প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ০২:১১
মহাকালের এজলাসে এক ফোঁটা কালো তিল: যেভাবে ধসে পড়ল ৪৫ বছরের খুনি-দুর্গ!

মহাকালের এজলাসে এক ফোঁটা কালো তিল: যেভাবে ধসে পড়ল ৪৫ বছরের খুনি-দুর্গ
|আরো খবর
ইতিহাস কখনো মৃত নয়। সময়ের ধুলোয় চাপা পড়ে থাকা কোনো কোনো অধ্যায় হঠাৎ এমনভাবে জেগে ওঠে, যেন অতীত নিজেই বর্তমানের দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। তখন ঘটনাটি আর কেবল সংবাদ থাকে না; তা রূপ নেয় রাষ্ট্র, অপরাধ, মনস্তত্ত্ব, প্রযুক্তি এবং নিয়তির এক অনিবার্য মহাকাব্যে।
সাড়ে চার দশক ধরে যে নামটি ইতিহাসের অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছিল, ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই গভীর রাতে ঢাকার বনানী ডিওএইচএসের নিস্তব্ধতা সেই দীর্ঘ নীরবতাকে ভেঙে দিল। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত সাবেক মেজর মো. মোজাফফর হোসেনের গ্রেপ্তার যেন ইতিহাসের বুক থেকে রক্তমাখা একটি অসমাপ্ত অধ্যায় আবার খুলে দিল।
এটি শুধু একজন পলাতকের পতনের গল্প নয়; এটি সময়ের বিরুদ্ধে মানুষের পরাজয়, অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দীর্ঘ ধৈর্য এবং মহাকালের অদৃশ্য আদালতের এক বিস্ময়কর দলিল।
১. রক্তের টান: যেখানে পরাজিত হলো চার দশকের ছদ্মজীবন
একজন ফেরারি আসামির সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা অস্ত্র তার বিচ্ছিন্নতা। তাকে ভুলে যেতে হয় নিজের নাম, নিজের শহর, নিজের অতীত, এমনকি নিজের আত্মীয়স্বজনকেও। প্রতিটি সম্পর্ক হয়ে ওঠে ঝুঁকি, প্রতিটি স্মৃতি হয়ে ওঠে সম্ভাব্য বিপদ।
দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে মোজাফফর হোসেন ছদ্মনাম, ভুয়া পরিচয় ও নীরব নির্বাসনের প্রাচীর তুলে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। কিন্তু মানুষের ভেতরের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় কোনো সামরিক পদবি নয়—তা হলো একজন পিতা।
বয়স যত বাড়ে, কৌশল তত ক্ষয় হয়; অথচ রক্তের টান তত গভীর হয়। যে মানুষটি চার দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রকে এড়িয়ে চলেছেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই কন্যার স্নেহের আকর্ষণে ফিরে এলেন পরিচিত ভূখণ্ডে।
সম্ভবত তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, ইতিহাস তাকে ভুলে গেছে।
কিন্তু ইতিহাস ভুলে যায় না।
যে রক্তের সম্পর্ক তাকে ঘরে ফিরিয়েছিল, সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই রাষ্ট্র পৌঁছে গেল তার দরজায়। কন্যার প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, যাতায়াত, পরিচিত পরিবেশ—সব মিলিয়ে গড়ে উঠল অনুসন্ধানের সেই অদৃশ্য মানচিত্র, যার শেষ বিন্দুতে দাঁড়িয়েছিলেন একজন পলাতক অভিযুক্ত।
নিয়তির নির্মমতম বিদ্রূপ সম্ভবত এটাই—যে ভালোবাসাকে তিনি নিরাপদ আশ্রয় ভেবেছিলেন, সেটিই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ ফাঁদ।
২. এক ফোঁটা কালো তিল: প্রকৃতির অমোচনীয় স্বাক্ষর
মানুষ রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
জাল পাসপোর্ট বানাতে পারে।
ভুয়া পরিচয় তৈরি করতে পারে।
