শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২৫  |   ২৬ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতিশিক্ষাস্বাস্থ্যসারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে মাটি বোঝাই বাল্কহেডসহ আটক ৯
  •   কচুয়ায় কৃষিজমির মাটি বিক্রি করার দায়ে ড্রেজার, ভেকু ও ট্রাক্টর বিকল
  •   কচুয়ায় খেলতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেছে শিশু সামিয়া
  •   কচুয়ায় ধর্ষণের অভিযোগে যুবক শ্রীঘরে
  •   ১ হাজার ২৯৫ কেজি নিষিদ্ধ পলিথিন জব্দ করেছে কোস্ট গার্ড

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৪, ০০:০০

খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(ষোড়শ পর্ব)

বাবা হচ্ছে পৃথিবীতে এক অনন্ত আকাশের মতো। ‘আমার বাবা আছে’ এই ভাবনাই মানুষকে মনোবলে বলীয়ান করে তোলে। পিতৃহীন হওয়ার পর থেকে পিতার স্নেহের ফল্গুধারাকে যেন আরও বেশি করে অনুভব করতে লাগলাম। শৈশবে বাবাকে ভয় করে সন্ধ্যার আগে আগে খেলার মাঠ থেকে ঘরে ফেরা এখন মনে হয় যদি অনন্তকাল ধরে থাকতো! দুয়েকবার এমনও হয়েছে, বাবার শার্ট ছোট করে আমিও পরেছি। বাবাকে কোথাও প্যান্ট-শার্টের কাপড় উপহার দিয়েছে, বাবা তা আমাকে দিয়ে দিয়েছেন। একাকী রিকশায় চলতে চলতে বাবাকে মাঝে মাঝে ভাবি। আমাদের বড় পরিবারের জাহাজটাকে তিনি একাকী সংসারের সমুদ্রে টেনে নিয়ে গেছেন। মধ্য সমুদ্রে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জাহাজের মতোই মধ্যবিত্তের সংসার একটা সময় টাল-মাটাল হয়ে যায়। কিন্তু বাবার নিবেদিত নেতৃত্বে আমরা নিরাপদে তীরে অবতরণ করতে পেরেছি। বাবা কেবল আমাদের জন্যে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি আমাদের জন্যে তৈরি করে গেছেন সামাজিক মর্যাদার এক সমীহ জাগানিয়া বলয়। সমাজে বা ভিন্নগ্রামে আমরা সুরেশ বাবুর ছেলে বললেই মনে হতো যেন অন্যদের চেয়ে একটু গভীর মমতায় ও সমীহে গৃহীত হচ্ছি। সুরেশ বাবুর ছেলে হিসেবে অগ্রজরা যে ভালোবাসা ও মর্যাদায় আমাদের গ্রহণ করতো এবং করেন, তাতে আজ বুঝতে পারি, একজন দূরদর্শী প্রাজ্ঞ পিতা কেবল সন্তানদের লালন-পালনই করেন না, তাদের বিচরণের ক্ষেত্রটাকেও মর্যাদামণ্ডিত করে রেখে যান। আমার পিতৃস্মৃতিতে বাবার এই অবদান অম্লান হয়ে থাকবে।

দুহাজার ছয় থেকে দুহাজার আট, এই দুবছরের অধিক কিছু সময় বাংলাদেশের জন্যে ছিলো এক অদ্ভুত ক্রান্তিকাল। খুব সহজে যেন ক্ষমতার পালা বদল হতে চাইছিলো না। মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ঘোষণা করে সেই জটিলতাকে আরও দুরতিক্রম্য করে তুললেন। দুহাজার ছয় সালের সেপ্টেম্বরে বাবার প্রয়াণের পর দুহাজার সাতের জানুয়ারিতেই মা তাঁর সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তথা আমাদের সবচেয়ে ছোট বোনের বিবাহ সম্পন্ন করে ফেললেন। তার যেদিন বিয়ের পাকা কথা হবে এবং আশীর্বাদ হবে সেদিন সিডরকে মাথায় নিয়ে আমি গিয়েছিলাম চট্টগ্রাম। বাসায় একা রেখে গিয়েছিলাম আমার পত্নীকে যার তখন শারীরবৃত্তীয় কারণে পথযাত্রার ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব ছিলো না। তার কাছে রেখে গিয়েছিলাম আমার চেম্বারের সাগর নামে এক ছোট্ট কিশোরকে। সিডরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে তাদের খুব কষ্ট হয়েছিলো সেদিন আঁধার মোকাবেলায়।

