শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৭ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৪, ০০:০০

মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস

এই জনমে

অনলাইন ডেস্ক
এই জনমে

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

এগারো.

কিছু কিছু মানুষর জীবন জলতরঙ্গের মতো। নদীতে তর তর করে বয়ে যায়, সাগরে ঢেউয়ের তালে উছলে উঠে আর পুকুরের বদ্ধ জল জীবনের মতো আবদ্ধ থাকে। কখনও কঠিন বাষ্প হয়, কখনও তরল মেঘ হয়ে পৃথিবীর জমিনে বৃষ্টি হয়ে বয়ে যায় আবার আগুনের তাপে কঠিন বাষ্পের মতো গলে গরম হয়ে যায়।

রূপালির জীবনটাও এমনই। তার জীবনে জলতরঙ্গের মতো তিনটা বাস্তবতাই সামনে এসেছে। সেই বাস্তবতায় সে কখনও ডুবেছে, আবার ভেসেও উঠেছে।

পাক আর্মিদের ক্যাম্প থেকে পালানোর পর সে কখনই বাঁচতে চায়নি। বেঁচে থেকেছে শুধুমাত্র দেশের জন্যে, দেশের শত্রুদের চরমভাবে ঘায়েল করার জন্যে। রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে।

তাই সে যুদ্ধ করতে করতে যখন দেখেছে মেহের জল্লাদ ও তার অনুচর হেকমতকে কোনোমতেই কাবু করতে পারেনি, তখনই সে বুলেট খরচ বন্ধ করে দেয়। তারপর পলায়নপর দুজনের পেছনে পেছনে গুপ্তচরের মতো এগিয়ে যেতে থাকে রাইফেলটা কাঁধে নিয়ে।

রাতের আঁধারে নদীটা পাড়ি দিয়ে ওই পাড়ে মেহের জল্লাদ ও তার অনুচর হেকমত আওরঙ্গজেবের ক্যাম্পে পৌঁছে। রূপালিও অন্য একটা নৌকায় করে একটু পরে সেখানে পৌঁছে যায়।

শেষ রাত। এখনও অন্ধকার অটুট আছে। মেহের জল্লাদ ও তার অনুচর হেকমত ক্যাম্পে প্রবেশ করতেই আওরঙ্গজেব প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে? তোমরা ভেগে আসলে কেনো? সব ক’টা মুক্তিযোদ্ধাকে খতম করতে পারলে না কেন?’

মেহের জল্লাদ অত্যন্ত বিনয় করে বললো, ‘সাহেব। ওরা দুইটি দল একত্রিত হয়ে গিয়েছিলো। ওরা সংখ্যায় ছিলো অনেক। তাদের চারদিকের আক্রমণে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলাম। তবে চিন্তা করবেন না। আমরা আবার হানা দিবো তাদের ক্যাম্পে। তারপর তাদের সবাইকে একে একে শেষ করবো জনাব।’

মুচকি হাসলো আওরঙ্গজেব। তারপর বললো, ‘ওদের ওখানে যতগুলো নারী আছে, সবার পেটে আমার সন্তান। তুমি চিন্তা করো না মেহের। ওদের পেট থেকে দশমাস পর আমার সন্তানগুলো বের হয়ে আসবে, তারপর এভাবেই সারাদেশে অগণিত নারীর পেট থেকে আমাদের সন্তানগুলো জন্ম নেওয়া শুরু করবে। একদিন এই নারীদের সন্তানগুলো আমাদের কথাই বলবে।’

‘আপনার তো স্যার ভয়ানক বুদ্ধি। তারিফ করতেই হয়, আপনার বুদ্ধির’। তেল মাখানো কথা বলে আওরঙ্গজেবের আরও নিকটবর্তী হলো মেহের জল্লাদ।

