প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৪
দুর্গাপূজা ও মহিষাসুরের ভিন্ন কাহিনী এবং আদিবাসী প্রসঙ্গ

সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালিদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। অসুর বধ এবং দেবী দুর্গা দুর্গাপূজার অন্যতম মূল প্রসঙ্গ। অনিল অসুর বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে বলছিলেন, “আসলে মানুষের মনে ওরকমই একটা ছবি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে যে আমরা খলনায়ক, আমাদের ওইরকম দানবের মতো দেখতে। যারা মহিষাসুরসহ আমাদের পূর্বপুরুষদের পরাজিত করে আমাদের জমি-জঙ্গল দখল করে নিয়েছে, মানুষের মনে অসুর সম্পর্কে এরকম ধারণাটা তারাই তৈরি করেছে। কিন্তু সেটা তো আসলে আর্য-অনার্যদের লড়াইতে আমাদের ছলচাতুরি করে পরাজিত করার কাহিনী।”
এই উপজাতির সদস্য এবং নৃতত্ত্ববিদরা মনে করেন যে, হিন্দু বাঙালিদের দুর্গাপূজায় যে মহিষাসুর বধের কাহিনী রয়েছে, তিনি এই অসুর উপজাতিরই পূর্বপুরুষ—মহাবিক্রমশালী এক আদিবাসী রাজা ছিলেন। তবে হিন্দু পুরাণ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মধ্যে আবার দুর্গাপূজার কাহিনী আদৌ আর্য-অনার্যদের লড়াই কি না, তা নিয়ে মতভেদ আছে। জ্যোতিরাও ফুলে অথবা বি. আর. আম্বেদকরের মতো দলিত-আদিবাসী শ্রেণির দৃষ্টিকোণ থেকে যারা ইতিহাস বিশ্লেষণ করেন, তারা এই কাহিনীকে আর্য-অনার্যদের মধ্যে লড়াই বললেও হিন্দু শাস্ত্রের পণ্ডিতরা তা মানেন না।
অনিল অসুর ‘অসুর’ তফসিলি উপজাতির মানুষ। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার আর ঝাড়খণ্ডে তফসিলি উপজাতিদের যে সরকারি তালিকা আছে, তার মধ্যে প্রথম নামটিই এই অসুর উপজাতির। ঝাড়খণ্ডের গুমলা জেলায় থাকেন অনিল অসুর। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত; ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই)-এর সদস্য। দুবার বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থীও হয়েছিলেন। তারা পেশাগতভাবে পাথর গলিয়ে লোহা বের করার কাজ করে থাকেন। সেই প্রাচীন পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে রক্ষা করেন তারা। তবে অনেক অসুরই এখন অন্যান্য পেশা বেছে নিয়েছেন।
“যেমন আমার বাবা তো স্কুলশিক্ষক ছিলেন। বাবার কথায় মনে পড়লো, একবার দুর্গাপূজার সময়ে আমার মা পূজা দিতে যাচ্ছিলেন, বাবা কিছুটা স্বগতোক্তি করেই বলেছিলেন— ‘হুঁঃ, চলল আমাদের পূর্বজদের হত্যাকারিণীকে পূজা দিতে!’ অর্থাৎ, আমাদের সম্প্রদায় এখনও বিশ্বাস করে যে দুর্গা আমাদের পূর্বপুরুষ মহিষাসুরকে হত্যা করেছিলেন। এরপর থেকে আর কখনও আমার মা দুর্গাপূজা দিতেন না।”
“আমরা মহিষাসুরেরও পূজা করি না। তার কোনো বিগ্রহ বা প্রতিকৃতি অসুর পরিবারে থাকে না। আমরা শুধু মনে মনে তাকে প্রণাম জানাই, স্মরণ করি। তবে এখন আদিবাসী সমাজ দুর্গাপূজার সময়ে যে অসুরপূজা বা অসুর স্মরণ করছে, সেগুলো একটা পৃথক সামাজিক আন্দোলনের অংশ। এই সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে আর্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটা পাল্টা আখ্যান তৈরি হচ্ছে,” বলছিলেন অনিল অসুর।
হিন্দু পুরাণে যেমন মহিষাসুর আর দেবী দুর্গার যুদ্ধের কাহিনী আছে, আদিবাসী লোকগাথাতেও সেই কাহিনী রয়েছে; কিন্তু দুটি কাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বিপরীত।
