শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:০৫

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা ও করণীয়

সুনির্মল দেউরী
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা ও করণীয়

শিক্ষা কী বা শিক্ষা বলতে কী বোঝায়? এই প্রশ্নের উত্তর পৃথিবীর বহু দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও গবেষকগণ বহুভাবে প্রদান করেছেন। প্রাচীন থেকে শুরু করে আধুনিক মনীষীদের নানাবিধ মতবাদের সমন্বিত রূপ আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে মহাজ্ঞানী এরিস্টেটল বলেছেন, “সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করা-ই হলো শিক্ষা।” আবার প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, “শিক্ষা হলো--শিশুর দেহ, মন ও আত্মার সুষম বিকাশ সাধন।” তাই বলা যায় শিক্ষার সাথে শরীরের রয়েছে ওতপ্রোত সম্পর্ক। আর শিশুর এই শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্যে সর্বাপেক্ষা সহায়ক ও কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত খেলাধুলার চর্চা। তাই তো সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার অনুশীলন সর্বজন স্বীকৃত। জাতি গঠনে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সরকারি-বেসরকারি সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শীতকালীন, গ্রীষ্মকালীন ও বার্ষিকসহ নানাবিধ ক্রীড়ানুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।

আমাদের দেশে সাধারণত ১১ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ালেখার সাথে যুক্ত থাকে। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গঠনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সময় এটি। এ বয়সে তাদের শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশের জন্যে প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা। এই প্রেক্ষাপটে তাদের মাদকাসক্তি, ডিভাইস আসক্তিসহ যে কোনো ধরনের বদ অভ্যাস থেকে দূরে রেখে সুস্থ-সুন্দর জীবন গড়ে তোলার জন্যে পড়ালেখার পাশাপাশি অন্যতম প্রধান উপায় খেলাধুলার চর্চা। তবে খেলাধুলার উপকারসমূহ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা চর্চার প্রচলিত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে প্রবর্তন করতে হবে আধুনিকতম কৌশল তথা ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলা।

সচারচর ক্লাব বা সংঘ বা সংগঠন বলতে আমরা যেমন বুঝি যে, একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও কিছু উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সমমনা কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে পরিকল্পনা মাফিক কার্য সম্পাদন করে। ঠিক তেমনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শ্রেণির একই ধরণের খেলাধুলায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়ে এক একটি ক্লাব গঠিত হবে। খেলাধুলার নামানুসারে ক্লাবগুলোর নাম হবে, যেমন-ফুটবল ক্লাব, ক্রিকেট ক্লাব, সাঁতার ক্লাব, দাবা ক্লাব, ভলিবল ক্লাব ইত্যাদি। ক্লাবগুলোতে প্রতিষ্ঠান প্রধান, শ্রেণি শিক্ষক বা ঐ খেলায় পারদর্শী শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও পিটিএ সদস্যের অন্তর্ভুক্তি থাকবে। প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের আগ্রহ ও প্রবণতা অনুসারে কোনো না কোনো ক্লাবে বাধ্যতামূলকভাবে সংযুক্ত থাকবে। আবার কোনো শিক্ষার্থী চাইলে একাধিক ক্লাবের সাথে যুক্ত হতে পারবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির ক্যাচমেন্ট এরিয়া, অবকাঠামোগত সুবিধা, শিক্ষার্থীদের চাহিদা ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে ক্লাবের সংখ্যা ও ধরনের ভিন্নতা হতে পারে। প্রতিটি ক্লাবের থাকবে আলাদা আলাদা কমিটি ও কর্মপরিকল্পনা। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী সারা বছর ধরে শ্রেণিকার্যক্রমের পাশাপাশি চলবে খেলাধুলার অনুশীলন।

একজন উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার হিসেবে আমার পেশাগত দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, স্থানীয় পর্যায়ে বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় হতে যখন কোনো প্রতিযোগিতা আহ্বান করা হয় তখন বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাড়াহুড়া করে দল গঠন করে। পূর্বপরিকল্পনা না থাকায় একজন বা অল্পকিছু শিক্ষার্থী অনেকগুলো খেলায় অংশগ্রহণ করে। ফলে অধিকাংশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক প্রতিষ্ঠান কোনো দলই গঠন করতে পারে না। আবার যে দল গঠন করা হয় তাদের ধারাবাহিক অনুশীলনের অভাবে যথাযথ দক্ষতা (পারফরমেন্স) দেখাতে ব্যর্থ হয়। কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার হয়। আবার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক সংকট রয়েছে। ব্যতিক্রম বাদে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক আছেন, সেখানে তাঁদের অতিরিক্ত বিভিন্ন শ্রেণিকার্যক্রম চালাতে হয় বিধায় প্রতিষ্ঠানগুলো খেলাধুলায় পিছিয়ে যাচ্ছে। এসব অব্যবস্থাপনা দূরীকরণে ও খেলাধুলার পরিসর বৃদ্ধি করতে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার প্রচলন হতে পারে উত্তম বিকল্প।

খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা আমরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেও আমাদের সকলের সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট করে জানা উচিত খেলাধুল তথা ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের কী ধরনের উপকারে আসে। শিক্ষার্থীদের সুসংগঠিত, নিয়ম শৃঙ্খলাপূর্ণ ও প্রাণবন্ত শিক্ষাজীবন গঠনে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার ব্যাপক ভূমিকার মধ্য হতে সংক্ষেপে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হলো।

