প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ১০:৩৬
চাঁদপুরে ১২টি সিনেমা হলের গৌরব বিলুপ্তি
টিকে আছে কাজলী সিনেমা হল, ঈদের পরে এটিও একেবারেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে

একটা সময় ছিলো, সন্ধ্যা নামলেই শহরের অলিতে গলিতে মুখর হয়ে উঠতো সিনেমা দেখতে যাওয়ার হিড়িকে। বন্ধুবান্ধব মিলে সারি বেঁধে বিভিন্ন বয়সী লোকেরা যেতো সিনেমা হলে। সাদা পর্দায় আলো-ছায়ার যে জাদু ছিলো, সেটিই ছিলো মানুষের বিনোদনের প্রধান খোরাক। সেই আলো-ছায়ার শহর ছিলো চাঁদপুর। সারা জেলার মানুষ মুখিয়ে থাকতো নতুন সিনেমা মুক্তির জন্যে। সময়ের বিবর্তনে সেই চাঁদপুরেই আজ সিনেমা হল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এক সময়ের গৌরবময় এই বিনোদন মাধ্যম এখন ধ্বংসের মুখে। অতীত গৌরবের গল্প শোনায় শুধু কিছু স্মৃতিময় অদৃশ্য দেয়াল আর একটি মাত্র টিকে থাকা সিনেমা হল। হলটি হলো মতলবের কাজলী সিনেমা হল।
তখন সিনেমা হল ছিলো শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, ছিলো মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি আর সামাজিক জীবনের এক বিশাল অংশ।
চাঁদপুর ছিলো সেই আলো-ছায়ার শহর, যেখানে নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই ছিলো উৎসবের আমেজ। শহর থেকে গ্রাম, চায়ের দোকান থেকে বাজার, সর্বত্র চলতো নতুন ছবির আলোচনা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই গৌরব আজ শুধুই স্মৃতি। এক সময় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় থাকা ১২টিরও বেশি সিনেমা হল আজ বিলুপ্ত। কোনোটি ভেঙ্গে মার্কেট করা হয়েছে, কোনোটি গুদাম, আবার কোনোটি ধ্বংসস্তূপ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী হয়ে। সবশেষ নিঃশ্বাস নিয়ে এখনো কোনোরকম টিকে আছে মতলব দক্ষিণ উপজেলার ‘কাজলী সিনেমা হল’।
একসময় সিনেমা হলেই ছিলো মানুষের প্রধান বিনোদন। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো বিশ্বাসই করবে না, একটা সময় সিনেমা দেখতে যাওয়াটাই ছিলো মানুষের সবচেয়ে বড়ো বিনোদন। তখন ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিলো না, ছিলো না মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটের দুনিয়া। তাই সপ্তাহের ছুটির দিন কিংবা নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই মানুষ ভিড় জমাতো সিনেমা হলে।
চাঁদপুর শহরের ছায়াবাণী, চিত্রলেখা ও কোহিনূর হল ছিলো তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা হল। শুধু শহরেই নয়, জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই ছিলো সিনেমা হলের প্রাণচাঞ্চল্য।
মতলবে ছিলো রাজমহল ও কাজলী, হাজীগঞ্জে রণি ও শান্তনা, হাইমচরের আলগী বাজারে রূপালী এবং চরভৈরবীতে মেঘনা ও মৌসুমী। ফরিদগঞ্জে ছিলো মনিহার ও রূপসী সিনেমা হল। এসব হলকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিলো এক বিশাল সাংস্কৃতিক বলয়।
সিনেমা মুক্তি মানেই ছিলো বিনোদনের উৎসব। পুরোনো দিনের মানুষদের মুখে এখনো শোনা যায় সেই সময়ের গল্প। বেদের মেয়ে জোছনা, শত্রু বন্ধু, অনন্ত ভালোবাসা, কেয়ামত থেকে কেয়ামত, কিংবা সালমান শাহ-মৌসুমীর সিনেমা মুক্তি পেলে পুরো চাঁদপুর যেন উৎসবে মেতে উঠতো।
সিনেমা হলের সামনে টিকিটের জন্যে দীর্ঘ লাইন ছিলো স্বাভাবিক দৃশ্য। অনেক সময় ব্ল্যাকেও টিকিট বিক্রি হতো। সকাল, বিকেল ও রাতের তিনটি শোতেই দর্শকের উপচেপড়া ভিড় থাকতো। কেউ কেউ একই সিনেমা দুই-তিনবারও দেখতেন।
নব্বইয়ের দশকে সিনেমার প্রচারণাতেও ছিলো আলাদা আকর্ষণ। মাইকিং করে পুরো শহর ঘুরে নতুন সিনেমার খবর জানানো হতো। দেয়ালে দেয়ালে লাগানো হতো বিশাল পোস্টার। রিকশার পেছনে ঝুলতো নায়ক-নায়িকার ছবি। সন্ধ্যা নামলেই সিনেমা হলের আশপাশে জমে উঠতো মানুষের আড্ডা।
ছায়াবাণী সিনেমা হলে নায়ক রাজ রাজ্জাকের ছবি চললে দর্শকদের ঢল নামতো। আবার সালমান শাহর নতুন সিনেমা মুক্তি মানেই তরুণ-তরুণীদের উন্মাদনা। কোহিনূরের পুরোনো দেয়ালজুড়ে ঝুলে থাকতো রঙিন পোস্টার। সিনেমা শুরুর আগ মুহূর্তে হলের ভেতরে-বাইরে যে কোলাহল তৈরি হতো, তা আজ শুধুই স্মৃতি।
