বুধবার, ০৫ আগস্ট, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য
ব্রেকিং নিউজ

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৫

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভূমিকা

ফরিদুল ইসলাম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভূমিকা

জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি ছিলো ন্যায়, গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের দাবিতে সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক। এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো—এটি কোনো একক শ্রেণি, পেশা বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না; বরং ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিল্পী, শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী, নারীরা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে উদ্ভূত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিলো দেশের ইতিহাসের অন্যতম অভূতপূর্ব জনবিস্ফোরণ। এটি কেবল একটি ছাত্র আন্দোলন ছিলো না; বরং তা পরিণত হয়েছিলো আপামর ছাত্র-জনতার এক সর্বাত্মক অভ্যুত্থানে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাকস্বাধীনতা হরণ, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে এই আন্দোলনের সূচনা। কোনো একক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর না করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই অভ্যুত্থানকে সফল করে তোলে। নিচে এই অভ্যুত্থানে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের ঐতিহাসিক ভূমিকা বিশদভাবে তুলে ধরা হলো :

১. ছাত্র-ছাত্রী : আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ও মূল চালিকাশক্তি

আন্দোলনের প্রথম আলো প্রজ্জ্বলিত করেছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে।

স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী : ঢাকা ও অন্যান্য শহরের স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টিয়ারশেল ও গুলিবর্ষণের মুখোমুখি দঁাড়িয়ে যে সাহসের পরিচয় দিয়েছে, তা আন্দোলনকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা : আন্দোলন যখন দমনের চেষ্টা করা হয়, তখন নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, আইইউবি, ইস্ট ওয়েস্ট, অহসানউল্লাহসহ অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অদম্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে। উত্তরা, বাড্ডা ও ধানমন্ডি এলাকা প্রতিরোধ দুর্গে পরিণত হয়।

২. সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ ও রিকশাচালক : অদম্য সহযোদ্ধা

জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও রক্তক্ষয়ী ভূমিকা পালন করেছে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাচালক, দিনমজুর, হকার ও পরিবহন শ্রমিকরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন।

শারীরিক বাধা অতিক্রম : রিকশাচালকরা নিজেদের রিকশাকে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করে আহত শিক্ষার্থীদের দ্রুত হাসপাতালে পেঁৗছে দিয়েছেন।

জীবন উৎসর্গ : আন্দোলনে প্রাণ হারানো ও গুরুতর আহতদের বড় একটি অংশ ছিলো শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষ। রাজনৈতিক সচেতনতার চেয়ে বৈষম্যহীন ভবিষ্যতের প্রত্যাশাই তাদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছিলো।

৩. পোশাক শ্রমিক (গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স) : আন্দোলনের গতিপথ পরিবর্তন

পোশাক শিল্প অধ্যুষিত এলাকা—যেমন গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের লাখ লাখ শ্রমিক রাজপথে নেমে এলে আন্দোলনের মাত্রা পুরোপুরি বদলে যায়। ৫ আগস্টের চূড়ান্ত মুহূর্তে ঢাকা অভিমুখী হাজার হাজার পোশাক শ্রমিকের পদযাত্রা শাসকগোষ্ঠীর ওপর সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছিল।

৪. শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও গবেষক

শুরু থেকেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলের শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের পাশে গিয়ে দঁাড়ান।

শিক্ষক সংহতি : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকবৃন্দ ‘উৎপীড়নবিরোধী শিক্ষক নেটওয়ার্ক’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদে রাজপথে অবস্থান কর্মসূচি নেন।

নৈতিক সমর্থন : আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন ব্লগে গবেষক ও বুদ্ধিজীবীরা আন্দোলনের পক্ষে নিয়মিত লেখালেখি ও সাক্ষাৎকার দিয়ে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন।

৫. অভিভাবক ও নারী সমাজ : মাতৃরূপী প্রতিরোধ

এই অভ্যুত্থানের একটি অনন্য রূপ ছিলো মা ও নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ। অভিভাবকদের রাজপথে উপস্থিতি : সন্তানরা যখন পুলিশের গুলির মুখে, তখন “আমাদের সন্তানদের ওপর গুলি চালাবেন না” স্লোগান নিয়ে হাজার হাজার অভিভাবক (বিশেষ করে মায়েরা) রাস্তায় নেমে আসেন।