আর ক্যাম্পের পর্দার বাইরে থেকে কথাগুলো শুনছিলো রূপালি।

আওরঙ্গজেব বলতে লাগলো, ‘এটা আমার বুদ্ধি নয়, এটা উপর থেকে আমাদের প্রতি নির্দেশ। সময় ঘনিয়ে আসছে। ভারতীয় বাহিনীও এখন আমাদের দিকে আক্রমণ শুরু করেছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তেমন একটা অস্ত্রের যোগান দিচ্ছে না। যুদ্ধে আমাদের নির্যাতনের খবর বাইরের রাষ্ট্রের মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। ক্রমাগত আমাদের উপর চাপ আসছে এই যুদ্ধ বন্ধ করার। তাই হয়তো আর বেশিদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যাবে না। কিন্তু আমরা এই দেশের নারীদের পেটে আমাদের সন্তানগুলো রেখে যাবো।’ কথাগুলো বলেই হাসতে লাগলো আওরঙ্গজেব।

‘কিন্তু হুজুর, আমাদের কী হবে? আমাদেরকে পেলে তো ওরা আস্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।’ কম্পিত কণ্ঠে মেহের জল্লাদ বলতে লাগলো।

‘তোদের কিছুই হবে না। তোরাও তো পাকিস্তানের বংশধর, তা না হলে নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরিস? তোরাও আমাদের সাথে পাকিস্তানে চলে যাবি।’

এবার ভাবনায় পড়ে গেলো মেহের জল্লাদ। সে জানে, এই কয়েকটা মাসে সে হাজার হাজার বাঙালিকে নির্দয়ভাবে খুন করেছে, অনেক নারীকে ধর্ষণ করেছে, মানুষের বাড়িতে বাড়িতে হামলা চালিয়ে সবকিছু লুটপাট করেছে। পাকিস্তানে চলে যেতে না পারলে তো তাকে মানুষ আস্ত মুরগির রোস্ট বানিয়ে ফেলবে।

‘হায় কী হবে আমার!’ যে মেহের জল্লাদ হাজার হাজার মানুষকে খুন করতে বুক কাঁপতো না, মানুষকে কুকুরের মতো গুলি করতে ভয় পেতো না। আজ সেই মেহের জল্লাদ ভয়ে কাঁপতে শুরু করলো।

মেহেরের কাঁপন দেখে আরও হাসতে লাগলো আওরঙ্গজেব। তারপর তাকে বললো, ‘ভয় পাস না। যুদ্ধে আমরাই জিতবো। সব বাঙালিকে খতম করবো। তারপর তোদের সব বাহিনীকে আমরা আমাদের আর্মিতে নিয়োগ দিবো।’

মেহের জল্লাদ বুঝতে পারে, এটা তাদের মনের কথা নয়। আওরঙ্গজেবের কথায় বুঝা গেলো, এদের পালানোর আর বেশি সময় বাকি নেই। তাহলে? মেহের বুঝতে পারে তার কি করতে হবে। তাই সে বলে, ‘আচ্ছা হুজুর ঠিক আছে। আপনার কথায় খুব খুশি হলাম। আমরা তাহলে এবার যাই।’

রূপালি আর দেরি করলো না। সে দ্রুতবেগে নদীর কিনারায় চলে গেলো। তারপর নৌকাটায় করে নদীর ওই পাড়ে গিয়ে উঠলো।

আমির ও জহিরুল হক খানের বাহিনী রূপালিকে খুঁজতে ব্যস্ত ছিলো। রূপালি এই পাড়ে উঠতেই তাদের সাথে দেখা হয়ে গেলো। এ সময় ইমতিয়াজ দৌড়ে এসে রূপালিকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো, ‘তুমি কোথায় ছিলে রূপালি?’