সময়ের পালাবদলে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে মানুষের বিনোদনের ধরণ। টেলিভিশনের বিস্তার, স্যাটেলাইট চ্যানেল, পরে ইউটিউব, ফেসবুক ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম মানুষের হাতে এনে দেয় ঘরে বসে সিনেমা দেখার সুযোগ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলা চলচ্চিত্রের মানহানি। একসময় গল্পনির্ভর ও পারিবারিক চলচ্চিত্রের জায়গা দখল করে নেয় নিম্নমানের ও অশ্লীল কনটেন্ট। পরিবার নিয়ে সিনেমা হলে যাওয়ার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ে। অন্যদিকে সিনেমা হল পরিচালনার খরচ বাড়তে থাকে। বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন, ভবন রক্ষণাবেক্ষণ, প্রজেক্টর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে মালিকদের জন্যে। দর্শক কমে যাওয়ায় আয়ও হ্রাস পেতে থাকে। ফলে একে একে বন্ধ হয়ে যায় চাঁদপুরের সব সিনেমা হল।
আজ আর নেই ছায়াবাণীর সামনে টিকিটের জন্যে দীর্ঘ লাইন। নেই চিত্রলেখার ব্যস্ততা কিংবা কোহিনূরের পোস্টারে মোড়ানো দেয়াল। যেসব স্থানে একসময় মানুষের কোলাহল ছিলো, সেখানে এখন নীরবতা।
সবশেষ আশ্রয় মতলবের কাজলী সিনেমা হল। সব সিনেমা হল হারিয়ে যাওয়ার পর এখনো কোনো রকম নিঃশ্বাস নিয়ে টিকে আছে মতলব দক্ষিণ উপজেলার কাজলী সিনেমা হলটি। এটি এখন যেন চাঁদপুরের হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্র সংস্কৃতির শেষ প্রতীক।
তবে এখানেও দর্শক সংকট প্রকট। অনেক সময় সপ্তাহে একটি বা দুটি সিনেমা চালানো হয়। আবার অনেক দিন শো বন্ধও থাকে।
কাজলী সিনেমা হলের সিনেমা অপারেটর মো. মিলন মিয়া জানান, জাকির হোসেন নামের এক ব্যক্তি হলটি ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করছেন। কিন্তু আগের মতো দর্শক না থাকায় এখন অনেক সময় মাত্র ৪ থেকে ৫ জন দর্শক নিয়েই সিনেমা চালাতে হয়। আবার কোনো কোনো সপ্তাহে দর্শক না পেয়ে শো বন্ধ রাখা হয়। তিনি বলেন, দর্শক হইলে চালাই, না হইলে শো বন্ধ রাখতে হয়। তার এই কথাতেই যেন ফুটে ওঠে পুরো চাঁদপুরের সিনেমা হলগুলোর করুণ বাস্তবতা। একসময় যেখানে শত শত দর্শকের ভিড়ে গমগম করতো প্রেক্ষাগৃহ, সেখানে আজ হাতে গোণা ক’জন দর্শক নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম চলছে। তবে গত ক’বছর এভাবে এতোদিন সিনেমা হলের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখা হলেও ঈদুল আযহার পরে হয়তোবা এটিও চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন হল মালিক পক্ষ।
আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে সিনেমা হল যেন রূপকথার গল্প। তারা সিনেমা দেখে মোবাইল ফোনে, ইউটিউবে কিংবা নেটফ্লিক্সে। দল বেঁধে সিনেমা হলে যাওয়ার আনন্দ, টিকিট কেটে বড়ো পর্দায় ছবি দেখার উত্তেজনা কিংবা শো শেষে বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা নিয়ে আলোচনা--এসব অভিজ্ঞতা তাদের কাছে অচেনা। অথচ সিনেমা হল ছিলো এক ধরনের সামাজিক মিলনমেলা। সেখানে মানুষ একসঙ্গে হাসতো, কাঁদতো, আনন্দ ভাগাভাগি করতো।
চাঁদপুরের সিনেমা হলগুলোর বিলুপ্তি শুধু একটি ব্যবসা হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়, এটি একটি জনপদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস হারানোর বেদনা।
যে শহরে একসময় সন্ধ্যা নামলেই সিনেমা দেখতে মানুষের ঢল নামতো, আজ সেখানে সিনেমা হল খুঁজে পাওয়াই কঠিন। টিকে আছে শুধু কাজলী সিনেমা হল, সেটিও যেন শেষ নিঃশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অতীতের স্মৃতি বুকে নিয়ে।
সময়ের নির্মম বাস্তবতায় হারিয়ে যাওয়া সেই সিনেমা হলগুলো এখন শুধু মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। পুরোনো দিনের দর্শকদের চোখে এখনো ভাসে ছায়াবাণীর ভিড়, কোহিনূরের পোস্টার আর চিত্রলেখার ব্যস্ত সন্ধ্যা...







