প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৪
একুশ বছরেও ফরিদগঞ্জ পৌরসভার ভবন না হওয়া অনেক বড় ব্যর্থতা

একটি পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পরও যদি তার নিজস্ব একটি ভবন না থাকে, তাহলে সেটিকে নিছক অব্যবস্থাপনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতারই স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। ফরিদগঞ্জ পৌরসভা ‘ক’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে, কিন্তু নিজের একটি স্থায়ী দাপ্তরিক ভবন দাঁড় করাতে পারেনি—এ বাস্তবতা যেমন লজ্জার, তেমনি পৌরবাসীর জন্য গভীর হতাশার।
এই ব্যর্থতার খেসারত এখন পৌরবাসীকেই দিতে হচ্ছে। নিজস্ব ভবন না থাকায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের জন্য সরকারের ২০ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে পৌরসভা। একটি ভবনের অভাবে শুধু একটি প্রকল্পের অর্থই হাতছাড়া হলো না; পৌরসভার বিদ্যুৎ ব্যয় কমানো এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনাও নষ্ট হলো। প্রশ্ন হচ্ছে, ২১ বছর ধরে যারা পৌরসভার দায়িত্বে ছিলেন, তারা কি এই পরিণতি বুঝতে পারেননি?
ফরিদগঞ্জ পৌরসভার সমস্যা অবশ্য শুধু ভবন না থাকা নয়। পৌরসভার মৌলিক নাগরিক সেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এখনো একটি কার্যকর ডাম্পিং স্টেশন গড়ে ওঠেনি। ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনার জন্য উপযোগী গাড়ি থাকা বা থাকলেও সেটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারা পৌর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। নাগরিকদের কাছ থেকে নিয়মিত কর ও বিভিন্ন ফি আদায় করা হলে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা হবে না কেন?
অন্যদিকে নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত মনোযোগের পরিবর্তে মেয়রদের গাড়ি-বিলাস, অফিস সজ্জার নামে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এবং নানা ধরনের অপচয়ের অভিযোগও জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। যে পৌরসভা নিজের একটি স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য জমি পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি, সেখানে বিলাসী ব্যয় ও দৃষ্টিনন্দন অফিসসজ্জা কতোটা যুক্তিসঙ্গত—এই প্রশ্নের জবাব পৌর কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। সড়ক, ড্রেন, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে চরম দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা কেবল অর্থের অপচয় নয়; এটি নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। উন্নয়নের নামে নিম্নমানের কাজ করে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হলে তার দায় শুধু ঠিকাদারের নয়, তদারকি ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও নিতে হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় হতে পারে না।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—ভবন নির্মাণের জন্য ২১ বছরে পৌরসভা সামান্য জায়গাও নিশ্চিত করতে পারেনি। অথচ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার আগে ব্যবহৃত ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় চার শতাংশ জমি রয়েছে বলে জানা যায়। নতুন জায়গা কেনা, অধিগ্রহণ করা কিংবা সরকারি জমি বরাদ্দ নেওয়ার উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত জায়গা বা ভবনকে স্থায়ীভাবে পৌরসভার কাজে ব্যবহারের উপযোগী করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে কার্যকর তদবির, ধারাবাহিক যোগাযোগ এবং সর্বাত্মক প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিলো। সেটিও যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক।
একটি পৌরসভা পরিচালনা শুধু চেয়ার-টেবিল, গাড়ি কিংবা অফিস চালানোর নাম নয়। ভবিষ্যৎ ১০, ২০ বা ৫০ বছরের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা পৌর নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। ফরিদগঞ্জে সেই দূরদর্শিতার ঘাটতিই আজ সবচেয়ে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। ২১ বছর আগে পৌরসভা প্রতিষ্ঠার সময়ই ভবিষ্যৎ দাপ্তরিক ভবনের জন্য জায়গা নির্ধারণ, জমি ক্রয় বা সরকারি জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু করা হলে আজ এই দুর্ভোগ হতো না।
এখন দায় এড়ানোর সময় নয়। সাবেক মেয়র, প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আমলে কেন জমি কেনা বা বরাদ্দ নেওয়া হলো না, কেন ভবন নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হলো না, কেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান হয়নি, কেন উন্নয়ন ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলো না—এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
ফরিদগঞ্জ পৌরসভাকে আর সাময়িক ব্যবস্থা ও জোড়াতালির ওপর চালানো যাবে না। অবিলম্বে নিজস্ব ভবনের জন্য উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করে জমি ক্রয়, অধিগ্রহণ বা সরকারি জমি বরাদ্দের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে ডাম্পিং স্টেশন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন।
একুশ বছর একটি পৌরসভার জন্য কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে একটি নিজস্ব ভবন করতে না পারা কোনো স্বাভাবিক প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নয়; এটি বড় ধরনের পরিকল্পনাগত ও নেতৃত্বগত ব্যর্থতা। এখন অন্তত সেই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি না করে দায়িত্বশীলতা, দূরদর্শিতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে ফরিদগঞ্জ পৌরসভাকে একটি আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হোক। পৌরবাসী আর প্রতিশ্রুতি নয়—দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়।





