প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৬
সাক্ষাৎকার : মোহাম্মদ রুহুল্লাহ
ভালো ফলাফলের চেয়ে ভালো মানুষ হওয়াই বেশি জরুরি

মোহাম্মদ রুহুল্লাহ। জন্ম চঁাদপুরের ফরিদগঞ্জে। দীর্ঘ ৩৬ বছরের শিক্ষকতা ও শিক্ষা প্রশাসনের অভিজ্ঞতায় তিনি কাজ করেছেন ঢাকা, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ছিলেন মাস্টার ট্রেইনার, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের হেড এক্সামিনার। টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নির্বাচিত এই শিক্ষা প্রশাসক বর্তমানে চঁাদপুরের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তঁার বিশ্বাস, শুধু ভালো ফল নয়, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
চঁাদপুরের শিক্ষার পরিবেশ, জনবল সংকট, সহশিক্ষা কার্যক্রম, এসএসসি পরীক্ষা, শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দৈনিক চঁাদপুর কণ্ঠ-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলআমিন হোসাইন।
চঁাদপুর কণ্ঠ: আপনার শিক্ষা ও কর্মজীবনের পথচলা সম্পর্কে জানতে চাই।
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: আমার জন্ম চঁাদপুরের ফরিদগঞ্জে। প্রাথমিকের পর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছি। পরে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯০ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করি। একই বছর একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করি। ১৯৯১ সালে সরকারি শিক্ষকতায় যোগ দিই। দীর্ঘ সময় ঢাকার বিভিন্ন সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। এক যুগের বেশি সময় ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে কর্মরত ছিলাম। এ সময় সরকারের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে মাস্টার ট্রেইনার এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের হেড এক্সামিনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। পরে হবিগঞ্জে সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চঁাদপুরে যোগদান করি।
চঁাদপুর কণ্ঠ: আপনি টানা তিনবার শ্রেষ্ঠ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়েছেন। এর পেছনে কী কাজ করেছে বলে মনে করেন?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: দীর্ঘ শিক্ষকতা ও শিক্ষা প্রশাসনের অভিজ্ঞতাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। কারিকুলাম, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্বে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সেই অভিজ্ঞতাগুলো মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। সম্ভবত সে কারণেই টানা তিনবার এই স্বীকৃতি পেয়েছি।
চঁাদপুর কণ্ঠ: চঁাদপুরের মাধ্যমিক শিক্ষার পরিবেশকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: চঁাদপুর একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা। এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহু কৃতী মানুষ দেশ-বিদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেন। শিক্ষা নিয়ে এখানকার মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি। এই সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
চঁাদপুর কণ্ঠ: সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: আমরা নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। জেলা প্রশাসন, শিক্ষা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন। পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা ও আত্মবিশ্বাসের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
চঁাদপুর কণ্ঠ: চঁাদপুরের শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবল সংকট। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক নেই। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তারও ঘাটতি রয়েছে। সীমিত জনবল নিয়েই সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি।
চঁাদপুর কণ্ঠ: শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: আমি চাই, বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দের জায়গা হয়ে উঠুক। তারা যেন শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, শেখার আনন্দে বিদ্যালয়ে আসে। তাই স্কাউট, গার্লস গাইড, বিএনসিসি, কিশোর ক্লাব, বিতর্ক, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছি। পাশাপাশি প্রতিটি বিদ্যালয়ে হাউস সিস্টেম চালু করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার থেকে দূরে থাকবে এবং বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়বে।
চঁাদপুর কণ্ঠ: মিড-ডে মিল নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: আমি চাই প্রতিটি শিক্ষার্থী বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসুক এবং বিদ্যালয়ে সবাই একসঙ্গে দুপুরের খাবার খাক। এতে তারা বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়াতে পারবে। একই সঙ্গে শেষ ক্লাস পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে। আমার বিশ্বাস, এটি বাস্তবায়ন হলে শিক্ষার পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
চঁাদপুর কণ্ঠ: অবসরের পরও কি শিক্ষা নিয়েই কাজ করতে চান?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: অবশ্যই। ২০২৭ সালে অবসরে যাব। তবে শিক্ষা নিয়েই কাজ করতে চাই। বিশেষ করে নৈতিক শিক্ষা, দেশপ্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলার বিষয়টি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।
চঁাদপুর কণ্ঠ: শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার সবচেয়ে বড় পরামর্শ কী?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: শুধু ভালো ফল করলেই হবে না। একজন শিক্ষার্থীকে নৈতিক, মানবিক ও দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে হবে। আমি সব সময় শিক্ষকদের বলি, প্রতিদিন অন্তত কয়েক মিনিট শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ নিয়ে কথা বলতে। কারণ ভালো মানুষ তৈরি করতে পারলে দেশও এগিয়ে যাবে।
চঁাদপুর কণ্ঠ: ব্যক্তিগত জীবনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে?
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: আমার মা। তঁার দোয়া ও অনুপ্রেরণাই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষের সফলতার পেছনে বাবা-মায়ের দোয়ার ভূমিকা সবচেয়ে বড়।
চঁাদপুর কণ্ঠ: সবশেষে চঁাদপুরবাসীর উদ্দেশে আপনার কিছু বলার থাকলে বলবেন।
মোহাম্মদ রুহুল্লাহ: আমাদের লক্ষ্য শুধু ভালো ফল অর্জন নয়; নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলা। পরিবার, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসন ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে চঁাদপুর শিক্ষায় আরও এগিয়ে যাবে। আমি চাই, আমাদের শিক্ষার্থীরা জ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠুক।
বিশেষভাবে একটি বিষয়ে বলতে চাই, সেটি হলোÑচঁাদপুরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে শিক্ষার্থীর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। মানুষ নগদ উপার্জনের জন্য ছেলেদেরকে ব্যাপকভাবে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সুশীলসমাজ এ নিয়ে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এখানকার সামাজিক অবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে যেতে পারে।








