প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৬
ঢাকা আবাহনীর খেলা ও সাপোর্টার দেখেই চাঁদপুরে আবাহনী ক্লাবের সৃষ্টি

আবাহনী ক্লাব চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনে এক অনন্য নাম। এখনও দেশের তুমুল জনপ্রিয় দুটি ক্লাবের একটির নাম আবাহনী। ফুটবল এবং ক্রিকেট দেশের প্রধান এ দুটি খেলায় আবাহনীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকাল থেকে শুরু করে আজ অবধি অটুট আছে। অথচ এ ক্লাবটির চাঁদপুরে জন্মই হয়েছিলো এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে।
ঢাকা আবাহনীর খেলা ও সাপোর্টার দেখেই চাঁদপুর আবাহনী ক্লাবের সৃষ্টি। এমন কথাই জানালেন এই ক্লাব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঢাকা আবাহনী ক্রীড়া চক্রের (বর্তমানে লিমিটেড) আকাশী-নীল জার্সি, রোমাঞ্চকর খেলা এবং বিপুল জনপ্রিয়তা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে সারাদেশে, বিশেষ করে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ক্লাব সংস্কৃতি ও নতুন নতুন ক্লাব সৃষ্টির জোয়ার তৈরি হয়। এক্ষেত্রে বাদ থাকেনি চাঁদপুর জেলার ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনীর অগ্রযাত্রা। স্থানীয় মোহামেডান, ব্রাদার্স ইউনিয়ন,বিষ্ণুদী,নতুন বাজার, পূর্ব শ্রীরামদী, নিতাইগঞ্জ, ভাই ভাই ক্লাবসহ জেলা পর্যায়ের ক্লাবগুলোর মধ্যে ফুটবল-ক্রিকেটের অন্যতম এক শক্তির নাম চাঁদপুর আবাহনী ক্লাব। এক সময় ফুটবলে দুর্দান্ত অংশগ্রহণ ছিলো আবাহনীর। সময়ের ব্যবধানে এখন কিছুটা নিষ্প্রভ থাকলেও ফের স্বমহিমায় আবির্ভূত হতে মরিয়া চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার পুরানো জোড়পুকুরপাড় এলাকার এই ক্লাবটি। এটি স্থানীয় ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা করে। আবাহনীর খেলার স্টাইল এবং মাঠের বাইরের সমর্থকদের উন্মাদনা স্থানীয় পর্যায়কে উৎসাহিত করেছিলো। সেই সাপোর্টারের উন্মাদনা থেকে ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটিও ঘরোয়া ফুটবল-ক্রিকেটে বেশ সফল।
চাঁদপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার অন্তর্ভুক্ত দেশের জনপ্রিয় এই ক্লাবটি শহরের জোড় পুকুরপাড় এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করে। যার প্রধান কারিগর আধুনিক পোশাক তৈরি হাউজ ড্রেসকোর মালিক আনোয়ার হোসেন বাবুল। অন্যরা ক্লাব সভাপতি ও সেক্রেটারি হতেন আর তিনি থাকতেন ক্লাবের ক্রীড়া কর্মকাণ্ডে চালকের ভূমিকায়। তিনি জানান,
চাঁদপুরে মোহামেডান ক্লাব ও সাপোর্টার রয়েছে, আবাহনী ক্লাব ও সাপোর্টার থাকবে না, তাতো হয় না। ঢাকা আবাহনীর খেলা ও সাপোর্টার দেখেই চাঁদপুর আবাহনী ক্লাবের সৃষ্টি করা হয়।
জেলায় ক্রীড়া সংস্থার স্থানীয় লিগ টুর্নামেন্ট বা জাতীয় টুর্নামেন্টে সব সময় অংশগ্রহণ থাকতো। অতি অল্প সময়ের মধ্যে সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করে আজ আবাহনী বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।
আবাহনী লিমিটেড বাংলাদেশের অন্যতম সফল ও ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া ক্লাব, যার ফুটবল ও ক্রিকেটে বহু রেকর্ড অর্জন রয়েছে।