চট্টগ্রামের লাকেরা নামের সমৃদ্ধ বৌদ্ধ জনপদে ছোটবোন সুমনাকে সুপাত্রস্থ করা হলো। চট্টগ্রাম শহর থেকে কালুরঘাট সেতু পার হয়ে কর্ণফুলি নদীকে অতিক্রম করে কিছুদূর গেলেই লাকেরা। সবুজ তরুবীথি, টলটলে পুকুরে শোভিত শ্যামল এক পল্লি জনপদ। সর্বকনিষ্ঠার বিয়ে উপলক্ষে মায়ের আনন্দ-বেদনার অনুভূতি অধিক। একে তো আমরা সবাই সদ্য পিতৃহারা, তার ওপর মায়ের কাছে আর কেউ আঁচল ধরে থাকলো না। বিয়ে উপলক্ষে আল্পনায় মায়ের নির্দেশ, কনে বিদায় কথাটা লেখা যাবে না। মেয়েকে বিদায় কেন দিবো। বিয়ে দেওয়া আর বিদায় দেয়া তো এক নয়। অতএব বিবাহের আল্পনায় লেখা হলো, রাঙার বিয়ে। মায়ের নির্দেশ পেয়ে আমি ছুটলাম হাজারী গলিতে যাতে বিয়ের গীত বা হঁলার (আঞ্চলিক বিয়ের মেয়েলি গান) গানের ক্যাসেট পাওয়া যায়। মায়ের ইচ্ছে, গায়ে হলুদে এ গান বাজবে। সারা ঘরে একটা নান্দনিক উৎসবের আমেজ তৈরি হবে। বিয়েতে একটা নিয়ম আছে, কন্যা সম্প্রদান। বাবা তো নেই। কাকারাও দূরবর্তী অঞ্চলে আবাস গড়ে তুলেছেন। একজন আসামের গৌহাটিতে আর একজন রামগড়ে। কাজেই মায়ের নির্দেশ ও ঐকান্তিক ইচ্ছেতে বড় মামা প্রকৌশলী সুনীল কান্তি বড়ুয়াই কন্যা সম্প্রদান করলেন। এতে আবারও বুঝলাম, আমার মা তাঁর ছোট ভাইদের প্রগাঢ় স্নেহ করতেন। তাঁরাও আমার মাকে বোন না ভেবে তাঁদের বড় ভাই হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। সুমনার বিয়েতে সামাজিকীকরণের অনুষ্ঠানে মন্ত্র পাঠ করেন আমাদের গ্রামের কাকা, তৎকালীন সদ্য অবসরে যাওয়া বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব বিমল কান্তি বড়ুয়া। তিনিও একজন স্বখ্যাত মানুষ।