নতুন জীবন শুরু করতে পারে।
কিন্তু প্রকৃতি মানুষের শরীরে এমন কিছু স্বাক্ষর রেখে দেয়, যা কোনো ছদ্মবেশের অন্তরালে চিরকাল অমোচনীয় থেকে যায়।
এই দীর্ঘ পলায়নের কাহিনিতে সেই নীরব সাক্ষ্য হয়ে উঠেছিল নাকের নিচের একটি কালো তিল।
সেটি ছিল না কেবল একটি જન્મচিহ্ন।
সেটি যেন সময়ের গোপন সাক্ষী।
যে মানুষটি চার দশকের বেশি সময় ধরে নিজের পরিচয়কে হাজারো স্তরের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষুদ্রতম বৈশিষ্ট্যই অতীত ও বর্তমানের মধ্যে অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি করল।
কখনো কখনো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সত্যগুলো সবচেয়ে ক্ষুদ্র চিহ্নেই লুকিয়ে থাকে।
একটি তিল তখন আর তিল থাকে না; তা হয়ে ওঠে ৪৫ বছরের মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রকৃতির নীরব সাক্ষ্য।
৩. দম্ভের উচ্চারণ থেকে আত্মপরিচয়ের স্বীকারোক্তি: ইতিহাসের পূর্ণবৃত্ত
১৯৮১ সালের ৩০ মে।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের রক্তাক্ত রাত।
সেই রাতের এক প্রান্তে ছিল ক্ষমতার দম্ভ, অস্ত্রের গর্জন এবং ইতিহাস বদলে দেওয়ার উন্মত্ততা।
আর চার দশকেরও বেশি সময় পরে বনানীর এক নিঃশব্দ রাতে একই মানুষকে বলতে হলো—
"আমি মোজাফফর... ওর বাবা।"
এই দুটি উচ্চারণের মাঝখানে শুধু সময় নয়, দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নির্মম বৃত্ত।
একসময় যার হাতে ছিল অস্ত্র, শেষ পর্যন্ত তার মুখেই উচ্চারিত হলো নিজের পরিচয়ের স্বীকারোক্তি।
যে মানুষটি একদিন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিরুদ্ধে রাইফেল তুলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত নিজের সন্তানের পরিচয়ের মধ্য দিয়েই উন্মোচিত হলো তার বহুদিনের গোপন অস্তিত্ব।
সময়ের কাছে এর চেয়ে গভীর ব্যঙ্গ আর কী হতে পারে?
শেষ কথা: ইতিহাসের আদালতে সময়ই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক
এই গ্রেপ্তার কেবল একটি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সফল অভিযান নয়।
এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত অধ্যায়ে নতুন আলোকপাতের মুহূর্ত।
এটি স্মরণ করিয়ে দেয়—অপরাধ কখনো শুধু একটি মামলার নথিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; ইতিহাস তার নিজস্ব হিসাবও সংরক্ষণ করে।
সময় ধীর হতে পারে, কিন্তু থেমে থাকে না।
পলায়ন দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু অনন্ত নয়।
মিথ্যার দুর্গ যতই দুর্ভেদ্য হোক, একদিন না একদিন তার দেয়ালে সত্যের প্রথম ফাটল ধরেই।
আর সেই ফাটল কখনো সৃষ্টি হয় অস্ত্রের আঘাতে, কখনো প্রযুক্তির নির্ভুলতায়, কখনো একটি সম্পর্কের টানে, আবার কখনো নাকের নিচের এক ফোঁটা কালো তিলের মতো আপাত তুচ্ছ অথচ অমোচনীয় এক চিহ্নে।
মহাকালের আদালতে সময়ই শেষ সাক্ষী, ইতিহাসই শেষ বিচারক, আর সত্য—শেষ পর্যন্ত—অপরিহার্য।
ডিসিকে /এমজেডএইচ
প্রতিবেদক: অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন
বিশেষ প্রতিনিধি,সিনিয়র সাব-এডিটর, ও কলামিস্ট, দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, চাঁদপুর জেলা বিএনপি।







