প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০৬
হৃদয়বতী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
বিশ.
রাত গভীর হচ্ছে। চেঙ্গিস একা দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে তাকিয়ে। তার ভেতরে একটা যুদ্ধ চলছে--সে কি সত্যিই পরিবর্তিত হতে পারে? অতীতে দিলশাহ যেভাবে বেরিয়ে এসেছিলো, সে কি পারবে? তার হাত শক্ত হয়ে উঠলো। সে একটানা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।
‘তালাশ কখনও বন্ধ করা যাবে না’, সে ফিসফিস করে বললো।
চেঙ্গিস প্রথমে তার নিজস্ব চিন্তার সঙ্গে লড়াই করলো। সে ভাবে সে কি সত্যিই বদলাতে চায়? তার অপরাধী বাহিনীর বিরুদ্ধে সে কি যেতে পারবে?
সে ধীরে ধীরে তার কালো গাড়িটাতে উঠে। তারপর ড্রাইভারকে বলে, ‘ওয়েস্ট শেরাটনে আমার বন্ধুরা অপেক্ষা করছে, সেখানে যাও।’
ড্রাইভার মোসলেম জানে সেখানে চেঙ্গিসের বাহিনী অপেক্ষা করছে। আজ রাতে সবাই মিলে ফূর্তি করবে। তারপর নেশায় ঢুলু ঢুলু হয়ে রাত দুই তিনটায় বাসায় ফিরবে। এগুলো তার নিয়মিত রুটিন হয়ে গেছে।
ফাইভস্টার হোটেল ওয়েস্ট শেরাটনে লবি দিয়ে ঠাস ঠাস আওয়াজে হেঁটে চলছে চেঙ্গিস। এ সময় নাদিরাকে সে দেখতে পেলো। নাদিরা তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরতে চাইলো। চেঙ্গিসের কঠিন চোয়ালের দিকে তাকিয়ে সে ভড়কে গেলো।
রুমে অপেক্ষা করছিলো তার সাথীরা। নাদিরাও চেঙ্গিসের পেছনে পেছনে ঢুকলো। চেঙ্গিসকে দেখেই তার বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড সুরেশ বড়ুয়া তাজিম করলো। তারপর বললো, বস নাদিরা তো পুরাণ হয়ে গেছে। এবার আপনার জন্যে নতুন একজন সাথী খুঁজছি।’
চেঙ্গিস বুঝতে পারে, তার বাহিনী এখন স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর হয়ে গেছে, যা তাকে ভাবিয়ে তুলছে। তাই সে সবাইকে বসতে বললো। নাদিরা প্রশ্ন করলো, ‘নতুন কেউ কি আসছে আমাদের দলে?’
চেঙ্গিস সরাসরি তার বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেয়, ‘এখানে আমি আর নেই, আমি বদলে গেছি!’
‘এটা কী করে সম্ভব?’ পাশের রুম থেকে একজন বেরিয়ে এলো। তার মুখ ঢাকা কালো কাপড়ে। সে কালো কাপড়ের ভেতর থেকে ক্রমাগত হাসছে।
এই হাসিটা চেঙ্গিসের কাছে নতুন মনে হলো না। মনে হলো সে এই হাসি দূরে কোথায়ও শুনেছে।
চেঙ্গিস তার বাহিনীর দিকে তাকিয়ে কালো কাপড়ে মুখঢাকা লোকটাকে প্রশ্ন করলো, ‘এই তুমি কি আমার সাথে মজা করছো?’
দ্রুতই চেঙ্গিসের বাহিনীর প্রত্যেকের হাতের রিভলবার ওপেন হলো, তারপর সেই রিভলবারগুলো চেঙ্গিসের দিকেই নিশানা করলো।
চেঙ্গিস হতভম্ভ হয়ে গেলো। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা লোকটি তার মুখ থেকে কালো কাপড়টা সরালো। তারপর হা হা করে হাসতে লাগলো।
‘জামশেদ। তুমি?’
