সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৮

তাহলে বিজয় মেলা প্রেস ক্লাবের পেছনে করাই উত্তম

অনলাইন ডেস্ক
তাহলে বিজয় মেলা প্রেস ক্লাবের পেছনে করাই উত্তম

চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের বিজয়গাথাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে বিজয় মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। নব্বইয়ের দশকের প্রায় মাঝামাঝি সময়ে যাত্রা শুরু করা এই মেলা দীর্ঘদিন ধরে চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে প্রাণের সঞ্চার করেছে। মাসব্যাপী মেলাকে কেন্দ্র করে সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিনোদন ও দেশীয় ঐতিহ্যের যে সম্মিলন ঘটে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের সংস্কৃতি চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাই বিজয় মেলার আয়োজন অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, মেলার আয়োজন কোথায় হলে জনস্বার্থ, খেলাধুলা, পরিবেশ ও নগরজীবনের স্বাভাবিকতা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকবে?

একসময় হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিজয় মেলার আয়োজন করা হতো। কিন্তু মূল শহরের যানজটসহ নানা ভোগান্তির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মেলাটি চাঁদপুর আউটার স্টেডিয়ামে স্থানান্তর করা হয়। অথচ সেখানেও নতুন করে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। মেলার কারণে প্রায় আড়াই থেকে তিন মাস খেলাধুলা বন্ধ থাকে। শিশু-কিশোর, উদীয়মান খেলোয়াড় ও ক্রীড়াপ্রেমীরা তাদের নিয়মিত অনুশীলন ও খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অন্যদিকে বিজয় মেলা চলাকালে স্টেডিয়াম রোডে অসহনীয় যানজট, শব্দদূষণ এবং পার্শ্ববর্তী কবরস্থানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অর্থাৎ একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অন্য স্থানে আরও কিছু সমস্যার জন্ম হয়েছে।

এ অবস্থায় চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের বক্তব্য ও নির্দেশনা অত্যন্ত সময়োপযোগী। চাঁদপুর স্টেডিয়াম ও আউটার স্টেডিয়াম পরিদর্শনকালে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, খেলার মাঠে কোনো মেলার আয়োজন করতে দেওয়া হবে না। মাঠে খেলাধুলাই চলবে, শিশু-কিশোর ও খেলোয়াড়দের খেলার অধিকার কোনোভাবেই ব্যাহত করা যাবে না। তাঁর এই অবস্থানকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কারণ একটি শহরের সুস্থ সামাজিক বিকাশে খেলাধুলার মাঠের বিকল্প নেই। মেলা প্রতিবছর আয়োজন করা যায়, কিন্তু একটি প্রজন্মের খেলাধুলার সময় ও সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।

তাহলে বিকল্প স্থান কোথায়? আমাদের বিবেচনায়, কবি নজরুল সড়কস্থ চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের পেছনের মাঠ, অর্থাৎ ডাকাতিয়া নদীর উত্তর পাড়ের ফোরশোর ল্যান্ড হতে পারে বিজয় মেলার জন্য একটি উপযুক্ত স্থান। এ স্থানের পক্ষে রয়েছে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ও আয়োজনের দৃষ্টান্ত। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে এখানে বিশাল আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে অতীতে এই মাঠে প্রায় মাসব্যাপী মেলা আয়োজনেরও নজির রয়েছে। ফলে স্থানটি যে বড় ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনের উপযোগী হতে পারে, তা একেবারে অপ্রমাণিত নয়।

ডাকাতিয়ার ফোরশোর ল্যান্ডে বিজয় মেলার আয়োজন করা গেলে একদিকে যেমন স্টেডিয়াম ও আউটার স্টেডিয়ামের খেলাধুলার পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকবে, অন্যদিকে কবরস্থানের পবিত্রতা রক্ষা এবং স্টেডিয়াম রোডকেন্দ্রিক যানজট ও শব্দদূষণের সমস্যাও এড়ানো সম্ভব হতে পারে। অবশ্য মেলা আয়োজনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জায়গাটির ধারণক্ষমতা, নিরাপত্তা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, পার্কিং, পরিচ্ছন্নতা এবং নদীর পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা মনে করি, চাঁদপুরের বিজয় মেলা কেবল একটি বিনোদনমূলক আয়োজন নয়, এটি এ শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্যের অংশ। নব্বইয়ের দশকের প্রায় মাঝামাঝি থেকে যে মেলা চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনকে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখে আসছে, তা বন্ধ হয়ে যাওয়া কাম্য নয়। বরং সময় ও বাস্তবতার প্রয়োজনে এর আয়োজনস্থল পুনর্র্নিধারণ করা উচিত। মেলার ঐতিহ্য রক্ষা করতে গিয়ে খেলাধুলার পরিবেশ নষ্ট করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি মেলার প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করাও যুক্তিযুক্ত নয়।

সুতরাং আমাদের প্রস্তাব, খেলার মাঠে নয়, ডাকাতিয়ার ফোরশোর ল্যান্ডে বিজয় মেলা বা বিজয় উৎসবের আয়োজন করা হোক। এতে সংসদ সদস্যের খেলার মাঠ সংরক্ষণের নির্দেশনার যথাযথ মর্যাদা রক্ষা পাবে, স্থানীয় প্রশাসন ও মেলার উদ্যোক্তারাও বিজয় মেলার আয়োজন অব্যাহত রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।

আমরা চাই, চাঁদপুরে খেলাধুলা চলুক, সংস্কৃতির চর্চা চলুক, বিজয় মেলার ঐতিহ্যও বেঁচে থাকুক। এই তিনটির মধ্যে কোনো বিরোধ নয়, বরং সমন্বয়ই হোক আমাদের প্রত্যাশা। আর সেই সমন্বয়ের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে—তাহলে বিজয় মেলা প্রেস ক্লাবের পেছনে করাই উত্তম।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়