শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০৪:২৩

সেলুলয়েডের জীবনদর্শন (২য় পর্ব) ​

মেধার দেওয়াল বনাম মানবিক দায়বদ্ধতা!

-----------ব্যর্থতার দায় কি শুধুই শিক্ষার্থীর?

অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন

​সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, বরং জীবনের এক গভীর প্রতিফলন। রূপালি পর্দার কোনো বিশেষ দৃশ্য বা সংলাপ কখনো কখনো আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো দর্শনের জন্ম দেয়। সেইসব কালজয়ী সিনেমার অনুপ্রেরণামূলক অংশ থেকে জীবনের পাঠ খুঁজে নিতেই আমাদের এই নিয়মিত আয়োজন— 'সেলুলয়েডের জীবনদর্শন'।

​ভূমিকা: শিক্ষার মূল সংকট ও সেলুলয়েড বার্তা

​আধুনিক সভ্যতা শিক্ষার সংজ্ঞাকে ক্রমেই সংকীর্ণ করে আনছে। শিক্ষা আজ কেবল ভালো ফলাফল, জিপিএ-৫ আর একটি উজ্জ্বল ক্যারিয়ার গড়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই ইঁদুর দৌড়ের ভিড়ে আমরা কি হারিয়ে ফেলছি না শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য? সম্প্রতি একটি সিনেমার খণ্ডচিত্র আমাদের সামনে এক রূঢ় বাস্তবতা এবং নৈতিক সংকট এর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ‘নাম’ বা ‘সাফল্য’ ধরে রাখতে গিয়ে নির্বিচারে শিক্ষার্থীদের ঝরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই দৃশ্যটি কেবল একটি কাল্পনিক চিত্রনাট্য নয়, বরং আমাদের ঘুণে ধরা শিক্ষা ব্যবস্থার এক নগ্ন প্রতিফলন।

​প্রেক্ষাপট: সংখ্যার লড়াই বনাম জীবনের গল্প

​ভিডিওর দৃশ্যপটে আমরা দেখি একজন আদর্শিক প্রধান শিক্ষিকা বা শিক্ষা প্রশাসক যখন স্কুলের অতীত রেকর্ড যাচাই করেন, তখন বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ তথ্য। গত বছর নবম শ্রেণিতে ৮২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি বিশাল অংশকে ‘ফেল’ করানো হয়েছে। কেন? কারণ দশম শ্রেণিতে যেন তারা ভালো রেজাল্ট করে স্কুলের মান বজায় রাখতে পারে। অথচ এর বিপরীতে ফলাফল কী দাঁড়িয়েছে? ৫৪ জন শিক্ষার্থী চিরতরে স্কুল ছেড়ে দিয়েছে।

​এই ৫৪ জন কি কেবল সংখ্যা? না, এরা ৫৪টি জীবন। এই জীবনের স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎকে একটি প্রতিষ্ঠানের তথাকথিত সুনাম রক্ষার্থে বলি দেওয়া হয়েছে। এখানেই জন্ম নেয় প্রশ্ন— আমরা কি মানুষ গড়ার কারিগর হচ্ছি, নাকি কেবল ভালো গ্রেড উৎপাদনের কারখানা চালাচ্ছি?

​শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও নৈতিক ধস

​বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি স্কুল চায় তাদের শতভাগ পাস বা ভালো গ্রেডের রেকর্ড থাকুক। এই রেকর্ডের পেছনে ছুটতে গিয়ে তারা ভুলে যায় যে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা ও গ্রহণের ক্ষমতা এক নয়। যে শিক্ষার্থী পিছিয়ে আছে, তাকে টেনে তোলা যেখানে শিক্ষকের প্রধান ধর্ম হওয়ার কথা, সেখানে তাকে ‘অযোগ্য’ বলে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে।

​ভিডিওতে শিক্ষিকার সেই অমোঘ সংলাপটি স্মরণীয়— "আপনারা কি জানেন এই বাচ্চাগুলো এখন কী করছে? এদের মধ্যে কেউ হয়তো আজ দিনমজুর, কেউ বা অপরাধী।" এটি একটি অমোঘ সত্য। যখন একটি স্কুল থেকে একজন ছাত্রকে বের করে দেওয়া হয়, তখন সমাজ তাকে গ্রহণ করে না। হতাশা আর অবজ্ঞা তাকে ঠেলে দেয় অন্ধকারের দিকে। তাহলে কি আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজ অপরাধী বা অদক্ষ শ্রমিক তৈরির কারখানায় রূপান্তরিত হচ্ছে?

