প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:০৪
মতলব দক্ষিণে ক্লাবভিত্তিক ক্রীড়াচর্চায় জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনার বাস্তবতা গতিহীন
নতুন শিক্ষা বর্ষ থেকে শুরু করবেন এমনটাই জানিয়েছেন বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ

চাঁদপুর জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লাহ তাঁর যোগদানের পর সহশিক্ষা কার্যক্রমকে আরো বেগবান করতে এবং শিক্ষার্থীদের মেধাভিত্তিক ক্যারিয়ার গড়তে সহযোগিতা করার প্রয়াসে জেলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বছরের শুরুতে ক্লাবভিত্তিক দল গঠনের জন্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি যখনই যেই প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা পরামর্শ ছাড়াও প্রতিটি বিদ্যালয়ে ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, আবৃত্তি ক্লাব, অংকন ক্লাব, স্কাউট গ্রুপ, গার্লস গাইড, ক্রীড়ার মধ্যে ফুটবল ক্লাব, কাবাডি ক্লাব, ভলিবল ক্লাব, ক্রিকেট ক্লাব, ব্যাডমিন্টন ক্লাব, দাবা ক্লাব, সুইমিং ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাব করার নির্দেশনা দেন। ক্লাব গঠনের পর সপ্তাহের নির্দিষ্ট একদিন এসব ক্লাবের কার্যক্রম শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। ক্লাবগুলো সঠিকভাবে গঠন ও পরিচালিত হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্যে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার এবং জেলা শিক্ষা অফিসের পরিদর্শকদেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘জেলা শিক্ষা অফিসারের নির্দেশনা মতলব দক্ষিণ উপজেলায় কেমন পালন হচ্ছে’ এ সংক্রান্ত খবর নিতে উপজেলার কলেজ, মাদ্রাসা ও উচ্চ বিদ্যালয়সহ ৫৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ ক’টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে এবং পরবর্তীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সাথে কথা বলে বেশ হতাশাজনক তথ্যই পাওয়া গেছে। ক’জন প্রতিষ্ঠান প্রধান ক্লাব গঠনের জন্যে শিক্ষকদের দায়িত্ব প্রদান করেছেন, আবার কেউ কিছু ক্লাব গঠন করেছেন, বাকিগুলো নতুন শিক্ষা বর্ষ থেকে শুরু করবেন এমনটাই জানিয়েছেন। তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা এসব বাড়তি ঝামেলা এড়ানোর চেষ্টা করেন, যার ফলস্বরূপ জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা পর্যায়ে বিভিন্ন ক্রীড়া, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ঘুরে ফিরে নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরই পুরস্কার নিতে দেখা গেছে।
গত সোমবার (১৭ নভেম্বর ২০২৫) থেকে বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর ২০২৫) পর্যন্ত চারদিন এ উপজেলার কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকগণের সাথে সহশিক্ষা কার্যক্রমে বিভিন্ন ক্লাব স্থাপনের বিষয়ে কথা হয়।
বিতর্ক প্রতিযোগিতা মানুষকে যুক্তিবাদী, চিন্তাশীল এবং আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, যা ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে শেখায়। বিতর্ক প্রতিযোগিতা বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক বিষয় সম্পর্কে জানার এবং নিজেদের চিন্তাভাবনা গুছিয়ে প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। এ ক্লাবটি অনেক প্রতিষ্ঠানে রয়েছে। তবে কার্যক্রম খুব একটা নেই।
ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব ইংরেজি শেখা ও অনুশীলন করার জন্যে একটি মজাদার এবং অনানুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম। এটি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে, বাস্তব জীবনে ইংরেজি ব্যবহার করার সুযোগ দিতে এবং পড়া, লেখা, বলা ও শোনার দক্ষতা বিকাশে সাহায্য করে। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক দক্ষতা বিকাশেও সহায়তা করে। কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর অস্তিত্ব নেই। উপজেলা সদরের দুটি প্রতিষ্ঠানে এটি চালু হলেও জোরদার কার্যক্রম নেই। ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একই অবস্থা।
আবৃত্তি ক্লাব ভাষা ও উচ্চারণের মানোন্নয়নে সাহায্য করে, আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করে। অংকন ক্লাব সৃজনশীলতা বিকাশ, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং ব্যক্তিগত বিকাশে সাহায্য করা। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে, তাদের চারপাশের জগৎ সম্পর্কে আরও সচেতন করে তোলে এবং মানসিক ও আবেগিক বিকাশে সহায়তা করে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই জানুয়ারিতে এ ক্লাবগুলো করার পরিকল্পনা করেছেন।
কথা হয় মতলব সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের সাথে। সহশিক্ষার কার্যক্রমের বেশ কিছু ক্লাব পূর্ব থেকে রয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নোটিস দিয়ে শিক্ষকদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী সকল কার্যক্রম জানুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
রয়মনেন নেছা মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অরুন চন্দ্র সরকার জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সকল কার্যক্রম পালন করি। ল্যাংগুয়েজ ক্লাব নেই। বিতর্ক ক্লাবসহ বেশ ক’টি ক্লাব রয়েছে। ক্রীড়ার অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
মতলব দারুল উলুম ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মকবুল হোসেন জানান, খেলাধুলার কিছু কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ল্যাংগুয়েজ ক্লাব নেই। ফুটবল, ক্রিকেটসহ বেশ কয়েকটি ক্লাবের কার্যক্রম চলামান রয়েছে। ভবিষ্যতে সকল ক্লাব স্থাপনের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
মতলব জগবন্ধু বিশ্বনাথ (জেবি) সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জাভেদ হোসেন জানান, পূর্বের ক’টি ক্লাবসহ বেশ ক’টি সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বাকি ক্লাবগুলো গঠন করার জন্যে শিক্ষকদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
মতলবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজী মোহাম্মদ শাহআলম জানান, ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ ক্লাবসহ বেশ ক’টি ক্লাব করা হয়েছে। বাকি ক্লাবগুলোর চলমান কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। শিক্ষকদের নিয়ে সকল সহশিক্ষা কার্যক্রমের ক্লাব স্থাপন করে কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
দিঘলদী এমএ ছাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন খান জানান, আমার বিদ্যালয়ে বেশির ভাগ ক্লাবের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বাকি ক্লাবগুলো স্থাপন করে ক্লাবের কার্যক্রম চলমান রাখবো।
নারায়ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান জানান, নতুন কোনো ক্লাব করা হয়নি। বেশ ক’টি ক্লাবের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জানুয়ারির মধ্যে সকল ক্লাবের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
মুন্সীরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ছাখাওয়া উল্লাহ জানান, বিতর্ক ক্লাব ও স্কাউট ক্লাবসহ বেশ ক’টি ক্লাব পূর্ব থেকে রয়েছে। নতুন কোনো ক্লাব গঠন করা হয়নি। বছরের শুরুতে শিক্ষকদের নিয়ে সকল কার্যক্রম চালিয়ে যাবো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উল্লেখিত স্কুল ও মাদ্রাসায় অধিকাংশ সহশিক্ষা কার্যক্রম তেমন একটা হয় না। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজ ও কার্যক্রম করতে গিয়ে সহশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গাউসুল আযম জানান, বিদ্যালয়গুলোকে মৌখিক নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ে পরীক্ষা ও অন্যান্য কার্যক্রম থাকায় সকল বিদ্যালয়ের ক্লাবগুলো স্থাপন করা হয়নি। তবে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় সকল ক্লাব স্থাপন করে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হবে। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে লিখিত নির্দেশনা দেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।







