণ, তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন যাঁরা, নাসিরুদ্দীন তাঁদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ।
নজরুল প্রতি সপ্তাহে বান্ডিল বান্ডিল লেখা পাঠাতেন। নাসিরউদ্দীন সেগুলোর মধ্য থেকে বেছে সওগাত-এ প্রকাশ করতেন। তখনও তাঁদের মুখোমুখি পরিচয় হয়নি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সৈনিক জীবন শেষে নজরুল হাওড়ায় নেমে প্রথমেই সওগাত কার্যালয়ে যান। নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমি কাজী নজরুল ইসলাম।’ নজরুলের তরফ থেকেই প্রথম পরিচয়ের সূত্রপাত।
নাসিরউদ্দীন তাঁকে বসতে দেন। চা-পানির আপ্যায়ন করেন। গল্পগুজবের একপর্যায়ে নজরুল বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি লেখায় মনোযোগ দেব।’
যুদ্ধফেরত নজরুল অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণ সমাজের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন। সমগ্র বাঙালির হৃদয় জয় করার এমন দুর্বার ক্ষমতা এর আগে বা পরেও খুব কম সাহিত্যিকের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।
এরই মধ্যে নজরুলের প্রথম গ্রন্থ তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা (সওগাত, প্রথম বর্ষ, ১২শ সংখ্যা, কার্তিক ১৩২৬) এবং প্রথম গান উদ্বোধন (সওগাত, দ্বিতীয় বর্ষ, বৈশাখ ১৩২৬) প্রকাশিত হয়। শুধু মাসিক সওগাত নয়, নজরুলকে প্রাধান্য দিয়ে নাসিরউদ্দীন সাপ্তাহিক সওগাতও প্রকাশ করেন।
একসময় নজরুল অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ধারাবাহিক লেখায় ছেদ পড়ে। তখনও নাসিরউদ্দীন নানা কৌশলে তাঁর কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করেছেন। মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসের ধারাবাহিক প্রকাশ তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
অনেক সমালোচনার মুখেও ১৯২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্মাননা প্রদান করা হয়। এ আয়োজনেও সওগাত-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় কবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৬ সালে কবির মৃত্যুর পরও জাতীয় কবির মর্যাদা রক্ষায় সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন নিবেদিত ছিলেন।
১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত কবির জন্মবার্ষিকীর এক সভায় নাসিরউদ্দীন বলেন, ‘আমরা চাই কবির নামে একটি “কবি ভবন”। সেখানে থাকবে তাঁর বাসকক্ষ, ব্যবহার্য জিনিসপত্র, সম্পূর্ণ রচনাবলি, অসংখ্য গানের রেকর্ড, তাঁকে নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রকাশিত গবেষণাগ্রন্থ, প্রবন্ধ এবং সংগ্রহযোগ্য সব উপকরণ। আমি মনে করি, সরকার ও জনগণের পক্ষে এটি অসম্ভব কোনো কাজ নয়।’
তিনি আবারও অনুরোধ করেন, ‘নজরুল ভবন’ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার যেন অবিলম্বে উদ্যোগ গ্রহণ করে। (সওগাত-যুগে নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, পৃষ্ঠা ৩২৪, নজরুল ইনস্টিটিউট)।
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবির মৃত্যুর পর ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় শোকসভায়ও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন জাতীয় কবির মর্যাদা রক্ষায় দ্রুত সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
১৯৭৯-৮০ সালে নজরুল ভবন প্রকল্প গৃহীত হয়। ১৯৮৫ সালে গঠিত হয় নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ড। সেখানে নজরুলের অগ্রজপ্রতিম বন্ধু, ঘনিষ্ঠ সুহৃদ, নজরুল প্রতিভা ও সাহিত্যের অকৃত্রিম আলোকবর্তিকা, প্রবীণ সাংবাদিক এবং সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন পদে পরিবর্তন এলেও আমৃত্যু তিনি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন।
নজরুলের প্রতিভা বিকাশ, লালন, পরিচর্যা, নজরুলচর্চা, গবেষণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের অবদান ঐতিহাসিক স্বীকৃতির দাবিদার।
নজরুলের জীবনে, মরণে এবং মৃত্যুর পরও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ছিলেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। সময়ের ব্যবধানে ক্ষীণ হচ্ছে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের অবদান। অথচ নাসিরউদ্দীনকে স্মরণে রাখলে জাতীয় কবির যাপিত জীবন সম্পর্কেও অনেক কিছু জানা যাবে।
বাংলা একাডেমি যদি সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও বেগম সম্পাদক নূরজাহান বেগমকে নিয়ে আলোচনা ও স্মরণসভার কার্যক্রম গ্রহণ করে, তবে পিছিয়ে পড়া মুসলিম সাহিত্যজাগরণের অগ্রদূতদের সম্পর্কে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে। সমৃদ্ধ হবে বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার।
একই সঙ্গে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সাহিত্যহিতৈষী জীবন পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।মোখলেছুর রহমান ভূঁইয়া : কার্যনির্বাহী সদস্য,
সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর।








