প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৫
নফি-ইসবাত জিকিরের গোপন রহস্য:
কালিমায়ে তাইয়্যিবার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য, তাওহিদ ও আত্মশুদ্ধির পথ!

ভূমিকা: মানবজীবনের প্রকৃত সাফল্য কেবল পার্থিব উন্নতি, ধনসম্পদ কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মহান আল্লাহকে চেনা, তঁার প্রতি অবিচল বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তঁার নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত কল্যাণ। আর এই আত্মিক যাত্রায় আল্লাহর জিকির বা স্মরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেনÑ“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।”- (সূরা আর-রা‘দ, ১৩:২৮)
আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরে ঈমানকে সজীব রাখে, আত্মাকে পাপ থেকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে এবং স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য বৃদ্ধি করে। ইসলামের আধ্যাত্মিক সাধনায় কালিমায়ে তাইয়্যিবার জিকিরÑ“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”Ñবিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাসাউফের পরিভাষায় এই জিকিরের দুটি দিককে বলা হয় ‘নফি’ ও ‘ইসবাত’।
নফি ও ইসবাত: শব্দের অর্থ ও অন্তর্নিহিত শিক্ষা ‘নফি’ আরবি শব্দ। এর অর্থ অস্বীকার করা বা নাকচ করা। আর ‘ইসবাত’ অর্থ প্রতিষ্ঠা করা, স্বীকার করা বা কোনো বিষয়কে সত্য বলে সাব্যস্ত করা।
কালিমায়ে তাইয়্যিবার মধ্যে এই দুটি দিক সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
১. নফিÑ(লা ইলাহা): অর্থÑ“কোনো সত্য উপাস্য নেই।”
এখানে আল্লাহ ছাড়া যাদের উপাস্য বলে গ্রহণ করা হয়, তাদের উপাস্যত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো সৃষ্টি, প্রতিমা, মানুষ, বস্তু কিংবা অন্য কোনো সত্তা আল্লাহর মতো ইবাদতের অধিকারী নয়। একই সঙ্গে মুমিনের কর্তব্য হলো নিজের প্রবৃত্তি, অন্যায় আকাঙ্ক্ষা ও অবৈধ আনুগত্যের দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করা।
২. ইসবাতÑ(ইল্লাল্লাহ) : অর্থÑ“আল্লাহ ছাড়া।” পূর্ববর্তী অংশের সঙ্গে মিলিয়ে পূর্ণ অর্থ দঁাড়ায়Ñ“আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।” অর্থাৎ, একমাত্র মহান আল্লাহই ইবাদতের প্রকৃত অধিকারী। তঁার সঙ্গে কাউকে শরিক না করা, তঁার ওপর ভরসা রাখা এবং তঁার নির্দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা তাওহিদের অপরিহার্য শিক্ষা।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: নফি ও ইসবাতকে কেবল ‘না’ ও ‘হ্যঁা’ বলার ভাষাগত কৌশল হিসেবে দেখলে কালিমার প্রকৃত তাৎপর্য সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। এর মূল শিক্ষা হলোÑমিথ্যা উপাস্যত্বকে প্রত্যাখ্যান করে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করা।
পবিত্র কুরআনে তাওহিদের ঘোষণা মহান আল্লাহ বলেনÑ“তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।”- (সূরা আল-বাকারা, ২:১৬৩)
এই আয়াত কালিমায়ে তাইয়্যিবার মূল বক্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বাস, ইবাদত, আনুগত্য ও জীবনাচরণে তার প্রতিফলন ঘটাতে হয়।
অন্যত্র আল্লাহ বলেনÑ“তোমরা জেনে রাখো, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।”-(সূরা মুহাম্মদ, ৪৭:১৯) অতএব, নফি-ইসবাতের মূল দর্শন হলো তাওহিদকে উপলব্ধি করা এবং সেই উপলব্ধিকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর করা।
নফি-ইসবাতের বাস্তব জীবনের উদাহরণ: আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও কোনো বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করার সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়কে অস্বীকার করার সম্পর্ক দেখা যায়। যেমন, কেউ বললেন, “আমি দঁাড়িয়ে আছি।” এর দ্বারা বোঝা যায়, ওই মুহূর্তে তিনি বসে নেই। এখানে দঁাড়িয়ে থাকার ইতিবাচক বক্তব্যের সঙ্গে বসে থাকার অনুপস্থিতি যুক্ত রয়েছে।
কিন্তু এই সাধারণ উদাহরণটি কেবল নফি ও ইসবাতের ধারণা বোঝানোর জন্য। কালিমায়ে তাইয়্যিবার তাৎপর্য এর চেয়ে অনেক গভীর, কারণ এটি আল্লাহর একত্ব এবং ইবাদতের অধিকার সম্পর্কিত মৌলিক আকিদা।
বাস্তব জীবনে এর শিক্ষা আরও সুদূরপ্রসারী। একজন মানুষ যখন ঘোষণা করেন, “আমি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করি”, তখন তঁার উচিত শিরক থেকে দূরে থাকা, অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করা, সত্যকে গ্রহণ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা। উদাহরণস্বরূপÑ মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকা এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। অন্যায় উপার্জন প্রত্যাখ্যান করে হালাল জীবিকা অর্জন করা। অহংকার ও আত্মপ্রশংসা পরিহার করে বিনয়ী হওয়া। মানুষের অধিকার নষ্ট না করা এবং আমানত রক্ষা করা। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও আল্লাহর বিধান মেনে চলার চেষ্টা করা। এসব কাজ নিজে নিজে কালিমার পূর্ণ অর্থের বিকল্প নয়; বরং তাওহিদে বিশ্বাসী মানুষের চরিত্রে সেই বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন।