দুহাজার সাত সালের মার্চ মাস। মার্চ এমনিতেই বাঙালি জীবনে স্বাধীনতার মাস, বঙ্গবন্ধুর জন্ম মাস এবং ঐতিহাসিক ভাষণ-মহাকাব্যের মাস। মার্চ যেমন আলবার্ট আইনস্টাইনকে দিয়ে গেছে পৃথিবীর কোলে তেমনি দিয়ে গেছে গণিতের গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুবক 'পাই'কেও। এতোসব মহান ঘটনার ফাঁকে মার্চের শেষ দিনে আমারও নবজন্ম হয়। এতদিন আমি ছিলাম শুধুমাত্র আমার জনকের তনয়। কিন্তু মার্চের একত্রিশ তারিখ আমাকে পৃথিবীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিলো প্রত্নের বাবা হিসেবে। মার্চ তাই আমার কাছে অনন্য ও অদ্বিতীয়। জনক হিসেবে আমার পরিচিতি লাভের মাস হলো মার্চ। সেদিন ছিলো শুক্রবার সকাল আটটার সময়। চাঁদপুর শহরের স্টেডিয়াম রোডস্থ সিটি হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট ছিলেন কিশোরদা। তার সূত্রে ঐ হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো আজকের মুক্তা পীযূষকে। ডাঃ ফাতেমা নেওয়াজ আপার হাতে জন্ম নিলো সুরেশ বাবুর প্রথম পৌত্র প্রত্ন পীযূষ। তার মামীর কোলে শুয়ে সে দেখে প্রথম তার জনকের মুখ, সদ্য জন্মদাত্রী জননী তখনো অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে বেদনাকে প্রশমিত করতে অবেদনবিদের দেওয়া ব্যথানাশকে তন্দ্রাচ্ছন্ন। আগের দিনও তার মায়ের কোনো অসুবিধা ছিলো না। কিন্তু সেদিন সকাল থেকেই পানি চুয়ে চুয়ে পড়তে থাকায় মায়ের গর্ভে তার থাকার জায়গায় জলস্বল্পতা দেখা দেয়। তবে তেমন কোনো অসুবিধা না হলেও সাবধানী চিকিৎসার কারণে প্রত্ন জন্ম মাত্রই হাতে পরতে হলো ক্যানুলা যা দিয়ে পৃথিবীর কীটাণুর সাথে যুঝতে তাকে দেওয়া হলো অ্যান্টিবায়োটিক ও পুষ্টি। সিটি হাসপাতালের দোতলায় শুয়ে শুয়ে তার মা আবিষ্কার করলো হঠাৎ, ছোট শিশুটা কান্নার সাথে সাথে তার ক্যানুলা লাগানো হাতটি জাগিয়ে তুলে নাকি মাকে জানান দিতো ব্যথার কথা। দিন তিনেক পরে তারা মা-ছেলে স্বর্ণখোলা বাস স্ট্যান্ডের কাছে চারতলার বাসায় পদার্পণ করলো। বাসায় আসার পর রোশনি বেগম নামে একজন গৃহ সহায়িকার মমতায় আমাদের নতুন দিনগুলো সহজ হয়ে উঠলো। তিনি প্রসূতির জন্যে সেবাদাত্রী হয়ে নিজেকে নিবেদন করলেন নিঃস্বার্থভাবে। প্রত্নের মামী শিলা আমাদের মন খারাপ করে দিয়ে দুসপ্তাহ পরে চলে যেতে বাধ্য হলো তার সংসারের টানে। শিলার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা অফুরান। শিক্ষা আর রুচিবোধের কারণে সে কোনরূপ জটিলতা ছাড়াই আমাদের সেবাদাত্রী হয়ে যেতে পেরেছিলো সংকটে সহায় হয়ে।

