প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৮
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(বাইশতম পর্ব)
দুহাজার পনের সালের জুলাই মাসের কোনো এক রাত। হতে পারে তা মাঝামাঝি কোনো এক কর্মদিবসের বুড়ো সন্ধ্যা। তরুণ রাতের শুরুতে চতুরঙ্গ ইলিশ উৎসবের রূপকার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক হারুন আল রশীদ ফোনে আমাকে খুঁজে পেলেন। তিনি ও কাজী শাহাদাত ভাইয়ের ঔদার্যে আমি চতুরঙ্গ ইলিশ উৎসবের একজন উপদেষ্টাও বটে। তাঁর আলাপের মূল বিষয় হলো সদ্য যোগ দেওয়া জেলা প্রশাসক জনাব আবদুস সবুর মন্ডল ইলিশ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার জন্যে কয়েকজনকে ডেকেছেন। আসন্ন জেলা প্রশাসক সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্যে তাঁর অগ্রাধিকারমূলক বিষয়বস্তু নির্ধারণকল্পে মতবিনিময় সভা। চতুরঙ্গ ইলিশ উৎসবের পক্ষে উপস্থিত থাকার জন্যে হারুন ভাই যে কয়জন মানুষের নাম প্রস্তাব করেছেন, তাদের মধ্যে আমি একজন। হারুন ভাইয়ের ফোনের ভিত্তিতে আমি ঘরে ফেরা মানুষ আবারও ঘরের বের হলাম। রিকশায় যেতে যেতে আমার কী ভূমিকা বা কী করণীয় তা ভেবে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। আমরা তখন স্টেডিয়াম রোডে প্রকৌশলী জয়নাল আবেদীন সাহেবের বাসায় থাকতাম। দ্বিতীয় তলায়। বাড়ির নাম শিউলি ভিলা। বাড়ির প্রাঙ্গণ আমি ও আমার পত্নীর বেশ পছন্দ ছিলো কেবল পুষ্প সমারোহের জন্যে। ব্যস্ত শহরের দামি এলাকায় পুষ্পোদ্যানের জন্যে এতোবড় উঠোন ছেড়ে দেওয়া গভীর রুচিবোধ আর সৌন্দর্য চেতনার বিষয়। এ অবসরে শিউলি ভিলার প্রতি আমাদের প্রেমের একটু বর্ণনা তাই না দিলেই নয়। জয়নাল সাহেব একজন রোটারিয়ান বিধায় তার সাথে আমার সহজ পরিচয় গড়ে উঠলো। তিনি অবশ্য কাজী শাহাদাত ভাইয়ের ভক্ত। সকালের সূর্যকে মনে হয় তিনি জেগেই আহ্বান করেন। প্রতি ভোরে, কি শীত কি গ্রীষ্মে, তিনি নজরুলের জাগরণী খোকার মতো জেগে ফুলগুলোর যত্ন নিতেন। পানিসেচ, মাটি খুঁড়ে আলগা করে তাতে বাতাসের প্রবেশ্যতা তৈরি, ডালপালা ছাঁটানো, ঘেরাবেড়া দেওয়া প্রভৃতি সমুদয় কাজ তিনি করতেন। মাঝে মাঝে সকাল আটটায় ঘুম থেকে জেগে দুই পুত্রের হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার সময় দরোজার সামনে রেখে যাওয়া তার সতেজ লকলকে ডাঁটা কিংবা সুস্মিতা লিলিফুল আমাদের ভোরের সম্ভাষণ জানাতো। তাঁর পত্নীর মমতা আমাদের দুতলার ঘরে তিনতলা হতে সহজেই প্রবহমান ছিলো। তাঁর দুমেয়ে। শিউলি ও ডালিয়া। শিউলির নামে বাড়ির নাম। তাই ঢুকতেই একটা শিউলি গাছ অভ্যাগতকে অভ্যর্থনা জানাতো। এই শিউলি গাছের একটা বিশেষত্ব ছিলো। এটার ফুল শরতে নয়, ফুটতো হেমন্তে। এটা নিয়ে আমার একটা কবিতাও আছে, ' সে আসে হেমন্তে ' শিরোনামে। অবশ্য 'শিউলি ভিলা' শিরোনামেও আমার একটা কবিতা লেখা হয়ে গেছে তার আগে। স্কুলে দিয়ে আসার পথে হাঁটু ভেঙ্গে বসে ঝরা শিউলি কুড়োতে কুড়োতে দুহাত ভরে যেতো। সেই শিউলির কিছু পেতেন বুদ্ধ, শ্রদ্ধার নৈবেদ্য রূপে। আর কিছু যেতো পত্নীর হাতে, জলপাত্রে