বুধবার, ২০ মে, ২০২৬
জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয় অন্যান্য

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ০২:২৫

সরকারি সম্পদ খোলা আকাশের নিচে

মতলব পৌরসভার কোটি টাকার যানবাহন নষ্ট, দায় কার?

উজ্জ্বল হোসাইন ও রেদওয়ান আহমেদ জাকির।।
মতলব পৌরসভার কোটি টাকার যানবাহন নষ্ট, দায় কার?
ক্যাপশনঃ মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের পাশে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে ময়লা ফেলার গাড়ি এবং মিনি এক্সেভেটর (খননযন্ত্র)।

মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের পাশের একটি খোলা জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে মতলব পৌরসভার জন্যে কেনা কোটি টাকার সরকারি সম্পদ। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি ময়লা ফেলার গাড়ি এবং একটি মিনি এক্সেভেটর (খননযন্ত্র)। যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে ইতোমধ্যে এসব যানবাহনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে এবং অবশিষ্ট অংশগুলোও দ্রুত নষ্ট হয়ে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের পাশেই খোলা জায়গায় সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে পাঁচটি ময়লা পরিবহনের ট্রাক। পাশেই রাখা রয়েছে একটি মিনি এক্সেভেটর। গাড়িগুলোর চাকা অনেকাংশে বসে গেছে, বডিতে মরিচা ধরেছে, আর জানালার কাচ ভাঙ্গা। কিছু গাড়ির দরজাও খুলে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গাড়ির ব্যাটারি, তার, ইঞ্জিনের ছোটখাট যন্ত্রাংশসহ মূল্যবান অংশ ইতোমধ্যেই চুরি হয়ে গেছে। দিনের পর দিন নজরদারির অভাবে এই চুরির ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

জানা যায়, মতলব পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে এসব যানবাহন কেনা হয়েছিলো। প্রতিটি গাড়ির মূল্য কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকার মধ্যে এবং মিনি এক্সেভেটরের মূল্যও উল্লেখযোগ্য। সব মিলিয়ে এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে এক কোটিরও বেশি টাকা। কিন্তু বাস্তবে এসব যানবাহনের কোনো কার্যকর ব্যবহার না থাকায় তা এখন পরিণত হয়েছে অচল লোহার স্তূপে। ফলে সরকারের বিপুল অর্থ কার্যত অপচয় হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যেখানে পৌর এলাকায় নিয়মিত ময়লা অপসারণের সমস্যা রয়েছে, সেখানে এ ধরনের আধুনিক যানবাহন অকেজো পড়ে থাকা এক ধরনের অব্যবস্থাপনারই প্রমাণ।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, আমরা নিয়মিত ময়লার সমস্যায় ভুগছি, অথচ কোটি টাকার গাড়ি এখানে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আরেকজন বলেন, “যদি জায়গার অভাব থাকে, তাহলে অন্তত কোনো গ্যারেজ ভাড়া করে রাখার ব্যবস্থা করা যেতো। এভাবে ফেলে রাখার মানে হলো ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পদ নষ্ট করা।”

এ বিষয়ে মতলব পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, পৌরসভায় পর্যাপ্ত জায়গার অভাব রয়েছে। তাই সাময়িকভাবে এসব যানবাহন এখানে রাখা হয়েছে। তবে তার এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন স্থানীয়রা। তাদের মতে, ‘সাময়িকভাবে’ রাখা হলেও বাস্তবে এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, যা এখন স্থায়ী ক্ষতির রূপ নিয়েছে।

খোলা জায়গায় কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় চুরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এলাকাবাসীর দাবি, রাতের বেলা এসব জায়গায় কোনো প্রহরী থাকে না, ফলে সহজেই দুর্বৃত্তরা যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যেতে পারছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সম্পদের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এর জন্যে নির্দিষ্ট গ্যারেজ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি অপরিহার্য। এসবের অভাবেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এই ঘটনার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতাজবাবদিহিতার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। প্রকল্প গ্রহণ, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় যদি সমন্বয় না থাকে, তাহলে এমন অপচয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে. এম. ইশমাম মুঠোফোনে বলেন, মিনি এক্সেভেটর (খননযন্ত্র) নিয়মিত রাস্তার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। পৌরসভার জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় এবং ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় ময়লার গাড়িগুলো কম ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই উন্নয়ন হয় না, তার যথাযথ বাস্তবায়ন ও ব্যবহারের ওপরই প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে।

মতলব দক্ষিণে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি জনগণের করের টাকার অপচয় এর একটি দৃষ্টান্ত। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ক্ষতি আরও বাড়বে এবং জনমনে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হবে।

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।

ডিসিকে/ এমজেডএইচ

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়