প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৪, ০০:০০
খণ্ডে খণ্ডে অখণ্ড জীবন

(পঞ্চদশ পর্ব)
জীবন হলো উপযুক্ত তালের যুগলবন্দিতা। যারা জ্যোতিষ শাস্ত্র ব্যাখ্যা করেন বা চর্চা করেন তারা বিশ্বাস করেন হৃদয়ের অর্ধেক আপনি বহন করছেন আর অর্ধেক তিনি বহন করছেন যিনি আপনার জীবনের অর্ধেক। খণ্ডকালীন কর্মক্ষেত্র আমাকে আর্থিক প্রাচুর্য না দিতে পারলেও পূর্ণকালীন জীবনসঙ্গীর সম্মিলন ঘটিয়ে দিয়েছে। ডাক্তারিবিদ্যার চর্চার মাধ্যমে অন্নের সংস্থান করতে গিয়ে অন্নপূর্ণাও যে স্বয়ং স্বয়ম্বরা হয়ে উঠবেন তা বিলক্ষণ জানা ছিলো না। ফলে লক্ষ্মী পকেটে না এসে হৃদয়ে বাসা বেঁধে দখিনা মলয়ের বীজনে জীবনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তুললো। কখনো কখনো রিকশাকে অমানবিক বাহন বলে মনে হলেও মলয় বীজনের এমন বসন্ত দিনে রিকশাই হয়ে উঠলো নান্দনিক। প্রগাঢ় শীতে আইসক্রিমের স্বাদ নিতে নিতে অলিতে গলিতে ভ্রমণে অনিকেত পথ হয়ে উঠলো আনন্দ নিকেতন। ফলে কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলকে বন্ধন ভেবে বন্ধনহীন জীবনের লক্ষ্যে মুক্তির বলাকায় উড়ে যাই প্রতিবেশীর কাছে। সে এক আশ্চর্য রোমাঞ্চ জাগানিয়া দিন। জীবনের মধুকে যাপনের চন্দ্রিমায় উদযাপন করতে করতে ঘুরে ঘুরে দেখা হলো জ্যোতিবাবুর বাংলো থেকে চা আর টিলার দেশ। শেষমেষ আবারো জীবন থিতু হলো ইলিশের কাছে এসে। অর্থাৎ আমার পূর্বতন কর্মশহরে এসে শুরু হলো আমার সংসারকে সারবত্তায় পূর্ণ করে তোলার দিনপঞ্জি। ঐতিহাসিক বড় মসজিদের শহর হাজীগঞ্জে প্রিয়লাল বাবুর স্নেহনীড় হয়ে উঠলো আমাদের টোনাটুনি হয়ে ওঠার প্রথম তীর্থ। তাদের মমতার ঘ্রাণে আমাদের যে নির্মিতি হলো তার ওপর ভর করেই আমাদের স্থানান্তর হলো স্বর্ণখোলায়। বাসগুলো যাত্রী আনা-নেওয়া করে সারাদিন সেই জায়গায় আর আমরা তাদের যান্ত্রিক শব্দ শুনে শুনে রচনা করি স্বপ্ন ও বাস্তবতার মনোজ্ঞ জীবনকাব্য।
বাংলাদেশের জন্যে তখন এক অনিশ্চিত লগি-বৈঠার কাল। রাষ্ট্রপতি সেসময় নিজেই নিজেকে ঘোষণা করেছেন অন্তর্বর্তী নির্বাহী প্রধান হিসেবে। রাস্তায় তাই অবধারিতভাবে নেমে এলো জলপাই রঙ। ব্যারাক ছেড়ে জলপাইগুলো সাধারণ জনতাকে যখন সবক দিতে ব্যস্ত তখন, সেই অনিশ্চিত দিনে শুরু হলো আমার কর্মক্ষেত্রের যাত্রা। তার নাম দেওয়া হলো কেয়ার এন্ড কিওর। নামটি আমারই দেওয়া। ওপার বাংলার বারাসাতে আমার কিছুদিনের ডাক্তারি করার অভিজ্ঞতা ছিলো এই নামধারী হাসপাতালে। তারই কৃতজ্ঞতায় এই নামটি ধারণ করে আহমদ শপিং সেন্টারের নিচতলায় আমার যাত্রা হলো শুরু। সাথে পেলাম আরো বেশ কয়েকজনের সহযোগ।
কেয়ার এন্ড কিওরকে মূলত জন্ম দিয়েছে 'দীর্ঘায়ু' প্রকল্প। এটি বিনামূল্যে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার একটা প্রকল্প ছিলো যার অর্থায়ন আমরাই করতাম। ফার্মাসিউটিক্যালস্ কম্পানিগুলো থেকে পাওয়া ঔষধের সাহায্যে এই প্রকল্প চলতো। চিকিৎসাপ্রার্থী মানুষদের কাছ থেকে দশ টাকা করে একটা টোকেন মানি নেওয়া হতো যাতে তাদের কাছে এই চিকিৎসা গুরুত্ব পায়। 