জামশেদ মজা পেলো। সে বললো, ‘অবাক হয়ো না চেঙ্গিস। মালাকাল মউত সেদিন আমার রূহ কবজ করতে আসেনি। আমি শুধু ইমতিয়াজকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম। ইমতিয়াজ আমাকে হত্যা করেছে ভেবে এখন ফকির হয়ে মাজারে বসবাস করছে। সে ভেবেছে, বাকি জীবনটা এভাবেই পার করে দিবে কোনোরকম ঝঞ্ঝাট ছাড়াই। ঠিক না। আর তুমিও ঘোষণা দিলে ইমতিয়াজ তথা দিলশাহর মতো ভালো হয়ে যাবে। তাহলে তোমার বাহিনীর কী হবে?’
তাসপিয়া গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠলো। তারপর একটা চিৎকার করে উঠলো। বাবা নাদের শাহ সেই চিৎকারে তার রুমে এসে লাইট জ্বালালো। তারপর প্রশ্ন করলো, ‘কী হয়েছে মা?’
‘বাবা এখনই চলো দিলশাহর মাজারে। তার সামনে মহাবিপদ। আমার স্বপ্ন বলছে, তার মহাবিপদ। তাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতেই হবে।’
ইরফান ও অনন্যা পাশের রুমেই ছিলো। তারাও জেগে উঠলো। তারপর তাসপিয়ার রুমে এসে কথাগুলো শুনতে পেলো। ইরফান প্রশ্ন করলো, ‘কী হয়েছে তাসপিয়া, কিসের বিপদ?’
দম নিলো তাসপিয়া। তারপর বললো, ‘তুমি এখনই তুষার ভাইয়াকে কল করে আমাদের বাসায় আসতে বলো।
গভীর ঘুমে অচেতন ইমতিয়াজ ওরফে দিলশাহ। হঠাৎ করেই তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। কিন্তু এরপর আর ঘুম আসছেই না। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত ৪টা বাজে। ধীরে ধীরে ঘুম থেকে উঠলো, তারপর অজু করে তাজাজ্জুদ নামাজে দাঁড়িয়ে গেলো। নামাজ শেষে সে প্রার্থনা করলো, ‘হে আল্লাহ, আমার মৃত্যুটা যেনো সেজদারত অবস্থায় হয়। আর আমার জানা-অজানা সকল গুণাহ তুমি তোমার দয়ায় ক্ষমা করে দাও। জীবনে জেনে না জেনে অনেক পাপ করেছি, আজ আমি তোমার দরবারে ভিখারীর মতো হাত তুলেছি, আমি তওবা করছি--জীবনে আর গুনাহ করবো না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। ভালো হয়ে থাকার সুযোগ দাও।’
এ সময় হাসির আওয়াজ পাওয়া গেলো। ইমতিয়াজ মোনাজাত শেষ করে পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলো জামশেদ দাঁড়িয়ে আছে।
সে কিছুই হয়নি এমন ভাব করে তাকে প্রশ্ন করলো, ‘জামশেদ, তুমি বেঁচে আছো? ভালোই হয়েছে। আমি একটা খুনের দায় থেকে বেঁচে গেলাম।’ এ সময় চেঙ্গিসকে তার বাহিনী মুখ বেঁধে নিয়ে এলো।
‘এর কী দোষ, একে কেনো এখানে নিয়ে আসছো। আমার মনে হচ্ছে, লোকটা সত্যিই ভালো হতে চায়। তাকে ভালো হতে দাও।’
‘ভালো হওয়া এতো সহজ নয় ইমতিয়াজ। তুমি আমার বিশ্বস্ত লোক হয়েও আমার বুকে ছুরি মেরেছিলে। ভেবেছিলে আমি আত্মরক্ষার কোনো ব্যবস্থাই রাখিনি। তাই না? আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন মাফিয়া ডনকে মেরে ফেলা তোমার মতো বোকার কাজ নয়। বুঝতে পারছো?’