দুহাজার সাত পেরিয়ে দুহাজার আটের দিকে জুলাই মাসের এগার তারিখ আমার স্বর্ণখোলা রোডের বাসায় চুরি হলো দিনে-দুপুরে। সেদিন ছিলো বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। প্রত্নকে নিয়ে তার মা গেছে মাতৃত্ব অর্জনের পরে প্রথম বাপের বাড়ি। আমি রোটারী ক্লাব ভবনে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি সূর্যের হাসি ক্লিনিক থেকে। জেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দীপক বাবুর আগ্রহে আমি বক্তব্য দেই। এই প্রথম সম্ভবত চাঁদপুরে কোনো অনুষ্ঠানে আমার বক্তা হিসেবে নিজেকে উন্মোচিত করা। নচেৎ এতোদিন কারও জানা ছিল না আমার বক্তা হিসেবে অভ্যস্ত জীবনের কথা। ছোট বেলা থেকেই মঞ্চে বক্তৃতা দিতে দিতে আমি বড় হয়ে উঠেছি। তৃতীয় শ্রেণিতে থাকাকালীন খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরীর হয়ে জেলা শিশু একাডেমীতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে আমার মঞ্চ জীবনের শুরু। মাঝখানে দুহাজার পাঁচ থেকে দুহাজার আটের জুন পর্যন্ত আমার এই চর্চার বিষয়টি সম্পর্কে কেউ ওয়াকিবহাল ছিলো না। ডাঃ ইলিয়াছ ভাইয়ের সঞ্চালনায় আমি আমার পাঁচ মিনিটের বক্তব্য দিয়ে পৃথিবীর জনসংখ্যার ওপর নিজের অভিমত প্রকাশ করলাম। সবেমাত্র তখন পৃথিবী তার সাতশো বিলিয়ন জীবিত সন্তানের মা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে কখন বেড়ে জনসংখ্যার ঘনত্ব দুহাজার হয়ে যায় সে বিষয়ে উদ্বেগ ঝরে পড়লো আমার বক্তব্যে। র‌্যালি আর বক্তব্য শেষ করেই আমি চলে গেলাম বাবুরহাটে আমার সাপ্তাহিক চেম্বারে। দুপুর দুটোর দিকে বাসায় উঠতে গিয়ে দেখি, আমার ঢোকার দরজায় পর্দা চাপা দেওয়া। অর্থাৎ বুঝতে পারলাম, এ ঘরে কারও অবৈধ ও অসিদ্ধ অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আমি লক ভাঙা দরোজা ঠেলে ঘরে ঢুকে দেখলাম, সামনের শোকেসের আয়না ভাঙা। শোয়ার কক্ষে দেখলাম, সব ড্রয়ার তন্ন তন্ন করা। দুঃখের মাঝেও চোরের কষ্ট দেখে হাসি পেলো ভীষণ। চোর জানতো না আমি ঘরে কোনো স্বর্ণালঙ্কার রাখিনি। কিংবা নিজ সামর্থ্যে রাখার মতো অতো স্বর্ণগহনা আমার নেই। আমি দিনজীবী মানুষ। বর্তমানকে বেচে খাই। ভবিষ্যৎ থাকে আমার কল্পনায় আর অতীত থাকে আমার নিঃসঙ্গতায়। ফোনে এই মহা সুসংবাদ ঘরের কর্ত্রীকে জানাতে হলো। তিনি জেনে সফর সংক্ষিপ্ত করে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে তৈরি হলেন। আমি এ ফাঁকে বাসার তত্ত্বাবধায়কের সাথে আলাপ করে নিলাম। কী করণীয়। তিনি কিছু করার মতো আগ্রহ দেখালেন না। উল্টো বাসা ছেড়ে দেবো বলায় তিন মাসের আগাম ভাড়া, গড় বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল দাবি করে বসলেন। মাথা গেলো গরম হয়ে। ব্যাটা এমনিতেই ঘরের নিরাপত্তা দিতে পারলি না এবং ভাড়াটিয়াকে চুরি হওয়া জিনিস উদ্ধারে সাহায্য করতে পারলি না তার উপরে বাড়তি ভাড়া চাস্? শুনিয়ে দিলাম নিজের যত ক্ষোভের কথা। তারপর তিনি সেই মাসের ভাড়াসহ বিদ্যুৎ বিল নিয়ে আমাকে ছাড়তে রাজি হলেন। যেদিন বিউটি স্টোরের পেছনে নতুন বাসায় স্থানান্তরিত হতে যাচ্ছিলাম, সেদিন হাল্কা বৃষ্টির কারণে আমার আসবাব ও বিছানাপত্তর বরুণসিক্ত হয়ে গেলো বিরক্তি উৎপাদন করে। ফলে সুখকর স্থানান্তর হলো না। এর ওপর ওয়াশিং মেশিন সেট করতে গিয়ে দিলীপ নামের প্রিয়ভাজন কর্মযোদ্ধা পুরো বাড়ি পানিতে সয়লাব করে দিয়েছিলো। এতে আমার সদ্য হাঁটতে শেখা ছেলেটা জলবাহিত জীবাণু সংক্রমণের কারণে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে রাতভর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিলো। এ সময় আমার প্যাথলজি ল্যাবের নাহার-সোহাগ এরা ভাগ্যিস আমাকে সহযোগিতা করেছিলো। নাহার নিয়েছিলো রান্নার দায়িত্ব আর সোহাগ রাইস স্যালাইন বানিয়ে হাসপাতালে আনা-নেওয়া করেছিলো। তাদের পাশাপাশি অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালসের এরিয়া ম্যানেজার অনুপদা তাঁর এমপিও উত্তমকে দিয়ে মতলব আইসিডিডিআরবি থেকে তাদের তৈরি স্যালাইন (বা হালুয়া বলে অনেকেই) আনিয়ে দিয়েছিলেন। স্কয়ারের প্রিয়তোষ, রবিউল, মারুফ, শরিফ এরাও আমাদের সহযেগিতায় এগিয়ে এসেছিলো।