রূপালি নিরুদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো, ‘আমি মেহের জল্লাদ ও তার অনুচর হেকমতকে অনুসরণ করছিলাম। কিছু কথা শুনেছি। ক্যাম্পে গিয়ে সব বলবো।’

কথা শেষ না হতেই জহিরুল হক খান এগিয়ে রূপালির সামনে এলেন। রূপালি তাঁকে দেখেই হতভম্ভ হয়ে গেলো। তারপর জড়িয়ে ধরে বললো, ‘ভাইয়া! তোমাকেই তো এতোটা মাস ধরে খুঁজছিলাম আমি। কোথায় ছিলে তুমি?’

আমি কানাইঘাট সীমান্ত যুদ্ধ করছিলাম। হঠাৎ গতকাল আমার কাছে ম্যাসেজ আসে তোমাদের ক্যাম্প রাজাকার বাহিনী আক্রমণ করবে, তাই আমরা নদী পাড়ি দিয়ে তোমাদেরকে সহযোগিতা করার জন্যে আসি। যুদ্ধ শেষে সবাই বললো, রূপালি নামের একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখনও আমি জানতাম না তুমিই সেই রূপালি।’

জহিরুল হক খানের বন্ধন মুক্ত হয়ে রূপালি খুশিতে চোখ মুছলো। পাক আর্মি ক্যাম্পে বন্দী জীবন শেষে এই জীবনে রূপালি এই প্রথম কাঁদলো এবং খুশিতে হাসলো। তারপর ইমতিয়াজের দিকে ইশারা করে বললো, ‘ভাইয়া, ইনি আমাকে ক্যাম্পে বিয়ে করেছেন, সবকিছু জেনে শুনেও।’

জহিরুল হক খান এবার অন্য এক ইমতিয়াজকে অনুধাবন করলেন। তারপর তার সাথে করমর্দন করে বললেন, ‘তুমি শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নয়, তুমি মহৎ হৃদয়েরও মানুষ। তোমার প্রতি আমার অভিবাদন।’

রূপালি এবার সবার কথাই বললেন। ইশাণবালা, অনন্যা, অধরা, ইরণাসহ ক্যাম্পের সব নারী পুরুষের মহানুভবতার কথাও খুলে বললেন।

জহিরুল হক খান এসব কথা শুনে বললেন, ‘আসলেই সবাই মুক্তিযোদ্ধা হতে পারে না। শুধুমাত্র যারা নিজের সব চাওয়া পাওয়া ভুলে সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করে অন্যের যন্ত্রণার ভাগ নিতে পারে অন্যের সুখের কারণ হতে পারে সে-ই মুক্তিযোদ্ধা হতে পারে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক বাঙালির পক্ষেই এটা সম্ভব। তোমাদের সবার প্রতিই আমার সম্মান ও দোয়া রইলো। যাতে তোমাদের জন্যে দেশ ও দেশের জনগণ এভাবেই আমরণ উপকৃত হতে পারে।’

এ সময় আমির এসে জহিরুল হক খানের সাথে করমর্দন করলেন। তারপর জহিরুল হক খান তার বাহিনী নিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসল গন্তব্যে চলে গেলেন।

হঠাৎ করেই আমিরের হাতের বেতার যন্ত্রটিতে ভেসে আসলো রফিকুল ইসলামের কথা, ‘আমি রফিকুল ইসলাম বলছি, রাজারবাগে দেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে গতকাল রাতে। তোমরা সজাগ থেকো। দেশের জন্যে সাহসিকতার সাথে লড়বে। প্রয়োজনে নিজের প্রাণ দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। আর আমরা আমাদের ত্যাগের বিনিময়ে খুবই দ্রুত হয়তো শত্রুমুক্ত হতে যাচ্ছি। তোমরা আশাহত হয়ো না। আল্লাহতায়ালা সব সময় নির্যাতিতের পক্ষে আছেন। আমাদের জয় হবেই।’

বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার বিষয়ে প্রথমে ক্যাম্পের সবাই মনে কষ্ট পেলেও রফিকুল ইসলামের শেষের কথায় সবাই আশার আলো খুঁজে পেলো। একসাথে সবাই বলে উঠলো, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।’ (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়