ইমতিয়াজ বুঝতে পারছে না, এতোগুলো ছুরিকাঘাত করে রক্তের বন্যা বইয়ে দেওয়ার পরও জামশেদ কীভাবে বেঁচে আছে? ভাবছে সে।
এ সময় হঠাৎ করেই ইরফান, তুষার ও নাদেরের আগমন সবাইকে চমকে দেয়। নাদের একাত্তরের রণাঙ্গনের সেই যুদ্ধবিদ্যা প্রয়োগ করলো। হাতের অস্ত্রটা জামশেদের দিকে তাক করে দ্রুত চেঙ্গিসের বাঁধন খুলে দিলো। সাথে সাথে সচকিত হয়ে উঠলো চেঙ্গিস। এক লহমায় দ্রুত নাদেরের অস্ত্রটা হাতে নিয়ে জামশেদের ঠিক কপাল বরাবর গুলি চালালো। তারপর এক এক করে তার অবিশ্বস্ত সহচরদের ভবলীলা সাঙ্গ করলো।
পাশে ইমতিয়াজ, ইরফান ও তুষার আহমেদ। এদের মাঝখানে চেঙ্গিস একা দাঁড়িয়ে থাকে, রক্তাক্ত কিন্তু দৃঢ়সংকল্প। সে নিজের ভেতরের যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। আর অপরাধী নয়, বরং নতুন এক যাত্রার পথে। সে এই গভীর রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের পরিণতির কথা ভাবছে।
জামশেদের রক্তাক্ত লাশটার দিকে তাকিয়ে ভাবছে, অহঙ্কার, অপরাধ আর আস্ফালন জীবনের কঠিন পরিণতি ঘটায়। একটা বুনো শুয়োর যতো বারই মরে, সে ততোবারই শুয়োরের মতোই মরে। আর বীর পুরুষ কখনোই হারে না, জীবনের শেষ সময়েও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
চেঙ্গিস রক্তাক্ত হাতে আবারও জামশেদের লাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা, চারপাশের বাতাসও যেন থমকে গেছে।
সে শ্বাস নেয়, যেন তার বুকে জমে থাকা সমস্ত গ্লানি বের করে দিচ্ছে।
‘এটাই শেষ’, চেঙ্গিস ফিসফিস করে বলে।
ইমতিয়াজ, ইরফান, তুষার আহমেদ তাকিয়ে আছে।
চেঙ্গিস ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যায়। রাতের অন্ধকারে সে একা, কিন্তু মুক্ত।
তার পেছনে অপরাধের ছায়া, সামনে নতুন জীবনের ডাক।
তার কপালে ঘাম, চোখে প্রশ্ন— সে কি সত্যিই বদলাতে পারবে?
কিন্তু সে আর পেছনে তাকায় না। তবুও চেঙ্গিস রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলো, আজ সে জিতেছে। কিন্তু সত্যিই কি শেষ হয়েছে সবকিছু?
পেছন থেকে হঠাৎ ইরফানের কণ্ঠ শুনতে পেলো, ‘তুমি কি ভেবেছো, জামশেদই শেষ শত্রু?’
চেঙ্গিস ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো, ‘তুমি কী বলতে চাচ্ছো?’
ইরফান কিছুটা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বললো, ‘এই যাত্রা সহজ হবে না, চেঙ্গিস। যারা বাহিনী হারিয়েছে, তারা এখন তোমার বিরুদ্ধে।’
চেঙ্গিস ঠোঁট কামড়ে ধরে। ‘তাহলে আমাকে আরও প্রস্তুত হতে হবে, সে বললো।
আকাশের অন্ধকারে তার চোখ জ্বলছিলো।
জামশেদের মৃতদেহের দিকে একবার শেষবার তাকিয়ে নেয়। তুষার আহমেদ ফিসফিস করে বলে, ‘তুমি সত্যিই বদলাতে পারবে?’