কিন্তু বাসাটা আমাদের ভালো ছিলো না। বিশেষত বাসার মালিক ছিলো জটিল মানসিকতার। সেই কারণে দুহাজার নয় সালের দিকে আমরা চলে আসি স্টেডিয়াম রোডে আবুলের দোকানের সামনে, মাদ্রাসা রোডে অবস্থিত আখতার সাহেবের বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায়। বাসাটি ঠিক করে দেন কিশোর সিংহ রায়। তার অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার দিয়ে তিনি ধোয়া-মেছা করিয়ে আমাদের জন্যে বাসযোগ্য করে তোলেন। আখতার সাহেবের বিল্ডিংয়ের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন শহিদ। তিনি রিকশা চালাতেন একবেলা এবং গণফোরামের রাজনীতি করতেন। বেশ ভালো লোক ছিলেন। আমার ছেলেরা তাকে পছন্দ করতো বেশ। বাসাটার সবকিছু ভালো থাকলেও দুটো জিনিস দুর্বল ছিলো। প্রথম পুরানো দরোজা-জানালা আর দ্বিতীয়ত বাড়ি নিয়ে বাড়ি ওয়ালা ও তার আত্মীয়দের মধ্যে মামলা। এই বাসাতেই একসময় থাকতেন তখনকার তারকা ম্যাজিস্ট্রেট রোকনউদ্দৌলা। এ কথা বাড়িওয়ালা যখনই চট্টগ্রাম থেকে সস্ত্রীক আসতেন তখনই বলতেন। বাড়িটি পেয়েছিলেন পৈত্রিক সূত্রে ঐ ভদ্রলোকের পত্নী। বোনে-বোনে দ্বন্দ্বের কারণে আমরাও তার আত্মীয়দের নেতিবাচক আচরণের শিকার হতাম। এ বাসাতে থাকাকালীন একদিন সূর্যের হাসি ক্লিনিকের শাহেদ রিয়াজ ভাইয়ের কাছে শুনতে পেলাম, চাঁদপুর ক্লাবে জাতীয় বিতর্ক উৎসব হচ্ছে। কথাটা শুনে আমার আগ্রহ তৈরি হলো। আমি তাকে ঠাট্টা করে বললাম, বিতর্কের ওস্তাদ বসে আছে এখানে, তাকে না জানিয়ে এ আবার কেমন বিতর্ক উৎসব? আমার কথা শুনে রিয়াজ ভাই বললেন, ঠিক আছে, আমি একদিন শাহাদাত ভাইকে আপনার কথা বলবো। আসলে যার রক্তে প্রেম ঢুকে গেছে তাকে কেউ তার প্রিয় বিষয় থেকে দূরে রাখতে পারে না। যেদিন চাঁদপুর ক্লাবে বিতর্ক উৎসব চলছিলো সেদিন ছিলো শুক্রবার। আমি বাবুরহাটে আমার সাপ্তাহিক চেম্বার সেরে আবার শহরের চেম্বারে ফিরে এলাম দুপুর দেড়টায়। এসে কৌতূহলবশত ঢুঁ মারলাম চাঁদপুর ক্লাবে। দেখলাম, প্রাঙ্গণ ফাঁকা। সবাই নামাজ ও মধ্যাহ্ন বিরতিতে গেছে। আমি মিনিট দুয়েক দেখে ফিরে আসবার পথে দেখা হলো পলাশ মজুমদারের সাথে। তখন পলাশকে চিনতাম ডাঃ বিদ্যুৎ মজুমদারের ভাগিনে হিসেবে। সে আমাকে দেখে বললো, দাদা, আগে জানলে তো আপনাকে বিচারক রাখা যেতো। আমি তার কথা শুনে ফিরে আসতে আসতে মনে মনে বললাম, ব্যাটা বিচারক রাখা যেতো নাকি বক্তা রাখা যেতো সেটা তো আর জানো না। (চলবে)

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়