হিন্দু পুরাণের গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপনের মতে, “মহিষাসুর ছিলেন অত্যন্ত বলশালী এবং প্রজাবৎসল এক রাজা। আদিবাসীদের প্রচলিত লোকগাথা অনুযায়ী, এক গৌরবর্ণা নারীকে দিয়ে তাদের রাজাকে হত্যা করা হয়েছিল।”
“এক গৌরবর্ণা নারীই যে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন, তা হিন্দু পুরাণেও আছে। দেবী দুর্গার যে প্রতিমা গড়া হয়, সেখানে দুর্গা গৌরবর্ণা, টিকলো নাক—যেগুলো আর্যদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য। দুর্গার আরেক নাম সেজন্যই গৌরী। অন্যদিকে দুর্গাপূজায় মহিষাসুরের যে মূর্তি গড়া হয়, সেখানে তার গায়ের রং কালো, কোঁকড়ানো চুল, পুরু ঠোঁট। এগুলো সবই অনার্যদের বৈশিষ্ট্য,” ব্যাখ্যা করছিলেন তথ্যচিত্র নির্মাতা সুমিত চৌধুরী।
শরদিন্দু উদ্দীপন আরও বলছিলেন যে, আর্যরা ভারতে আসার পরে তারা কোনোভাবেই মহিষাসুরকে পরাজিত করতে পারছিলো না। তাই তারা একটি কৌশল নেয়; একজন নারীকে তারা ব্যবহার করে মহিষাসুরকে বধ করার জন্য। “রাজা মহিষাসুরের সময়ে নারীদের অত্যন্ত সম্মান দেওয়া হতো। একজন রাজা কোনো নারীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না বা তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না—এরকমটাই ধারণা ছিলো আর্যদের। তাই তারা এক নারীকে এই কাজে ব্যবহার করেছিল বলেই আদিবাসী সমাজ বিশ্বাস করে,” বলছিলেন হিন্দু পুরাণ গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপন।
তার কথায়, দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনী আসলে আর্য-অনার্যদের লড়াইয়ের কাহিনী। এই একই কথা বলেছেন অনিল অসুরও। শরদিন্দু উদ্দীপন অবশ্য দলিতদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুরাণের গবেষণা করেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ঊনবিংশ শতকে প্রথম পৌরাণিক কাহিনীগুলোর বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করেছিলেন সামাজিক কর্মী ও ইতিহাসবিদ জ্যোতিরাও ফুলে।
হিন্দুদের অবতার ও দেবদেবীদের আলোকে তিনি বিশ্লেষণ করেছিলেন ভারতের আদিবাসীদের লোকগাথা ও ইতিহাস। তারপরে মি. ফুলের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যান ভারতের সংবিধান রচয়িতা বি. আর. আম্বেদকর। পুরাণ ও লোককথার ওপরে ভিত্তি করে তিনি আর্য ও অনার্যদের সংঘাতকে বিশ্লেষণ করেছিলেন। তার লেখাতেই প্রথম বলা হয়—দানব, রাক্ষস, দৈত্য, কিন্নর, নাগ, যক্ষ এরা সব মিলে যে অসুর সম্প্রদায়, তারা আসলে মানুষই ছিলেন। তিনিই প্রথম এই অসুর সম্প্রদায়ের লড়াইয়ের ইতিহাস তুলে ধরেন।
হিন্দু শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ও পশ্চিমবঙ্গ বৈদিক অ্যাকাডেমির প্রধান নবকুমার ভট্টাচার্য বলছিলেন যে, আর্য-অনার্যদের লড়াইয়ের যে তত্ত্ব, সেটা কিন্তু আগে শোনা যায়নি। “বেদ, পুরাণ, উপনিষদে ছড়িয়ে রয়েছে দুর্গাপূজার কাহিনী। আবার বেদের মধ্যেই এটাও আছে যে, অসুর মানেই খারাপ—তা কিন্তু নয়। মহিষাসুর বধের কাহিনী আমরা যা দেখি, সেটা কিন্তু পুরো অসুর সম্প্রদায়কে বধের ঘটনা নয়। এটা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির লড়াইয়ের ইতিহাস।”
“পুরাণে তো আমরা ভালো অসুরও দেখতে পাই, যেমন ময়দানব। তিনিও তো অসুরই ছিলেন; কিন্তু হিন্দুরা কারিগরি বিদ্যার দেবতা বলে যাকে পূজা করে, সেই বিশ্বকর্মার পরেই স্থান ছিল এই অসুর ময়দানবের। তিনি কারিগরি বিদ্যায়, নির্মাণের ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষ ছিলেন।”