প্রথমত ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের সংগঠন ও নিয়মতান্ত্রিকতার শিক্ষা দেয়। যখন কোনো একজন শিক্ষার্থী একটি খেলাধুলার ক্লাবে যুক্ত হয় তখন তাকে নিয়মিত নির্দিষ্ট সময়ে অনুশীলন করতে হয়, দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হয়। এতে তার মধ্যে সময় ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ববোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের গুণাবলি বিকশিত হয়। যা তার ভবিষ্যৎ জীবনে সফলতার পথ তৈরি করে।

দ্বিতীয়ত দলীয় চেতনা ও সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধির একটি উত্তম ক্ষেত্র ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলা। ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি দলীয় খেলায় প্রত্যেকে একে অন্যের ওপর নির্ভর করতে শেখে। এক সঙ্গে পরিকল্পনা করে, সমস্যা সমাধান করে এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে চলে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও সহমর্মিতা গড়ে উঠে। তারা সামাজিক জীবনে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে দক্ষ হয়।

তৃতীয়ত ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি ও সুস্থ প্রতিযোগিতায় উদ্বুদ্ধ করে। ক্লাবে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, বিজয়ের উল্লাস উপভোগের পাশাপাশি পরাজয়কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে শেখায়। তারা কঠোর পরিশ্রমে উদ্বুদ্ধ হয় এবং মনোবল বাড়িয়ে মানসিক চাপ মোকাবেলায় সক্ষম হয়। এই অর্জন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনসহ বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক ভূমিকা রাখে।

চতুর্থত স্বাস্থ্য সচেতনতা ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলা অত্যন্ত কার্যকর। নিয়মিত অনুশীলন শরীরকে সতেজ বাখে, স্থূলতা কমায়। ডায়াবেটিকসহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মনকে উজ্জীবিত করে। যে সব শিক্ষার্থী পড়াশোনার চাপে মানসিকভাবে ক্লান্ত, তাদের জন্যে খেলাধুলা অনন্য এক উদ্দীপক।

পঞ্চমত ব্যক্তিগত পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠানের সুনামসহ ইতিবাচক ভাবমূর্তি গঠনে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার অবদান অনস্বীকার্য। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত দল আন্তঃবিদ্যালয় বা আন্তঃউপজেলাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও মর্যাদা বৃদ্ধি করে। শিক্ষার্থীদের প্রতিভা জাতীয় পর্যায়েও তুলে ধরতে সহায়তা করে। সেরা দক্ষতা প্রদর্শনকারী শিক্ষার্থীর ইতিবাচক পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়।

মূলত এমন বহুবিধ গুরুত্বের কথা অনুধাবন করে চাঁদপুরের সুযোগ্য জেলা শিক্ষা অফিসার জনাব মোহাম্মদ রুহুল্লাহ মহোদয় জেলার মাধ্যমিক স্তরের সকল বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার কার্যক্রম প্রবর্তনের জন্যে ইতোমধ্যে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : তাঁর অফিসের সকল কর্মকর্তাসহ চাঁদপুরের আটটি উপজেলার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ও সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারদের নিয়ে সভা করে দিকনির্দেশনা প্রদান, উপজেলাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সাথে মতবিনিময় সভাকরণ, প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে পরামর্শ প্রদানসহ বিভিন্ন সভা, সেমিনার ও অনুষ্ঠানে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। তিনি শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, চাঁদপুর জেলার সম্মানিত জেলা প্রশাসক, আটটি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারবৃন্দ, সাংবাদিকবৃন্দসহ সকল অংশীজনের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তাঁর যথাযথ নেতৃত্বে আগামী ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ হতে চাঁদপুরের মাধ্যমিক স্তরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলা কার্যক্রম বাস্তবায়নের জোর চেষ্টা অব্যহত রয়েছে। এজন্যে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করার এখনই উপযুক্ত সময়, যাতে করে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ক্লাবগুলোর কার্যক্রম পূর্ণ উদ্যমে শুরু করা যায়। শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষক বা প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, পর্যাপ্ত উপকরণের স্বল্পতা ও অবকাঠামোগত কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছাটাই গুরুত্বপূর্ণ। একবার কার্যক্রম শুরু করলে ধীরে ধীরে এর ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষা বিভাগের একজন নগণ্য কর্মী হিসেবে এটুকু বলতে পারি যে, আমার অধিক্ষেত্র হাজীগঞ্জসহ সমগ্র চাঁদপুর জেলার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যেসব চ্যালেঞ্জ আসবে তা মোকাবেলায় জেলা শিক্ষা অফিসার মহোদয়ের নির্দেশনা মোতাবেক যে কোনো পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদানে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছি।

পরিশেষে বলতে পারি, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু বহুমুখী জ্ঞানার্জনই নয়, ববং শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীণ বিকাশ নিশ্চিত করা। আর এই ক্লাবভিত্তিক খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সমৃদ্ধকরণের পাশাপাশি তাদের জীবনদর্শন, মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করে। তাই প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত ও কার্যকর খেলাধুলার একাধিক ক্লাব গঠন এখন সময়ের দাবি।

সুনির্মল দেউরী : উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়