মোহামেডানের সাথে আবাহনীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ।ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট লিগ শিরোপাতেও আবাহনী ফাইনাল খেলতো। যদিও বিভিন্ন সময়ে ক্লাবের পেশাদারিত্ব এবং অবকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তবুও মাঠে সাফল্যের বিচারে তারা চাঁদপুরের ক্রীড়াঙ্গনে শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোর একটি।
সুস্থ জাতি গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা অপরিসীম ও ব্যাপক। খেলাধুলার মাধ্যমে নির্মল আনন্দ পাওয়া যায় এবং নিরোগ শরীর গঠন করা যায়। মানব সভ্যতার ক্রম বিকাশের সাথে ক্রীড়াঙ্গনের প্রবহমানতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত। ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়াঙ্গন শুধুমাত্র গণমানুষের চিত্তবিনোদন ও আনন্দের ভিত্তিভূমি নয়। ক্রীড়াবিদ ও ক্রীড়াঙ্গন মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা ও অগ্রগতির বিস্তীর্ণ চলার পথে এক চিহ্নিত মাইল ফলক।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চাঁদপুর। বিংশ শতকের আশির দশকের গোড়া থেকেই ক্রীড়া জগতে এক গৌরবময় ভূমিকা পালন করে আসছে আবাহনী ক্লাব। ক্রীড়া চর্চা ও খেলাধুলার মাধ্যমে যুব সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে সুস্থ শরীর ও সুন্দর জীবন গড়ার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্য নিয়ে চাঁদপুর শহরে তৎকালীন সময়ের এক ঝাঁক তরুণ ক্রীড়া সংগঠক অফিসিয়াল হিসেবে আবাহনী ক্লাবকে চাঁদপুর জেলাতেও সম্পৃক্ত করেছে।
এই ক্লাবের প্রথম সভাপতি ছিলেন এবং মুখ্য ভূমিকা পালন করেন মমিন কোম্পানির পাট ব্যবসার অংশীদার হাজীগঞ্জের মুজিব চেয়ারম্যান। স্টেডিয়াম রোডে তার বাসা ছিলো। এরপর পর্যায়ক্রমে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এমএ ওয়াদুদ, চাঁদপুরের বিশিষ্ট শিল্পপতি শাহিদুর রহমান চৌধুরী,
পরে তাজমহল বোর্ডিংয়ের মালিক শেখ হাবিবুর রহমান, এখন আমেরিকায় থাকেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা গুয়াখোলার মুজিব ভাই --এই ক্লাবের কর্মকর্তা ছিলেন।
এছাড়াও ক্লাব টিমের ফুটবল খেলোয়াড় থেকে অফিসিয়াল এবং পরে কর্মকর্তা হিসেবে আবাহনী ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন জয়নাল আবেদীন জনু হাওলাদার। পরবর্তীতে সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেওয়ান মো. সফিকুজ্জামান এবং অ্যাড. জাহিদুল ইসলাম রোমান। সাধারণ সম্পাদক না হলেও এই ক্লাবের আরেকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন হাসান ইমাম বাদশা।
প্রথমে ফুটবল দিয়ে আবাহনী ক্লাবের যাত্রা শুরু হয় চাঁদপুরে। পরে চাঁদপুর মোহামেডান ক্লাব ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট কর্মকর্তা প্রয়াত খন্দকার মজিবুর রহমানের অনুপ্রেরণায় ক্রিকেট লীগে অংশগ্রহণ শুরু করে আবাহনী ক্রীড়া চক্র। প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলার মোস্তফা হোসেন মুকুল, আবুল, তৎকালীন জাতীয় তারকা ফুটবলার আশরাফ, অমলেশ, চুন্নু, পাকির আলী, প্রেমনাথ, ভানু, টুটুল, বাবু, জাহাঙ্গীর পাটওয়ারী এই ক্লাবে খেলেছেন।আবাহনী ক্লাব যতোবার লীগ ধরেছে ততোবারই ফাইনাল খেলেছে। জেলা ক্রিকেট লিগেও অংশগ্রহণে পিছিয়ে ছিলো না চাঁদপুর আবাহনী ক্রীড়া চক্র। সমর দাস ও তাঁর এক ভাই (যিনি প্রবাসে থাকেন এখন) লিটন, আদালত পাড়ার মিঠু, মরহুম অ্যাড. জাহাঙ্গীর হোসেন খান, তারাই মূলত চাঁদপুর আবাহনী ক্রিকেট ক্লাবের নিয়মিত প্লেয়ার ছিলেন।
কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বাবুল বলেন, আগে তো ফুটবলই ছিলো খেলার প্রাণ। ১৯৮২ সালের দিকে সদ্য প্রয়াত খন্দকার মজিবের সহযোগিতা নিয়ে চাঁদপুর আবাহনী ক্রিকেট টিম করা হয়। যার নেতৃত্বে ছিলেন সমর দাস। আবাহনী ক্লাব যতোবারই লীগ টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে ততোবারেই ফাইনাল খেলেছে। বর্তমানে চাঁদপুর স্টেডিয়াম গ্যালারি মার্কেটে পাওয়া ঘরই ক্লাবঘর হিসেবে এখন ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেখানে আমাদের কিছু সাফল্যের ট্রফি রয়েছে। এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো খেলাধুলা ও ক্লাব নিয়ে চিন্তা করছি না। সামনের দিনগুলোতেও সাফল্যের পথেই ছুটতে চায় আবাহনী। তবে নতুনরা ক্লাব কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে চাইলে আমার সহযোগিতা থাকবে।
মানবিক এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়রোধে যুব সমাজকে ক্রীড়াঙ্গনের দিকে ধরে রাখার জন্যে আমরা বাংলাদেশের জনপ্রিয় ক্লাবটি চাঁদপুরেও গঠন করি। সেই লক্ষ্য নিয়ে একটা সময় টিম গঠনের জন্যে প্রতিনিয়ত কাজ করেছি এবং ক্লাব সফলতাও পেয়েছে।
আনোয়ার হোসেন বাবুল বলেন, আমি জানি আগামী প্রজন্ম ও তরুণদের মাদকমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থা উপহার দিতে স্পোর্টসের কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমানে আবাহনীর যাত্রা শুরু মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধের পর।আর চাঁদপুরে শুরু পঁচাত্তর পরবর্তী সময় থেকে। চাঁদপুরের প্রতিটি ফুটবল লীগে দেশী বিদেশী তারকা খেলোয়াড়ে সবসময় ভরপুর ছিলো চাঁদপুর আবাহনী ক্রীড়া চক্রের দলে।
বাংলাদেশের ন্যায় এ জেলার ফুটবলে আবাহনী এক অনন্য নাম। তারা অন্য ক্লাবগুলোর সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার টিম গঠন করতো সবসময়।
সুতরাং চাঁদপুর আবাহনী ক্রীড়াচক্র চাঁদপুর জেলা স্টেডিয়ামে অবস্থিত একটি স্থানীয় সক্রিয় ফুটবল ও ক্রিকেট ক্লাব। এটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার তত্ত্বাবধানে আয়োজিত বিভিন্ন টুর্নামেন্টে, যেমন জেলা লীগ, ক্লাব কাপ ফুটবল ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অংশগ্রহণ করে থাকে। ক্লাবটি স্থানীয় পর্যায়ে যুব সমাজকে খেলায় উৎসাহিত করতে কাজ করে। সর্বশেষ চাঁদপুর প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগ (২০২৩-২৪)-এর ফাইনালে রানাআপ হয়েছিল আবাহনী ক্লাব।এ ক্লাবের কর্মকর্তা হিসেবে দেওয়ান সফিকুজ্জামান ও অ্যাড. জাহিদুল ইসলাম রোমান বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সদস্য হয়েছিলেন।
এই ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন জনু আক্ষেপ করে বলেন, ক্লাবের প্লেয়ার থেকে কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছি দীর্ঘদিন। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে আমাকে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।