চণ্ডী এবং কালিকাপুরাণ উদ্ধৃত করে নবকুমার ভট্টাচার্য বলছিলেন, “যখন মহিষাসুর মারা যাচ্ছেন, তখন তিনি দেবী দুর্গার কাছে আত্মসমর্পণ করছেন। তার মধ্যে কোনো পাপবোধ ছিল বলেই তো সে আত্মসমর্পণ করে বলছে যে, ‘আমি যেন তোমার সঙ্গে থাকতে পারি, তোমার সঙ্গেই পূজা পাই।’ তার মধ্যে যে সংশোধনের ভাবনাটা এসেছে, তার জন্যই তাকে পূজা করা হচ্ছে।”
তিনি এ-ও বলছিলেন যে, দুর্গাপূজার নানা নিয়মরীতির মধ্যেই কিন্তু আদিবাসী সমাজের অনেক প্রথা আজও চালু আছে—যেমন নবপত্রিকার পূজা। সেটা তো আদতে আদিবাসীদের প্রকৃতিপূজা। আবার তামসিক পদ্ধতিতে যে দুর্গাপূজা হয়, সেটা তো কিরাত, শবরদের পূজা। তারা তো আদিবাসীই।
শরদিন্দু উদ্দীপন বলছিলেন, “কোথাও অরন্ধন পালন করা হয়, কোথাও জানলা-দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকেন আদিবাসীরা, যাতে দুর্গাপূজার যে উৎসব, সেই মন্ত্র বা ঢাকের শব্দ যেন তাদের কানে না যায়। দুর্গাপূজার এই সময়ে তারা অশৌচ পালন করেন এবং ভুয়াং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নাচ হয়। দাসাই নাচ করেন তারা, যেখানে পুরুষরা নারী যোদ্ধার ছদ্মবেশ ধারণ করে কান্নার সুরে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরেন। তাদের গানটা এরকম : ‘ওকার এদম ভুয়াং এদম জনম লেনা রে, ওকার এদম ভুয়াং এদম বছর লেনা রে’।”
তবে এইভাবে যে শোক পালন অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে, তার সঙ্গে চিরাচরিত প্রথায় শোক পালনের একটা ফারাক আছে বলে মনে করেন মহিষাসুর গবেষক প্রমোদ রঞ্জন। প্রমোদ রঞ্জন ভারতের নানা জায়গায় ঘুরে মহিষাসুর-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ যোগাড় করেছেন। “তফাতটা হলো—চিরাচরিত প্রথায় যেভাবে শোক পালন হতো, তার ভিত্তি ছিল লোকগাথা; আর এখন যেটা হচ্ছে, সেটা একটা ইতিবাচক সাংস্কৃতিক রাজনীতি। যেটা একদিকে মনুবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আদিবাসী সমাজের রুখে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা, অন্যদিকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরার প্রয়াস,” বলছিলেন মি. রঞ্জন।
গবেষকদের মতে, মহিষাসুর-সংক্রান্ত যে লোকগাথা রয়েছে, তা প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো, যখন আর্যরা ভারতবর্ষে আসেননি। মহিষাসুর-সংক্রান্ত লোকগাথা গোটা দক্ষিণ এিয়াজুড়েই পাওয়া যায়—উত্তর ভারত থেকে শুরু করে দাক্ষিণাত্য, বর্তমানের নেপাল এবং বাংলাদেশেরও নানা জায়গায়।
মহিষাসুর গবেষক প্রমোদ রঞ্জনের কথায়, “বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এই অসুর জাতির ইতিহাস আর্যদের পূর্ববর্তী যুগের ইতিহাস। আমরা যেমন মহিষাসুরকে খুঁজে পেয়েছি বর্তমান উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখণ্ডে, আবার এখনকার যে মহীশূর বা মাইসোর শহর, সেই অঞ্চলেও মহিষাসুরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। আবার খাজুরাহোর যে বিশ্বখ্যাত মন্দির, সেখানেও মহিষাসুরের মূর্তি পেয়েছি আমরা।”
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক; নিলয় ১৭৪/৩, পূর্ব নতুন পাড়া, সুনামগঞ্জ।
দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ, ১২৭৫ খ্রিস্টাব্দে হাতে আঁকা ছবি। রাজস্থানের বিকানের থেকে সংগৃহীত। -বিবিসি।