'দীর্ঘায়ু'র লোগো-এর পরিকল্পনা আমারই করা। নামটাও আমি দিয়েছিলাম। 'দীর্ঘায়ু'র আয়োজনে আমরা চেয়ারম্যানঘাট গুচ্ছগ্রাম, জামতলা, স্বর্ণখোলা, গুণরাজদী ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে মেডিক্যাল ক্যাম্প করি। আমি ছিলাম মূল চিকিৎসক আর মাহবুব ছিলো সহকারী। তার সহকারী ছিলো শিখা। আমাদের এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন প্রিয়তোষ, রবিউল, মারুফ, ফারুক, মোর্শেদ, বাবু, অনুপ, উত্তম, কিশোর প্রমুখ। তখন ছিলো মাইক্রো ক্রেডিট ও সমবায় সমিতির রমরমা যুগ। ড. মুহম্মদ ইউনুছ নোবেল পেয়েছেন। কাজেই সবাই হুজুগে মেতে সমবায় সমিতির মালিক হতে থাকলো। আমরাও একটা সমবায় সমিতির নিবন্ধন নিলাম কিন্তু চালাতে পারিনি। সমবায় সমিতির নাম দেওয়া হয়েছিলো 'মাদার কো-অপারেটিভ সোসাইটি'। লোকজনের শ্রম ও সময়ের অভাবে 'দীর্ঘায়ু' প্রকল্পটাও বন্ধ করে দিতে হলো। সবাই মিলে কেয়ার এন্ড কিওরে মনোনিবেশ করলাম। তবে সমবায় সমিতির নিবন্ধনটা বিক্রি করে দিলাম মোর্শেদের কাছে। তখন মোর্শেদ অবশ্য ডেসটিনির সাথে যুক্ত হয়ে অতি লোভের ফাঁদে পড়ে নিজের জীবনের ডেসটিনিকে ওলট-পালট করে ফেলেছে। কেয়ার এন্ড কিওরের যাত্রার আগে কিছুদিনের জন্যে আমার ঠিকানা হয় পিয়ারলেস। কিন্তু পিয়ারলেসে দুটো গ্রুপ হয়ে যায়। ফলে যার কারণে পিয়ারলেসে ছিলাম তার কারণেই পিয়ারলেস ছেড়ে কেয়ার এন্ড কিওরে চলে আসি।
দুহাজার ছয় সালের সেপ্টেম্বর মাস। মাঝামাঝি সময়। পনের সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে চারটা। মোবাইল ফোনে এক মর্মবিদারী খবর এলো। আমার জন্মদাতা বাবা পৃথিবীর সকল মায়াকে কাটিয়ে চলে গেছেন অমর্ত্যলোকে। আমি বজ্রাহতের মতো সে খবরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। কোনোরকমে পরনের কাপড় নিয়ে রওনা করি বোগদাদে বিশ্বরোড। তারপর বিশ্বরোড হতে সৌদিয়া প্রিন্সযোগে চট্টগ্রাম অলংকার এবং অবশেষে সিএনজিযোগে আমার বাসা। তখন বাসা ছিলো সদরঘাট সানরাইজ ভবনে। তৃতীয় তলায়। পিতৃপ্রয়াণ যেন লহমায় আমাকে জীবনরেখায় টেনে বড় করে তুললো। আমি বাসযাত্রায় যত অমূল্য পিতৃস্মৃতি রোমন্থন করতে করতে চলেছি। এর মাঝে সহযাত্রী কেউ একজন অবশ্য লগি-বৈঠার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলো।
বাবার সাথে আমাদের সম্পর্ক কখনো সহজ ছিলো না। আমার রাশভারী বাবা তাঁর মধ্য বয়সেও আমাদের সাথে সহজ হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর ব্যক্তিত্ব আমাদের কাছে ছিলো প্রখর ও গম্ভীর। কখন তাঁর সাথে একত্রে বসে এক টেবিলে খেয়েছি তা মনে পড়ে না। হয় আমরা আগে ফেলতাম না হয় তিনি খেয়ে নিতেন একা বসে। কখনো আমরা খাওয়াকালীন বাবা এলে বাইরে থেকে, আমরা তাড়াহুড়ো করে খাওয়া শেষ করে নিতাম। মা আমাদের সেই তাড়াহুড়োয় আরও ঘি ঢালতেন নিজে থেকে কথা বলে, ' তোরা খেয়ে নে, কোন অসুবিধা নেই।' এতে আমরা আরও তাড়াহুড়া করে খেয়ে নিতাম। একদিন ঠেগরপুণি মেলায় অন্যরা কেনাকাটা করতে গেলে আমি ও বাবা পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়েছিলাম। মেলা হতে কেনা একটা বল খেলতে