প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ১০:৩৩
স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে চাঁদপুরের সংস্কৃতি মঞ্চে এখনও সক্রিয় ‘শব্দ সৈনিক’ কৃষ্ণা সাহা

চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে পথচলা এক পরিচিত নাম কণ্ঠশিল্পী কৃষ্ণা সাহা। সংগীত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যার জীবন জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, গণসংগীত, দেশাত্মবোধক গান থেকে শুরু করে লোকগীতি ও আধুনিক বাংলা গানে সমান দক্ষ এই শিল্পী আজও সংস্কৃতিচর্চায় সক্রিয় রয়েছেন নিষ্ঠা ও ভালোবাসা নিয়ে।
ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিলো তার গভীর অনুরাগ। স্বাধীনতার আগেই গানের চর্চা শুরু করলেও প্রকৃত অর্থে তার সংগীতজীবনের যাত্রা শুরু হয় স্বাধীনতার পর।
১৯৭২ সালে বান্ধবী কণ্ঠশিল্পী রূপালী চম্পকের মাধ্যমে তিনি চাঁদপুর ললিত কলায় সংগীত শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন। সেখানে তিনি ললিত কলার অধ্যক্ষ সংগীত গুরু প্রয়াত শীতল ঘোষাল, চম্পক সাহা, শান্তি রক্ষিত এবং প্রয়াত ইতু চক্রবর্তীর কাছে পর্যায়ক্রমে গানের তালিম নেন। সেই সময় চাঁদপুরের সংস্কৃতি অঙ্গনে ললিত কলা ছিলো শিল্পচর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ললিত কলার ব্যানারেই চাঁদপুর টাউন হলের মঞ্চে প্রথম গান পরিবেশন করেন কৃষ্ণা সাহা। আর সেই প্রথম মঞ্চেই যেন শুরু হয় তার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পথচলা।
তবে তার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পরিবারের সঙ্গে ভারতে আশ্রয় নেন তিনি। ভারতের আসাম রাজ্যের ভাওয়ালপুর শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানকালে স্বাধীনতার পক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান পরিবেশন করতে শুরু করেন। সে সময় ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্নেল এস. বি. থাপ্পা একটি সাংস্কৃতিক টিম গঠন করে দেন। সেই দলের সদস্য হয়ে কৃষ্ণা সাহা আসামের বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক, গান ও গীতিনাট্য পরিবেশন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগানো এবং শরণার্থীদের মাঝে সাহস ও দেশপ্রেম ছড়িয়ে দিতে তাদের এই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন এসব অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কর্নেল এস. বি. থাপ্পার স্বাক্ষরিত সনদপত্র অর্জন করেন তিনি।
স্বাধীনতার দীর্ঘ কয়েক যুগ পর ২০১৭ সালে তিনি তার অর্জিত সনদপত্রগুলো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। পরবর্তীতে ২০২০ সালে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিল (জামুকা) তাকে সাক্ষাৎকারের জন্যে ডাকেন। যাচাই-বাছাই শেষে তাকে ‘শব্দ সৈনিক’ হিসেবে মনোনীত করা হয়, যা তার জীবনের অনেক বড়ো প্রাপ্তি।
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন। পাশাপাশি চাঁদপুর ললিত কলা ও চতুরঙ্গ সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও দীর্ঘদিন সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। নিয়মিত শিল্পী হিসেবে চাঁদপুরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আয়োজন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির মঞ্চে তিনি গান পরিবেশন করে আসছেন। তার কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীতের কোমলতা, নজরুলের দ্রোহ, গণসংগীতের চেতনা এবং লোকগীতির মাটির টান দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে বহুবার।
১৯৯২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে চাঁদপুরে প্রথম শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার মঞ্চেও তিনি শিল্পকলা একাডেমির শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সে সময়ের বিজয় মেলা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন, আর সেই মঞ্চে অংশগ্রহণ ছিলো তার জন্যে গর্বের বিষয়।
এছাড়া চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির ব্যানারে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘জীবন যেখানে যেমন’ গীতিনৃত্য নাট্যেও অংশ নেন তিনি। সংগীত ও মঞ্চশিল্পে দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে তাকে ‘গুণী শিল্পী সম্মাননা’ পুরস্কার প্রদান করা হয়।
শুধু সংস্কৃতি অঙ্গনেই নয়, স্কুলজীবন থেকেই সংগীতে তার প্রতিভার স্বাক্ষর ছিলো স্পষ্ট। বিভিন্ন সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়ে অর্জন করেছেন একাধিক পুরস্কার ও সনদপত্র।
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার বিজরা গালিমপুর গ্রামের সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণা সাহার পিতা ছিলেন স্বর্গীয় পণ্ডিত যোগেশ চন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতা স্বর্গীয় সবিতা চক্রবর্তী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চাঁদপুরের পরিচিত মুখ বীর মুক্তিযোদ্ধা অজিত সাহার সহধর্মিণী।
নিজের দীর্ঘ সংগীতজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কৃষ্ণা সাহা বলেন, “আমাকে চাঁদপুরে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী হিসেবে দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠের প্রধান সম্পাদক রোটারিয়ান কাজী শাহাদাত আখ্যা দিয়েছেন। এটি আমার জন্যে অনেক বড়ো সম্মানের।”
সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে কণ্ঠশিল্পী কৃষ্ণা সাহা আজও এগিয়ে চলেছেন নিরলসভাবে। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছু বদলালেও তার কণ্ঠে এখনও বেঁচে আছে স্বাধীনতার গান, মানুষের গান, বাংলার মাটির গান। আর সংগীতের প্রতি এই ভালোবাসার গভীর টানকে ধরে রাখতে চান বাকি জীবনেও।