​প্রকৃত শিক্ষকতা: মুমূর্ষু প্রাণের সঞ্জীবনী

​প্রকৃত শিক্ষক কে? ভিডিওর একটি সংলাপ আমাদের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দর্শন শিক্ষা দেয়: "সুস্থ মানুষের জন্য চিকিৎসকের প্রয়োজন হয় না, চিকিৎসকের সার্থকতা অসুস্থকে সুস্থ করে তোলায়।" চিকিৎসা বিজ্ঞানে যেমন একজন মৃতপ্রায় রোগীকে বাঁচিয়ে তোলা চিকিৎসকের পরম সার্থকতা, শিক্ষকতার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। যে ছাত্রটি এমনিতেই মেধাবী, তাকে পড়ানো একজন শিক্ষকের জন্য যান্ত্রিক কাজ মাত্র। কিন্তু যে ছাত্রটি বুঝতে পারছে না, যার মেধা অবিকশিত, যে পরিস্থিতির শিকার হয়ে পিছিয়ে পড়েছে— তাকে আলোর পথ দেখানোই হলো প্রকৃত শিক্ষকতা।

​যদি আমরা কেবল স্মার্ট এবং মেধাবী ছাত্রদেরই পড়াই, তবে শিক্ষক হিসেবে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব কোথায়? শিক্ষার মূল নির্যাস হলো রূপান্তর। একজন অযোগ্য বা অবাধ্য ছাত্রকে সুযোগ দিয়ে তাকে যোগ্য করে গড়ে তোলাই হলো শিক্ষকতার চরম পরাকাষ্ঠা।

​ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রতিবাদ

​ভিডিওতে আমরা দেখি, আমলাতান্ত্রিক দোহাই দিয়ে বলা হচ্ছে— ওপর মহলের কর্তারা বা শিক্ষা কর্মকর্তারা এই ফলাফলে স্বাক্ষর করেছেন। এটি ব্যবস্থার এক বিশাল ত্রুটি। শিক্ষা যখন কেবল ফাইলে আর সিগনেচারে বন্দি হয়ে যায়, তখন সেখানে মানবিকতা বিদায় নেয়। ওই শিক্ষিকা যখন সমস্ত দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং বলেন, "আমি এই ৮২ জন বাচ্চার দায়িত্ব নিলাম," তখন সেখানে ফুটে ওঠে এক বিরল সাহস। এই সাহসই আজ আমাদের সমাজে বড় অভাব।

​শিক্ষককে হতে হবে আপসহীন। তিনি কেবল ব্যবস্থার দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। যখন একজন শিক্ষক ব্যক্তিগত নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তখনই সমাজ পরিবর্তনের নতুন পথ উন্মোচিত হয়।

​ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়

​একবার ভেবে দেখুন, যে ছেলেটি বা মেয়েটি নবম শ্রেণিতে ‘অযোগ্য’ তকমা নিয়ে স্কুল থেকে বিদায় নিল, তার মনের অবস্থা কী? সে তার সহপাঠীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তার পরিবার তাকে বোঝা মনে করতে শুরু করল। এই মানসিক ট্রমা তাকে সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু বানিয়ে দিতে পারে।

​প্রতিটি শিক্ষার্থী একটি সম্ভাবনা। কোনো কারখানার ছাঁটাই হওয়া মালের মতো তাদের ফেলে দেওয়ার অধিকার কারো নেই। উচ্চ শিক্ষা বা দশম শ্রেণির ভালো ফলের নেশায় আমরা কি একটি সুস্থ প্রজন্মের বলি দিচ্ছি না? নবম শ্রেণিতে ফেল করার বিষয়টি যতটা না শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা

​সেলুলয়েডের পাঠ ও আমাদের করণীয়

​সেলুলয়েডের এই দৃশ্যটি আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমাদের চারপাশে এমন হাজারো শিক্ষার্থী প্রতিদিন নিভৃতে ঝরে পড়ছে। আমরা কি তাদের হাত ধরতে পারছি? আমরা কি কেবল প্রথম সারির ছাত্রদের নিয়ে গর্ব করব, নাকি শেষ সারির ছাত্রটিকে নিয়ে মঞ্চে ওঠার স্বপ্ন দেখব?

​একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ছাত্রদের ভালোবাসা এবং তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। গ্রেড আর ফলাফলের উর্ধ্বে উঠে আমাদের তাকাতে হবে মানুষের দিকে। সমাজ ও রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে— শিক্ষা কোনো ব্যবসায়িক পণ্য নয়, এটি একটি অধিকার। আর এই অধিকার রক্ষার অগ্রসেনানী হলেন শিক্ষক।

​জীবনদর্শন: মনে রাখতে হবে, পৃথিবী কেবল সেরাদের জন্য নয়, পৃথিবী সবার জন্য। আর যারা পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য ভালোবাসা আর সুযোগই হলো এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র জ্বালানি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেওয়াল যেন কোনো শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিবন্ধকতা না হয়, বরং তা যেন হয় এমন এক আকাশ যেখানে ডানা ভেঙে যাওয়া পাখিটিও আবার উড়তে শিখবে।

​পরিশেষ: 'সেলুলয়েডের জীবনদর্শন' আমাদের এটাই শেখায় যে, পর্দা ও বাস্তবের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে পারে কেবল আমাদের সদিচ্ছা। আগামী পর্বে আমরা সিনেমার আরও এক কালজয়ী দৃশ্য নিয়ে হাজির হবো, যা আমাদের জীবনের গভীর সত্যকে উন্মোচন করবে। ততক্ষণ পর্যন্ত, আসুন আমরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাঝেই এক একজন আগামীর সফল মানুষের ছায়া খুঁজি।

​অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন, সিনিয়র সাব-এডিটর ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।

ডিসিকে / এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়