গিয়ে আমি পুকুরে ফেলে দিলাম। বাবা আমাকে না বকে সেই বল তুলে এনে দিলেন। আমি অবাক হয়েছিলাম। বাবা একটুও বকেননি বলে। কখনো কখনো বাবার বাসায় ফিরতে দেরি হতো। রাতে তিনি গেটের বাইরে থেকে আমার নাম ধরে ডাকতেন। আমি যেন কানকে জাগিয়ে রাখতাম কখন বাবা ডাকবেন তা শুনতে। আমি উঠে দরজা বা গেট খুলে দিতাম। আমার দাদুও তাঁর মতো রাশভারী ছিলেন। ফলে বাবার শৈশবও কেটেছে আমাদের মতো রাশভারী বাবার সাথে। বাবার সাথে আমাদের বড়ো মিল ছিলো ক্রিকেট খেলা নিয়ে। আমি, আমার ছোটভাই এবং বাবা মিলে একসাথে টিভিতে খেলা দেখতাম। বিশেষত শচীন তেন্ডুলকারের ব্যাটিং। বাবার খুব প্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন শচীন। বাবাকে ভাবতে ভাবতেই আমি পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।
বাড়ি পৌঁছে বাবাকে পেলাম তিনি দেহান্তরিত। তাঁর চারপাশে বসে আছে আমার বোনেরা। মা বসে আছেন বাবার নিথর দেহটা ধরে। শেষদিকে বাবা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর রক্তে শর্করার পরিমাণ কমে গিয়েছিল। কোন না কোন একটা উছিলায় মানুষকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়। বাবাকেও তাঁর পৃথিবীর জীবনাবাস গুটিয়ে যেতে হল চিরকালীন আবাসে। আমার বড়দা আসার প্রতীক্ষায় বাবার হিমায়িত দেহ রাখা হলো সিটি কর্পোরেশনের ফ্রিজিংয়ের গাড়িতে। চকবাজার কাতালগঞ্জ বৌদ্ধ বিহারের আঙিনায় বাবার মরদেহ আমরা ঘিরে থাকলাম রাতভর। পরদিন বাবাকে নিয়ে রওনা হলাম গ্রামের বাড়িতে। যাওয়ার পথে কালুঘাট সেতুতে এসে মায়ের কথা মোতাবেক মৃত্যুকালীন বাবার গায়ের শার্ট ও লুঙ্গি ফেলে দিলাম কর্ণফুলি নদীতে। বাবার প্রিয় গ্রামে পৌঁছে এই প্রথম বাবা নির্বাক হয়ে থাকলেন। কাউকে ডাকলেন না, কাউকে খোঁজ করলেন না।
বাড়ির উঠোনে বাবার প্রয়াণে অনিত্য সভা অনুষ্ঠিত হলো। সেই অনিত্যসভায় মরদেহকে সামনে রেখে পূজনীয় ভিক্ষুসংঘ উপস্থিত সকলকে মৃত্যুর মাহাত্ম্য সম্পর্কে জ্ঞান দান করলেন। বাবার আলোকিত জীবন নিয়ে কেউ কেউ তাঁর সম্পর্কের উষ্ণতা স্মরণ করলেন। বাবার শেষ যাত্রার জন্যে বানানো হলো আলং। তা-ই কাঁধে নিয়ে গ্রামের যুবকেরা চললো শ্মশানের দিকে। সাঁঝের মায়ায় বাবা তাঁর প্রিয় বাড়ির পুকুর প্রদক্ষিণ করে চলে গেলেন অগস্ত্য যাত্রায়।
গ্রামে বাবাকে শ্মশানে অন্তিম বিদায় দেওয়ার পর আমরা সাতদিন থাকলাম। ছোটভাই পুষ্প বাবার জন্যে শেষকৃত্যের করণীয়গুলো করলো। পরদিন আমাকে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রামণ্যধর্মে প্রব্রজ্যিত করা হলো। প্রয়াত বাবার মঙ্গলার্থে এই প্রব্রজ্যা। প্রতিদিন মা বিকালে ফ্লাস্কে করে আমার জন্যে রং চা নিয়ে আসতেন বৌদ্ধ বিহারে। পাঁচদিনের মতো গেরুয়া ধারণ করে আমি আবার গৃহী জীবনে ফিরে এলাম। এসময় আমাকে নাম দেওয়া হয়েছিলো তিস্স। বাবার প্রয়াণের সাতদিনের ভেতরে তাঁর শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা হলো। ভিক্ষু সঙ্ঘের সাথে আমিও কাষায় বস্ত্র পরিধান করে শ্রমণরূপে বাবার
সাত তারিখ ক্রিয়ার কর্মে বাড়িতে এসে আহার বা ফাং গ্রহণ করলাম। (চলবে)