রেখে তার সৌরভের ভাগ নিতেন তিনি। শিউলির সাদা-কমলার যুগলবন্দি আমার কাছে নিষ্পাপ আর শৈল্পিক মনে হয়। তাই তাকে ঘরে সতেজ রাখার প্রয়াসকে আমিও সহযোগিতা করতাম। নিচতলার বৌদিরাও শিউলি নিতেন। তবে আমার মতো কুড়িয়ে ঝরা ফুল নয়। তারা নিতেন গাছ ঝাঁকিয়ে। মাসী কুড়োনো ফুল দিয়ে দেবদ্বিজে পুজো দিতেন না। জয়নাল সাহেবের ঋতুভিত্তিক ফুলের প্রতি অনীহাহেতু নিজের ছোটমেয়ের নাম ডালিয়া হলেও ডালিয়া সবসময় তার বাগানে থাকতো না। তবে আমরা থাকাকালীন আমাদের বারান্দায় ডালিয়াকে পেলে-পুষে বড় করেছিলাম। সে বড়োজোর তিনমাস ছিলো। তারপর ফাগুন শেষে বৈশাখের রুদ্রতাপে ডালিয়া নাই হয়ে গেল। শিউলি ভিলার গর্বিত সদস্য ছিলো পটপটি। বেগনি আর সাদা রঙের দুরকম পটপটি ফুল এখানে সেখানে ছড়িয়েছিলো অনাদর অবহেলায়। প্রাঙ্গণে প্রবেশের সদর দরোজার ডানে ছিলো ফুরুশ ফুলের গাছ। দুটো ফুরুশ ছিলো। একটা বেগনি বা জারুলের রং। আরেকটা তুষার শুভ্র। থোকা থোকা ফুলগুলোর কোথায় যেন বনেদীয়ানা ছিল। বামপাশে ছিলো মধুমঞ্জরি আর অলকানন্দা। হলুদ অলকানন্দাগুলো ট্রাম্পেটের মতো। সদা যেন বিজয় ভেরি বাজানোর ঢঙে উদ্ধত। মধুমঞ্জরি ফুটতো সন্ধ্যায়। রাতের সূচনায় যখন ঘরে ফিরতাম তখন সদ্য প্রস্ফুটিত মধুমঞ্জরির ঘ্রাণে পরাজিত হতো ফরাসী সৌরভ। মধুমঞ্জরির পাশে চুপ করে ছিলো ব্লু-বেল বা নীলকণ্ঠ। বাগান বিলাস ছিলো না শিউলি ভিলায়। ছিলো বেশ কয়েক পদের রঙ্গন। প্রেমনলিনীর বাড় বাড়ন্ত ছিলো। মে মাস আসলেই চোখে পড়তো মে বল। মনে হতো লাল রঙে চুবানো শন পাপড়ির বল। ভবনের গা বেয়ে বেলি উঠেছিলো তিনতলা অব্দি। বর্ষার সাথে তার ছিলো নিবিড় সখ্য। শিউলি ভিলাতে এসে মাধবী লতা আর মধুমঞ্জরির ভুল ভাঙে আমার। তেজপাতার মতো পাতা ছিলো মাধবী লতার। জয়নাল সাহেবের বাগানে আমরা দিয়েছিলাম দোলন চাঁপা আর পাঁচ পাপড়ির বড়ো টগর। জবার তেমন রকমফের ছিলো না। তবে রক্তজবা ছিলো আর ছিলো ঝুমকো জবা। কাটা কাটা নকশার ঝুমকো জবারা ঝুলে ঝুলে দুলে দুলে বাতাসকে ঘুম পাড়াতো। শিউলি ভিলার মাধবী লতার গাছ দেখে আমার মনে আসে 'লুই পা-র কলম' নামে এক কিশোর গল্পের প্লট। মাধবী লতার গাছের গোড়ায় মীননাথ ওরফে লুই পা' একটা কলম মাটিচাপা দিয়ে জমা রেখে গিয়েছিলো। এটাই ছিলো গল্পের মূল। ড্রাগন ফুলও ছিলো শিউলি ভিলায়। একবার এরকম একটা ফুল আমাদের বারান্দায় বেশ কিছুদিন প্রস্ফুটিত ছিলো। লাল-হলুদ-ম্যাজেন্টায় ফুলগুলো বর্ণিল ছিলো চীনা ড্রাগনের মতো জীবন্ত হয়ে।
শিউলি ভিলা হতে রিকশায় ডিসি বাংলোতে যেতে তখন কুড়ি টাকা নিতো। যেতে লেগেছে মিনিট দশেক। পথে পড়তো ডিএন স্কুল, কদমতলা, বেগম মসজিদের মতো ইতিহাসঋদ্ধ স্থাপনাগুলো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ছোঁয়া বঞ্চিত এক মহান মানুষ দ্বারকা নাথ। তাঁরই দানকৃত ভূমিতে গড়ে উঠেছে মানুষ গড়ার আলোকিত প্রতিষ্ঠান ডি. এন. ( দ্বারকা নাথ) উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কেউ বুয়েটের উপাচার্য, কেউ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, কেউ নামজাদা ডাক্তার আর