প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৩
থামছে না মা ইলিশ ধরা, এখনই প্রয়োজন টেকসই পরিকল্পনা

শুরু হয়ে গেছে ২২ দিনের ইলিশ রক্ষা অভিযান। এ অভিযান সফল করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস-আদালত ছেড়ে নেমে গেছেন নানা কর্মসূচিতে। এতে অংশগ্রহণ করছেন প্রশাসনের লোকজন, আমাদের গণমাধ্যমকর্মী-সাংবাদিক, জেলেরা এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও। অথচ থামছে না ইলিশ ধরা। এখনই জরুরি ভিত্তিতে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন; নয়তো ইলিশ সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
বাইশ দিনের এ অভিযানে সচেতনতার পাশাপাশি চলবে ইলিশ ধরার জাল, জেলে ও নৌকা আটক, ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড এবং নৌকা ও জাল পোড়ানোর কর্মসূচি। তবে এই কর্মসূচি বছরের পর বছর ধরে চললেও ইলিশের কেজি ৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষেরা ইলিশ খাওয়া তো দূরের কথা, ইলিশের গন্ধই পায় না বহু বছর—এমন মানুষের সংখ্যা কিন্তু কম হবে না।
একসময়কার ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি এখন নিছক গল্প আর বিনোদন ছাড়া কিছুই নয়। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশীয় প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে। সংশ্লিষ্ট মৎস্য অধিদপ্তর টেকসই, বাস্তবভিত্তিক এবং সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়ায় ইলিশসহ সামগ্রিক মৎস্যসম্পদ আজ ধ্বংস ও বিলুপ্তির মুখে। দেশীয় মাছ ইলিশ নিয়ে টেকসই পরিকল্পনা না থাকায় তা আজ সাধারণ মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো।
ইলিশ শুধু একটি মাছের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের নদী, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, জীবিকা ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জাতীয় সম্পদ। দেশের মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে শুরু করে জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা—সবখানেই ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। তাই ইলিশ রক্ষা মানে শুধু একটি মাছের প্রজাতি রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দেওয়া।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিলো প্রায় ৫.২৯ লাখ মেট্রিক টন, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। দেশের মোট মাছ উৎপাদনে একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ইলিশ সংরক্ষণকে আর বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা। নিষেধাজ্ঞা আছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা কতোটা কার্যকর?
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের আহরণ নিষেধাজ্ঞা বহু বছর ধরে কার্যকর রয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রধান প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞার সময় বাড়িয়ে ২২ দিনে উন্নীত করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হয়।
পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণ, ইলিশ অভয়াশ্রম পরিচালনা এবং জেলেদের বিকল্প আয় সৃষ্টির উদ্যোগও রয়েছে। বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তর পাঁচটি ইলিশ অভয়াশ্রম পরিচালনা করছে এবং বিকল্প আয়মূলক কার্যক্রম ও নিষেধাজ্ঞার সময়ে খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান দিয়ে কি ইলিশ রক্ষা সম্ভব? আমার উত্তর—না। নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, অভিযান প্রয়োজন, আইনপ্রয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি দরকার নদী ও জলজ পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ, জেলেদের বাস্তবভিত্তিক সহায়তা, বাজার ব্যবস্থাপনা, মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ।
২০২৬ সালের ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে ৮ অক্টোবর ২০২৬ এবং শেষ হবে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে (মোট ২২ দিন)। এ সময়ে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে।
এ সংক্রান্তে গত মাসে রাজধানীর মিরপুর প্রেস ক্লাবের আয়োজনে ‘ইলিশ সম্পদ রক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রধান বক্তা হিসেবে সেখানে আমি মূল প্রবন্ধ পাঠ করি এবং একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরি। আমার প্রস্তাবনামতে প্রথম করণীয় বিষয় হলো—”সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। যে প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ইলিশ প্রজনন এলাকার তালিকাভুক্ত জেলেদের মাছ ধরার নৌকা ও জাল ৫ অক্টোবরের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরের মৎস্য কর্মকর্তার নিকট জমা দিতে হবে এবং জমাদানের স্লিপ সংগ্রহ করতে হবে। ওই ২২ দিন জেলেদের নৌকা এবং জাল সরকারের নিকট জমা থাকবে। যে সকল জেলে কেবল নৌকা এবং জাল জমা দেবেন, তারাই সরকারের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।”
