প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৯
বিদ্যুৎ খুঁটিতে বারবার আগুন—কার উদাসীনতায়?

আগুন লাগার পর দৌড়ঝাঁপ, আগুন নিভে গেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস—এভাবেই কি চলবে? নাকি আগুনের উৎস খুঁজে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে? চাঁদপুর শহরের বিদ্যুৎ খুঁটিতে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে দুবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) চাঁদপুর শহরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়কস্থ ভূমি অফিসের সামনে বৈদ্যুতিক খুঁটির তারের জঞ্জালে আগুন ধরে। ঠিক সাত দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গেটসংলগ্ন খুঁটিতে আবার আগুন। দুটি স্থানই জনবহুল, গুরুত্বপূর্ণ এবং মানুষের চলাচলে ব্যস্ত। বিশেষ করে মাতৃপীঠের সামনে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের যাতায়াত। সেখানে বিদ্যুতের খুঁটিতে আগুন লাগা নিছক আতঙ্কের বিষয় নয়—এটি সম্ভাব্য বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যুতের খুঁটিতে বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে নিচে ইন্টারনেট, ডিস, টেলিফোনসহ বিভিন্ন ধরনের তার এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে কোনটি কিসের তার—তা বোঝাই কঠিন। এর সঙ্গে আবার ঝুলছে ব্যানার-ফেস্টুন। ফলে একটি খুঁটি যেন পরিণত হয়েছে তারের জঞ্জালের অগ্নিকুণ্ডে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত তাপ বা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—অতিরিক্ত তাপ বা শর্টসার্কিট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে কেন? কার অনুমতিতে, কার তদারকিতে এবং কোন্ নিয়মের ভিত্তিতে এতগুলো তার একই খুঁটিতে ঝুলছে? আর এসব ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ছে না কেন? আরও বড় প্রশ্ন—একই এলাকায় সাত দিনের মধ্যে দু’বার আগুন লাগার পরও কি আমরা তৃতীয় অগ্নিকাণ্ডের অপেক্ষায় থাকবো?
দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নেভাবে—এটাই ব্যবস্থা নয়। ফায়ার সার্ভিসের কাজ আগুন নেভানো; বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ঝুঁকি শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আগুন নিভিয়ে সংবাদ সম্মেলন কিংবা দায়সারা বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই।
কয়েক মাস আগে চাঁদপুর কণ্ঠে বিদ্যুৎ খুঁটির তারের জঞ্জাল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ সতর্কবার্তা যদি উপেক্ষিত হয়, পরবর্তী দুর্ঘটনা আর কেবল দুর্ঘটনা থাকে না—তখন প্রশ্ন ওঠে দায়িত্বশীলতার।
বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এমন ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ খুঁটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি স্পার্ক, একটি শর্টসার্কিট, একটি মুহূর্তের ভুল—তারপর আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে আশপাশের দোকান, যানবাহন কিংবা মানুষের ভিড়ে। তখন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কেবল টাকা দিয়ে মাপা যাবে না।
তাই এখনই প্রয়োজন জরুরি ও সমন্বিত অভিযান। শহরের প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ খুঁটি সরেজমিনে পরিদর্শন করতে হবে। অবৈধ ও অপ্রয়োজনীয় তার অপসারণ করতে হবে। বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে যোগাযোগ ও ইন্টারনেটের তারের বিশৃঙ্খল সংযোগ বন্ধ করতে হবে। খুঁটিতে ব্যানার-ফেস্টুন ঝোলানোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে।চাঁদপুরবাসী জানতে চায়—আর কতবার আগুন লাগলে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে? আরেকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন, কারণ অনুসন্ধান ও দায়ীদের খোঁজার চেয়ে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ আগুন লাগার পর দায়িত্বশীল হওয়া সহজ; আগুন লাগার আগেই দায়িত্বশীল হওয়াটাই প্রকৃত কর্তব্য। চাঁদপুরের মানুষ কোনো অঘটনের পর শোকবার্তা শুনতে চায় না। তারা চায় নিরাপদ বিদ্যুৎব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ খুঁটি এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ। তাই প্রশ্নটি থাকলো—বিদ্যুৎ খুঁটিতে বারবার আগুন, কার উদাসীনতায়? উত্তর শুধু কথায় নয়, কার্যকর পদক্ষেপেই দিতে হবে।