কেউ অনুকরণীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্নকে গন্তব্যে নিয়ে গেছেন। ডি. এন. স্কুল হয়ে কদমতলার কাছে আসলে মনে পড়ে চাঁদপুরের গান্ধী নামে খ্যাত হরদয়াল নাগকে। তাঁর বাড়ি ও পুকুর ছিলো এ এলাকায়। মতলবের মানুষ হরদয়াল নাগ মহাত্মা গান্ধীর খুব কাছের মানুষ ছিলেন। উনিশশো একুশ সালের কুড়ি মে তারিখে চাঁদপুরে আসামের চা বাগান ফেরত কুলিদের ওপর যে নির্যাতন হয়েছিলো তার প্রতিবাদকারী সংগঠকদের একজন ছিলেন উকিল হরদয়াল নাগ। বারো টাকার বদৌলতে হরদয়াল নাগ কবি কাজী নজরুলের জীবনের সাথে ব্র্যাকেটবন্দি হয়ে গেলেন। ঘটনা হলো এই, আলী আকবর খানের চতুরতায় ঊনিশশো একুশ সালের সতের জুনে তার ভাগ্নি নার্গিস আসার খানমের ( ওরফে সৈয়দুন্নেছা) সাথে নজরুলের বিবাহ হয়। কিন্তু নজরুল কিছু অসঙ্গত শর্তে রাজি না হওয়ায় সে বিয়ে পূর্ণতা পায়নি। ফলে তিনি বিয়ের রাতেই নৌকাযোগে পালিয়ে দৌলতপুর হতে কুমিল্লা কান্দির পাড়ে এসে বিরজা সুন্দরীর কাছে আশ্রয় নেন। এ সময় তাঁর বন্ধু মুজফ্ফর আহমদ কুমিল্লা এসে তাঁকে কোলকাতায় নিয়ে যান। নজরুল বন্ধু মুজফ্ফর আহমদসহ কুমিল্লা হতে চাঁদপুর হয়ে কোলকাতা যাওয়ার পথে আটকে পড়েছিলেন রেল আর স্টিমার শ্রমিকদের ধর্মঘটে। এ ধর্মঘট ছিলো আসামের চা বাগানের কুলিদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে। সময়টা ছিলো ঊনিশশো একুশ সালের আট জুলাই। থার্ড ক্লাসের টিকিট না পাওয়ায় তাঁদের প্রথম শ্রেণির টিকেট নিতে হয়েছিলো। কিন্তু এই টিকেট ক্রয়ের পয়সা তাঁদের পকেটে ছিলো না। তাই কোলকাতা-কুমিল্লার আফজাল-আশরাফ হয়ে কবি কাজী নজরুলের টেলিগ্রামের বার্তাসংশ্লিষ্ট অনুরোধ এসে পৌঁছায় চাঁদপুরের গান্ধী হরদয়াল নাগের কাছে। তিনি কুলদাপ্রসাদ রায়কে দিয়ে বারো টাকা ডাকবাংলোয় অবস্থানকারী নজরুলের কাছে পাঠান। হরদয়াল নাগের কদমতলা পার হয়ে আসতে আসতে সামনে পড়ে বেগম মসজিদ। মসজিদের সাথে বেগম নামের সংশ্লিষ্টতাও এই হরদয়াল নাগের কারণে। তাঁর সাথে নবাব সলিমুল্লাহর সখ্য ছিলো বেশ। তাঁর বাড়িতে নবাবপত্নী বেড়াতে এলে নামাজের জায়গা ছিলো না। তাই হরদয়াল নাগ তাঁর ভগ্নিতুল্য নবাবের বেগমের জন্যে নিজ উদ্যোগে স্থাপন করেন এ মসজিদ। তিনি নবাবের বেগমের নামে এটার নাম দিলেন বেগম মসজিদ। হরদয়াল নাগ নিজে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সম্পাদক ছিলেন। বেগম মসজিদের পাশ দিয়ে বহমান সড়কটির নাম জে এম সেনগুপ্ত রোড। চাঁদপুরে কুলিহত্যার ঘটনার বিরুদ্ধে তথা কুলিদের 'ম্ল্লুুক চলো' আন্দোলনের পক্ষের একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নেতা ছিলেন যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত। তাঁর বাবা ঐতিহাসিক যাত্রামোহন সেনগুপ্তের ( জে. এম.সেনগুপ্ত) মতে চাঁদপুরের নামকরণ হয়েছে বার ভূঁইয়ার একজন, বিক্রমপুরের জমিদার চাঁদ রায়ের নামে। রিকশায় যেতে যেতে একসময় এসবি খাল পার হতে হয় কালভার্টের ওপর দিয়ে। এই এসবি খাল আগে যৌবনা ছিলো। তার বুকে সে টেনে আনতো নায়রী নৌকাগুলো। মেঘনা-ডাকাতিয়া হয়ে এই খাল দিয়েই পৌর নাগরিকরা শহরে ঢুকে পৌঁছে যেত বাড়িতে। এখন যত্নের অভাবে তাতে জমেছে ময়লা, দুর্গন্ধে তা হয়েছে জীর্ণ। তবে খালের পাড়ে কালভার্টের অনতিদূরে জে.