আল্লাহর জিকিরের মর্যাদা ও ফজিলত: আল্লাহর জিকিরের গুরুত্ব পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিসে বারবার বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেনÑ“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো।” - (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪১)
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছেÑ “সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।” - (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫২)
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, জিকির মুমিনের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। এটি কেবল নির্দিষ্ট সময়ে কিছু শব্দ উচ্চারণের বিষয় নয়; বরং সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সচেতন থাকা এবং তঁার সন্তুষ্টি অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলার সাধনা।
সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন, বান্দা তঁাকে স্মরণ করলে তিনি বান্দার সঙ্গে থাকেন; বান্দা তঁাকে মনে মনে স্মরণ করলে তিনিও তাকে স্মরণ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৪০৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৭৫) এই হাদিস আল্লাহর জিকিরের মর্যাদা ও বান্দার প্রতি তঁার অনুগ্রহের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”Ñসর্বোত্তম জিকিরের তাৎপর্য : কালিমায়ে তাইয়্যিবা ইসলামের মৌলিক সাক্ষ্যবাক্য। এর মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহর একত্ব এবং তঁার ইবাদতের একচ্ছত্র অধিকার স্বীকার করেন।
তিরমিজি শরিফে বর্ণিত হয়েছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম জিকির হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৩৮৩; হাদিসটির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের মূল্যায়ন রয়েছে।)
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”Ñএই কালিমার শ্রেষ্ঠত্ব শুধু এর শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অর্থ উপলব্ধি করা, অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং সেই বিশ্বাস অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই এর প্রকৃত দাবি। কেউ যদি মুখে কালিমা পাঠ করেন, অথচ প্রতারণা, জুলুম, অহংকার ও মানুষের অধিকার হরণের মতো কাজে লিপ্ত থাকেন, তবে তঁার উচিত নিজের জীবনকে কালিমার শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করা। কারণ প্রকৃত জিকির মানুষের অন্তর ও আচরণে কল্যাণকর পরিবর্তন আনতে সহায়তা করে।
তাসাউফে নফি-ইসবাত জিকিরের পদ্ধতি: ইসলামের আধ্যাত্মিক সাধনায় তাসাউফের বিভিন্ন ধারায় নফি-ইসবাত জিকিরের বিশেষ ব্যাখ্যা ও অনুশীলন প্রচলিত রয়েছে। চিশতিয়া, কাদরিয়া এবং অন্যান্য তরিকার কোনো কোনো ধারায় জিকিরের সময় বসার ভঙ্গি, শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ, শব্দের উচ্চারণ ও মনোসংযোগের জন্য নির্দিষ্ট অনুশীলন অনুসরণ করা হয়। কোনো কোনো পদ্ধতিতে চোখ বন্ধ রেখে একাগ্রতা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। আবার কিছু ধারায় “লা ইলাহা” ও “ইল্লাল্লাহ” উচ্চারণের সময় শরীরের নির্দিষ্ট অংশের দিকে মনোযোগ পরিচালনা করা হয় এবং “ইল্লাল্লাহ” বলার সময় অন্তরে প্রতীকী প্রভাব সৃষ্টির অনুশীলন করা হয়।
তবে এসব জিকিরের পদ্ধতি সম্পর্কে দুটি বিষয় পৃথকভাবে বোঝা/জানা একান্ত প্রয়োজন। প্রথমত, আল্লাহর জিকির করা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ইবাদত। দ্বিতীয়ত, কোনো নির্দিষ্ট তরিকার বিশেষ শারীরিক ভঙ্গি, শব্দ টেনে উচ্চারণ, নির্দিষ্ট অঙ্গের দিকে মনোযোগ পরিচালনা কিংবা অন্তরে প্রতীকী আঘাতের পদ্ধতিকে সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত বলতে হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য শরয়ি দলিল প্রয়োজন।
সুতরাং কোনো তরিকার অনুশীলনকে সর্বজনীন ইসলামী বিধান বা জিকিরের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। এ ধরনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পদ্ধতির প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং শরিয়তের সীমারেখা বিবেচনা করে যোগ্য আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করা সমীচীন।
জিকিরে মনোযোগ, বিনয় ও অন্তরের প্রশান্তি আল্লাহর জিকিরের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল জিহ্বাকে কিছু শব্দ উচ্চারণে অভ্যস্ত করা নয়; বরং অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে সজাগ রাখা, তঁার প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা এবং পাপ থেকে ফিরে আসার শক্তি অর্জন করা।
মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেনÑ“আর তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনয় ও ভীতির সঙ্গে এবং অনুচ্চ স্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ করো; আর উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”- (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:২০৫) এই আয়াত জিকিরে বিনয়, আন্তরিকতা ও আল্লাহর প্রতি সচেতনতার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে জিকিরের সব ধরনকে একই স্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না; যেসব ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ নির্দিষ্ট উচ্চারণ বা পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছে, সেগুলোও যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
একজন মুমিন যখন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পাঠ করেন, তখন তঁার মনে এই উপলব্ধি জাগ্রত হওয়া উচিত যে, জীবনের প্রকৃত আশ্রয় মহান আল্লাহ, ইবাদতের একমাত্র অধিকারী তিনি এবং তঁার সন্তুষ্টি অর্জনই জীবনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
জিকিরের সঙ্গে আমলের সমন্বয়: জিকিরের সুফল তখনই জীবনে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়, যখন তা মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। জিকিরকারী ব্যক্তি যদি মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেন, অন্যের অধিকার নষ্ট করেন কিংবা অহংকারে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন, তবে তঁার নিজের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা অনুসারে ইসলামে ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষা, উত্তম চরিত্র, সততা, দয়া ও ন্যায়পরায়ণতার গুরুত্ব অপরিসীম।
তাই নফি-ইসবাতের শিক্ষা হতে পারেÑঅন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করা এবং ন্যায়কে গ্রহণ করা; অহংকারকে পরিহার করা এবং বিনয়কে ধারণ করা; হারাম থেকে দূরে থাকা এবং হালালকে বেছে নেওয়া। তবে এসব নৈতিক শিক্ষা কালিমার মূল আকিদাগত অর্থের বিকল্প নয়; বরং সেই বিশ্বাসেরই বাস্তব প্রয়োগ।
উপসংহার: নফি-ইসবাত জিকিরের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো তাওহিদের স্বীকৃতিÑমিথ্যা উপাস্যত্বকে অস্বীকার করে একমাত্র মহান আল্লাহকে ইবাদতের অধিকারী হিসেবে মেনে নেওয়া। এই উপলব্ধি মানুষের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে, আত্মশুদ্ধির পথকে উৎসাহিত করে এবং জীবনে সত্য, ন্যায় ও আনুগত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
কালিমায়ে তাইয়্যিবা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি ঈমানের ঘোষণা এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি। এর অর্থ অন্তরে ধারণ করে, জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার মধ্যেই রয়েছে এর প্রকৃত শিক্ষা।
আসুন, আমরা নিয়মিত আল্লাহর জিকির করি, কালিমায়ে তাইয়্যিবার অর্থ অনুধাবন করি, নিজেদের ভুল-ত্রুটি সংশোধন করি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ তাওহিদ, আন্তরিক জিকির, আত্মশুদ্ধি এবং সৎকর্মের তাওফিক দান করুন। আমাদের অন্তরকে তঁার স্মরণে প্রশান্ত করুন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
প্রাথমিক শিক্ষায় দ্বীনি শিক্ষা হোক
মুফতি মুহা: আবু বকর বিন ফারুক
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর নৈতিকতা শিক্ষার প্রাণ। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল ভালো ফলাফল অর্জন, উচ্চতর ডিগ্রি লাভ কিংবা অর্থ উপার্জনের যোগ্যতা অর্জন নয়; বরং একজন মানুষকে সৎ, আদর্শবান, নৈতিকতাসম্পন্ন ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে দ্বীনি শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে শিশুর জীবনের প্রাথমিক পর্যায়, অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সময়টি তার জীবন গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময়েই শিশুর মনে বিশ্বাস, নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও ভালো-মন্দের পার্থক্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।
তাই প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে পবিত্র কুরআন শিক্ষা, নামাজ, প্রয়োজনীয় দোয়া, মৌলিক দ্বীনি জ্ঞান, নৈতিকতা, আদর্শ চরিত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। প্রাথমিক স্তরে দ্বীনি শিক্ষার ভিত্তি মজবুত হলে পরবর্তী সময়ে একজন শিক্ষার্থী মাদরাসা কিংবা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানÑযেখানেই পড়াশোনা করুক না কেন, সে নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও নৈতিক আদর্শ ধরে রাখতে পারবে।
দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব : ইসলাম মানুষকে জ্ঞান অর্জনের প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে। দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ তাআলাকে চিনতে শেখে, ইবাদতের নিয়মকানুন জানতে পারে এবং জীবনের সঠিক পথ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- অর্থ: “হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” Ñসুরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১৪।
এই আয়াত থেকে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার শিক্ষা পাওয়া যায়। একজন শিশুর শিক্ষাজীবনের সূচনালগ্ন থেকেই তার মধ্যে জ্ঞান অর্জনের আগ্রহ সৃষ্টি করা উচিত। পাশাপাশি তাকে এমন জ্ঞান দিতে হবে, যা তার বিশ্বাস, ইবাদত, চরিত্র ও দৈনন্দিন জীবনকে সুন্দর করে তুলবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑ অর্থ: “প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ।” Ñসুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২৪। তবে দ্বীনের অপরিহার্য জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব-এ বিষয়টি ইসলামে সুপ্রতিষ্ঠিত। একজন শিশুর জন্য নিজের ঈমান-আকিদা, পবিত্রতা, নামাজ ও দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় দ্বীনি বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়েই দ্বীনি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে: শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা পরিবার, শিক্ষক ও চারপাশের পরিবেশ থেকে যা দেখে, তা-ই শেখার চেষ্টা করে। শৈশবে শেখা ভালো অভ্যাস ও নৈতিক শিক্ষা পরবর্তী জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে। তাই প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষা সমন্বয় করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বয়স ও সামথর্য অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিষয়গুলো শেখার ব্যবস্থা থাকা উচিতÑ
১. বিশুদ্ধভাবে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত শেখা।
২. ঈমান-আকিদা ও ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো জানা।
৩. নামাজের নিয়মকানুন ও প্রয়োজনীয় মাসআলা শেখা।
৪. অজু, গোসল, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার বিধান জানা।
৫. দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দোয়া ও হাদিস মুখস্থ করা।
৬. পিতা-মাতা, শিক্ষক ও বড়দের সম্মান করতে শেখা।
৭. সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ধৈর্য, ক্ষমা ও সহানুভূতির চর্চা করা।
৮. মিথ্যা, প্রতারণা, গালিগালাজ, হিংসা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে শেখা।
৯. প্রতিবেশী, সহপাঠী ও অসহায় মানুষের প্রতি সদাচরণ করা।
১০. দেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলা। এভাবে প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বীনি জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব।
সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া অভিভাবকদের দায়িত্ব : সন্তানের শিক্ষা ও চরিত্র গঠনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় শিশুকে জ্ঞান দেয়, কিন্তু পরিবারের পরিবেশ তার আচরণ ও অভ্যাস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সন্তানকে শুধু স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তার ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন- অর্থ: “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।” -সুরা আত-তাহরিম, আয়াত: ৬। এই আয়াতের শিক্ষা হলো, নিজেদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনায় সহায়তা করতে হবে। সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া, নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখানো এই দায়িত্ব পালনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- অর্থ: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”-সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৯। সুতরাং অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই দ্বীনি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজেদের আচরণের মাধ্যমে তাদের সামনে উত্তম আদর্শ উপস্থাপন করা।
নামাজ শিক্ষা ও অনুশীলনের গুরুত্ব : নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। শৈশব থেকেই নামাজের শিক্ষা ও অভ্যাস গড়ে তোলা হলে পরবর্তী জীবনে তা ধরে রাখা সহজ হয়। তবে নামাজ শেখানোর ক্ষেত্রে বয়সোপযোগী পদ্ধতি, ভালোবাসা, ধৈর্য ও উৎসাহকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- অর্থ: “তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও।” -সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫।