এ সময় নাদের, তাসফিয়া, রুবিনা, অনন্যা আসে। তাদেরকে দেখে চেঙ্গিস হাসে, এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে।
‘আমি জানি না, কিন্তু আমি চেষ্টা করবো। তবে নাদের গুণ্ডা যদি মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে নিজের জীবনটা পাল্টে দিতে পারে, আমিও তো মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, আমি কোনো পারবো না?’
ইমতিয়াজ নীরবে মাথা ঝাঁকায়। অন্ধকারে চেঙ্গিসের স্যালুয়েট মিলিয়ে যাচ্ছে, যেন নতুন এক অধ্যায় শুরু হচ্ছে। এ সময় তাসফিয়া এসে ইমতিয়াজকে বলে, ‘সবার মাঝেই যদি পরিবর্তন আসে, তাহলে আমি কেনো তোমাকে ভালোবেসে বাতাসে ভেসে যেতে পারবো না?’
তাসফিয়া ইমতিয়াজের দিকে তাকায়। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
‘তুমি কি জানো, সত্যিকারের পরিবর্তন ভালোবাসাকেও বদলে দেয়?’
ইমতিয়াজ হাসে, তবু তার চোখে প্রশ্ন।
তাসফিয়া বাতাসে হাত বাড়ায়, যেন কিছু ধরার চেষ্টা করছে।
রাত আরও ঘন হচ্ছে, চেঙ্গিস দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর ভালোবাসা? ভালোবাসার উত্তর হয়তো বাতাসেই রয়ে গেল।
নাদের সাহেব তাসফিয়ার হাত ধরে বলেন, ‘তাসফিয়া, ভালোবাসা শুধু অনুভূতির বিষয় নয়, এটি দায়িত্বও। ইমতিয়াজ যদি তোমার সত্যিকারের আশ্রয় হয়, তাহলে তার হাত শক্ত করে ধরো।’ এ কথা বলে তিনি ধীরে ধীরে তাসফিয়ার হাত ইমতিয়াজের হাতে তুলে দেন, যেন তাদের যাত্রা শুরু হয়।
তিনি পকেটে থেকে বের করে ইমতিয়াজকে একটি পুরনো ঘড়ি দেন, যা তার বাবার ছিলো।
তিনি ইমতিয়াজকে বললেন, ‘এটি শুধু সময় দেখানোর জন্যে নয়, বরং তোমার দায়িত্ব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে। তাসফিয়াকে মনের কুটিরে রেখে রক্ষা করো।’
এরপর নাদের সাহেব, ইরফান, তুষার আহমেদ, অনন্যা সবাই বাড়ি ফিরে গিয়ে একটি পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করলেন, যেখানে তাসফিয়া ও ইমতিয়াজ একসঙ্গে রয়েছে।
সন্ধ্যা, বাগানের আলো ঝলমল করছে। তিনি সবাইকে বলেন, ‘আজ থেকে তাসফিয়া ও ইমতিয়াজ একসঙ্গে, ভালোবাসায় বাঁধা। আমি আশীর্বাদ দিচ্ছি।’
নাদের সাহেব ইমতিয়াজকে একটি চূড়ান্ত প্রশ্ন করলেন, তিনি ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ভালোবাসা দায়িত্ব। তুমি কি তাসফিয়াকে সত্যিই আগলে রাখতে পারবে?’
ইমতিয়াজ এক মুহূর্ত থেমে যায়, তারপর দৃঢ়ভাবে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, আমি পারবো।’
এরপর নাদের সাহেব হাসেন, তাসফিয়ার হাত ইমতিয়াজের হাতে রাখেন।
নাদের সাহেব আর কোনো কথা না বলে, শুধু একটি মৃদু হাসি দিয়ে তাসফিয়ার হাত ইমতিয়াজের হাতে রেখে চলে যান।
তাসফিয়া ও ইমতিয়াজ একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, বাতাসে প্রেমের এক অদ্ভুত নীরবতা। (চ্লবে)





