শনিবার, ০৯ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ০৮:৩৬

বেঞ্চ, বন্ধু আর ফেলে আসা কৈশোর

মাহমুদ হাসান সজীব
বেঞ্চ, বন্ধু আর ফেলে আসা কৈশোর

কখন যে স্কুলজীবন শেষ হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি! আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয় জীবনের সবচেয়ে নির্ভেজাল সময়টা রয়ে গেছে শাহতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই চেনা আঙিনায়। তখন বুঝিনি, একদিন এই দিনগুলোই স্মৃতি হয়ে কেবল চোখ ভেজাবে।

গ্রামের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা শাহতলী উচ্চ বিদ্যালয়টা শুধু একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না ওটা ছিল আমাদের শৈশব আর কৈশোরের সবচেয়ে আপন আশ্রয়। লালচে মাটির উঠোন, পুরোনো ভবনের দেয়াল, আর তার পেছনের সেই নিরিবিলি জায়গাটাÑআজও মনে পড়লে বুকের ভেতর হালকা একটা কাঁপন ওঠে। স্কুলের পাশের মাছের হ্যাচারি বাগানটা ছিল আমাদের গোপন আড্ডাখানা। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সেখানে বসে থাকা, গল্প করা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অযথা স্বপ্ন বোনা সেই মুহূর্তগুলো এখন স্বপ্নের মতো মনে হয়।

সকালের সমাবেশে দাঁড়িয়ে রোদে পুড়তে পুড়তে জাতীয় সংগীত গাওয়া, তারপর ক্লাসে ঢুকে বেঞ্চে বসা এই ছিল আমাদের প্রতিদিনের রুটিন। বেঞ্চগুলো ছিল শক্ত, কিন্তু বন্ধুত্বগুলো ছিল নরম। সেখানেই তো আব্দুর রহমানের সঙ্গে টিফিন ভাগাভাগি করে খাওয়া। কারো কাছে বিস্কুট, কারো কাছে শুকনো রুটিÑকিন্তু ভাগ করে খাওয়ার আনন্দটাই ছিল আলাদা। আজ এত রকম খাবারের ভিড়েও সেই স্বাদ আর ফিরে আসে না।

আর এমরান ওর সঙ্গে আড্ডাবাজির কথা মনে পড়লে আজও হাসি পায়। ক্লাসে বসে অযথা গল্প, পরীক্ষার আগের দিন “কিছুই পড়িনি” বলা, আর পরদিন হলে গিয়ে মাথা চুলকানো সবই ছিল আমাদের দৈনন্দিন নাটক। তখন জীবনটাকে এত সহজ মনে হতো। ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না, ছিল শুধু আজকের দিনটা কীভাবে কাটবে সেই ভাবনা।

শিক্ষকদের কথা মনে পড়লেই মনটা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে আসে। ইবনে মাসুদ স্যার ক্লাসে ঢুকলেই একটা আলাদা সম্মান তৈরি হতো। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল মায়া। আজ বুঝি, সেই কঠিন শাসনের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল আমাদের ভালো মানুষ বানানোর চেষ্টা। আর শুক্কুর স্যারের মার আহা! তখন রাগ লাগত, অভিমান হতো। আজ মনে হয়, সেই মারগুলোর মধ্যেই ছিল সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

স্কুলের পুরোনো ভবনের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিকেলগুলো আজও চোখে ভাসে। ক্লাস শেষ, কিন্তু কেউ বাড়ি যেতে চায় না। কেউ গল্প করছে, কেউ হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কেউ আবার চুপচাপ দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। তখন জানতাম না, একদিন এই বিকেলগুলোই সবচেয়ে বেশি কাঁদাবে।

আজ আমরা সবাই আলাদা। কেউ শহরে, কেউ দূরে, কেউ নিজের জীবনের যুদ্ধে ব্যস্ত। শাহতলী স্কুলটা হয়তো আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু আমরা আর আগের মতো নেই। বেঞ্চগুলো হয়তো বদলে গেছে, মাঠে নতুন ছেলেরা খেলছেÑকিন্তু আমাদের হাসিগুলো সেখানে আর ফেরে না।

তবু কখনো যখন মনটা খুব ভারী হয়ে আসে, তখন চোখ বন্ধ করলেই দেখি আমি আবার স্কুল ড্রেস পরে দাঁড়িয়ে আছি, হাতে খাতা, পাশে বন্ধু, আর দূরে কোথাও ভেসে আসছে স্যারের ডাক।

শৈশবটা হয়তো ফিরে আসে না, কিন্তু সাহাতলীর দিনগুলো আজও বুকের ভেতর নীরবে বেঁচে থাকে। আর তখন মনে হয়, জীবনে যত দূরেই যাই না কেন, আমার সবচেয়ে সুন্দর সময়টা ফেলে এসেছি ওই স্কুলের উঠোনেই।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়