এই হাদিস শিশুদের শৈশব থেকেই নামাজের প্রশিক্ষণ দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে নামাজের পদ্ধতি, নামাজের দোয়া, সূরা, তাশাহুদ ও প্রয়োজনীয় মাসআলা শেখানোর ব্যবস্থা থাকা দরকার।
নৈতিকতা ও আদর্শ চরিত্র গঠনে দ্বীনি শিক্ষার ভূমিকা : শিক্ষিত হওয়া আর নৈতিকতাসম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থী অনেক জ্ঞান অর্জন করেও যদি মিথ্যা বলে, অন্যের অধিকার নষ্ট করে, দূর্বলকে অপমান করে কিংবা অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। ইসলাম জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি উত্তম চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছি।” -মুসনাদ আহমাদ।
এই হাদিসের শিক্ষা অনুসারে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সত্যবাদিতা, শালীনতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তোলা জরুরি। কুরআন-হাদিসের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুরা বুঝতে শিখবে - সৎ হওয়া কেন জরুরি, অন্যের অধিকার রক্ষা করা কেন কর্তব্য এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকা কেন প্রয়োজন।
মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় : প্রাথমিক পর্যায়ে দ্বীনি শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে পরবর্তী সময়ে অবশ্যই মাদরাসায় পড়তে হবে। বরং প্রত্যেক মুসলিম শিশুর জন্য মৌলিক দ্বীনি শিক্ষা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। কেউ মাধ্যমিক পর্যায়ে মাদরাসায় পড়বে, কেউ সাধারণ স্কুল-কলেজে পড়বে, আবার কেউ উচ্চশিক্ষা অর্জন করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক কিংবা অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হবে। যে পথেই সে এগিয়ে যাক না কেন, তার মধ্যে কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকা জরুরি। একজন চিকিৎসক যদি দক্ষতার পাশাপাশি সৎ ও মানবিক হন, একজন শিক্ষক যদি জ্ঞানের পাশাপাশি আদর্শবান হন, একজন ব্যবসায়ী যদি লাভের পাশাপাশি সততা বজায় রাখেন এবং একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার পাশাপাশি ন্যায়পরায়ণ হন, তাহলে সমাজ উপকৃত হবে। অতএব, দ্বীনি শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে, সুশিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ গঠনের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। পরিশেষে বলব, শিশুরাই আগামী দিনের জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের হাতে আগামী দিনের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব অর্পিত হবে। তাই তাদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিয়ে গড়ে তুললেই চলবে না; পাশাপাশি ঈমান, ইবাদত, নৈতিকতা, মানবিকতা ও আদর্শ চরিত্রের শিক্ষাও দিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায় তথা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য বয়সোপযোগী দ্বীনি শিক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মক্তব ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে এ শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত-প্রত্যেক শিশু কুরআন পড়তে শিখবে, নামাজের শিক্ষা গ্রহণ করবে, দ্বীনের মৌলিক বিধান জানবে, নৈতিকতা ও আদর্শ চরিত্রে গড়ে উঠবে এবং পরবর্তী জীবনে যে শিক্ষাধারাতেই অধ্যয়ন করুক না কেন, একজন সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। মনে রাখতে হবে, প্রাথমিক পর্যায়ে দ্বীনি শিক্ষার বীজ বপন করা গেলে ভবিষ্যৎ জীবনে তার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। তাই আসুন, শিশুদের হাতে বই তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের হৃদয়ে ঈমান, জীবনে আমল এবং চরিত্রে নৈতিকতার আলো জ্বালিয়ে দিই। তাহলেই গড়ে উঠবে আদর্শ প্রজন্ম, সমৃদ্ধ সমাজ এবং নৈতিকতা সম্পন্ন জাতি।
লেখক : ইমাম ও খতিব, বিষ্ণুপুর মনোহরখাদী মদিনা বাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, প্রধান শিক্ষক : দারুসসুন্নাত বিসমিল্লাহ মডেল মাদরাসা। চঁাদপুর সদর, চঁাদপুর।
পবিত্র জমাদিউল আউয়াল মাসের গুরুত্ব ও ফজিলত!
দুধরচকী ছাহেব।
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ, আরবের শীতকাল জমাদিউল আউয়াল। আরবি বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের পঞ্চম মাস হলো ‘জমাদিউল আউয়াল’। এর জোড়া মাস হলো ‘জমাদিউস সানি’, এটি হিজরি আরবি সনের ষষ্ঠ মাস। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে এই মাস দুটি ‘জমাদিউল আউয়াল’ ও ‘জমাদিউস সানি’ নামে সমধিক পরিচিত।
এর বাংলা অর্থ হলো প্রথম জমাদা ও দ্বিতীয় জমাদা বা প্রথম শীত ও দ্বিতীয় শীত; অর্থাৎ শীতকালের প্রথম মাস ও শীতকালের দ্বিতীয় মাস। (আল মুনজিদ)। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তুমি পর্বতমালা দেখছ, মনে করছ উহা স্থির অচল, অথচ তারা মেঘপুঞ্জের ন্যায় সঞ্চারমান। ইহা আল্লাহরই সৃষ্টি নৈপুণ্য, যিনি সমস্ত কিছুকে করেছেন সুষম। তোমরা যা করো সে সম্পর্কে তিনি সম্যক অবগত।’ (সুরা-২৭ নমল, আয়াত: ৮৮)।