নারী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব : আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীরা কেবল অংশগ্রহণ করেননি, অনেক ক্ষেত্রে মিছিলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতির আধিপত্য গুঁড়িয়ে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন সাধারণ নারী শিক্ষার্থীরা।

৬. প্রবাসী বাংলাদেশিরা (ডায়াসপোরা)

বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন না, তারা আন্দোলনের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করেন।

রেমিট্যান্স বয়কট আন্দোলন : ‘নো রেমিট্যান্স’ বা হুন্ডির মাধ্যমেও টাকা পাঠানো বন্ধ করার জন্যে সামাজিক মাধ্যমে যে প্রচার চালানো হয়, তা দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ও ব্যাংকিং চ্যানেলে বড় ধরনের ঝঁাকুনি দেয়।

কূটনৈতিক চাপ : যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা দূতাবাসের সামনে ও জাতিসংঘ কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।

৭. আইনজীবী ও বিচার বিভাগীয় সদস্য

শিক্ষার্থীদের ওপর গণগ্রেপ্তার, রিমান্ড ও অন্যায় মামলার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সকল জেলা জজ কোর্টের আইনজীবীরা সোচ্চার হন।

বিনামূল্যে আইনি সহায়তা : আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থী ও কিশোরদের জামিন নিশ্চিত করতে এবং ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের প্রতিবাদে বিপুল সংখ্যক আইনজীবী স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করেছেন।

৮. চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী

জুলাইয়ের রক্তাক্ত দিনগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল শিক্ষার্থীরা জীবন রক্ষাকারী মূল ভূমিকা পালন করেছেন।

জরুরি চিকিৎসা সেবা : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা হাসপাতাল, এনাম মেডিকেলসহ দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকরা টানা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে শত শত গুলিবিদ্ধ মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছেন।

সংকট মুহূর্তে সাহস : অনেক হাসপাতালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি সত্ত্বেও চিকিৎসকরা আহত আন্দোলনকারীদের গোপন রেখে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করেছেন।

৯. শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর

সংস্কৃতিকর্মীরা তাদের শিল্পকে প্রতিবাদের হাতিয়ারে পরিণত করেন।

সংগীত ও দৃশ্যশিল্প : “আওয়াজ উঠা”, “গণজোয়ার” কিংবা শিক্ষার্থীদের দেয়ালে অঁাকা গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখন আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে।

ইনফ্লুয়েন্সার ও ক্রিয়েটর : দেশের তরুণ ইউটিউবার, ইনফ্লুয়েন্সার এবং সোশাল মিডিয়া ক্রিয়েটররা নিজেদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিশ্ববাসীর কাছে আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন।

১০. তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও সাংবাদিক

ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেও তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা ভিপিএন এবং অন্যান্য বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করে বিশ্বকে দেশের ভেতরের প্রকৃত চিত্র জানানোর পথ সুগম রাখেন। পাশাপাশি বহু মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রকৃত খবর ও সহিংসতার ফুটেজ প্রকাশ করেছেন, যা আন্দোলনকে বেগবান করে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, যখন জাতির অস্তিত্ব ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আসে, তখন সব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভেদ মুছে যায়। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের এই সর্বাত্মক অংশগ্রহণই বাংলাদেশকে এক নতুন ইতিহাসের মুখোমুখি দঁাড় করিয়েছে।

আমাদের শিক্ষা : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, জাতীয় সংকটে জনগণের ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ একটি দেশের গণতান্ত্রিক চেতনাকে আরও সুদৃঢ় করে। তবে যে কোনো গণআন্দোলনের সফলতা নির্ভর করে শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর।

উপসংহার : জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়; এটি ছিলো নাগরিক সচেতনতা, ঐক্য এবং দায়িত্ববোধের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে একটি শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। জাতীয় স্বার্থ, মানবিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক : ফরিদুল ইসলাম, চিন্তক, সমাজ ও মানবাধিকারকর্মী এবং গবেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়