এম.সেনগুপ্ত সড়কে একটা শিউলি গাছ এবং একটা বকুল ফুলের গাছ আছে, যেটাতে তৎকালীন মেয়রের নির্দেশে পৌরসভার পক্ষ থেকে পানি দেওয়া হতো। কালভার্ট পেরিয়ে মুখার্জি সড়ক হয়ে মুখার্জি ঘাটলার সামনে আসি। এই মুখার্জি ঘাটলায় একসময় বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নৌকা হতে অবতরণ করে শহরে চাঁদপুর সরকারি কলেজে ঢুকেছিলেন। তিনি লঞ্চযোগে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে এসে অতঃপর নৌকায় চড়ে মুখার্জি ঘাটলায় নামেন। এখানে এখন দুর্গা পূজার প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। মুখার্জি ঘাটলাকে পার হয়ে কিছুদূর গেলেই সামনে পড়ে ডিসি বাংলো। তার উল্টোদিকে চাঁদপুর প্রেসক্লাব ভবন। এই সড়কটি বর্তমানে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক নামে পরিচিত। এটার পেছনেও কাজী শাহাদাতের মুখ্য ভূমিকা ছিলো। তিনি জাতীয় অধ্যাপক, মতলবের কৃতী সন্তান ড. রফিকুল ইসলামের লেখা বই ও বক্তব্য হতে জ্ঞাত হয়ে লেডি প্রতিমা মিত্র স্কুলের সামনে দিয়ে আসা স্ট্র্যান্ড রোডকে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক নামে নামকরণের প্রস্তাব করেন। কেননা, কাজী নজরুল একরাতের জন্যে তৎকালীন যে ডাকবাংলোতে ছিলেন তা ছিলো আজকের লেডি প্রতিমা মিত্র স্কুলের জায়গার ওপরে। তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে চাঁদপুর পৌরসভার তৎকালীন মেয়র জনাব নাসিরউদ্দিন আহমেদ এ সড়কটিকে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক নামে নামকরণ করেন।
জেলা প্রশাসকের ডাক বাংলোর সামনের সড়কটির গায়ে সাদা ও ঘোলাটে রঙের ছোপ ছোপ দাগ দিনের বেলায় সহজেই চোখে পড়ে। অনেকটা আল্পনার মতো। এ আল্পনা হলো নদী হতে মাছ খাওয়া বকদের মলের ফসল। জেলা প্রশাসকের বাংলোতে যে গাছ আছে তাতে দিনমান বকেরা বিশ্রাম করে। তাদের স্নেহাশিস্ কখনো কখনো রিকশাযাত্রী বা পথচারীর মাথায় পড়ে তাদের জীবনকে ধন্য করে। বাংলোর সামনে রিকশা ছেড়ে দিয়ে ঢুকলাম ভিতরে। গেটের ডানপাশে একটা নাগলিঙ্গম ফুলের গাছ আছে। বেশ বড়ো। সারা চাঁদপুরে মনে হয় এ রকম তিনটি গাছ আছে। একটা হলো চাঁদপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমে, একটা জেলা প্রশাসকের বাংলোতে এবং আরেকটা মতলবে। রামকৃষ্ণ আশ্রমের গাছটা মতলবেরটার ছানা আর জেলা প্রশাসকের বাংলোরটা রামকৃষ্ণ আশ্রমের গাছের ছানা। এই নাগলিঙ্গম ফুল নিয়ে বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে, পরবর্তী বুদ্ধ তথা আর্যমৈত্রেয় বুদ্ধ এ গাছের তলায় বসে ধ্যানশেষে বোধি বা আলোকনপ্রাপ্ত হবেন। জেলা প্রশাসকের বাংলোয় ঢুকে আরও কয়েকজনকে দেখতে পেলাম। এর মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিক, কাজী শাহাদাত ভাই, আমি, পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষসহ জেলা