প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:০৩
মেঘনার পাড়ের ফসলি জমির টপ সয়েল যাচ্ছে ইটভাটায়, ৮ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায়

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দিনে ও রাতের আঁধারে চলছে ইটভাটার জন্যে ফসলের মাটি কাটা। প্রভাবশালী চক্র ব্যস্ত হয়ে পড়ে কৃষি জমির টপ সয়েল কেটে নিয়ে ব্যবসার ধান্ধায়। ভূমিদস্যু চক্রটি কৃষকদের নানাভাবে বুঝিয়ে বা জোরপূর্বক রাজি করিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান টপ সয়েল। ভূমিদস্যুদের তাণ্ডব সীমা ছাড়িয়ে যায়। দিনের বেলা প্রশাসনের নজরদারি এড়াতে চুপচাপ থাকলেও সন্ধ্যা নামলেই শুরু করে মাটি কাটা, এছাড়া বেছে নেওয়া হয় ছুটির দিনগুলো।
এই অপরাধে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬) রাতে উপজেলার উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের আলতাফ মাস্টারঘাট এলাকায় মোবাইল কোর্টের অভিযানে মাটি কাটার অপরাধে স্বপন কবিরাজ নামের (৪০) ব্যক্তিকে ৮ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান কাউছার। এর আগে ২৮ ডিসেম্বর রাতে উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের আলতাফ মাস্টার ঘাট এলাকায় মেঘনাতীরবর্তী বাল্কহেড, ভেকু মেশিন ও ১১ টি ট্রাক্টর নিজ জিম্মায় রাখার অপরাধে অভিযুক্ত মহসিন বকাউল (২৫)কে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, পরিবেশ আইন অমান্য করে ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা। ফলে কৃষি জমির উর্বরতা হারানোর পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশের ভারসাম্য। ভেঙ্গে যাচ্ছে এলাকার রাস্তাঘাট। এলাকাবাসীর দাবি, টপ সয়েল বিক্রেতা এবং ক্রেতা ও এই কাজের সঙ্গে অন্যান্য যারা জড়িত তাদের অধিকাংশই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও ব্রিক ফিল্ডের দালাল কিংবা মালিক।
জানা যায়, উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ চরবংশী এবং চরমোহনা ইউনিয়নের ক'টি গ্রামের ফসলি জমি থেকে দেদার চলছে এ মাটি কাটার উৎসব। কৌশল বুঝে মাটি কাটার চক্রটি কখনো দিনে, কখনো রাতের বেলা মাটি কেটে নিচ্ছে। এর পাশাপাশি উপজেলার পশ্চিমাঞ্চলের ইটভাটা অধ্যুষিত উত্তর চরবংশী, দক্ষিণ চরবংশী, উত্তর চরআবাবিল, দক্ষিণ চরআবাবিল ও চরমোহনা ইউনিয়নে চলছে মাটিখেকোদের মাটি কাটার উৎসব।চাঁদপুর সেচ প্রকল্পভুক্ত রায়পুর ও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় সেচ প্রকল্পের বাইরের অংশে প্রতি বছর বর্ষায় পলি মাটি জমে। ফলে এসব এলাকায় পরবর্তীতে ভালো ফসল হয়, যা উপজেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয়ভাবে ভূমিকা রাখছে। সেচ প্রকল্পভুক্ত এলাকার কৃষিজমি থেকে মাটা কাটার ফলে জমিগুলো ক্রমশ নিচু হচ্ছে। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের বংশী ব্রীজ এলাকার আবদুর রহিম ও দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের মিয়ারহাটবাজার এলাকার খলিল মিয়া জানান, তাদের গ্রামে ৫টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ভাটার জন্যে কয়েকটি স্থান থেকে মাটিখেকোরা ফসলি এসব জমি থেকে এক্সেভেটরে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ট্রাক্টরের মাধ্যমে। আর এসব মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে ইটভাটাসহ নানা কাজে।
মাটি ব্যবসায়ীরা প্রতি ট্রাক্টর মাটি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করে সেগুলো বিক্রি করে দিচ্ছেন দেড় হাজার থেকে দু হাজার টাকায়। আর এতে অধিক মুনাফা আদায় করে নিচ্ছে চক্রটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চারজন জনপ্রতিনিধি জানান, এই চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত। এতে তারা কিছুই বলতে পারছেন না। প্রভাবশালীরা সবই একই গোত্রের। সরকার পরিবর্তন হলে শুধু কয়েক জন পরিবর্তন হয়, বাকিরা সবাই থাকে। কে কোন্ রাজনৈতিক দলের তা কোনো বাধা নয়।
দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফাতেমা বেগম, নজরুল ইসলাম ও মহিউদ্দিন জানান, টপ সয়েল কাটার সংবাদ জানালেও প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে লাঞ্ছিত হতে হবে এবং মাইরও খেতে হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাজেদুল ইসলাম বলেন, জমির উপরিভাগের ছয় থেকে ১০ ইঞ্চিতে জৈব পদার্থ বিদ্যমান থাকে। উপরিভাগ কাটার ফলে জমির ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা হ্রাস পায়। অসাধু চক্রের ফাঁদে পড়ে সামান্য কিছু টাকার জন্য জমির উপরিভাগের মাটি কাটার অনুমতি দিচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা। এ বিষয়ে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান।
রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান কাউছার বলেন, জমির উপরিভাগের মাটি কাটার খবর পাওয়ামাত্রই অভিযান চালানো হচ্ছে। যারাই অবৈধ এসব কর্মকাণ্ড করবে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।