সরকারের এ প্রজ্ঞাপনটি বাস্তবায়নের জন্য ইলিশ প্রজনন এলাকার নদী ও রাস্তাঘাটে ব্যাপক মাইকিং এবং সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জেলে ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। ইলিশ প্রজনন মৌসুমে নদীতে মাছ ধরার নৌকা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বিশেষ বিধি-নিষেধ ঘোষণা করা যেতে পারে। এ প্রস্তাবনাটি সরকার কার্যকর করতে পারলে ইলিশ রক্ষা কার্যক্রমের নামে প্রজনন এলাকায় সরকারের ডিসি, এসপি, ম্যাজিস্ট্রেট ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সরকারি কাজ ফেলে রেখে নদীতে নৌকাবাইচ বা অন্যান্য কর্মকাণ্ড করতে হতো না। প্রতি বছর ইলিশ রক্ষায় কাজ করতে গিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকরাও জেলেদের দ্বারা মারধর, আক্রমণ এবং লাঞ্ছিতের শিকার হয়ে থাকেন। পাশাপাশি জেলেরা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কারাদণ্ডের শিকার হন এবং তাদের নৌকা ও জাল পুড়িয়ে ফেলা হয়। এতে জেলেদের কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়। এ মৌসুমে সারা দেশের শত শত জেলে কারাদণ্ডের শিকার হন এবং তাদের পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করে।
মা ইলিশকে প্রজননের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সমুদ্র—উভয় পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রজনন মৌসুমে প্রজনন এলাকায় সব ধরনের অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ, ইলিশ ধরার নৌযান ও সরঞ্জামের ওপর কার্যকর নজরদারি, নদীর গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থলে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, রাতের অভিযান জোরদার, নৌপথে সমন্বিত টহল এবং মাছের আড়ত ও অবতরণকেন্দ্রে নজরদারি একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে, নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে অভিযান চলছে, কিন্তু বাজারে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে—এমন অসংগতিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা কার্যকর হতে পারে না। মাছ ধরার উৎস থেকে শুরু করে পরিবহন, আড়ত, বাজার এবং ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয় করণীয় : জেলেকে প্রতিপক্ষ নয়, সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। ইলিশ সংরক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হচ্ছেন জেলেরা। একজন দরিদ্র জেলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে না নামলে তার পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবন কীভাবে চলবে—এই প্রশ্নের বাস্তব উত্তর না দিয়ে শুধু আইন প্রয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। মৎস্য অধিদপ্তরের চলমান কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞার সময়ে খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প আয়মূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আমাদের প্রয়োজন ‘জেলে সহায়তা’ থেকে ‘জেলে পুনর্বাসন ও সক্ষমতা উন্নয়ন’-এর দিকে যাওয়া।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে প্রকৃত জেলে পরিবার এবং আইন অমান্যকারীদের চিহ্নিত করতে হবে; খাদ্য সহায়তা সময়মতো পৌঁছাতে হবে; বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে; ক্ষুদ্র ঋণ বা সুদমুক্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে; জেলেদের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা দিতে হবে এবং নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে। জেলেকে যদি বলা হয়—”তুমি মাছ ধরবে না, কিন্তু তোমার পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে”, তবেই সংরক্ষণ কার্যক্রমে জেলেদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে।
তৃতীয় করণীয় : অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক জাল বন্ধ করতে হবে। ইলিশের অন্যতম বড় বিপদ হলো ছোট মাছ ও জাটকা নির্বিচারে আহরণ এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার। সরকারি প্রকল্পের নথিতেও ক্ষতিকর অবৈধ জাল ও সরঞ্জাম নির্মূলকে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শুধু জাল জব্দ ও ধ্বংস করলেই হবে না; সরকারকে দেখতে হবে জাল কোথায় তৈরি হচ্ছে, কে বিক্রি করছে, কারা কিনছে, কোথায় ব্যবহার হচ্ছে এবং কারা এর পেছনে অর্থ জোগাচ্ছে। অর্থাৎ অবৈধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান নদী থেকে শুরু করে বাজার ও উৎপাদন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে।
চতুর্থ করণীয় : জাটকা রক্ষায় বছরব্যাপী কর্মসূচি প্রয়োজন। ইলিশ সংরক্ষণকে শুধু অক্টোবরের ২২ দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একটি মা ইলিশকে রক্ষা করার অর্থ হলো ভবিষ্যতের বিপুলসংখ্যক ইলিশের সম্ভাবনা রক্ষা করা। একইভাবে ছোট ইলিশ বা জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে তা প্রজননক্ষম মাছে পরিণত হবে। তাই জাটকা সংরক্ষণে বছরব্যাপী নদীভিত্তিক নজরদারি, জাটকার বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ, নিয়মিত অভিযান, বাজার পর্যবেক্ষণ, জেলে সচেতনতা এবং স্কুল-কলেজে প্রচারাভিযান চালু রাখা প্রয়োজন।
মৎস্য অধিদপ্তরও ২০২৬ সালে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে ইলিশ গবেষণা, জাটকা সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে কর্মশালার উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে গবেষণাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
পঞ্চম করণীয় : নদীকে বাঁচাতে হবে। ইলিশ রক্ষার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র আসলে নদী। নদী যদি দূষিত হয়, নাব্যতা কমে যায়, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হয়, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় কিংবা নির্বিচারে বালু উত্তোলন ও অন্যান্য পরিবেশগত ক্ষতি ঘটে, তবে শুধু মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যাবে না। তাই ইলিশ অভয়াশ্রমকে শুধু একটি মানচিত্রের সীমারেখা হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদী রক্ষা, পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নৌযান চলাচলের প্রভাব মূল্যায়ন—সবকিছুই ইলিশ ব্যবস্থাপনার অংশ হতে হবে।