শীত ও গ্রীষ্ম খোদা প্রদত্ত প্রকৃতির অবদান। এর প্রতিটিতে রয়েছে কুদরতের নিদর্শন ও নিগূঢ় রহস্য। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যেহেতু কুরাইশদের অনুরাগ রয়েছে! তাদের আগ্রহ আছে শীত ও গ্রীষ্মে ভ্রমণের। অতএব তাদের ইবাদত করা উচিত এই (কাবা) গৃহের রবের। যিনি তাহাদিগকে ক্ষুধায় অন্ন দান করেন এবং শঙ্কায় নিরাপত্তা দান করেন।’ (সুরা-১০৬ কুরাইশ, আয়াত: ১-৪)।
‘জমাদা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ স্থির, অবিচল, দৃঢ়, কঠিন; জমাটবদ্ধ, নিস্তব্ধ, নীরব, নিথর, পাথর; শুষ্ক, খুষ্ক, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, বিশ্বস্ত: শীতল, শীতকাল, শীতবস্ত্র; কার্পণ্য, বদ্ধমুষ্টি; কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অস্থির সময়, চিন্তাযুক্ত অবস্থা। যেহেতু আরব দেশে শীতকালে প্রচণ্ড শীতে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে তুষারে পরিণত হয় এবং তরল পানি জমে বরফে পরিণত হয়; জড় পদার্থ জমে কঠিন হয়ে যায়; উদ্ভিদ ও জীব নিথর হয়ে যায়; প্রাণীরা নীরব হয়ে যায়; তাই এই মাসকে এই নামে নামকরণ করা হয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রা.) বলেন, ‘জমাদা’ হলো আরব দেশের শীতকাল, এটি বসন্তের নিকটবর্তী; গ্রীষ্মের পূর্বে। দুই ভূমির সীমানা বা দুই বাড়ির সীমানাকে এবং নিকট প্রতিবেশীকেও ‘জমাদা’ বলা হয়।
এ মাসের ফজিলত সম্পর্কে বিভিন্ন কিতাবে নানা বিষয় বর্ণিত আছে। নেক আমল ও সৎকর্ম দ্বারা সাধারণ সময়ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। আমরা জানি, নতুন বছরে নির্ধারিত দোয়া পড়া হয় এবং নতুন মাসে নির্দিষ্ট দোয়া পড়া হয়। আসলে জীবনের প্রতিটি দিনই নতুন দিন, প্রতিটি সময়ই নতুন; তাই নেক আমলের মাধ্যমে সময়কে মূল্যবান করে তুলতে হবে।
মূলত এই মাসের নামের মাঝে যেসব অর্থ বিদ্যমান তা তিন ভাগে বিভাজনযোগ্য। যথা: ইতিবাচক, নেতিবাচক ও মধ্যবর্তী বা ক্রান্তিকালীন। সুতরাং আমাদের করণীয় হবে ইতিবাচক অর্থে উদ্বুদ্ধ হয়ে বেশি বেশি নেক কাজ বা সৎকর্ম সম্পাদনে ব্রতী হওয়া। নেতিবাচক অর্থগুলো অনুধাবন করে নিজের মধ্যে থাকা সব নেতিবাচক অভ্যাস ও বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের প্রতি মনোনিবেশ করা। ক্রান্তিকাল বা অন্তর্বর্তীকাল বিবেচনা করে সদা সতর্ক ও সজাগ থাকা এবং ইতিবাচক পরিবর্তন ও সাফল্য লাভের জন্য সদা সক্রিয় থাকা।
এ মাসের আমল হলো নফল নামাজ, নফল রোজা, দান-খয়রাত ইত্যাদি। পঁাচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি পঁাচ ওয়াক্ত নফল নামাজ, তথা তাহাজ্জুদ, ইশরাক, চাশত, জাওয়াল ও আউয়াবিন নামাজ আদায় করা। কাজা রোজা থাকলে পুরা করা; মান্নত রোজা থাকলে তা আদায় করা। মাসের ১ তারিখ, ১০ তারিখ, ২৯ ও ৩০ তারিখ রোজা রাখা এবং চঁাদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ ‘আইয়ামে বিদ’ বা শুভ্র সময়ের বাবা হজরত আদম (আ.)-এর সুন্নাত রোজা করা। সপ্তাহে প্রতি সোমবার, বৃহস্পতি ও শুক্রবার নফল রোজা পালন করা।
এ মাসের ফজিলত সম্পর্কে বিভিন্ন কিতাবে নানা বিষয় বর্ণিত আছে। নেক আমল ও সৎকর্ম দ্বারা সাধারণ সময়ও অসাধারণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। আমরা জানি নতুন বছরে নির্ধারিত দোয়া পড়া হয় এবং নতুন মাসে নির্দিষ্ট দোয়া পড়া হয়। আসলে জীবনের প্রতিটি দিনই নতুন দিন, প্রতিটি সময়ই নতুন; তাই নেক আমলের মাধ্যমে সময়কে মূল্যবান করে তুলতে হবে।
জিকির আজকার, দোয়া-কালাম, দরুদ ও সালাম, তাসবিহ তাহলিল, তাওবা ইস্তিগফার, খতম তিলাওয়াত, সদকা, খয়রাত ইত্যাদি আমলের মাধ্যমে মাস অতিবাহিত করলে নিশ্চিত এর বরকত, ফজিলত ও কল্যাণ লাভ হবে। অন্যথায় সময়ের অপচয়ের জন্য অনুতাপ ও অনুশোচনা করতে হবে।
হাদিস শরিফে আছে, পরকালে নেককার মুমিন জান্নাতিদের কোনো আফসোস থাকবে না; তঁাদের আফসোস থাকবে শুধু ওই সময়ের জন্য, যে সময়গুলো তারা নেক আমল ছাড়া অতিবাহিত করেছেন বা বেহুদা কাটিয়েছেন। (তিরমিজি)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা যেন আমাদের সকলকে উপরিউক্ত আলোচনার প্রতি আমল করার তাওফিক দান করেন আমীন।
লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতীব: সিলেট নগরীর কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ রহ. মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল: হযরত শাহজালাল রহ. ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা উপশহর সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক: তৈয়ব কামাল হযরত শাহজালাল রহ. লতিফিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা সিলেট।
শিশুর নাম রাখা নিয়ে যে নির্দেশনা দিয়েছেন নবীজি (সা.)
