প্রসববেদনায় কাতর প্রসূতির স্বজনদের একটাই চাওয়া—মা ও সন্তান যেন সুস্থ থাকেন। আর এই কঠিন মুহূর্তে মতলব দক্ষিণ ও পাশের উপজেলাগুলোর হাজারও গর্ভবতী মায়ের কাছে আশার আলো হয়ে উঠেছেন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা খালেদা আক্তার। দীর্ঘ সাড়ে ১৩ বছরের কর্মজীবনে কোনো রকম অস্ত্রোপচার (সিজারিয়ান) ছাড়াই ২২ শত গর্ভবতী মায়ের স্বাভাবিক প্রসব (নরমাল ডেলিভারি) করিয়ে এলাকায় অনন্য আস্থা ও জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি।
প্রসববেদনায় কাতর হয়ে গত বুধবার গভীর রাতে নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিদর্শিকা খালেদা আক্তারের বাসায় আসেন মতলব দক্ষিণ উপজেলার দুলিয়াউড়া গ্রামের হাবিবা আক্তার। খালেদা আক্তার সেসময় নিজে কিছুটা অসুস্থ থাকলেও প্রসূতিকে ফিরিয়ে দেননি। দ্রুত নিচতলার সেবা কক্ষে নিয়ে ঘণ্টাখানেকের প্রচেষ্টায় একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের স্বাভাবিক প্রসব নিশ্চিত করেন তিনি।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হাবিবা আক্তার বলেন, "খালেদা আপা কোনো রকম জটিলতা ছাড়াই আমার স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন। তাঁর হাত ধরেই আমার মেয়ে দুনিয়ার মুখ দেখেছে। প্রসূতি ও নবজাতক দুজনই এখন সুস্থ। তাঁর এই উপকারের কথা কোনোদিন ভুলব না।"
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) পদে কর্মরত খালেদা আক্তার ২০১৩ সালের ১৬ এপ্রিল যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে দীর্ঘ সাড়ে ১৩ বছরে তিনি মতলব দক্ষিণ, পার্শ্ববর্তী হাজীগঞ্জ ও কচুয়া উপজেলার প্রায় ২ হাজার ২০০ মায়ের নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন। সততা ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইতোমধ্যে আটবার উপজেলার সেরা পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার পুরস্কার লাভ করেছেন।
খালেদা আক্তার জানান, তাঁর কেন্দ্রে প্রতি মাসে গড়ে ১৪টি এবং বছরে প্রায় ১৬৮টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা গভীর রাত—যেকোনো মুহূর্তে রোগী এলেই সাড়া দেন তিনি। নিজের শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও সেবা দেওয়া বন্ধ রাখেন না। সেবা গ্রহীতা মায়েদের হাসিমুখই তাঁর সব ক্লান্তির অবসান ঘটায়।
উপজেলার লেকোটা গ্রামের গৃহবধূ রুমানা শাহানাজ (৩০) তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, "গত ১ আগস্ট রাতে প্রসববেদনা নিয়ে খালেদা আপার কাছে আসি। আপা অত্যন্ত যত্নের সাথে প্রসব করিয়েছেন। সব সেবা হাসিমুখে দিয়েছেন, কোনো টাকাও নেননি। তাঁর কাছে এলে রোগীরা মানসিক শক্তি ও ভরসা পায়।"
ব্যক্তিগত জীবনে ২০০৭ সালে এসএসসি পাসের পর পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে মনোনীত হন খালেদা আক্তার। পরে টাঙ্গাইলের পরিবার পরিকল্পনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে স্বাভাবিক প্রসব ও মিডওয়াইফারির ওপর ১৮ মাসের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। নারায়ণপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি ফ্ল্যাটেই তিনি পরিবারসহ বসবাস করেন, যেন যে কোনো জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সেবা দেওয়া যায়।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দীপ্ত দাস খালেদা আক্তারের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, "অস্ত্রোপচার এড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিক প্রসব বৃদ্ধিতে খালেদা আক্তার যেভাবে নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরিতে এটি একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।" সূত্র : প্রথম আলো।
ডিসিকে /এমজেডএইচ