শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৯

‎ট্রাজেডির

ট্রাজেডির অন্য নাম ইয়াছিন

কামরুজ্জামান টুটুল
ট্রাজেডির অন্য নাম ইয়াছিন

না পেলেন বাবার স্নেহ, না পেলেন মায়ের মমতা। হয়নি স্ত্রীর ভালোবাসায় ঘর বাঁধা, কিংবা নিজের দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করার সুযোগ। পৃথিবীর কোনো সুখ-আহ্লাদই যেন তার ভাগ্যে ছিলো না। সব কিছুতেই এক অদ্ভুত 'না'-এর সমীকরণ নিয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সেই আঞ্চলিক মহাসড়কে ঝরে গেলো তরুণ ইয়াছিন বেপারীর জীবন।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাতে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের হাজীগঞ্জের বাকিলা এলাকায় মোটরসাইকেল ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান ইয়াছিন। তার এই অকাল মৃত্যুতে বন্ধু মহল, মামাবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। যে নানাবাড়িতে ইয়াছিনের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে, সেখানে তার ছিন্নভিন্ন নিথর দেহ পৌঁছালে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। নানি, খালা ও মায়ের গগনবিদারী আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় স্থানীয়দের আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায়, "এমন দুঃখের জীবন যেন আর কারও না হয়।"

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাজীগঞ্জের কালচোঁ দক্ষিণ ইউনিয়নে ইয়াছিনের পৈতৃক বাড়ি। তারা ছিলেন জমজ দুই ভাই ও এক বোন, যার মধ্যে ইয়াছিন বড়। তারা তিন ভাই-বোন ছোট থাকতেই মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর থেকে মায়ের সঙ্গে নানাবাড়িতেই বেড়ে উঠতে থাকেন ইয়াছিন। পরবর্তীতে বাবা আলমগীর হোসেন অন্য জায়গায় বিয়ে করে সংসার শুরু করেন এবং সন্তানদের খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দেন। এর মধ্যে মামারা মাকে পুনরায় বিয়ে দিলে তিন ভাই-বোন আরও অসহায় হয়ে পড়েন।

নানা বা মামাদের পক্ষে তিন শিশুর পড়াশোনা ও ভরণপোষণের খরচ চালানো সম্ভব ছিলো না। বাধ্য হয়ে পড়ালেখা থামিয়ে দু ভাইকে কাজ শেখাতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর ছোট বোনটিকে ঠাঁই দেওয়া হয় চাঁদপুর শহরের একটি এতিমখানায়।

অভিভাবকদের সহায়তাহীন ইয়াছিন নিজের চেষ্টায় চাইনিজ রান্নায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং হাজীগঞ্জের বাকিলার ‘ত্রি-মোহনা থিম পার্ক’-এ বাবুর্চি হিসেবে যোগ দেন। যত দিন চাকরি করেছেন, নিজের দক্ষতা দিয়ে সবার মন জয় করে কাজ করে গেছেন।

কয়েক বছর আগে ভালোবেসে একই উপজেলার সিদলা লোয়ারী এলাকার এক তরুণীকে বিয়ে করেন ইয়াছিন। সংসারের বছর না ঘুরতেই তাদের কোলে আসে এক কন্যাসন্তান। কিন্তু সন্তান জন্মের কিছুদিন পরই স্ত্রীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর থেকে আবারও একাকী হয়ে পড়েন তিনি।

মাত্র ২২ বছর বয়সে বাবা-মায়ের স্নেহবঞ্চিত, স্ত্রী-সন্তানহারা ইয়াছিন জীবনের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে একা লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু শুক্রবার রাতের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা তার সব চেষ্টা থামিয়ে দিলো। সড়ক দুর্ঘটনায় জীবনপ্রদীপ নিভে গিয়ে ইয়াছিন শেষ পর্যন্ত আর কারও হয়ে রইলেন না।

ডিসিকে/ এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়