বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাজীগঞ্জে ৩ ডাকাত গ্রেফতার। পিকআপ সহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার

প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৫

শৈশবের অন্যরকম ঈদ

উজ্জ্বল হোসাইন
শৈশবের অন্যরকম ঈদ

ঈদ মানেই নতুন জামা এই কথাটার ভেতরে যে কতটা স্বপ্ন, কতটা অপেক্ষা আর কতটা না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে, তা বোঝে কেবল সেই শিশুরা, যাদের ঈদ আসে খালি পায়ে, ছেঁড়া শার্টের বোতামহীন বুকের ওপর দিয়ে। ঈদ ঠিক এমনই।

বাড়িটা ছিল গ্রামের শেষ প্রান্তে, পুকুরপাড়ের একটু উঁচু ঢিবির ওপর। টিনের চাল, মাটির দেয়াল, বর্ষা এলেই দেয়ালের গা বেয়ে নামত সরু সরু কাদা পানি। রাতে বাতি নিভে গেলে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে ঘুম ভাঙত বারবার। বাবা তখন দিনমজুর। কখনো মাঠে কাজ, কখনো নদীর ঘাটে বস্তা টানা, আবার কোনো দিন কাজই জোটে না। সারাদিন মানুষের বাড়িতে কাজ করে যা পেত, তা দিয়েই চলত সংসার।

কিন্তু ঈদ এলেই বুকের ভেতর একটা আলাদা আলো জ্বলে উঠত।

স্কুলে যাওয়ার পথে দেখতাম বাজারের দোকানগুলো ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। রঙিন কাপড়ে ঢেকে যাচ্ছে সামনে-পেছনের কাঠের তাক। ঝুলছে পাঞ্জাবি, শার্ট, ফ্রক, বাচ্চাদের রঙিন টি-শার্ট। ঈদের এক সপ্তাহ আগ থেকেই দোকানগুলো যেন আলাদা হয়ে উঠত আলাদা আলো, আলাদা গন্ধ, আলাদা ডাকাডাকি।

থমকে দাঁড়িয়ে থাকতাম।

একটা নীল রঙের শার্ট সামনে সাদা বোতাম, বুকের পাশে ছোট একটা পকেট। কেমন যেন বুকের ভেতর হু হু করে উঠত। মনে হতো, এই শার্টটা যদি আমার হতো!

বাড়ি ফিরে মাকে বলতাম না। সাহস হতো না।

কারণ আমি জানতাম, মায়ের মুখের দিকে তাকালেই আমার সব আবদার গিলে ফেলতে হবে।

তবু ঈদের তিন-চার দিন আগে থেকে মনে মনে হিসাব করতাম

হয়তো বাবা আজ ভালো কাজ পাবে।

হয়তো কেউ বকশিশ দেবে।

হয়তো মায়ের কাজের বাড়িতে ঈদের আগে কিছু টাকা দেবে।

শৈশবের ঈদ মানেই ছিল অপেক্ষা।

আর সেই অপেক্ষার নাম ছিল নতুন জামা।

আমাদের বাড়িতে ঈদের প্রস্তুতি খুব জাঁকজমক করে হতো না। মা দুদিন আগে থেকেই চুলায় পাতিল চাপাত। সেমাই, চিনি, দুধ সবই থাকত হিসাব করে। আমি আর আমার ছোট বোন সারাদিন ঘুরঘুর করতাম উঠানে। মাঝে মাঝে মাকে জিজ্ঞেস করতাম

মা, ঈদ আর ক’দিন?

মা মুচকি হাসত।

দু’দিন বাকি।

এই “দু’দিন বাকি” কথাটার ভেতরেই আমি লুকিয়ে রাখতাম সব আশা।

ঈদের আগের দিন বিকেলে বাবা যখন বাড়ি ফিরত, আমি উঠানের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। তার হাতে কোনো প্যাকেট আছে কি না এই দেখার জন্য।

প্রতিবারই বুকের ভেতর একটা ছোট কাঁপুনি উঠত।

কিন্তু বেশিরভাগ দিনই বাবার হাতে থাকত শুধু পুরোনো গামছা আর ক্লান্ত শরীর।

সেদিনও তাই হয়েছিল।

বাবা উঠানে ঢুকে গামছাটা মাচার ওপর রেখে বসে পড়লেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন

আজ কাজ কম ছিল।

এই তিনটা শব্দেই আমার বুকের ভেতরের স্বপ্নটা যেন একটু একটু করে গলে যেতে লাগল।

রাতে ভাত খেতে খেতে আমি সাহস করে বলেই ফেললাম

বাবা ঈদে আমার একটা জামা হবে?