ষষ্ঠ করণীয় : বাজারে ‘ইলিশ সংরক্ষণ’ বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা প্রায়ই দেখি নদীতে অভিযান চলছে, অথচ বাজারে বা ঘরে ঘরে অবৈধভাবে আহরিত মাছ পৌঁছে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। প্রজনন মৌসুমে শুধু জেলেকে দায়ী করলে হবে না; অবৈধ মাছের ক্রেতা, বিক্রেতা, আড়তদার, পরিবহনকারী ও মজুতকারীকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। কারণ বাজারে ক্রেতা থাকলে নদীতে অবৈধ আহরণও বন্ধ হবে না। এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, ভোক্তা অধিকার সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বাজার কমিটিকে নিয়ে সমন্বিত বাজার নজরদারি গড়ে তুলতে হবে।
সপ্তম করণীয় : ইলিশ সংরক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বর্তমান সময়ে নদী পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো সম্ভব। নির্দিষ্ট এলাকায় জিপিএসভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, ড্রোন নজরদারি, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক অভিযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল জেলের তালিকা, ভর্তুকি ও সহায়তার ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং অভিযানের তথ্য উন্মুক্তকরণ চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কোন্ এলাকায় কত অভিযান হয়েছে, কত জাল জব্দ হয়েছে, কতটি মামলা হয়েছে এবং কতজন জেলে সহায়তা পেয়েছেন—এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করলে জবাবদিহিও বাড়বে।
অষ্টম করণীয় : গবেষণাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে আনতে হবে। ইলিশের প্রজনন, বিচরণ, খাদ্যাভ্যাস, পানির পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর প্রবাহ এবং সমুদ্রের পরিবেশ—সবকিছু নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন। মৎস্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ইলিশের টেকসই উৎপাদন ও জাটকা সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা ও সংরক্ষণ কৌশল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে মৎস্য অধিদপ্তর ‘ঈড়হংবৎাধঃরড়হ ঝঃৎধঃবমু ভড়ৎ ইৎড়ড়ফ ঐরষংধ ্ ঔধঃশধ ঃড় ওহপৎবধংব ঝঁংঃধরহধনষব চৎড়ফঁপঃরড়হ ড়ভ ঐরষংধ’ বিষয়ে ঞবৎসং ড়ভ জবভবৎবহপব প্রকাশ করেছে। এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করে গবেষণা, তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন—এই তিনটি ধাপকে একসূত্রে আনতে হবে।
নবম করণীয় : ভোক্তার সচেতনতা সবচেয়ে বড় শক্তি। ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার বা জেলেদের নয়; একজন সাধারণ ক্রেতাও এই সংরক্ষণ ব্যবস্থার অংশ। প্রজনন মৌসুমে অবৈধভাবে ধরা ইলিশ না কেনা, জাটকা পরিহার করা এবং অবৈধ মাছ বিক্রির তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এগুলোও নাগরিক দায়িত্ব। আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যে ইলিশ আমরা অবৈধভাবে কিনছি, সেটিই হয়তো আগামী বছরের হাজারো ইলিশের জন্ম দেওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে।
ইলিশ রক্ষায় ১০ দফা প্রস্তাবনা :১. মা ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। ২. নিষেধাজ্ঞার আগে প্রকৃত জেলে পরিবারের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে বছরব্যাপী নদী ও বাজারে নজরদারি চালাতে হবে। ৪. অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক জালের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার—এই তিন পর্যায়েই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। ৫. ইলিশ অভয়াশ্রমগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। ৬. ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রের নদী-পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। ৭. জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে।৮. ইলিশ পরিবহন, আড়ত ও বাজারে ডিজিটাল ও সমন্বিত নজরদারি বাড়াতে হবে।৯. ইলিশ গবেষণার ফলাফল নিয়মিত প্রকাশ করে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সংশোধন করতে হবে। ১০. সরকার, মৎস্য বিভাগ, জেলে, ব্যবসায়ী, গবেষক, সাংবাদিক ও সাধারণ ভোক্তাকে নিয়ে জাতীয় ইলিশ সংরক্ষণ অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
শেষ কথা :
আমরা যদি সত্যিই ইলিশকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে চাই, তবে শুধু নিষেধাজ্ঞার দিন গুনলে চলবে না। আমাদের ভাবতে হবে, আগামী ১০, ২০ কিংবা ৫০ বছর পর বাংলাদেশের নদীতে ইলিশ থাকবে কি না। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেবো, তার ফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম। তাই ইলিশকে বাঁচাতে হলে নদীকে বাঁচাতে হবে। নদীকে বাঁচাতে হলে জেলেকে বাঁচাতে হবে। জেলেকে বাঁচাতে হলে তাকে সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। আর সংরক্ষণ সফল করতে হলে সরকার, প্রশাসন ও জনগণকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। ইলিশ রক্ষা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘আজ বেশি ইলিশ’ নয়; বরং ‘প্রতি বছর টেকসইভাবে ইলিশ’। ইলিশ বাঁচুক, নদী বাঁচুক, জেলে ও বাংলাদেশের অর্থনীতি বাঁচুক।
আহমেদ আবু জাফর : চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম এবং সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ।