কালেক্টরেটের কর্মকর্তাবৃন্দ। ছিলেন ইলিশ বিজ্ঞানী ড. আনিসুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) লুৎফর রহমান প্রমুখ। নতুন যোগদানকারী জেলা প্রশাসক মহোদয় চাঁদপুরের ইলিশের পাশাপাশি সম্মেলনে দুমিনিটের বক্তব্যে উপস্থাপনযোগ্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোকপাত করেন। সংক্ষিপ্ত আলোচনা হতে বুঝলাম, এটা মূলত চাঁদপুর জেলাকে ব্র্যান্ডিং করার প্রথম বৈঠক। আমরা তাঁর দুমিনিটের একটা বক্তব্যের সংক্ষিপ্তসার তৈরি করে দিলাম যা পরবর্তীতে এক মিনিটের মধ্যে আনার জন্যে আরও কয়েকবার প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্তৃক পরিমার্জিত হয়।
জুলাই মাসে জেলা প্রশাসক সম্মেলন থেকে আসার পরে আগস্ট মাস থেকে শুরু হয় জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের কার্যক্রম। জেলা ব্র্যান্ডিং ধারণাটি তখনও বায়বীয়। এটাকে দৃশ্যমান করাটা বাস্তবেই কঠিন। 'এক জেলা এক পণ্য' এই প্রতিপাদ্যকে মাথায় রেখে ঐ পণ্যকে কেন্দ্র করে পুরো জেলার সামগ্রিক উন্নয়নের প্লাটফর্ম তৈরি করাই ছিলো জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে দেশের চৌষট্টিটি জেলা ব্র্যান্ডিং হয়ে গেলে আল্টিমেটলি পুরো বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের একটা মূল কমিটি তৈরি হলো। কমিটি প্রতি শনিবার বিকেল তিনটায় মিটিংয়ে মিলিত হতো। এতে সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, তরুণ উদ্যোক্তা, সংগঠক, প্রশাসনের অনেকেই অন্তর্ভুক্ত হলেন। জেলা প্রশাসক মহোদয় সাংবাদিক সমাজকে নিয়ে বসে ধারণাটিকে সঞ্চারিত করেন। পত্রিকার সম্পাদকেরা সবাই একমত হলেন, তারা নিজ নিজ পত্রিকার হেডিংয়ের বাম পাশে জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের লোগো প্রকাশ করবেন। সেই মোতাবেক জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের লোগো তৈরি করা হলো। এতে দুটো ইলিশ মাছ যেন নদীর নীলাভ জলে বিচরণ শেষে আপন কুক্ষিতে ফিরছে। একটা ট্যাগলাইন তৈরি করা হলো। বাংলায় একে বলা হলো, ' ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর' আর ইংরেজিতে বলা হলো, 'ঈযধহফঢ়ঁৎ, ঞযব ঈরঃু ঙভ ঐরষংযধ.' লোগো তৈরি করলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রকর, স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকজয়ী ব্যক্তিত্ব জনাব হাশেম খান। উল্লেখ্য, তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের সাথে বাংলাদেশের সংবিধানের নকশা তৈরি করেন এবং এককভাবে বাংলাদেশের ছয়ঋতুর আদলে ছয়দফার পোস্টার ও শেখ মুজিবুর রহমানের জনসভার ব্যাকড্রপ তৈরি করেন। জেলা ব্র্যান্ডিং-এর ওপর জনসাধারণের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার জন্যে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের পরিকল্পনায় কাজী শাহাদাত ভাই তাঁর পত্রিকা ' দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ'-তে একটি বড় উপসম্পাদকীয় লেখা প্রকাশ করেন। লেখাটি খুবই কার্যকর ছিলো। (চলবে)