বাবা থেমে গেলেন।

ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।

মা চোখ তুলে তাকালেন বাবার দিকে।

আমার মনে হচ্ছিল, এই নীরবতাটা খুব ভারী। যেন ঘরের বাতাসও বোঝা হয়ে গেছে।

বাবা ধীরে ধীরে বললেন

দেখি মা চেষ্টা করব।

“চেষ্টা করব” এই কথাটার মানে আমি তখন খুব ভালো করেই বুঝতাম।

মানে হয়ও হতে পারে, নাও হতে পারে।

রাতটা আমার ঘুম আসেনি। চালের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো পড়ছিল মেঝেতে। আমি শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম আমার যদি নতুন জামা না হয়, তবে ঈদের নামাজে আমি কী পরে যাব? গত বছরের ছেঁড়া শার্টটা? যার কলারটা কেমন বেঁকে গেছে?

পরের দিন সকাল থেকে বুকটা ভারী লাগছিল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বাবা বাড়িতে নেই। মা বারবার উঠানের দিকে তাকাচ্ছেন।

হঠাৎ দূরে বাবার গলার পরিচিত ডাক শোনা গেল।

আমি দৌড়ে গেলাম।

বাবার হাতে একটা ছোট কাগজের ঠোঙা।

আমার বুক ধক করে উঠল।

ঠোঙাটা দেখে মনে হলো, ভেতরে বুঝি আমার শার্ট!

ঘরে ঢুকে বাবা ঠোঙাটা খুললেন।

ভেতর থেকে বের হলো একটা নতুন লুঙ্গি।

সবুজ আর নীল রঙের চেক।

আমি তাকিয়ে রইলাম।

মা চুপচাপ লুঙ্গিটা হাতে নিলেন।

বাবা একটু হাসার চেষ্টা করে বললেন

এইটাই পারলাম রে। ছেলেটার জন্য একটা লুঙ্গি নিলাম।

আমার মাথার ভেতর যেন সব শব্দ থেমে গেল।

আমি কিছু বললাম না।

কিছু বলতে পারলাম না।

লুঙ্গিটা খুব সুন্দর ছিল নতুন কাপড়ের গন্ধ, ভাঁজ করা নিখুঁত কোণ, রঙগুলো চোখে লাগে।

কিন্তু ওটা তো লুঙ্গি।

শার্ট না।

প্যান্ট না।

আমি যে স্বপ্নটা এত দিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছিলাম, তার রঙটা অন্যরকম ছিল।

মা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন

মন খারাপ করিস না বাবা। ঈদ তো কাপড়েই না, মনেই।

আমি মাথা নেড়ে উঠান পেরিয়ে পুকুরপাড়ে চলে গেলাম।

পুকুরের পানিতে আকাশের রঙ পড়েছে। গাছের ছায়া লম্বা হয়ে এসেছে।

চোখ জ্বালা করছিল।

আমি কাঁদতে চাইছিলাম না।

কিন্তু বুকের ভেতরটা এমন ভারী লাগছিল, যেন কেউ একটা পাথর চেপে রেখেছে।

পাড়ার ছেলেগুলো তখন বাজার থেকে ফিরে এসেছে। কারও হাতে প্যাকেট, কারও গায়ে নতুন জামা। তারা একে অন্যকে দেখাচ্ছে

দেখ, আমার পাঞ্জাবিটা কেমন!

আমি দূর থেকে তাকিয়ে রইলাম।

আমার মনে হচ্ছিল, ঈদ যেন আমার জন্য একটু আলাদা।

আমার ঈদে নতুন জামা নেই।

শুধু একটা লুঙ্গি।

রাতে মা আমাকে ডাকলেন

আয় তো, লুঙ্গিটা পরে দেখ।

আমি চুপচাপ ঘরে ঢুকলাম।

মা খুব যত্ন করে লুঙ্গিটা পরিয়ে দিলেন।

আয়নার সামনে দাঁড় করালেন।

আমাদের আয়নাটা ছোট, কোণায় ফাটা দাগ। তবু আমি নিজের দিকে তাকালাম।

লুঙ্গিটা একটু বড়।

কিন্তু নতুন।

পরিষ্কার।

ঝকঝকে।

মা বললেন

দেখ, কেমন মানিয়েছে!