মুফতি মুহাম্মাদ আল আমিন নূরী
সন্তানের জন্য বাবা-মার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় উপহার হলো একটি সুন্দর নাম। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তাদের পিতৃ পরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সঙ্গত। যদি তোমরা তাদের পিতৃ পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে তোমাদের কোনো বিচ্যুতি হলে তাতে তোমাদের কোনো গোনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত হলে ভিন্ন কথা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা আহযাব : ৫)।
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের ও তোমাদের পিতৃ পুরুষের নাম ধরে কেয়ামতের দিন ডাকা হবে। অতএব, তোমরা সুন্দর নাম নির্বাচন করো।’ (মুসনাদে আহমাদ : ২১৬৯৩)। সন্তানের সুন্দর নাম নির্বাচন করা পিতার কর্তব্য ও দায়িত্ব।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) ও আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘সন্তানের সুন্দর নাম রাখা ও তার উত্তম তারবিয়াতের ব্যবস্থা করা বাবার ওপর সন্তানের হক।’ (মুসনাদে বাযযার : ৮৫৪০)।
সন্তান জন্ম নেওয়ার ৭ দিনের মাথায় সুন্দর নাম রাখা মুস্তাহাব। তবে প্রথম দিন ও অন্য যে কোনো দিন নাম রাখাও নাজায়েজ নয়। এমনকি জন্মের আগেও নাম রাখা জায়েজ। (সুনানে আবু দাউদ : ২৮৪০, তাসমিয়াতুল মাওলুদ ১/১৮)।
কোনো আলেম ও নেককার ব্যক্তির পরামর্শ মতো নাম রাখা শ্রেয়। কেননা, সাহাবায়ে কেরাম তাদের সন্তানদের নাম নির্বাচনের জন্য নবিজি (সা.)-এর কাছে সন্তানকে পেশ করতেন।
সর্বোত্তম নাম নির্বাচন করা কর্তব্য। কেননা, নামের প্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে। হাদিস শরিফে আছে, ‘সর্বোত্তম নাম হলো আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান।’ (ইবনে মাযাহ : ৩৭২৮)।
ওই নাম যা আল্লাহর দাসত্ব প্রকাশ করে অর্থাৎ যে নামের সঙ্গে ‘আব্দ’ শব্দ সংযুক্ত থাকে এমন নাম রাখা মুস্তাহাব। তবে আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কারও নামে আব্দ শব্দ যোগ করা জায়েজ নেই। যেমন আবদুস শামস ইত্যাদি রাখা জায়েজ নেই। (তাসমিয়াতুল মাওলুদ পৃ. ১৫, মালাবুদ্দা মিনহু)।
হামদ বা আল্লাহতায়ালার প্রশংসা বোঝায় এমন নাম রাখা ভালো। যেমন মাহমুদ, হামেদ, আহমাদ ইত্যাদি। (তাসমিয়াতুল মাওলুদ পৃ. ১৫, মালাবুদ্দা মিনহু)। নবি-রাসূলদের নামে নাম রাখা মুস্তাহাব। যেমন মুহাম্মাদ, ইবরাহিম, ইসমাঈল ইত্যাদি। তবে নবিদের নামের মধ্যে সর্বোত্তম হলো, আমাদের নবির নামে নাম রাখা। (আবু দাউদ : ৪৯৫০, তাসমিয়াতুল মাওলুদ পৃ. ১৫)।
কোনো নেককার ব্যক্তির নামে নাম রাখার প্রচলনও সাহাবিদের মধ্যে ছিল। সুতরাং সুন্দর অর্থবহ যে কোনো নাম রাখা যায়। (মুসলিম : ৫৭২১)। আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট এমন নাম রাখা যাবে না-যেমন আল্লাহ, রহমান, রহিম ইত্যাদি। আবদুর রহমান ও আবদুর রহিম রাখা যাবে।
আল্লাহর দুশমনের নামে নাম রাখা যাবে না-যেমন ফেরাউন, হামান, কারুন ইত্যাদি। মূর্তির নামে নাম রাখা যাবে না-মালিকুল আমলাক, শাহেন শাহ, আহকামুল হাকিমিন, রাজাধিরাজ ইত্যাদি নাম রাখা নিষেধ। (মুসলিম : ৫৭৩৪, তাসমিয়াতুল মাওলুদ পৃ. ২১)।
মন্দ নামগুলো পরিবর্তন করে ভালো নাম রাখা নবিজির সুন্নত। (মুসলিম : ২১৩৯)। ইমাম নববি (রহ.) বলেন, মৃত অবস্থায় জন্ম নেওয়া সন্তানের নাম রাখা মুস্তাহাব। অনুরূপ গর্ভে মারা যাওয়া সন্তানের নাম রাখা মুস্তাহাব। যদি বোঝা না যায় যে, সে ছেলে না মেয়ে, তাহলে এমন নাম রাখার নিয়ম, যা ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য রাখা হয়। যেমন তালহা, উমাইরা ইত্যাদি। (আল আজকার পৃ. ২৮৫)।
যদি ব্যক্তি এটা খারাপ মনে না করে বা মনে কষ্ট না নেয়, তাহলে কোনো নামে তারখিম অর্থাৎ নামের কোনো অক্ষর বাদ দিয়ে সংক্ষেপে বলা জায়েজ। যেমন খাদিজাকে খাদি বলা। (বোখারি : ২৮৫)। ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, কাউকে ভালো উপাধী দেওয়া বৈধ। আর মন্দ উপাধী দেওয়া হারাম। আর এ ব্যাপারেও ওলামায়ে কেরাম একমত যে, পরিচয়ের এমনটি করা জায়েজ। (সূরা হুজুরাত : আয়াত-১১, আল আযকার পৃ. ২৯০)।
ছেলের নামে কুনিয়াত (উপনাম) রাখা বৈধ। আমাদের নবিজি (সা.)-এর উপনাম ছিল আবুল কাসেম। অনুরূপ ছেলের নাম ছাড়া অন্য নামে উপনাম রাখাও বৈধ। (মুসলিম : ৫৭৪৭)। ইমাম নববি (রহ.) বলেন, অপরিচিত ব্যক্তিকে এমন শব্দে সম্বোধন করা উচিত, যাতে ব্যক্তি কষ্ট না পায় এবং মিথ্যার আশ্রয় না হয়। যেমন, হে ভাই। ওই ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী যে নাম সঠিক মনে হয়। যেমন রিকশাচালককে রিকশাওয়ালা ভাই বলা। (মুসনাদে আহমাদ : ২০৭৮৪)।
