প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৪
নবগঠিত অলিপুর ইউনিয়নের জন্যে অশেষ শুভ কামনা

একটি নতুন প্রশাসনিক ইউনিটের যাত্রা কেবল একটি কার্যালয় উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় না; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পেঁৗছে দেওয়ার এক নতুন প্রত্যাশা। হাজীগঞ্জ উপজেলার নবগঠিত ১৩নং অলিপুর ইউনিয়নের প্রশাসনিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া তাই সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জন্যে নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আমরা নবগঠিত এই ইউনিয়নের প্রশাসনিক পথচলার জন্যে জানাই অশেষ শুভ কামনা।
গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (মঙ্গলবার) জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান কৈয়ারপুল এলাকার তালুকদার ভিলায় স্থাপিত অস্থায়ী কার্যালয়ে অলিপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন। এর মধ্য দিয়ে ইউনিয়নটির প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো। সাতটি গ্রাম নিয়ে গঠিত নতুন এই ইউনিয়নের মানুষের নাগরিক সেবা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং স্থানীয় উন্নয়ন এখন একটি স্বতন্ত্র কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পেলো। তবে নতুন ইউনিয়ন গঠন মানেই কেবল প্রশাসনিক সীমানার পরিবর্তন নয়। এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নাগরিকরা কতোটা সহজে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি সেবা পাচ্ছেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কতোটা জনবান্ধব হচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ কতোটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে তার ওপর। একটি ইউনিয়ন তখনই মানুষের কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন জন্মনিবন্ধন, নাগরিক সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা, ভূমি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহণে মানুষকে অযথা হয়রানি বা দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয় না।
জেলা প্রশাসক অলিপুর ইউনিয়নকে একটি ‘আদর্শ ইউনিয়ন’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তঁার এ প্রত্যাশা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আদর্শ ইউনিয়নের ধারণাটি শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রশাসনিক ভবনের সৌন্দর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। একটি আদর্শ ইউনিয়নের মূল পরিচয় হবে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দ্রুত নাগরিকসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, শিক্ষার প্রসার, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। বিশেষ করে মাদক, বাল্যবিবাহ, ইভ টিজিং ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী। এসব সমস্যা শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব এবং তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি অপরাধের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো নিয়েও কাজ করতে হবে।
নতুন ইউনিয়নের সাতটি গ্রামের মানুষের মধ্যে সমন্বয় ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও হবে একটি বড় দায়িত্ব। কোনো একটি এলাকা বা শ্রেণি যেন উন্নয়ন ও সেবার ক্ষেত্রে পিছিয়ে না পড়ে, সেদিকে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রয়োজন নিরূপণ করে অগ্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব হবে।
অলিপুর ইউনিয়নের প্রশাসনিক কার্যক্রমের শুরুতেই নাগরিকদের প্রতি একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরিÑএই প্রশাসন জনগণের জন্যে, জনগণের কাছেই দায়বদ্ধ। সেবা নিতে এসে কেউ যেন রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা আর্থিক সক্ষমতার কারণে বাড়তি সুবিধা কিংবা অসুবিধার শিকার না হন। একইভাবে উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন, বাস্তবায়ন ও তদারকিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নবগঠিত ইউনিয়নটির সামনে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকর করা, পর্যাপ্ত জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা, নাগরিকদের দ্রুত সেবা দেওয়া এবং স্থানীয় উন্নয়নকে সঠিক পরিকল্পনার আওতায় আনাÑসবই সময়সাপেক্ষ কাজ। এসব ক্ষেত্রে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সহযোগিতাও অপরিহার্য।
আমরা আশা করি, অলিপুর ইউনিয়নের প্রশাসনিক যাত্রা আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে মানুষের প্রত্যাশা পূরণের একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান। নাগরিকসেবা হবে সহজ ও হয়রানিমুক্ত, উন্নয়ন হবে প্রয়োজনভিত্তিক, প্রশাসন হবে জবাবদিহিমূলক এবং স্থানীয় মানুষ হবে উন্নয়নের প্রধান অংশীদারÑএমন একটি ইউনিয়ন গড়ে উঠুক, এটাই প্রত্যাশা।
নবগঠিত অলিপুর ইউনিয়ন একদিন সত্যিকার অর্থেই একটি আদর্শ ইউনিয়নের উদাহরণ হয়ে উঠুকÑজেলা প্রশাসকের এই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সর্বস্তরের জনগণ সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসুক। নতুন এই প্রশাসনিক যাত্রা হোক জনকল্যাণ, সুশাসন ও উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।