আমি হালকা করে হাসলাম।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা খালি জায়গা ছিল।

ঈদের নামাজের সকাল।

ভোরে ঘুম ভাঙতেই চারপাশে আলাদা একটা ব্যস্ততা। মায়ের হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ, বাবার গোসলের শব্দ, পাড়ার মসজিদের মাইকের কোরআন তিলাওয়াত।

আমি লুঙ্গিটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম।

মনে হচ্ছিল এইটাই আমার ঈদের জামা।

পরে নিলাম।

মা আমার শার্টটা ধুয়ে ইস্ত্রি করে রেখেছেন। পুরোনো, কিন্তু পরিষ্কার।

আমি লুঙ্গি আর সেই পুরোনো শার্ট পরে বের হলাম।

রাস্তার পাশে ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে। কারও গায়ে নতুন প্যান্ট-শার্ট, কারও পাঞ্জাবি।

আমার দিকে কেউ তাকাল না।

আমি হেঁটে চললাম বাবার পাশে।

গ্রামের মসজিদের ঈদগা মাঠে গিয়ে দাঁড়ালাম।

নামাজের কাতারে দাঁড়িয়ে হঠাৎ আমার মনে হলো আমার লুঙ্গিটা খুব আলাদা না। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি, আরো অনেকের গায়েই নতুন জামা নেই। কারও গায়ে পুরোনো পাঞ্জাবি, কারও লুঙ্গি, কারও গেঞ্জি।

আমি এত দিন শুধু নিজের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।

নামাজ শেষে সবাই যখন কোলাকুলি করছে, বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।

খুব শক্ত করে।

বললেন

ঈদ মোবারক, বাবা।

আমি বাবার গায়ের ঘামের গন্ধে মুখ লুকালাম।

সেই মুহূর্তে হঠাৎ মনে হলো এই জড়িয়ে ধরাটার ভেতরেই আমার সবচেয়ে বড় নতুন কিছু আছে।

বাড়ি ফিরে মায়ের বানানো সেমাই খেলাম।

বোনটা নতুন ফিতায় চুল বেঁধে আমার সামনে এসে দাঁড়াল।

বলল

ভাইয়া, দেখ আজ খুব ভালো লাগছে।

আমি হেসে ফেললাম।

সেই হাসিটা তখন আমার নিজের কাছেই অচেনা লাগল।

দুপুরের দিকে পাশের বাড়ির কাকু এলেন। হাতে একটা ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগ।

মাকে বললেন

আমার ছেলেরটা ছোট হয়ে গেছে, ভাবলাম তোমার ছেলেটা পরতে পারবে।

মা ব্যাগটা খুলে দেখলেন একটা হালকা বাদামি রঙের শার্ট।

পুরোনো।

কিন্তু পরিষ্কার।

আমার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।

মা বললেন

আয় বাবা, পরে দেখ।

আমি শার্টটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম।

এই প্রথম ঈদের দিনে আমি নতুন না হলেও আরেকটা ভালো জামা পরলাম।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আমার মনে হলো লুঙ্গিটাই যেন আমার ঈদের সবচেয়ে বড় উপহার।

কারণ ওই লুঙ্গিটার ভাঁজের ভেতরে লুকিয়ে ছিল বাবার ক্লান্ত শরীর, মায়ের না বলা কষ্ট, আর আমাদের সংসারের নিরব লড়াই।

সেদিন বিকেলে আমি উঠানে বসে লুঙ্গিটা রোদে মেলে দিলাম।

রোদে কাপড় শুকোতে শুকোতে বাতাসে দুলছিল।

আমি তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিলাম

আমি তো শুধু একটা জামা চাইনি।

আমি চেয়েছিলাম অন্যদের মতো হতে।

কিন্তু আজ বুঝতে পারছিলাম, আমার ঈদটা আলাদা।

আমার ঈদের নাম একটা নতুন লুঙ্গি।

সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্য ডোবা দেখলাম।

মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট জীবনে কত না-পাওয়া জমে আছে। কিন্তু তার ভেতরেও এমন কিছু পাওয়া থাকে, যা কোনো দোকানের শোকেসে সাজানো থাকে না।

রাতে শুয়ে পড়ার আগে লুঙ্গিটা খুব যত্ন করে ভাঁজ করে বালিশের পাশে রাখলাম।

চোখ বন্ধ করতেই বাবার মুখটা মনে পড়ল কেমন লজ্জার মতো একটা হাসি নিয়ে বলছিলেন,

এইটাই পারলাম রে।

আজ এত বছর পরে বুঝি

সেই “এইটাই পারলাম”-এর ভেতরেই ছিল আমার বাবার পুরো ভালোবাসা।

ঈদ মানে নতুন জামা এই কথাটা হয়তো অনেকের জীবনে সত্যি।

কিন্তু আমার শৈশবে ঈদ মানে ছিল

একটা নতুন লুঙ্গি,

আর সেই লুঙ্গির ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে থাকা আমাদের পরিবারের নীরব, নিরলস, অবিনাশী ভালোবাসা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়