সমাজে বাবা-মার নামের প্রথম অক্ষরের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখার প্রচলন লক্ষ করা যায়। ইসলামে এর কোনো বিশেষত্ব নেই। তবে জরুরি মনে না করে এমনটি করা দোষের কিছুও নয়। (আহকামে জিন্দেগি)। সূত্র : যুগান্তর।
তাহাজ্জুদ পড়ার ফজিলত
আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নফল ইবাদত রাতের নামাজ তাহাজ্জুদ। তাহাজ্জুদ অন্তর ও আত্মার শক্তি সঞ্চয়ের শক্তিশালী মাধ্যম। প্রাণহীন হৃদকে সজীব করার এক শ্রেষ্ঠতম উপায়। আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার এক অনন্য মধ্যম সালাতুত তাহাজ্জুদ। নবিজী বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজ।
রাতের নামাজ তাহাজ্জুদের ঘোষক স্বয়ং আল্লাহ। রাতের শেষাংশে মহান রব দুনিয়ার আকাশে নেমে মানুষকে নামাজের জন্য, তঁাকে ডাকার জন্য, ক্ষম প্রার্থনার জন্য আহ্বান করেন। হাদিসে এসেছে-
নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার তাঝে কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।’ (বুখারি, মুসলিম)
মহান আল্লাহ রাতের নামাজের গুরুত্ব কোরআনুল কারিমে এভাবে তুলে ধরেছেন-‘নিশ্চয়ই রাতের বেলার জেগে ওঠা আত্মসংযমের জন্য বেশি কার্যকর এবং স্পষ্ট কথা বলার জন্য বেশি উপযোগী।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল : আয়াত ৬)
‘আর রাহমান-এর বান্দা তারাই, যারা জমিনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম; আর তারা রাত অতিবাহিত করে তাদের রব-এর উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে এবং দঁাড়িয়ে থেকে।’ (সুরা ফুরকান : আয়াত ৬৩-৬৪)
তাহাজ্জুদ রাতের নামাজ। ফরজের পর আল্লাহ তাআলা রাতের নামাজের প্রতি যথাযথ গুরুত্বারোপ করেছেন। তাই মুমিন মুসল্লির কাছে রাতের নামাজ তাহাজ্জুদ-এর গুরুত্ব ও ফজিলত অনেক বেশি।
তাহাজ্জুদ পড়ার সময়
তাহাজ্জুদ নামাজ রাতে পড়তে হয়। এটি এশার নামাজ আদায় করার পর থেকে ভোর হওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ফজরের সময় হওয়ার আগ পর্যন্ত পড়া যায়। তবে তাহাজ্জুদ নামাজ অর্ধ বা দ্বিপ্রহরের সময় পড়া ভালো। সর্বোত্তম হচ্ছে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়া।
তাহাজ্জুদের রাকাত
তাহাজ্জুদ নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে ইসলামিক স্কলারদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। তবে অধিকাংশ স্কলারের মতে, তাহাজ্জুদ সর্বনিম্ন দুই রাকাত আর সর্বোচ্চ আট রাকাত। এর বেশিও পড়া বৈধ। নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো ৪ রাকাত, কখনো ৮ রাকত এবং কখনো ১২ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়তেন। কিন্তু যদি কেউ রাতে ইশার পর থেকে শেষ রাতের মধ্যে ২ রাকাত নামাজ পড়ে তবে তা তাহাজ্জুদ আদায় হবে। হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এশার পর দুই বা ততোধিক রাকাত নামাজ পড়ে নেয়, সে হবে তাহাজ্জুদের ফজিলতের অধিকারী।
তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার নিয়ম
তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সুরা বা নিয়ম নেই। অন্যান্য ওয়াক্তের নামাজের মতো রাতের নামাজ তাহাজ্জুদ পড়তে হয়। সুরা ফাতেহার সঙ্গে যে কোনো সুরা মিলিয়ে এ নামাজ পড়া যায়। তবে উত্তম হলো দীর্ঘ বা লম্বা কেরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া। যদি কারো বেশি আয়াত বা লম্বা সুরা মুখস্ত থাকে তবে তাদের জন্য লম্বা কেরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া উত্তম। কারণ নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় বড় বড় সুরা দিয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন। তাই আমাদেরও বড় সুরা মুখুস্ত করে, তা দিয়ে তাহাজ্জুত আদায় করা উত্তম।
মনে রাখতে হবে
রাতের নামাজ তাহাজ্জুদ এতোই মর্যাদাবান যে, এ নামাজ পড়া মুসল্লির দোয়া বা চাওয়া-পাওয়া লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। আল্লাহ তাআলা তাহাজ্জুদ পড়া ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেন। দোয়া ও মনের আশা কবুল করেন।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে যথাযথভাবে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার তাওফিক দান করুন। কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনার উপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন। সূত্র : যুগান্তর।








